শিরোনাম: কাঁকনমালা ও জোনাকির বিল
দ্বীপশিখা দে
দশম শ্রেণি, ভবনস্ ত্রিপুরা বিদ্যামন্দির
October 17, 2026
বহুকাল আগে, যখন নদীর জলে এখনকার মতো ক্লান্তি ছিল না, তখন বরেন্দ্রভূমির এক প্রান্তে ছিল ধানীপাড়া গ্রাম। সেই গ্রামে বাস করত কাঁকনমালা নামের এক কিশোরী। তার বাবা ছিলেন কুমোর, মা বুনতেন নকশিকাঁথা। তাদের ঘরে অভাব ছিল, কিন্তু ভালোবাসার অভাব ছিল না।
সে বছর আষাঢ়েও বৃষ্টি হলো না। মাঠ ফেটে চৌচির, পুকুর শুকিয়ে কাদা। গ্রামের মানুষের মুখে একটাই কথা — জোনাকির বিল যদি আবার জেগে ওঠে, তবেই বাঁচোয়া। কথিত ছিল, সেই বিলের তলায় ঘুমিয়ে আছে এক জলের দেবী, সে জাগলেই বৃষ্টি নামে।
কিন্তু কেউ জানত না তাকে জাগাবে কীভাবে।
এক রাতে কাঁকনমালা স্বপ্ন দেখল, এক বৃদ্ধা তাকে বলছে, "তুই যদি তোর সবচেয়ে প্রিয় জিনিসটা বিলের কাছে রেখে আসতে পারিস, দেবী জাগবে।"
কাঁকনমালার সবচেয়ে প্রিয় জিনিস ছিল তার মায়ের হাতে বানানো একটা ছোট্ট মাটির বাঁশি। সেই বাঁশি বাজালেই তার মন ভালো হয়ে যেত। সারারাত সে ভাবল। সকালে, কাউকে কিছু না বলে, সে বাঁশিটা নিয়ে শুকনো জোনাকির বিলের মাঝখানে গিয়ে রাখল।তারপর সে অপেক্ষা করল না, ফিরে এলো।
দুপুরে হঠাৎ আকাশ কালো করে এলো। দমকা হাওয়ায় ধুলো উড়ল। আর তারপর, বছরের প্রথম বৃষ্টি নামল ঝমঝমিয়ে। জোনাকির বিল জলে ভরে উঠল, আর সেই জলের ওপর হাজার হাজার জোনাকি জ্বলে উঠল একসাথে। মনে হচ্ছিল, বিলটা যেন আকাশের তারা নেমে এসে সাজিয়েছে।
গ্রামের মানুষ ছুটে এলো বিলের পাড়ে। তারা দেখল, জলের ঠিক মাঝখানে কাঁকনমালার সেই মাটির বাঁশিটা ভাসছে, আর তার থেকেই এক মিষ্টি সুর বের হচ্ছে আপনা-আপনি।
সেই থেকে ধানীপাড়ায় আর কখনও খরা হয়নি। আর প্রতি বর্ষায়, যখন জোনাকির বিল জলে ভরে, তখনও নাকি গভীর রাতে সেই বাঁশির সুর শোনা যায়। গ্রামের বুড়োরা বলে, ওটা কাঁকনমালার ত্যাগের সুর, যা জলকে জাগিয়ে রাখে, মানুষকে মনে করিয়ে দেয় — ভালোবাসা যখন নিঃস্বার্থ হয়, তখন প্রকৃতিও তার ডাকে সাড়া দেয়।
আরও পড়ুন...