ড্রাগ মুক্ত ত্রিপুরা, সবুজ ত্রিপুরা গড়তে, সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে, স্বেচ্ছা রক্তদানে, পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধিতে ক্লাবগুলিকে আরও এগিয়ে আসতে হবে : মুখ্যমন্ত্রী
নিজস্ব প্রতিবেদন
আগরতলা, অক্টোম্বর ৩০, : দুর্গোৎসব আজ জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সব অংশের মানুষের কাছে প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে। এবারের দুর্গাপূজা ও মায়ের গমন অনুষ্ঠানকে ঘিরে সারা রাজ্যে সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ ও উদ্দীপনা লক্ষ্য করা গেছে। এই উৎসব দিন দিন জাতি ও জনজাতি অংশের জনগণের মধ্যে ঐক্য, সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের বন্ধন আরও সুদৃঢ় করছে। এবছর দুর্গোৎসবকে কেন্দ্র করে জাতি জনজাতি অংশের মানুষের মধ্যে স্বতস্ফূর্ততা এবং সাংস্কৃতিক ঐক্যের বাতাবরণ তৈরী হয়েছে। ২৯ অক্টোবর রবীন্দ্র শতবার্ষিকী ভবনের ১নং হলে তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তর আয়োজিত শারদ সম্মান-২০২৬ অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করে মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর (ডা.) মানিক সাহা একথা বলেন।
শারদ সম্মান-২০২৬ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন আগরতলা পুরনিগমের মেয়র তথা বিধায়ক দীপক মজুমদার, অনুষ্ঠানের সভাপতি তথা রাজ্যভিত্তিক সাংস্কৃতিক উপদেষ্টা কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান সুব্রত চক্রবর্তী, তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরের সচিব কিরণ গিত্যে, অধিকর্তা বিম্বিসার ভট্টাচার্য প্রমুখ
অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, আরক্ষা প্রশাসন, তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তর, পূর্ত দপ্তর, আগরতলা পুরনিগম সহ বিভিন্ন ক্লাব, পূজা কমিটি, সামাজিক সংস্থার সহায়তায় এবছর রাজ্যে শারদ উৎসব শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছে। তিনি বলেন, আগে প্ৰতিমা নিরঞ্জনে এক আতঙ্কের পরিবেশ তৈরী হত। আজ সেদিন অতীত হয়ে গেছে। ত্রিপুরায় এখন শান্তিপূর্ণ পরিবেশ তৈরী হয়েছে। একে আরও সমন্বিত করতে হবে। তিনি বলেন, এবারের মায়ের গমন বা কার্নিভাল এর অন্যতম আকর্ষণ ছিল বিদেশী কূটনৈতিক প্রতিনিধিদের উপস্থিতি। এই প্রথম কয়েকটি দেশের দূতাবাস ও কূটনৈতিক পর্যায়ের উচ্চপদস্থ প্রতিনিধিগণ কার্নিভাল বা প্রতিমা নিরঞ্জনের বর্ণাঢ্য আয়োজন প্রত্যক্ষ করেছেন।
তাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন রাশিয়ান ফেডারেশনের কলকাতাস্থিত কনসাল্ট জেনারেল ম্যাক্সিম কোজলঙ, ভারতে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের সিনিয়র এডভাইজার ব্র্যাড ক্রোয়েগার, বাংলাদেশের সহকারি হাইকমিশনার হাসনে আল বাশার আব্দুল উলায়ে, ভারত সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রকের যুগ্ম সচিব কে কে নিরালা, সত্যজিৎ রায় ফিল্ম এন্ড টেলিভিশান ইনস্টিটিউটের উপাচার্য সন্তোষ আজমেরা প্রমুখ।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, আগামী বছর কার্নিভাল দেখার জন্য আরও বেশি দেশ ও বিদেশের অতিথিগণকে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য রাজ্য সরকার উদ্যোগ নেবে। এই ধরণের আয়োজনের মাধ্যমে বিদেশী অতিথিদের সঙ্গে সাংস্কৃতিক বিনিময়ের সুযোগ তৈরী হয়েছে। একই সঙ্গে রাজ্যের শিল্পীগণ ত্রিপুরার ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও পর্যটন ক্ষেত্রকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরার সুযোগ পেয়েছেন। বিদেশী অতিথিগণও রাজ্যের বিভিন্ন পর্যটনস্থল সম্পর্কে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। তিনি বলেন, ত্রিপুরার সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, দুর্গোৎসবের পরম্পরা এবং জাতি-জনজাতি অংশের মানুষের মধ্যে ঐক্য ও সম্প্রীতির বন্ধনকে আরও সুদৃঢ় করছে। এই কার্নিভালে ঐতিহ্যের সেই আবেগের সঙ্গে আধুনিক আয়োজন ও সৃজনশীলতার এক সুন্দর সমন্বয় ঘটেছে। স্থানীয় শিল্পী ও কারিগরগণ তাদের শৈল্পিক নৈপুন্য তুলে ধরার সুযোগ পেয়েছেন। এতে তাদের ক্ষুদ্র ব্যবসার উন্নতি সহ আর্থসামাজিক মান উন্নয়নও ঘটবে। তিনি বলেন, এই দুর্গোৎসবে সর্বস্তরের মানুষের স্বতস্ফূর্ত অংশগ্রহণ রাজ্যের সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করছে।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির স্বপ্নের আগরতলা লাইট হাউজ প্রকল্পের আজ দুটি টাউয়ারের উদ্বোধন করা হয়েছে। আজ ২৭৮টি পরিবারের এই আবাসে থাকার সংস্থান করা হয়েছে। এই লাইট হাউজে মোট ১ হাজার পরিবারের থাকার সংস্থান থাকবে। অবশিষ্ট আবাসনগুলির কাজ দ্রুত সম্পন্ন করতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, আজ রাজ্যে ই-টি নিলাম সেন্টারের উদ্বোধন করা হয়েছে। আগে ত্রিপুরার চায়ের নিলামের জন্য কলকাতা ও গুয়াহাটিতে যেতে হত। এতে ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ে উপকৃত হবেন। রুগ্ন চা বাগান আরও উজ্জীবিত হবে। তিনি উপস্থিত ক্লাব প্রতিনিধিদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, ড্রাগ মুক্ত রাজ্য গড়তে, সবুজ ত্রিপুরা গড়তে, সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে, স্বেচ্ছা রক্তদানে, পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধিতে ক্লাবগুলিকে আরও এগিয়ে আসতে হবে। তিনি শারদ সম্মানে যে ক্লাবগুলি বিজয়ী হয়েছে বা পুরস্কার পায়নি তাদের প্রতিনিধিদের অভিনন্দন জানান। তিনি এক ত্রিপুরা শ্রেষ্ঠ ত্রিপুরা গড়তে এক যোগে সকলকে কাজ করার আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে তথ্য ও সস্কৃতি দপ্তরের সচিব কিরণ গিত্যে বলেন, রাজ্যের স্থানীয় শিল্পী ও কারিগরদের প্রতিভা এবং শিল্প কৌশল প্রদর্শনের অন্যতম বড় মাধ্যম হল দুর্গোৎসব। এই উৎসব রাজ্যের সৃজনশীলতা এবং সামাজিক সম্প্রীতির একটি উজ্জ্বল প্রতিফলন। এবছর দুর্গোৎসবকে আরও আকর্ষনীয় করে তুলতে বিভিন্ন পূজা কমিটি, শিল্পী এবং সামাজিক সংগঠনগুলির অবদান ছিল প্রশংসনীয়। তিনি বলেন, দুর্গাপূজা আয়োজনে রাজ্যের ক্লাবগুলির শ্রেষ্ঠ প্রয়াসকে সম্মানিত করতে এবং তাদের সৃজনশীলতাকে স্বীকৃতি দিতেই এই শারদ সম্মান অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।
এই সম্মাননা কেবল একটি পুরস্কার নয়, বরং উৎসবের দিনগুলিতে পরিবেশ রক্ষা, আইন শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং শৈল্পিক উপস্থাপনার ক্ষেত্রে যৌথ প্রচেষ্টা ও শৃঙ্খলার একটি অনন্য প্রয়াস। আগামী দিনের দুর্গোৎসব এবং মায়ের গমন আনুষ্ঠান রাজ্যকে পর্যটনের একটি অন্যতম আকর্ষণের কেন্দ্রে পরিণত করবে। পাশাপাশি রাজ্যের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে আরও শক্তিশালী করবে।
এবছর মায়ের গমন ২০২৬ অনুষ্ঠানে প্রথম স্থান অধিকার করেছে আগরতলার শতদল সংঘ, দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেছে আগরতলার সংহতি ক্লাব এবং তৃতীয় স্থান অধিকার করেছে আগরতলার ব্লাড মাউথ ক্লাব। এছাড়া আজ শ্রেষ্ঠ প্রতিমা বিভাগে, শ্রেষ্ঠ মন্ডপসজ্জা বিভাগে, শ্রেষ্ঠ থিম বিভাগে এবং শ্রেষ্ঠ পরিবেশবান্ধব বিভাগে পশ্চিম জেলার ১৫টি ক্লাবকে শারদ সম্মান প্রদান করা হয়। পশ্চিম জেলা ছাড়া রাজ্যের অবশিষ্ট ৭টি জেলার ২৮টি ক্লাবকেও আজ শারদ সম্মান প্রদান করা হয়। অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী সহ অতিথিগণ বিজয়ী ক্লাবের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকদের হাতে ট্রফি, শংসাপত্র ও আর্থিক পুরস্কার তুলে দেন। আজকের এই শারদ সম্মান অনুষ্ঠানে বিভিন্ন ক্লাব, পূজা কমিটি, সামাজিক সংস্থার সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, সদস্য ও সদস্যাগণ উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরের পক্ষ থেকে শারদ সম্মান এবং মায়ের গমন- ২০২৬ এর বিষয়ে একটি তথ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়।
আরও পড়ুন...