মায়ের গমন অনুষ্ঠান ত্রিপুরার সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, দুর্গোৎসবের পরম্পরা এবং জাতি-জনজাতি অংশের মানুষের মধ্যে ঐক্য ও সম্প্রীতির বন্ধনকে আরও সুদৃঢ় করার বার্তা বহন করে : মুখ্যমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদন

আগরতলা, অক্টোম্বর ২৪, : বর্তমানে মায়ের গমন অনুষ্ঠান কেবল প্রতিমা নিরঞ্জনের শোভাযাত্রা নয়, এটি ত্রিপুরার রাজন্য ঐতিহ্য, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য, সম্প্রীতি ও সম্মিলিত সামাজিক চেতনার এক অনন্য প্রকাশ। এই ধরনের উদ্যোগের মধ্য দিয়ে রাজ্যের সাংস্কৃতিক পরিচিতিকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে আরও ব্যাপকভাবে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। ২৩ অক্টোবর মহারাণী তুলসীবতী উচ্চতর মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের সামনে বর্ণাঢ্য ‘মায়ের গমন ২০২৬' বা কার্নিভালের উদ্বোধন করে মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর (ডা.) মানিক সাহা একথা বলেন।

মুখ্যমন্ত্রী বলেন, এই অনুষ্ঠান ত্রিপুরার সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, দুর্গোৎসবের পরম্পরা এবং জাতি-জনজাতি অংশের মানুষের মধ্যে ঐক্য ও সম্প্রীতির বন্ধনকে আরও সুদৃঢ় করার বার্তা বহন করে। তিনি বলেন, আগরতলায় রাজন্য আমল থেকেই মহারাণী তুলসীবতী বালিকা বিদ্যালয়ের সামনের এই ঐতিহাসিক স্থান থেকে প্রতিমা নিরঞ্জনের শোভাযাত্রা বের হতো। সেই ঐতিহ্যকে সম্মান জানিয়ে বর্তমান সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ‘মায়ের গমন' বা কার্নিভালের আয়োজন করা হচ্ছে। অতীতে হয়তো আজকের মতো আধুনিক আলোকসজ্জা কিংবা উন্নত সাউন্ড সিস্টেম ছিল না, কিন্তু মানুষের আবেগ, ভক্তি ও স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল অত্যন্ত প্রাণবন্ত। আজকের এই কার্নিভালে ঐতিহ্যের সেই আবেগের সঙ্গে আধুনিক আয়োজন ও সৃজনশীলতার এক সুন্দর সমন্বয় ঘটেছে। তিনি বলেন, এই উদ্যোগ অল্প সময়ের মধ্যেই রাজ্যের বার্ষিক সাংস্কৃতিক কর্মসূচির অন্যতম আকর্ষণীয় অনুষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।

মুখ্যমন্ত্রী বলেন, দুর্গোৎসব এখন আর কেবল একটি ধর্মীয় উৎসবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর আবেদন সর্বজনীন এবং দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছে। ত্রিপুরায়ও দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে জাতি-জনজাতি নির্বিশেষে মানুষের অংশগ্রহণ ও উৎসাহ ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। সকল সম্প্রদায়ের মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এই উৎসবে শামিল হচ্ছেন, যা রাজ্যের সামাজিক সম্প্রীতি ও পারস্পরিক সৌহার্দ্যের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এই ঐক্য ও সম্প্রীতির পরিবেশকে আরও শক্তিশালী করে এক ত্রিপুরা, শ্রেষ্ঠ ত্রিপুরা গড়ে তোলার লক্ষ্যে সকলকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। এবারের ‘মায়ের গমন’ বা কার্নিভালের অন্যতম বিশেষ আকর্ষণ হলো বিদেশি কূটনৈতিক প্রতিনিধিদের উপস্থিতি। এই প্রথম বিভিন্ন দেশের দূতাবাস ও কূটনৈতিক পর্যায়ের উচ্চপদস্থ প্রতিনিধিগণ কার্নিভাল এবং প্রতিমা নিরঞ্জনের বর্ণাঢ্য আয়োজন প্রত্যক্ষ করতে আগরতলায় এসেছেন। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ত্রিপুরার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও মানুষের আন্তরিকতা প্রত্যক্ষ করার মধ্য দিয়ে বিদেশি অতিথিগণ রাজ্য সম্পর্কে আরও সম্যক ধারণা লাভ করতে পারবেন। এই প্রতিনিধিগণ ত্রিপুরার ইতিবাচক ভাবমূর্তি আন্তর্জাতিক স্তরে তুলে ধরার পাশাপাশি রাজ্যের শিল্প, সংস্কৃতি ও পর্যটনের সম্ভাবনাকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবেন বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

সম্প্রতি হাপানিয়ায় বিজনেস সামিটের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, রাজ্যে শিল্প ও পর্যটন ক্ষেত্রে বিনিয়োগের সম্ভাবনা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিদেশ থেকে আগত প্রায় ১০ জন বিনিয়োগকারীও ত্রিপুরায় শিল্প ও পর্যটন ক্ষেত্রে বিনিয়োগের বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। এই ধরনের সাংস্কৃতিক আয়োজনের মাধ্যমে রাজ্যের পরিচিতি আরও বিস্তৃত হওয়ার পাশাপাশি পর্যটনের বিকাশ ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের নতুন সুযোগ তৈরি হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

মুখ্যমন্ত্রী আরও বলেন, ২০১৮ সালের পর থেকে রাজ্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। বর্তমানে রাজ্যে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও আস্থার পরিবেশ বিরাজ করছে। এর ইতিবাচক প্রভাব দুর্গোৎসবের আয়োজন এবং সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণের মধ্যেও প্রতিফলিত হচ্ছে। পুজোর সংখ্যা বৃদ্ধি, উৎসবকে ঘিরে মানুষের উৎসাহ এবং সর্বস্তরের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ রাজ্যের সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করে। রাজ্যের এই শান্তিপূর্ণ পরিবেশ ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে কাজে লাগিয়ে ত্রিপুরাকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার উপর তিনি গুরুত্ব আরোপ করেন।

কার্নিভালের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী জানান, মহারাণী তুলসীবতী উচ্চতর মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের সামনে থেকে শুরু হওয়া প্রতিমাগুলির বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা জ্যাকসন গেট, পোস্ট অফিস চৌমুহনী, প্যারাডাইস চৌমুহনী ও বটতলা হয়ে দশমীঘাটে পৌঁছাবে। এই অনুষ্ঠানের সরাসরি সম্প্রচারের ব্যবস্থা করা হয়েছে, যাতে ত্রিপুরার পাশাপাশি দেশের অন্যান্য প্রান্তের মানুষও এই উৎসবের আনন্দ ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য প্রত্যক্ষ করতে পারেন। ঐতিহাসিক ঐতিহ্যকে অক্ষুন্ন রেখে আধুনিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অনুষ্ঠানটিকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলার এই উদ্যোগ রাজ্যের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

দুর্গাপূজা ও উৎসবকে শান্তিপূর্ণ, সুশৃঙ্খল ও সফলভাবে সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে রাজ্য প্ৰশাসন, আগরতলা পুর নিগম, পুলিশ, নিরাপত্তা বাহিনী, তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তর এবং দুর্যোগ মোকাবিলা দল সহ বিভিন্ন দপ্তরের ভূমিকার প্রশংসা করেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট সব দপ্তর ও সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ এবং আন্তরিক প্রচেষ্টার ফলেই এত বড় আয়োজন সুন্দরভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে। আগামীদিনেও রাজ্যের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও পরম্পরাকে অক্ষুন্ন রেখে এই ধরনের উদ্যোগকে আরও বৃহত্তর পরিসরে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ‘এক ত্রিপুরা, শ্রেষ্ঠ ত্রিপুরা' এবং ‘বিকশিত ভারত ২০৪৭'-এর ভাবনাকে সামনে রেখে সকলকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান মুখ্যমন্ত্রী।

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্যে মুখ্যমন্ত্রীর সচিব তথা তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরের সচিব কিরণ গিত্তে বলেন, মায়ের গমন অনুষ্ঠান ত্রিপুরার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক পরিচয়ে পরিণত হয়েছে। রাজ্যের কৃষ্টি, ঐতিহ্য এবং জাতি-জনজাতি অংশের মানুষের সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনকে তুলে ধরার পাশাপাশি স্থানীয় শিল্পী ও কারিগরদের প্রতিভা ও সৃজনশীলতা প্রকাশের ক্ষেত্রেও এই কার্নিভাল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তিনি জানান, এ বছর সরাসরি প্রায় দুই লক্ষাধিক মানুষ এবং ডিজিটাল মাধ্যমে ১০ লক্ষেরও বেশি দর্শক ও সাধারণ মানুষ এই অনুষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। এই বিপুল অংশগ্রহণ কার্নিভালের জনপ্রিয়তা ও পরিধিকে আরও বিস্তৃত করেছে। আগামীদিনে মায়ের গমনকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে আরও পরিচিত করে তোলার পাশাপাশি ত্রিপুরাকে একটি আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। রাজ্যের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করতে সকলকে এই ধরনের আয়োজনে অংশগ্রহণ করার আহ্বান জানান তিনি।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন রাশিয়ান ফেডারেশনের কলকাতাস্থিত কনসাল জেনারেল ম্যাক্সিম কোজলভ, ভারতে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের সিনিয়র অ্যাডভাইজার ব্র্যাড ক্রোয়েগার, বাংলাদেশের সহকারী হাইকমিশনার হাসান আল বাশার আবদুল উলায়ে, ভারত সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রকের যুগ্ম সচিব কে. কে. নিরালা এবং সত্যজিৎ রায় ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউটের উপাচার্য সন্তোষ আজমেরা। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন পর্যটন দপ্তরের মন্ত্রী সুশান্ত চৌধুরী, যুব বিষয়ক ও ক্রীড়া দপ্তরের মন্ত্রী টিঙ্কু রায়, সমবায় দপ্তরের মন্ত্রী শুক্লাচরণ নোয়াতিয়া, আগরতলা পুর নিগমের মেয়র তথা বিধায়ক দীপক মজুমদার, মুখ্য সচিব জে. কে. সিনহা, রাজ্য পুলিশের ভারপ্রাপ্ত মহানির্দেশক জি এস রাও, তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরের অধিকর্তা বিম্বিসার ভট্টাচার্য, রাজ্যভিত্তিক সাংস্কৃতিক উপদেষ্টা কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান সুব্রত চক্রবর্তী-সহ বিভিন্ন দপ্তরের উচ্চপদস্থ আধিকারিক, জনপ্রতিনিধি, বিভিন্ন ক্লাব ও সংগঠনের প্রতিনিধিগণ ।

আরও পড়ুন...


Post Your Comments Below

নিচে আপনি আপনার মন্তব্য বাংলাতেও লিখতে পারেন।

বিঃ দ্রঃ
আপনার মন্তব্য বা কমেন্ট ইংরেজি ও বাংলা উভয় ভাষাতেই লিখতে পারেন। বাংলায় কোন মন্তব্য লিখতে হলে কোন ইউনিকোড বাংলা ফন্টেই লিখতে হবে যেমন আমার বাংলা কিংবা অভ্রো কী-বোর্ড (Avro Keyboard)। আমার বাংলা কিংবা অভ্রো কী-বোর্ডের সাহায্যে মাক্রোসফট্ ওয়ার্ডে (Microsoft Word) টাইপ করে সেখান থেকে কপি করে কমেন্ট বা মন্তব্য বক্সে পেস্ট করতে পারেন। আপনার কম্পিউটারে আমার বাংলা কিংবা অভ্রো কী-বোর্ড বাংলা সফ্টওয়ার না থাকলে নিম্নে দেয়া লিঙ্কে (Link) ক্লিক করে ফ্রিতে ডাওনলোড করে নিতে পারেন।

Free Download Avro Keyboard

Fields with * are mandatory





Posted comments

Till now no approved comments is available.