গত অর্থবছরে রাজ্যের বিভিন্ন মহকুমায় ১,৫০০ কোটি টাকার বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্পের উদ্বোধন ও শিলান্যাস করা হয়েছে : মুখ্যমন্ত্রী
নিজস্ব প্রতিবেদন
আগরতলা, অক্টোম্বর ১৬, : ১৫ অক্টোবর খোয়াইয়ের সুভাষ পার্কের বইমেলা মাঠে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর (ডা.) মানিক সাহা গাড়ি পার্কিং করার সুবিধাযুক্ত বহুতল ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন এবং ভূমি পূজন করেন। একই সঙ্গে তিনি ভার্চুয়ালি ২১টি প্রকল্পের উদ্বোধন করেন। এই প্রকল্পগুলি রূপায়ণে ব্যয় হয়েছে ৩৮ কোটি ৭৩ লক্ষ টাকা।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ২০৪৭ সালের মধ্যে বিকশিত ভারত গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে রাজ্য সরকারও উন্নয়নমূলক কাজ করে যাচ্ছে। ২০১৮ সালের পর থেকে রাজ্যে নতুন কর্মসংস্কৃতির সৃষ্টি হয়েছে। গত অর্থবছরে রাজ্যের বিভিন্ন মহকুমায় ১,৫০০ কোটি টাকার বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্পের উদ্বোধন ও শিলান্যাস করা হয়েছে। এবছর এখন পর্যন্ত ১,২০০ কোটি টাকার বিভিন্ন প্রকল্পের উদ্বোধন ও শিলান্যাস করা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, খোয়াই জেলার উন্নয়নে রাজ্য সরকার ধারাবাহিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে। ২০২২ সালের ৬ ডিসেম্বর থেকে এখন পর্যন্ত খোয়াই জেলায় ৭১টি প্রকল্পের উদ্বোধন ও শিলান্যাস করা হয়েছে। আনুমানিক ব্যয় হচ্ছে ১ হাজার ৩৩ কোটি ৬২ লক্ষ টাকা। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত ১৯ প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছে। আরও ৫২টি প্রকল্পের কাজ চলছে। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, খোয়াই থেকে তেলিয়ামুড়া এবং তেলিয়ামুড়া থেকে সাব্রুমের হরিণা পর্যন্ত সড়কের জন্য ১৬০ কোটি ৭৯ লক্ষ টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। আগরতলা থেকে খোয়াই হয়ে কৈলাসহর পর্যন্ত রাস্তার জন্য ১১৫ কোটি ৮১ লক্ষ টাকার কাজ হাতে নেওয়া হয়েছে। গ্রামীণ সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে ১৬০ কোটি ৮৬ লক্ষ টাকা ব্যয় হয়েছে। নদীর ভাঙ্গন রোধ, জল সংরক্ষণ এবং চাষের জমি রক্ষায় ৯১ কোটি ৫৯ লক্ষ টাকা ব্যয়ে খোয়াই নদীর পাড়ে সিসি ব্লক স্থাপনের কাজ চলছে। পদ্মবিলে ৫০ কোটি ৮৬ লক্ষ টাকা ব্যয়ে একলব্য মডেল রেসিডেন্সিয়াল স্কুল নির্মাণ করা হয়েছে। তিনি জানান, সারা রাজ্যে ২১টি একলব্য মডেল স্কুল স্থাপনের অনুমোদন পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ১১টি স্কুলের কাজ শেষ হয়েছে। ১০০ শয্যাবিশিষ্ট খোয়াই জেলা হাসপাতালের কাজও শুরু হয়েছে। এজন্য ৪৫ কোটি ৪৬ লক্ষ টাকা ব্যয় হবে। বাচাইবাড়ি উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ১১ কোটি ৯৫ লক্ষ টাকা দেওয়া হয়েছে। চাম্পাহাওর থেকে তকছাইয়া এবং তুলাশিখর থেকে পশ্চিম রাজনগর রাস্তার উন্নয়নে ১৯ কোটি ৮৫ লক্ষ টাকা দেওয়া হয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, সম্প্রতি আগরতলায় অনুষ্ঠিত বিজনেস কনক্লেভে দেশী-বিদেশী প্রতিনিধিগণ রাজ্যে শিল্প স্থাপনে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। ইতিমধ্যে ১ লক্ষ ৩২ হাজার কোটি টাকার মৌ স্বাক্ষরিত হয়েছে।
রাজ্যের শান্তি শৃঙ্খলা অক্ষুন্ন রয়েছে বলেই এবং শিল্প স্থাপনের অনুকুল পরিবেশ থাকায় দেশ বিদেশের বিনিয়োগকারীরা ত্রিপুরায় বিনিয়োগ করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, রাজ্যে স্বাক্ষরতার হার ৯৫.৬ শতাংশ, যা সারা দেশের মধ্যে তৃতীয় স্থানে। বিভিন্ন বিদ্যালয়ে পরিকাঠামো উন্নয়নে ১১৭৮ কোটি টাকারও বেশি ব্যয় করা হয়েছে। তাতে ২ ১৩টি বিদ্যালয়ের পরিকাঠামো উন্নত হয়েছে। ভিবিজি রামজী প্রকল্পে গত ১ জুলাই থেকে এখন পর্যন্ত ৮৩ লক্ষ ৪৮ হাজার শ্রম দিবস সৃষ্টি হয়েছে। ইতিমধ্যেই রাজ্যের ৮৬.৬ শতাংশ বাড়িতে পরিশ্রুত পানীয়জলের সংযোগ দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনায় ৩ লক্ষ ৭৬ হাজার পরিবারকে পাকা বাড়ি নির্মাণ করে দেওয়া হয়েছে। নগর এলাকায় ৭৬ হাজার ৭৭১টি বাড়ি নির্মাণের কাজ শেষ হয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, মহিলাদের ক্ষমতায়ণে এবং তাদের স্বনির্ভর করে তুলতে তাদের স্বসহায়ক দলের সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত রাজ্যের ১ লক্ষের উপর মহিলা লাখপতি দিদি হয়েছেন। রাজ্যের স্বাস্থ্য পরিষেবার উন্নতির কথা উল্লেখ করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, রাজ্যের রোগীদের চিকিৎসার জন্য বহির্রাজ্যে যাওয়ার সংখ্যা প্রায় ৮০ শতাংশ কমে গেছে। রাজ্যে চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নতি হওয়ায় রোগীরা রাজ্যেই বিভিন্ন জটিল রোগের চিকিৎসা করাতে পারছেন। বিভিন্ন হাসপাতালে পরিকাঠামো উন্নত ও আধুনিক করা হচ্ছে। পাশাপাশি শয্যা সংখ্যা আগের তুলনায় অনেক বাড়ানো হয়েছে। বিভিন্ন জেলা হাসপাতাল ও মহকুমা হাসপাতালেও চিকিৎসা পরিষেবার অগ্রগতি হয়েছে। বর্তমানে রাজ্যে বিভিন্ন মেডিক্যাল কলেজের এমবিবিএস পড়ার জন্য ৫৫০টি সিট রয়েছে। বিডিএস পড়ার জন্য ৬৩টি, বিএসসি নার্সিং পড়ার জন্য ৫০টি আসন রয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী হোমিওপ্যাথ মেডিক্যাল কলেজ, আয়ুর্বেদিক মেডিক্যাল কলেজ স্থাপনের কথাও তুলে ধরেন।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিধানসভার সরকার পক্ষের মুখ্যসচেতক বিধায়ক কল্যাণী সাহা (রায়), বিধায়ক পিনাকী দাস চৌধুরী, খোয়াই জিলা পরিষদের সভাধিপতি অপর্ণা সিংহ রায় (দত্ত) প্রমুখ। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন খোয়াই পুর পরিষদের চেয়ারপার্সন দেবাশিস নাথ শর্মা। এছাড়াও অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সমাজ কল্যাণ ও সমাজশিক্ষা দপ্তরের বিশেষ সচিব তপন কুমার দাস, বিদ্যালয় শিক্ষা দপ্তরের অধিকর্তা ড. সমিত রায় চৌধুরী, এসপি বি জে রেড্ডি। স্বাগত বক্তব্য রাখেন খোয়াই জেলার জেলাশাসক রজত পন্থ। অনুষ্ঠান শেষে মুখ্যমন্ত্রী লালছড়া মহাশ্মশানে নতুন বৈদ্যুতিক চুল্লি উদ্বোধন করেন এবং বৃক্ষরোপন করেন। এর পর তিনি জেলাশাসক কার্যালয় প্রাঙ্গণে জেলা স্বচ্ছতা মেসকট মোতিহাতির প্রতিকৃতির আবরণ উন্মোচন করেন।
এদিকে, খোয়াই জেলায় ২১টি উন্নয়নমূলক প্রকল্পের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের অঙ্গ হিসেবে আশারামবাড়ি উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে মুখ্যমন্ত্রীর অনুষ্ঠানের সরাসরি ভিডিও সম্প্রচার এবং জনসংযোগ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন বনমন্ত্রী অনিমেষ দেববর্মা। মুখ্যমন্ত্রী ২১টি উন্নয়নমূলক প্রকল্পের অঙ্গ হিসেবে আশারামবাড়ি উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ে তিনটি নবনির্মিত ক্লাসরুম এবং তিনটি নবনির্মিত ল্যাবরেটরি, তুলাশিখর ব্লকের বেহালাবাড়ি দ্বাদশ শ্রেণি বিদ্যালয় সংলগ্ন ৫০ আসন বিশিষ্ট নবনির্মিত ছাত্রী আবাস, তুলাশিখর ব্লকের পিএম-শ্রী ভারত সর্দার উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নবনির্মিত স্কুল বিল্ডিং-এরও ভার্চুয়ালি উদ্বোধন করেন। এগুলি নির্মাণের জন্য ব্যয় হয় প্রায় ১০ কোটি ৮৬ লক্ষ টাকা। আশারামবাড়ি বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বনমন্ত্রী বলেন, আশারামবাড়ি বিধানসভা এলাকার জন্য আজ গর্বের দিন এবং তিনি এজন্য রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান। বনমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন এলাকার ছাত্রছাত্রীরা এই বিদ্যালয়ে পড়াশুনা করে নিজেরা প্রতিষ্ঠিত হবে এবং তাদের এলাকার এবং রাজ্যের সম্মান বৃদ্ধি করবে।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন খোয়াই জেলার অতিরিক্ত জেলাশাসক অভেদানন্দ বৈদ্য। অনুষ্ঠানে বিশিষ্টদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন খোয়াই জেলার জেলা পঞ্চায়েত আধিকারিক উত্তম দাস বৈষ্ণব, তুলাশিখর ব্লকের সমষ্টি উন্নয়ন আধিকারিক বিশ্ব দেববর্মা, বিশিষ্ট সমাজসেবী স্মরণজিৎ দেববর্মা, জয়ন্ত দেববর্মা, রাজেশ দেববর্মা প্রমুখ। এই অনুষ্ঠানে তুলাশিখর ব্লকের স্ব-সহায়ক দলের সদস্যারা তাদের নির্মিত ফুলের টব ও খোয়াই জেলা প্রশাসনের স্বচ্ছতা মিশনের প্রতীক অতিথিদের হাতে তুলে দেন।
আরও পড়ুন...