রাজ্যে স্বাস্থ্য পরিকাঠামো সম্প্রসারণের পাশাপাশি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এবং উন্নত চিকিৎসা পরিষেবার সুযোগ বাড়ানো হচ্ছে : মুখ্যমন্ত্রী
নিজস্ব প্রতিবেদন
আগরতলা, অক্টোম্বর ১২, : হিমোফিলিয়া ‘এ’ আক্রান্ত রোগীদের উন্নত চিকিৎসা পরিষেবা নিশ্চিত করতে ত্রিপুরায় শুরু হল অত্যাধুনিক এমিসিজুমাব প্রফিল্যাক্সিস চিকিৎসা। রাজ্য সরকার সম্পূর্ণ বিনামূল্যে এই চিকিৎসা পরিষেবা প্রদান করবে। এর ফলে রোগীদের চিকিৎসাজনিত কষ্ট কমার পাশাপাশি তাঁদের জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে। আগরতলার নার্সিং কলেজ, এজিডিসি ও আইজিএম কমপ্লেক্সে-র অডিটোরিয়ামে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এই চিকিৎসা পরিষেবার শুভ সূচনা করে একথা বলেন মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর (ডাঃ) মানিক সাহা।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, হিমোফিলিয়া আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার ক্ষেত্রে অতীতে নানা সমস্যা ছিল। বিশেষ করে ফ্যাক্টর এইট বাইরে থেকে সংগ্রহ করা এবং নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করে রাখা অত্যন্ত কঠিন ছিল। এর ফলে রোগী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের অনেক অসুবিধার সম্মুখীন হতে হতো। দীর্ঘদিন ধরে হিমোফিলিয়া সোসাইটির সঙ্গে যুক্ত থাকার সুবাদে তিনি এই সমস্যাগুলি খুব কাছ থেকে দেখেছেন। এমিসিজুমাব চিকিৎসা চালু হওয়ায় রোগীদের বারবার ইনজেকশন নেওয়ার প্রয়োজন কমবে এবং চিকিৎসা আরও সহজ হবে। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে এই ওষুধ প্রয়োগ করা হবে।
অনুষ্ঠানে প্রতীকীভাবে মুখ্যমন্ত্রী নিজ হাতে এক হিমোফিলিয়া ‘এ’ আক্রান্ত রোগীকে এমিসিজুমাব ইনজেকশন প্রয়োগ করে এই চিকিৎসা পরিষেবার আনুষ্ঠানিক সূচনা করেন। চিকিৎসক হিসেবে নিজের দীর্ঘ কর্মজীবনের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, দীর্ঘদিন পর আবার নিজের হাতে ইনজেকশন প্রয়োগ করতে পেরে তাঁর পুরনো দিনের কথা মনে পড়ে গেল।
হিমোফিলিয়া একটি বংশগত রক্তক্ষরণজনিত রোগ। হিমোফিলিয়া 'এ'-এর ক্ষেত্রে রক্ত জমাট বাঁধার জন্য প্রয়োজনীয় ফ্যাক্টর এইটের ঘাটতি থাকে, অন্যদিকে হিমোফিলিয়া 'বি'-এর ক্ষেত্রে ফ্যাক্টর নাইনের ঘাটতি দেখা যায়। এই রোগে আক্রান্তদের আঘাত লাগলে দীর্ঘক্ষণ রক্তপাত হতে পারে এবং কখনও কখনও শরীরের অভ্যন্তরেও রক্তক্ষরণ ঘটে। তাই সময়মতো রোগ শনাক্তকরণ ও উপযুক্ত চিকিৎসা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মুখ্যমন্ত্রী জানান, বর্তমানে রাজ্যে ৯৭ জন হিমোফিলিয়া ‘এ' এবং ১৩ জন হিমোফিলিয়া ‘বি' আক্রান্ত রোগী নথিভুক্ত রয়েছেন। তবে যথাযথ স্ক্রিনিংয়ের মাধ্যমে আক্রান্তের প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। এই রোগীদের চিকিৎসার জন্য রাজ্য সরকার বছরে প্রায় ৫ থেকে ৬ কোটি টাকা ব্যয় করছে। আইজিএম হাসপাতালকে এই পরিষেবার নোডাল কেন্দ্র হিসেবে রাখা হয়েছে। পাশাপাশি, প্রয়োজন অনুযায়ী জেলা হাসপাতালগুলিতেও চিকিৎসা পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যাতে রোগীদের চিকিৎসার জন্য দূরে যেতে না হয়।
রাজ্যের স্বাস্থ্য পরিষেবার উন্নয়নে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, রোগ প্রতিরোধ, টিকাকরণ, পুষ্টি এবং স্বাস্থ্য সচেতনতার উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। গত ১০ থেকে ২৫ আগস্ট রাজ্যে হাম-রুবেলা টিকাকরণ কর্মসূচিতে শতভাগ লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়েছে। ‘মাস্কা' কর্মসূচির বিভিন্ন পর্যায়েও নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা পূরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, অ্যালবেনডাজল, আয়রন-ফলিক অ্যাসিড এবং টিডি টিকাকরণের মতো কর্মসূচির মাধ্যমে শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় কাজ চলছে। বিদ্যাজ্যোতি প্রকল্পের ১২৫টি বিদ্যালয়ের প্রায় ৯০ হাজার পড়ুয়ার স্বাস্থ্য পরীক্ষাও করা হয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রী আরও বলেন, রাজ্যে স্বাস্থ্য পরিকাঠামো সম্প্রসারণের পাশাপাশি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এবং উন্নত চিকিৎসা পরিষেবার সুযোগ বাড়ানো হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী জন বিকাশ কার্যক্রমের অধীনে সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকায় মেডিক্যাল কলেজ স্থাপনের উদ্যোগ, ধলাই জেলায় বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ গড়ে তোলার পরিকল্পনা এবং জিবিপি হাসপাতাল ও মেডিক্যাল কলেজে সুপার স্পেশালিটি পরিষেবার সম্প্রসারণের মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, নেশামুক্তি কেন্দ্র ও পুনর্বাসন পরিষেবার উন্নয়নেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রী জন আরোগ্য যোজনার মাধ্যমে যোগ্য পরিবারগুলিকে পাঁচ লক্ষ টাকা পর্যন্ত নগদহীন চিকিৎসার সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। রাজ্যে উন্নত চিকিৎসার সুযোগ বাড়ার ফলে বহির্রাজ্যে চিকিৎসার জন্য যাওয়ার প্রয়োজনও আগের তুলনায় কমেছে।
তিনি বলেন, “প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ ভালো এবং কম ব্যয়সাপেক্ষ।” তাই রোগ প্রতিরোধে সচেতনতা বৃদ্ধি, সময়মতো রোগ শনাক্তকরণ এবং সকলের কাছে উন্নত চিকিৎসা পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার উপর গুরুত্ব দিতে হবে। সুস্থ সমাজ গড়ে তোলা এবং ২০৪৭ সালের মধ্যে উন্নত ভারত গড়ার লক্ষ্যে রাজ্য সরকার স্বাস্থ্য পরিষেবার উন্নয়নে ধারাবাহিকভাবে কাজ করে চলেছে বলে তিনি জানান।
অনুষ্ঠানে হিমোফিলিয়া বিষয়ক রাজ্যস্তরীয় কারিগরি কমিটির চেয়ারম্যান ডাঃ সঞ্জীব কুমার দেববর্মা স্বাগত বক্তব্য রাখেন। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য সচিব কিরণ গিত্তে, স্বাস্থ্য অধিকর্তা ডাঃ দেবশ্রী দেববর্মা, আইজিএম হাসপাতালের সুপারিনটেনডেন্ট ডাঃ নির্মল সরকার এবং হিমোফিলিয়া সোসাইটির নোডাল অফিসার ডাঃ মৃণাল দাস প্রমুখ।
আরও পড়ুন...