ত্রিপুরায় এডিসি-র হাতে যাচ্ছে জমির অধিকার, দিল্লির সিদ্ধান্তে উদ্বিগ্ন বাঙালিরা, ক্ষোভ বাড়ছে বিজেপির অন্দরেও
নিজস্ব প্রতিবেদন
আগরতলা, সেপ্টেম্বর ৩, : ত্রিপুরার রাজনীতিতে ফের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। আসন্ন টিটিএএডিসি ভিলেজ কাউন্সিল নির্বাচনকে ঘিরে বিজেপি ও তিপ্রামথার মধ্যে সম্ভাব্য রাজনৈতিক সমঝোতার খবর সামনে আসতেই রাজ্যের বাঙালি সমাজের একাংশের মধ্যে গভীর উদ্বেগ ও আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে এডিসি এলাকায় জমি, প্রশাসনিক ক্ষমতা এবং রাজনৈতিক অধিকারের প্রশ্নে সম্ভাব্য সিদ্ধান্ত নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে নানা প্রশ্ন উঠছে। একইসঙ্গে, বিজেপির অন্দরেও এই সম্ভাব্য সমঝোতা নিয়ে অনেক নেতা-কর্মীর মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে বলে রাজনৈতিক সূত্রের দাবি।
উচ্চপর্যায়ের সূত্রের দাবি, আগামী ৪ সেপ্টেম্বর দিল্লিতে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের উপস্থিতিতে বিজেপি ও তিপ্রামথার মধ্যে বৃহত্তর রাজনৈতিক বোঝাপড়া নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হতে পারে। মুখ্যমন্ত্রী মানিক সাহা ও মুখ্যসচিব জে কে সিনহা আজ দিল্লি যাচ্ছেন।
তিপ্রামথা প্রধান প্রদ্যোত কিশোর মাণিক্য দেববর্মাও আলোচনায় উপস্থিত থাকতে পারেন বলে সূত্রের খবর। দলের রঞ্জিত দেববর্মা ও বৃহিষকেতু দেববর্মার নামও সম্ভাব্য অংশগ্রহণকারী হিসেবে উঠে আসছে।
তবে এই সম্ভাব্য সমঝোতা শুধুমাত্র ভিলেজ কাউন্সিল নির্বাচনে আসন সমঝোতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না বলেই রাজনৈতিক মহলের ধারণা। সূত্রের দাবি, ত্রিপাক্ষিক চুক্তির প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে টিটিএএডিসিকে আরও বেশি প্রশাসনিক ও আর্থিক ক্ষমতা দেওয়ার বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে। এর মধ্যে এডিসি এলাকার জমি ও অন্যান্য সম্পদের উপর আরও বেশি নিয়ন্ত্রণ, এডিসি-কে সরাসরি অর্থ বরাদ্দ, প্রশাসনিক ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আদিবাসী ভাষা ও সংস্কৃতির সুরক্ষার মতো বিষয় থাকতে পারে। বাড়তে পারে বিধানসভার উপজাতিদের সংরক্ষিত আসনের সংখ্যা। কিন্ত বাঙ্গালীদের মধ্যে
সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি হয়েছে জমির অধিকার নিয়ে। রাজনৈতিক সূত্রে এমন দাবি সামনে এসেছে যে এডিসির অভ্যন্তরে জমি সংক্রান্ত ক্ষমতা আরও ব্যাপক ভাবে স্বশাসিত জেলা পরিষদের হাতে তুলে দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। যদিও এই বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনও ঘোষণা হয়নি এবং বিভিন্ন দাবি নিয়ে সরকারি স্পষ্টীকরণও প্রয়োজন, তবুও সম্ভাব্য পরিবর্তনের খবরকে ঘিরে এডিসির অভ্যন্তরে বসবাসকারী অ-উপজাতি, বিশেষ করে বাঙালি পরিবার গুলির মধ্যে ভবিষ্যৎ নিয়ে উৎকণ্ঠা বাড়ছে।
বহু মানুষের প্রশ্ন তৈরী হয়েছে, যদি জমি ক্রয়-বিক্রয়, খাস জমি হস্তান্তর এবং খাস ভূমি বন্টন ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে এডিসির হাতে চলে যায়, তাহলে এডিসি এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে বসবাসকারী অ-উপজাতি পরিবার গুলির জমির অধিকার ও ভবিষ্যৎ কী হবে? তাঁদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত থাকবে? নতুন কোনও বিধিনিষেধ এলে সাধারণ মানুষের উপর তার প্রভাব কী হবে? এই প্রশ্ন গুলির উত্তর এখনও স্পষ্ট নয়।
এরই মধ্যে রাজনৈতিক মহলে এমন কথাও ছড়িয়েছে যে ত্রিপুরার প্রায় ৭০ শতাংশ ভূখণ্ডের সঙ্গে সম্পর্কিত ভূমি-প্রশাসনিক ক্ষমতার একটি বড় অংশ এডিসির হাতে চলে যেতে পারে। তবে এই দাবির সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক কাঠামো কী হবে, কোন কোন জমি এর আওতায় পড়বে এবং অ-উপজাতিদের বর্তমান অধিকার কীভাবে সুরক্ষিত থাকবে, এসব বিষয়ে চূড়ান্ত সরকারি নথি বা ঘোষণা না আসা পর্যন্ত নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো সম্ভব নয়।
তবুও এডিসি-র ভিলেজ কাউন্সিল ভোটের মুখে রাজনৈতিক আবহে আশঙ্কার মাত্রা কমছে না। ত্রিপুরার বাঙালি সমাজের একাংশের মধ্যে এমন অনুভূতি তৈরি হয়েছে যে, ক্ষমতার বৃহত্তর রাজনৈতিক সমীকরণে তাঁদের স্বার্থ যেন উপেক্ষিত না হয়। বহু মানুষের কাছে এটি শুধু ভোটের সমঝোতার প্রশ্ন নয়, এটি তাঁদের বসতভিটা, জমি, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এবং ত্রিপুরায় তাঁদের সামাজিক অবস্থানের সঙ্গে জড়িত একটি আবেগের বিষয়।
বিজেপির অন্দরেও পরিস্থিতি নিয়ে অসন্তোষের খবর পাওয়া যাচ্ছে। দলের কিছু নেতা-কর্মী মনে করছেন, সিপিএমকে ক্ষমতাতে না আসতে দিতে গিয়ে এবং তিপ্রামথার সঙ্গে বৃহত্তর রাজনৈতিক সমঝোতা করতে গিয়ে যদি এমন কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যার ফলে অ-উপজাতি ভোটারদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা বা বঞ্চনার অনুভূতি তৈরি হয়, তাহলে তার রাজনৈতিক মূল্য বিজেপিকেই দিতে হতে পারে। বিশেষ করে দীর্ঘদিন ধরে বিজেপির সঙ্গে থাকা বাঙালি ভোটব্যাঙ্কের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হলে ২০২৮ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তার প্রভাব পড়তে পারে বলে তাঁদের আশঙ্কা।
অন্যদিকে, বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছে তিপ্রামথার সঙ্গে সমঝোতার রাজনৈতিক গুরুত্বও যথেষ্ট। ২০২৩ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পর ত্রিপুরার রাজনীতিতে তিপ্রামথার পাশাপাশি গত কয়েক বছরে সিপিএম একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে উঠে এসেছে। সিপিএমও এডিসি এলাকায় তাদের সাংগঠনিক ও জনভিত্তি দ্রুত বাড়াচ্ছে। ফলে আসন্ন ভিলেজ কাউন্সিল নির্বাচনে বিজেপি একা লড়াইয়ের ফল আশানুরূপ হবে না। এই আশংকা থেকে শুরু করে ২০২৮ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে সিপিএম - এর ক্রমাগত শক্তির মহড়া শেষ পর্যন্ত বিজেপির দিল্লির নেতৃত্বকে এমন চরম সিদ্ধান্তে মুখে নিয়ে গেছে। এবং তিপ্রামথার সাথে আসন ভাগাভাগির একটি দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরির চেষ্টা চলছে।
২৮ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হতে চলেছে টিটিএএডিসি ভিলেজ কমিটি নির্বাচন। মোট ৫৮৭টি ভিলেজ কমিটির ৪,৫৯৯টি আসনে নির্বাচন হবে এবং ৫ অক্টোবর হবে গণনা। এত বিপুল সংখ্যক আসনের নির্বাচনকে সামনে রেখে বিজেপি ও তিপ্রামথা উভয় দলই সম্ভাব্য প্রার্থী বাছাই ও সাংগঠনিক প্রস্তুতি শুরু করেছে বলে সূত্রের খবর। চূড়ান্ত সমঝোতা হলে স্থানীয় স্তরে উভয় দলের সাংগঠনিক শক্তি ও প্রার্থীর জয়ের সম্ভাবনা বিবেচনা করে আসন ভাগাভাগি হতে পারে।
এই সমঝোতার ভবিষ্যৎ আরও বড় রাজনৈতিক সম্ভাবনার ইঙ্গিতও দিচ্ছে। সূত্রের দাবি, ত্রিপাক্ষিক চুক্তি বাস্তবায়নের একটি বৃহত্তর কাঠামো তিনটি পর্যায়ে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা থাকতে পারে এবং ২০২৮ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগেই গুরুত্বপূর্ণ দাবি গুলি বাস্তবায়নের চেষ্টা হতে পারে। এর পাশাপাশি বিধানসভা ও লোকসভায় উপজাতি প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধির দাবিও আলোচনায় রয়েছে বলে জানা যাচ্ছে, যদিও এই ধরনের পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সাংবিধানিক ও আইনি প্রক্রিয়া অপরিহার্য।
আর এখানেই ত্রিপুরার রাজনীতির সবচেয়ে আবেগঘন প্রশ্নটি সামনে এসেছে, যার জন্য রাজনৈতিক সমীকরণ বদলাবে, কিন্তু সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও অধিকার কি অক্ষুণ্ণ থাকবে?
দিল্লির সিদ্ধান্তের দিকে এখন তাকিয়ে ত্রিপুরা। বাঙালি সমাজের একাংশের মনে প্রশ্ন উঠেছে, রাজনৈতিক সমঝোতার মূল্য কি তাঁদেরই দিতে হবে? তাঁদের বসত ভিটা, জমি এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে কি নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হবে? একই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন বিজেপির অনেক নেতা-কর্মীও।
৪ সেপ্টেম্বর দিল্লিতে কী সিদ্ধান্ত হয়, সেটিই এখন ত্রিপুরার রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ সেই সিদ্ধান্ত শুধু বিজেপি ও তিপ্রামথার সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে না, ত্রিপুরার বহু মানুষের মনে নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, তারও অনেকটাই নির্ভর করবে সেই সিদ্ধান্তের উপর।
আরও পড়ুন...