ত্রিপুরার পাহাড় অঞ্চলে প্রথম মেডিকেল কলেজ : এক নয়া ইতিহাস

নিজস্ব প্রতিবেদন

আগরতলা, ২৫ , : ত্রিপুরার ইতিহাসে ২৪ আগস্ট,২০২৬ দিনটি একটি স্মরণীয় দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। এই প্রথম ত্রিপুরার রাজ্য রাজধানী আগরতলার বাইরে, তাও আবার একটি প্রত্যন্ত পাহাড়ি অঞ্চলে একটি নতুন মেডিকেল কলেজ গড়ে উঠতে ভিত্তিপ্রস্তর স্হাপিত হবার গৌরব অর্জন করল। কারণ স্বাধীনতার পর বা ত্রিপুরার ভারত ভুক্তির পর থেকে এ রাজ্যে যা কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো গড়ে উঠবে,তা শুধুমাত্র আগরতলা কেন্দ্রিক-,এই যে একটা ট্র্যাডিশন চলে আসছিল-সেই মিথ ও রেকর্ডকে ভেঙে দিয়ে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মানিক সাহা জনজাতি অধ্যুষিত ধলাই জেলার আমবাসার লালছড়িতে একটি পূর্ণাঙ্গ মেডিকেল কলেজ গড়ে তোলার ছাড়পত্রের সূচনা করে দিয়ে রাজ্যে একটা নতুন চিন্তাচেতনার সূচনা করলেন।

সম্ভবতঃ ডাঃ মানিক সাহাই এ রাজ্যের একজন ব্যতিক্রমী মুখ্যমন্ত্রী, যিনি প্রথম রাজ্য রাজধানীর বাইরে দু'দুটি মেডিকেল কলেজ হবার ছাড়পত্র দিলেন।ক'দিন আগে উদয়পুরে একটি আয়ুর্বেদিক মেডিকেল কলেজের শিলান্যাস হয়ে গেছে।আর গত ২৪ আগস্ট রাজ্যে প্রথম বারের মতো আগরতলার বাইরে তাও আবার একটি জনজাতি অধ্যুষিত অঞ্চলে একটি মেডিকেল কলেজের শিলান্যাস করলেন।

এরাজ্যে যারা রাজধানী আগরতলার বাইরে বসবাস করেন- তাদের চিন্তাচেতনায় গ্রোথিত রয়েছে- বরাবরই রাজ্যে যা কিছু ভালো পরিকাঠামো গড়ে উঠবে- তা শুধুমাত্র শহর আগরতলা বা শহরতলী আগরতলা কেন্দ্রীক।এর বাইরে অন্য কিছু ভাবনার মধ্যে কখনো রাজধানী আগরতলার রাজনৈতিক নেতা ও নীতি নির্ধারকদের কাছ থেকে সার্বিক ত্রিপুরার উন্নয়ন ও সম বিকাশ কখনোই রাজ্যবাসী লক্ষ্য করেনি।এ ক্ষেত্রে আগরতলার কংগ্রেস ও কমিউনিষ্ট নেতারা যখনই এ রাজ্য শাসন করার সুযোগ পেয়েছে- তাদের সেই দৃষ্টিভঙ্গীর পরিচয় রাজ্যবাসী বরাবরই লক্ষ্য করেছে।যা কিছু উন্নতমানের ভালো কিছু হবে- তা আগরতলায়।

সেই দিক থেকে বলা যায় মুখ্যমন্ত্রী ডাঃ মানিক সাহা অবশ্যই ব্যতিক্রমী।তিনিই প্রথম ক'দিন আগে উদয়পুরের মফঃস্বলে আয়ুর্বেদিক কলেজের ছাড়পত্র দেন।আর এবার একটি মেডিকেল কলেজ গড়ে তুলতে আমবাসার লালছড়িতে ছাড়পত্র দেন।

মুখ্যমন্ত্রী মানিক সাহার আমলে দেখতে দেখতে ত্রিপুরায় পাঁচ পাঁচটি মেডিকেল কলেজের ছাড়পত্র পাওয়া হয়ে গেল রাজ্যবাসীর।এরমধ্যে আগরতলার মহেশখলা অঞ্চলে গড়ে উঠেছে শান্তিনিকেতন মেডিকেল কলেজ।শহর আগরতলায় হয়ে গেছে ডেন্টাল মেডিকেল কলেজ।আগামী দুই বৎসরের মধ্যে উদয়পুরে গড়ে উঠবে আয়ুর্বেদিক কলেজ।আগরতলার সাধু টিলায় গড়ে উঠছে হোমিওপ্যাথি মেডিকেল কলেজ।আর রাজ্যের প্রথম কোন জেলা স্তরের ধলাইতে গড়ে উঠবে এবার এইচ পি ঘোষ মেমোরিয়েল মেডিকেল কলেজ।এই পাঁচটি মেডিকেল কলেজের পাশাপাশি মানিক সাহার হাত ধরেই ইতিমধ্যে শহর আগরতলায় গড়ে উঠেছে একটি সিভিল হাসপাতাল।আর ইতিমধ্যে রাজ্যের জি বি হাসপাতাল সংলগ্ন অঞ্চলে আলাদা করে একটি আই হসপিটাল বা চক্ষু হাসপাতাল ও গড়ে উঠতে ইতিমধ্যে

তারও শিলান্যাস হয়ে গেছে।সেই হিসেবে মুখ্যমন্ত্রী ডাঃ মানিক সাহার আমলে স্বাস্হ্য পরিষেবা ও স্বাস্হ্য শিক্ষায় রীতিমতো উল্লেখযোগ্য কিছু কাজ করা হয়েছে।

এবারে আসা যাক- কিছু অন্য বিষয়ে।ব্যাক্তিগতভাবে এবং অনেক অভিজ্ঞ মানুষের অভিমত- ধলাইর আমবাসায় নতুন এই মেডিকেল কলেজটি গড়ে উঠলেই যে ঐ অঞ্চলের মানুষ বিশেষত রোগীদের সামগ্রিক লাভ হয়ে পড়বে বিষয়টা কিন্তু এমন নয়।একটি মেডিকেল কলেজ গড়ে ওঠা মানেই কিছু ছাত্রছাত্রীর পড়াশুনার সুযোগ সম্প্রসারণ অবশ্যই ঘটবে। কিন্তু একটি মেডিকেল কলেজের যেসব উন্নত ও সর্বাধুনিক স্বাস্হ্য পরিষেবার সকল প্রকারের সুযোগ থাকার কথা- তার যদি ঠিকমতো না থাকে তাহলে এতে কিছু ডাক্তার হয়তো তৈরি হবে, কিন্তু আপামর রোগীরা ভালো চিকিৎসা পরিষেবার সুযোগ না পেলে ঐ মেডিকেলে যাবে কেন?

তাছাড়া উত্তর ও ঊনকোটি জেলার রোগীদের কাছে অত্যন্ত উন্নতমানের ও ভালো স্বাস্হ্য পরিষেবার জন্য অনেক অভিজ্ঞ ও পুরোনো শিলচর মেডিকেল কলেজ পাশাপাশি প্রচুর ও অত্যন্ত হাইফাই ব্যবস্হায় প্রচুর বেসরকারি নার্সিং হোম কাছাকাছি শিলচর শহরে থাকতে কেন ধলাই জেলায় দৌড়বে- এ প্রশ্ন কিন্তু থাকছেই।উত্তর- ঊনকোটি জেলার এমন কি ধলাই জেলাবাসীও শিলচরের উপর এখনো নির্ভরশীল।

শিলচর শহরের দিকে ঝুঁকে থাকা এ রাজ্যের বিশেষতঃ ঊনকোটি ও উত্তর জেলার রোগীদের আটকে দিতে এই নতুন মেডিকেল কলেজটি কুমারঘাট অঞ্চলে গড়ে উঠলে সব দিক থেকে ভালো হতো।এতে লাভবান হতে পারতো ত্রিপুরা।কেননা- শহর ধর্মনগর ও কুমারঘাটের খুব কাছাকাছি অঞ্চল হল আসামের করিমগঞ্জ বা শ্রীভূমি জেলার পাথারকান্দি,বদরপুর, হাইলাকান্দি এইসব অঞ্চল।এসব অঞ্চলের রোগীরা তখন কুমারঘাটে পরিষেবাটা নিতে আসতে পারতো।এতে ত্রিপুরায় অন্য রাজ্য থেকে বেশকিছু অর্থ এ রাজ্যে আসতে পারতো।ত্রিপুরাই একমাত্র ব্যাতিক্রমী রাজ্য-যেখানে প্রতি বছর রাজ্যের লক্ষ কোটি টাকা শুধু চিকিৎসার জন্য বাইরের রাজ্যে চলে যায়।সেদিক থেকে এ রাজ্যে কিন্তু বহিঃরাজ্য থেকে একজন রোগীও এখানে চিকিৎসা করাতে আসেন না।ফলে বাইরের অর্থ এ রাজ্যে প্রবেশ করতে পারেনা। নতুন এইচ পি ঘোষ বেসরকারি মেডিকেল কলেজটি কুমারঘাট অথবা ধর্মনগর অঞ্চলে গড়ে উঠলে কাছাড়- করিমগঞ্জ জেলার রোগীরা চিকিৎসার জন্য এ রাজ্যে আসার সুযোগ ঘটত বলে অভিজ্ঞ মহলের মত।

একটা বেসরকারি মেডিকেল কলেজ গড়ে উঠলে বেশকিছু ছেলেমেয়ের পড়ার সুযোগ হয়তো বাড়বে। কিন্তু মালিক শ্রেণীর ব্যবসাটাও কিন্তু ঝেড়ে ফেলে দেবার মতো বিষয়ও নয়।আজকাল সকলেই জানে- একটি বেসরকারি মেডিকেলে একটি ছাত্রের পড়াশুনায় অনেক ক্ষেত্রেই এখন প্রায় কোটি টাকা খরচ হয়ে পড়ছে বলে একটা সর্বত্র বাতাস ও আলোচনা রয়েছে।তাই মালিক শ্রেনী হয়তো মেডিকেল কলেজ তৈরি করে বেশ কিছু ডাক্তার তৈরি করে দেবে। কিন্তু এলাকার রোগীদের কল্যাণে যেসব পরিষেবা বা অভিজ্ঞ চিকিৎসক ঠিক কতখানি সেভাবে পাওয়া যাবে- এই বিষয়টিকে কিন্তু অধিক গুরুত্ব দিতে হবে।

বড় বড় অট্টালিকা সম স্বাস্হ্য ভবন গড়ে উঠলেই নামে মেডিকেল কলেজ হলেই চিকিৎসা ব্যবস্হার চূড়ান্ত উন্নত পরিষেবার সুযোগ না থাকলে কিন্তু আর যাই হোক- রোগীদের স্বাস্হ্যের উন্নতি ঘটবে না। ফলে,ধলাইতে একটি মেডিকেল কলেজ গড়ে উঠলেও কার্যতঃ যদি সেই শিলচর নির্ভরশীল থাকতে হয়- তাহলে এই নতুন কলেজ এ অঞ্চলের অধিবাসীদের বিশেষ কোন উপকারে আসবে বলে মনে হয়না।

আগরতলা মেডিকেল কলেজ ও টিএমসি মেডিকেল কলেজের মতো সর্ব সুবিধাযুক্ত একটি পূর্ণাঙ্গ স্বাস্হ্য পরিকাঠামো ও অভিজ্ঞ চিকিৎসক ফেকাল্টি সমৃদ্ধ

মেডিকেল কলেজ গড়ে উঠতে হবে এই ঘোষ মেমোরিয়েল মেডিকেল কলেজটিকে।

রাজ্যের জনজাতিদের মন পেতে জনজাতি অধ্যুষিত অঞ্চলে রাজ্যে প্রথমবারের মতো একটি নতুন মেডিকেল কলেজ গড়ে তুলে রাজ্য সরকার একদিকে যেমন জনজাতি উন্নয়নে গুরুত্বের বিষয়টিকে যেমন তুলে ধরতে চেয়েছেন,তেমনি আসন্ন পাহাড়ে ভিলেজ কমিটি ভোটের মুখে নতুন কলেজের শিলান্যাস এখন ক্ষমতাসীন দলকে কতটা মাইলেজ দেয়- সেটাই এখন দেখার।

তবে রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে সরে এসেও এটিই শেষ কথা- রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ডাঃ মানিক সাহার আন্তরিকতায় কিন্তু কোথাও কোন খাদ নেই- এটা হলফ করেই বলা যায়।

তাই- নতুনকে নিয়ে বেশি আলোচনার চাইতে তার ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার দিকেই আমাদের মূল ফোকাসটা থাকুক।

আরও পড়ুন...


Post Your Comments Below

নিচে আপনি আপনার মন্তব্য বাংলাতেও লিখতে পারেন।

বিঃ দ্রঃ
আপনার মন্তব্য বা কমেন্ট ইংরেজি ও বাংলা উভয় ভাষাতেই লিখতে পারেন। বাংলায় কোন মন্তব্য লিখতে হলে কোন ইউনিকোড বাংলা ফন্টেই লিখতে হবে যেমন আমার বাংলা কিংবা অভ্রো কী-বোর্ড (Avro Keyboard)। আমার বাংলা কিংবা অভ্রো কী-বোর্ডের সাহায্যে মাক্রোসফট্ ওয়ার্ডে (Microsoft Word) টাইপ করে সেখান থেকে কপি করে কমেন্ট বা মন্তব্য বক্সে পেস্ট করতে পারেন। আপনার কম্পিউটারে আমার বাংলা কিংবা অভ্রো কী-বোর্ড বাংলা সফ্টওয়ার না থাকলে নিম্নে দেয়া লিঙ্কে (Link) ক্লিক করে ফ্রিতে ডাওনলোড করে নিতে পারেন।

Free Download Avro Keyboard

Fields with * are mandatory





Posted comments

Till now no approved comments is available.