রাজ্য সরকার রাজ্যের জনগণের সর্বাঙ্গীণ আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্য নিরলসভাবে কাজ করে চলেছে : অর্থমন্ত্রী
নিজস্ব প্রতিবেদন
আগরতলা, মার্চ ১৭, : বিভিন্ন বিকাশকেন্দ্রিক উদ্যোগের মধ্যে কিছু উল্লেখযোগ্য ক্ষেত্র, যেমন- পরিকাঠামো সুদৃঢ়করণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, স্বাস্থ্য ও পর্যটন ক্ষেত্রে উন্নয়ন ইত্যাদির মাধ্যমে ত্রিপুরা সরকার রাজ্যের জনগণের সর্বাঙ্গীণ আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্য নিরলসভাবে কাজ করে চলেছে। চলতি বছরের কেন্দ্রীয় বাজেট দৃঢ় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য একটি শক্ত ভিত্তি স্থাপন করেছে। এতে পরিকাঠামো উন্নয়ন, ডিজিটাল রূপান্তর ও গ্রামীণ ক্ষমতায়ন এবং বিশেষত যোগাযোগ ব্যবস্থা, পরিবহণ, পর্যটন ও লজিটিকস ক্ষেত্রে উন্নয়নের উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। এর ফলে উত্তর পূর্ব ভারত উল্লেখযোগ্যভাবে উপকৃত হবে এবং এ অঞ্চলের মানুষের আকাঙ্ক্ষা ও বাস্তবায়নের ব্যবধান দূর করতে এই কেন্দ্রীয় বাজেট অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে। গত ১৬ মার্চ, ২০২৬ বিধানসভায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেট পেশ করে অর্থমন্ত্রী প্রণজিৎ সিংহরায় একথা বলেন। বাজেট পেশ করতে গিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, কৃষিকাজ ত্রিপুরার গ্রামীণ অর্থনীতির মেরুদণ্ড এবং রাজ্যের প্রায় ৪ লক্ষ ৭২ হাজার মানুষ কৃষির উপর নির্ভরশীল। প্রাকৃতিক দুর্যোগের হাত থেকে কৃষকদের সুরক্ষার লক্ষ্যে ৯৬ হাজার জন কৃষকের উৎপাদিত ফসলকে প্রধানমন্ত্রী ফসল বীমা যোজনার অধীনে আনা হয়েছে। স্বল্পমেয়াদি ঋণের মাধ্যমে কৃষকদের সহায়তার জন্য ৪৫ হাজার ৭৮০টি কিষাণ ক্রেডিট কার্ড প্রদান করা হয়েছে এবং ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে মোট ২৫৭ কোটি ১৪ লক্ষ টাকার সহজ ঋণ বিতরণ করা হয়েছে। পশ্চিম ত্রিপুরার মোহনপুরে Agriculture Farm Machinery Promotion and Training Institute স্থাপনের প্রস্তাব করছি, যার জন্য ৮ কোটি ৯২ লক্ষ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে গবাদি পশু ও পাখির টিকাকরণে রাজ্য সরকার একটি স্পেশাল ড্রাইভ অভিযান গ্ৰহণ করেছে। ৮৭ লক্ষ ৫১ হাজার গবাদিপশুকে টিকাকরণ করা হয়েছে। এম.ভি.ইউ. কর্মসূচির আওতায় ১,২০৩টি স্বাস্থ্য শিবির আয়োজিত হয়েছে, যেখানে ৯৫ হাজার ৬৫০টি পশু এবং ২ লক্ষ ১৭ হাজার ২০৬টি পাখির চিকিৎসা করা হয়েছে। রাজ্যে দুধ উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে মোহনপুর মহকুমার বামুটিয়া আর.ডি. ব্লকে চল্লিশ হাজার লিটার ক্ষমতা সম্পন্ন দুগ্ধ প্রক্রিয়াকরণ ইউনিট স্থাপন করা হয়েছে। ২০২৩-২৪ সালের সুমারির রিপোর্ট অনুযায়ী মোট ২ লক্ষ সাতচল্লিশ হাজার ৩১০ মেট্রিকটন দুধ উৎপাদিত হয়েছে এবং দৈনিক মাথাপিছু দুধের প্রাপ্তির পরিমাণ ১৬৩.৩৮ গ্রাম। ত্রিপুরাকে মাছ উৎপাদন এবং মাছের পোনা উৎপাদনে স্বনির্ভর করে তুলতে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। 2025-26 অর্থবছরে মুখ্যমন্ত্রী মৎস্য বিকাশ যোজনার অধীনে ১৪ হাজার চারশো ১৮ জন বেনিফিসিয়ারিকে বিভিন্ন উপকরণ সরবরাহ করা হয়েছে এবং এই খাতে ৬ কোটি ৬৭ লক্ষ টাকা ব্যয় করা হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, আগরতলার গোর্খাবস্তিতে একটি ত্রিপুরা রাজ্য মৎস্য সচেতনতা কেন্দ্র স্থাপন করা হবে, যার জন্য ১২ কোটি ৬৮ লক্ষ টাকা বরাদ্দ করা হবে। এছাড়া কুমারঘাট, কমলপুর, সাব্রুম ও বিলোনীয়াতে মৎস্যচাষ জ্ঞান কেন্দ্র স্থাপনের প্রস্তাব রয়েছে, যার জন্য চার কোটি পঁয়তাল্লিশ লক্ষ টাকা ব্যয় বরাদ্দ ধরা হয়েছে। সমগ্র শিক্ষা অভিযানের অধীনে ১২৫টি নতুন শ্রেণিকক্ষ নির্মাণ করা হয়েছে এবং ৩৪৫টি পুরোনো শ্রেণিকক্ষ সংস্কার করা হয়েছে। পাশাপাশি ১ হাজার ৫৬টি ছাত্রছাত্রীদের শৌচাগার নির্মাণ এবং ৪ হাজার ২৩৮টি নিরাপদ পানীয়জলের সংস্থান করা হয়েছে, যার ফলে একটি শিশুবান্ধব ও নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ তৈরি হয়েছে। পি.এম. পোষণ প্রকল্পের আওতায় ৪ লক্ষ ১০ হাজার জন ছাত্রছাত্রীকে পুষ্টিকর মধ্যাহ্ন আহার প্রদান করা হয়েছে, যা বিদ্যালয়ে ছাত্রছাত্রীদের উপস্থিতি বাড়াতে এবং শিশু কিশোরদের পুষ্টি সুনিশ্চিত করতে সহায়তা করেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে নবম শ্রেণির ৪১ হাজার ৮০০ জন ছাত্রীকে সাইকেল বিতরণ করা হচ্ছে, যাতে তাদের বিদ্যালয়ে যাতায়ত সহজ হয় এবং বিদ্যালয়ে উপস্থিতির হার বাড়ে। RIDF-এর অধীনে ৭৯ কোটি ৬৩ লক্ষ টাকা ব্যয়ে ১২টি উচ্চ ও উচ্চতর মাধ্যমিক বিদ্যালয় পুনর্নির্মাণের প্রস্তাব করছি। ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে রাজ্য সরকার নলছড়ে একটি নতুন মহিলা মহাবিদ্যালয়ের স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে তার একাডেমিক কার্যক্রম শুরু হবে। তাছাড়া আমবাসা, কাকড়াবন ও করবুকে নবনির্মিত তিনটি সরকারি ডিগ্রি কলেজে একাডেমিক কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
তিনি বলেন, রাজ্যের ছেলেমেয়েরা ৬৯তম ন্যাশনাল স্কুল গেমসে অংশগ্রহণ করে জিমন্যাস্টিক্সে ৯টি, জুডোতে ৩টি, যোগায় ২টি, কুরাশে ৬টি, থাং-তায় ২টি পদক অর্জন করেছে। আগরতলায় অবস্থিত নেতাজি সুভাষ রিজিওন্যাল কোচিং সেন্টারে ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি নতুন ইন্ডোর জিমন্যাসিয়াম হল নির্মাণ করা হবে এবং রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে ২০টি ওপেন জিমন্যাসিয়াম স্থাপন করা হবে, যার জন্য ২ কোটি ব্যয় ধার্য করা হয়েছে। বাধারঘাটস্থিত দশরথ দেব স্টেট স্পোর্টস কমপ্লেক্সে ৩০ হাজার আসন বিশিষ্ট গ্যালারি নির্মাণ করা হবে এবং এর জন্য ৫৭ কোটি টাকা বরাদ্দ ধরা হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে ত্রিপুরার ককবরক এবং অন্যান্য ৭টি সংখ্যালঘু ভাষার উন্নয়নের জন্য রাজ্য সরকার উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। ককবরক ভাষার জন্য প্রথম শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত একটি সুশৃঙ্খল ও সময়োপযোগী পাঠক্রম এবং পাঠ্যপুস্তক প্রস্তুত করা হয়েছে। গারো, বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ও মণিপুরী প্রভৃতি সংখ্যালঘু ভাষার পাঠ্যপুস্তক পর্যালোচনা ও পাঠ্যক্রম উন্নীতকরণের কাজ চলছে। আই.এম.এ.-এ (মাদার’এর মণিপুরী অনুবাদ) এবং জো তাওয়াং গ্রামারের মতো বই প্রকাশিত হয়েছে। পাশাপাশি ককবরক, কুকি, মিজো, চাকমা, মণিপুরী এবং বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরীতেও বেশ কিছু বই প্রকাশের কাজ চলছে। আধুনিক চিকিৎসা পরিকাঠামোর উন্নয়নের মাধ্যমে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা হচ্ছে। ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে আয়ুষ্মান ভারত প্রধানমন্ত্রী জন আরোগ্য যোজনার (এ.বি.-পি.এম.জে.এ.ওয়াই.) আওতায় ১ লক্ষ ১৪ হাজার ১৩২ জন রোগী ক্যাশলেস চিকিৎসার সুবিধা পেয়েছেন। এছাড়া চিফ মিনিস্টার জন আরোগ্য যোজনার অধীনে ৪৩ হাজার ৯৭৫ জন রোগী ক্যাশলেস চিকিৎসার সুবিধা গ্রহণ করেছেন।
রাজ্যের মোট ১ হাজার ১৩৯টি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের মধ্যে ৫২৮টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র (৪৬.৩৬ শতাংশ) ন্যাশনাল কোয়ালিটি অ্যাসুরেন্স স্ট্যান্ডার্ডস (এনকোয়াস)-এর অধীনে স্বীকৃতি লাভ করেছে, যা সারা দেশের মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ অর্জন। ধলাই জেলা হাসপাতালে একটি ক্রিটিক্যাল কেয়ার ব্লক স্থাপন করা হবে। তেলিয়ামুড়া, খোয়াই ও বিশ্রামগঞ্জে ট্রমা কেয়ার সেন্টার স্থাপন করা হবে, যাতে দুর্ঘটনাজনিত ও জরুরিকালীন রোগীদের দ্রুত চিকিৎসা পরিষেবা প্রদান করা যায়। রাজ্য সরকার গোমতী জেলায় একটি আয়ুর্বেদিক মেডিক্যাল কলেজ এবং আগরতলাস্থিত নেতাজি সুভাষ রাজ্য হোমিওপ্যাথি হসপিটালে একটি হোমিওপ্যাথিক মেডিক্যাল কলেজ স্থাপনের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এই কলেজগুলিতে বছরে ৬০ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হবে। এই লক্ষ্যে ভারত সরকারের আয়ুষ মন্ত্রক ১৪০ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে। কলেজগুলি আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে কার্যক্রম শুরু করবে। তাছাড়া ত্রিপুরায় স্বাস্থ্য বিজ্ঞান শিক্ষার স্বার্থে ত্রিপুরা ইউনিভার্সিটি অব হেলথ সায়েন্সেস স্থাপন করা হবে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, রাজ্য সরকার রাজ্যের বিভিন্ন জনজাতি সম্প্রদায়ের আর্থ-সামাজিক অবস্থার পাশাপাশি শিক্ষা ও জীবিকার মানোন্নয়নে ধারাবাহিকভাবে বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করছে। ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে রাজ্য সরকার ৪০৭টি জনজাতি হোস্টেলে বসবাসকারী ৩৩ হাজার ৬৩৫ জন ছাত্রছাত্রীকে বোর্ডিং হাউস স্টাইপেন্ড প্রদান করেছে। বোর্ডিং ভাতা প্রতিদিন প্রতি শিক্ষার্থীর জন্য ৮০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১০০ টাকা করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন, যা ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাস থেকে কার্যকর হয়েছে। নবম ও দশম শ্রেণির ১২ হাজার ৩৬ জন শিক্ষার্থীকে প্রাক প্রাথমিক বৃত্তি এবং ৩২ হাজার ৩০৭ জন শিক্ষার্থীকে উচ্চমাধ্যমিক বৃত্তি প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া ৬ হাজার ৮০৪ জন শিক্ষার্থীকে মেধা পুরস্কার এবং ৭৪৬ জন জনজাতি শিক্ষার্থীকে এককালীন আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। তাছাড়া বিনামূল্যে পাঠ্যবই প্রকল্পের আওতায় ১১ হাজার ৩৭০ জন জনজাতি শিক্ষার্থী আর্থিক সাহায্য পেয়েছে। ৪০৮টি কেন্দ্রের মাধ্যমে ১০ হাজার ১২২ জন জনজাতি আবাসিক ছাত্রছাত্রীকে বিশেষ কোচিং এবং প্রাথমিক স্তরের পরিপূরক শিক্ষার অধীনে ৯ হাজার ৮৬০ জন শিক্ষার্থীকে কোচিং প্রদান করা হয়েছে। রাজ্যের ১০০টি জনজাতি হোস্টেলে স্মার্ট ক্লাস স্থাপন করা হয়েছে। পাশাপাশি ৬টি একলব্য মডেল রেসিডেন্সিয়াল স্কুলের উদ্বোধন করা হয়েছে এবং কার্যক্রম শুরু করেছে। জুমচাষ সাহায্য প্রকল্পের অধীনে ২ হাজার ১৫৩টি চিরাচরিত জুমিয়া পরিবারকে জুমচাষের বীজ সরবরাহ করা হয়েছে। চিফ মিনিস্টার্স রাবার মিশনের মাধ্যমে ৮০৬ জন বেনিফিসিয়ারির জন্য মোট ২২০০০.০৯ হেক্টর নতুন রাবার বাগান স্থাপন করা হয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষে রাজ্য সরকার ত্রিপুরা উপজাতি এলাকা স্বশাসিত জেলা পরিষদের জন্য মোট ৯১৪ কোটি ৮২ লক্ষ টাকা প্রদান করবে। তাছাড়া এই বরাদ্দের বাইরেও টি.টি.এ.এ.ডি.সি.-র সার্বিক পরিকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য আর.আই.ডি.এফ. ও এস.এ.এস.সি.আই-র অধীনে অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ থাকবে। ট্রাইবেল সাবপ্ল্যান অর্থাৎ টি.এস.পি.র আওতায় মোট বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৭৫৪২.০৬ কোটি টাকা, যা রাজ্যের মোট উন্নয়ন খাতের ব্যয়ের প্রায় ৩৯.৩৯ শতাংশ। ট্রাইবেল সাবপ্ল্যানের আওতাভুক্ত অধিকাংশ অর্থরাশি টি.টি.এ.এ.ডি.সি. এলাকায় ব্যয় হবে।
_অর্থমন্ত্রী বলেন, ত্রিপুরার তপশিলি জাতিভুক্ত জনগোষ্ঠীর সার্বিক উন্নয়নে রাজ্য সরকার দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে সংশ্লিষ্ট বিভাগটি সরাসরি ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণিতে পাঠরত ১৩ হাজার ২৮৫ জন তপশিলি জাতিভুক্ত ছাত্রছাত্রীকে প্রি-মেট্রিক বৃত্তি প্রদান করেছে এবং এ খাতে ৫৩ লক্ষ ১৪ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। নবম ও দশম শ্রেণির ৫ হাজার ৭২৫ জন ছাত্রছাত্রীকে ২৪ লক্ষ ৭ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তার মাধ্যমে প্রিমেট্রিক বৃত্তি প্রদান করা হবে। তাছাড়া ১০ হাজার ৫২০ জন তপশিলি জাতিভুক্ত ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে ৩২৮ লক্ষ ৩৩ হাজার টাকা ব্যয়ে পোস্টমেট্রিক বৃত্তি প্রদান করা হয়েছে। পাশাপাশি ৬ হাজার ৯ জন তপশিলি জাতিভুক্ত ছাত্রছাত্রীকে ড. বি.আর. আম্বেদকর মেরিট অ্যাওয়ার্ড প্রদান করা হয়েছে। ২০২৬- ২৭ অর্থবর্ষে আনুমানিক ২০ হাজার জন শিক্ষার্থীকে ২ কোটি টাকার আর্থিক সহায়তার মাধ্যমে প্রিমেট্রিক বৃত্তি (ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণি), আনুমানিক ৭ হাজার ৬৬১ জন শিক্ষার্থীকে ২ কোটি ৭৩ লক্ষ টাকার আর্থিক সহায়তার মাধ্যমে প্রিমেট্রিক বৃত্তি (নবম ও দশম শ্রেণি) প্রদান করা হবে। তাছাড়া প্রায় ২২ হাজার ৫৭ জন শিক্ষার্থীকে ৬৯ কোটি ৫৫ লক্ষ ৮৪ হাজার টাকার আর্থিক সহায়তায় পোস্টমেট্রিক বৃত্তি এবং ৮ হাজার ২০০ জন শিক্ষার্থীকে ড. বি.আর. আম্বেদকর মেরিট অ্যাওয়ার্ড প্রদান করা হবে, যার জন্য ৮০ লক্ষ টাকার বরাদ্দ রয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এন.এস.পি. পোর্টালের মাধ্যমে আনুমানিক ২২ হাজার জন ওবিসি শিক্ষার্থীকে পোস্টমেট্রিক বৃত্তি প্রদান করা হবে। এছাড়া আনুমানিক ৭ হাজার ৫০০ জন ওবিসি শিক্ষার্থীকে এন.এস.পি. পোর্টালের মাধ্যমে প্রিমেট্রিক বৃত্তি প্রদান করা হবে। ১৭২ জন অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল কিন্তু মেধাবী শিক্ষার্থীকে এককালীন ১ লক্ষ টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনাও করা হয়েছে। বর্তমানে সদ্য চালু হওয়া চিফ মিনিস্টার্স স্কিম ফর মেন্টালি চ্যালেঞ্জড পার্সনস সহ ৩৫টি ভিন্ন ভিন্ন সামাজিক পেনশন প্রকল্পের অধীনে ৩ লক্ষ ৮৭ হাজার জন বেনিফিসিয়ারি সামাজিক সুরক্ষা পেনশন পাচ্ছেন।
অর্থমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা গ্রামীণের অধীনে (পি.এম.এ.ওয়াই.জি.) ৩ লক্ষ ৭৬ হাজারেরও বেশি পাকা বাড়ি গ্রামীণ পরিবারগুলিকে প্রদান করা হয়েছে এবং ১১ মার্চ ২০২৬ ইং তারিখ পর্যন্ত পি.এম. জনমনের অধীনে রিয়াং পরিবারগুলিকে ১৭ হাজার ২১৫টি পাকা বাড়ি প্রদান করা হয়েছে। এম.জি.এন.আর.ই.জি.এ.-এর অধীনে গ্রামীণ এলাকায় ৫৫১ কিলোমিটার রাস্তা (ব্রিক সলিং, পেভার ব্লক, সিমেন্টের কংক্রিট রাস্তা) এবং ২৫৫টি কালভার্ট / ক্রস ড্রেনেজ নির্মাণ করা হয়েছে। এম.জি.এন.আর.ই.জি.এ.-এর অধীনে গ্রামীণ পরিবারসমূহের জন্য ২ কোটি ৫৫ লক্ষ শ্রমদিবস সৃষ্টি করা হয়েছে। ১১ মার্চ, ২০২৬ পর্যন্ত এই প্রকল্পে ৭৬৩ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৮০টি নতুন পঞ্চায়েত ভবন নির্মাণাধীন রয়েছে এবং ভবনপিছু বিয়াল্লিশ লক্ষ টাকা ব্যয় করা হচ্ছে। এই ভবনসমূহ আরও ফলপ্রসূভাবে পরিষেবা প্রদানে সহায়তা করবে। ৫৮টি ব্লক পঞ্চায়েত রিসোর্স সেন্টারের উন্নয়ন কাজের জন্য প্রতিটি কেন্দ্রে চার লক্ষ ২০ হাজার টাকা ব্যয় সহযোগে আপগ্রেডেশন কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়েছে। রাজ্যে বর্তমানে আইন-শৃঙ্খলার পরিস্থিতি ও অপরাধদমন চিত্রে যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে। ডাকাতি, চুরি, খুন, দাঙ্গা, নারী নির্যাতন, মাদক সংক্রান্ত অপরাধ, সাইবার জনিত অপরাধ এবং আর্থিক প্রতারণার মতো বিষয়গুলিতেও রাজ্যে অপরাধের হার যথেষ্ট নিম্নমুখী।
পুলিশ বিভাগের কঠোর ব্যবস্থা এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে রাজ্যে সড়ক দুর্ঘটনার হার যথেষ্ট হারে হ্রাস পেয়েছে। বিভিন্ন জেলা সদর ও রাজ্য সদর দপ্তরে পুলিশ কর্মীদের জন্য আবাসন নির্মাণেরও প্রস্তাব রাখছি। তদুপরি এস.পি. / অ্যাডিশনাল এস.পি. অফিস ও তাদের আবাসনের নতুন নির্মাণ ও উন্নয়নের জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। রাজ্যে শিল্পের উন্নয়ন, উদ্যোক্তা বিকাশ, নীতিগত সংস্কার ও পরিকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে বিনিয়োগ বান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করার লক্ষ্যে রাজ্য সরকার নিরলস প্রয়াস অব্যাহত রেখেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে আগরতলায় অনুষ্ঠিত ডেস্টিনেশন ত্রিপুরা-বিজনেস কনক্লেভ এবং নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত রাইজিং নর্থ ইস্ট ইনভেস্টমেন্ট সামিটে রাজ্য ১৫ হাজার ৮০০ কোটি টাকার বিনিয়োগ করার প্রস্তাব গ্রহণ করেছে। এরমধ্যে গত ১ বছরে ৫ হাজার ২২ কোটি টাকার ৯১টি বিনিয়োগ প্রকল্প বাস্তবায়নের পর্যায়ে এসেছে। সম্প্রতি উচ্চবিনিয়োগের প্রবণতাকে কাজে লাগাতে ২০২৬ সালের মে মাসে ডেস্টিনেশন ত্রিপুরা বিজনেস মিট ২০২৬ আয়োজন করা হবে।
তিনি বলেন, হস্তশিল্পের উন্নয়নের জন্য ১৩টি নতুন ক্লাস্টার গঠন করা হয়েছে। বিভিন্ন ক্লাস্টারে ১২টি সচেতনতা কর্মসূচি আয়োজন করা হয়েছে, যার মাধ্যমে ১,২০০ জন কারিগর উপকৃত হয়েছেন। এছাড়া ১,৩৭৫টি টুল কিট বিভিন্ন কারিগরের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে আগরতলার ইন্দ্রনগরে একটি হ্যান্ডলুম মিউজিয়াম এবং ট্রেনিং সেন্টার সহ হ্যান্ডলুম ভবন নির্মাণ করা হবে। কেন্দ্রীয় পর্যটন মন্ত্রকের প্রসাদ প্রকল্পের অধীনে উদয়পুরের মাতা ত্রিপুরাসুন্দরী মন্দিরের উন্নয়ন কার্য সুসম্পন্ন হয়েছে গত ২০২৫ সালের ২২ সেপ্টেম্বর মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হাত ধরে তার উদ্বোধন হয়েছে। উদয়পুরের বনদুয়ারে ৯৭ কোটি ৭০ লক্ষ টাকা ব্যয়ে ৫১টি শক্তিপীঠের প্রতিরূপ / রেপ্লিকা নির্মাণ করা হয়েছে। রাজ্য সরকারের গঠনমূলক ও ইতিবাচক উদ্যোগের ফলে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে (ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ পর্যন্ত) পর্যটকদের আগমন বেড়ে ৬ লক্ষ ৫০ হাজার ৭৭২ জন হয়েছে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে সেই সংখ্যাটি ছিলো ৫ লক্ষ ২৯ হাজার ৮১৫ জন। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ডম্বুর লেকে একটি হাউস বোট চালু করা হবে। উদয়পুরের অমরসাগর লেকে ৪০ কোটি টাকা ব্যয় করে ওয়াটার ফ্রন্ট উন্নয়নের কাজ হবে এবং ৩০ কোটি টাকা ব্যয় করে ডম্বুরে টুইন আইল্যান্ডস উন্নয়ন কার্য সাধিত হবে। ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষে ১৩ কোটি টাকা ব্যয়ে ব্রহ্মকুন্ডকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে উন্নয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। ২০২৫- ২৬ অর্থবছরে চারশো চল্লিশ কিলোমিটার সড়কের নির্মাণ ও উন্নয়ন সম্পন্ন হয়েছে। ২5.80 কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের আগরতলা পশ্চিম বাইপাস, ১৩৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের খোয়াই, তেলিয়ামুড়া, হরিনা জাতীয় সড়ক এবং ১৯ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য সম্পন্ন চম্পকনগর থেকে খয়েরপুর পর্যন্ত চার লেন রাস্তার নির্মাণ কাজ বর্তমানে চালু রয়েছে। চুরাইবাড়ি থেকে আগরতলা এবং আগরতলা থেকে উদয়পুর পর্যন্ত এন.এইচ.-৮-এর চার লেন করার কার্য, আগরতলা পূর্ব বাইপাস এবং উদয়পুর থেকে অমরপুর পর্যন্ত নতুন সংযোগ সড়কের ডি.পি.আর. প্রস্তুতির প্রাথমিক কাজ বর্তমানে চলছে। ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষে ৯৮০ কিলোমিটার জেলা সড়কের নির্মাণ ও উন্নয়ন এবং আটটি আর.সি.সি. সেতুর কাজ গ্রহণ করা হবে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ভারত সরকারের ব্যয় বিভাগ ‘ত্রিপুরা স্টেট হাইওয়ে ইমপ্রুভমেন্ট অ্যান্ড আরবান মবিলিটি প্রজেক্ট পি.পি.আর.আই.ডি. ২২৬২৫' নামে ১,৯২৬ কোটি ৪৩ লক্ষ টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদন করেছে। প্রতিটি পরিবারের জন্য সরবরাহকৃত জলের সংযোগ প্রদানে রাজ্য উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। এবছর ১২ মার্চ পর্যন্ত রাজ্যের মোট ৬ লক্ষ ৪৮ হাজার ২২৪টি অর্থাৎ (৮৬.৩৩ শতাংশ) গ্রামীণ পরিবারে ট্যাপ ওয়াটার সংযোগ পৌঁছেছে। ২০২৫- ২৬ অর্থবছরে বিয়াল্লিশটি ডিপটিউবওয়েল খনন করা হয়েছে এবং ১৫০টি ডিপ টিউবওয়েল, ৩৩৮টি স্মল বোর ডিপ টিউব ওয়েল প্রকল্প এবং ৩৭টি উদ্ভাবনী প্রকল্প চালু করা হয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে অবশিষ্ট ১ লক্ষ ৩ হাজার ২৬৬টি গ্রামীণ পরিবারকে এই পরিষেবার আওতায় আনা হবে। আশা করা যায় যে, ৩৫৫টি ডিপটিউবওয়েল, ৭৫৯টি স্মর বোর ডিপটিউবওয়েল প্রকল্প, ২৫৮টি উদ্ভাবনী প্রকল্প, ১,৫৪৩টি আয়রন রিম্যুভাল প্ল্যান্ট এবং ৩টি সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট চালু করা হবে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১,৪৮৪ হেক্টর চাষযোগ্য জমিকে নিশ্চিত সেচের আওতায় আনা হয়েছে। বর্তমানে আরও দশ হাজার চারশো হেক্টর চাষযোগ্য জমিকে নিশ্চিত সেচের আওতায় আনতে ৪২২টি ডিপ টিউবওয়েল, ৩২টি লিফট ইরিগেশন প্রকল্প, ১৪টি মাইনর ইরিগেশন স্টোরেজ প্রকল্প এবং একটি ডাইভারশন প্রকল্প চালু রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা আরবান বাস্তবায়নে ত্রিপুরা দেশের অন্যতম সেরা রাজ্য হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। শহর এলাকায় বসবাসকারী দরিদ্র জনসাধারণের জন্য ৮১ হাজার ৪২টি বাড়ি নির্মাণ অনুমোদিত হয়েছে, যার মধ্যে ৭৪ হাজার ৮৮০টি অর্থাৎ ৯২ শতাংশ বাড়ি নির্মাণ ইতিমধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে।
এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাঙ্কের ঋণ সহায়তায় ত্রিপুরা আরবান অ্যান্ড ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টের অধীনে বৃহৎ আকার নাগরিক পরিকাঠামো প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। আনুমানিক ৫৩০ কোটি টাকার এই প্রকল্প রাজ্যের ১২টি শহরকে অন্তর্ভুক্ত করেছে এবং জল সরবরাহ, সড়ক, নিকাশি ও পর্যটন পরিকাঠামোর উন্নয়নের উপর গুরুত্ব দিচ্ছে। প্রায় ৭৫ হাজার পরিবারকে বিশুদ্ধ পানীয়জল সরবরাহের উদ্দেশ্যে ৩০৫ কিলোমিটারেরও বেশি জল বিতরণকারী পাইপলাইন বসানো হচ্ছে। জাতীয় ক্যারিয়ার সার্ভিস প্রকল্পের অধীনে ৬টি চাকরি মেলা এবং একাধিক রিক্রুটমেন্ট ড্রাইভের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে, যাতে চাকরি প্রার্থী এবং বেসরকারি নিয়োগ কর্তাদের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করা যায়। তরুণদের উপযুক্ত কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণের সুযোগ সম্পর্কে সহায়তা করতে ১২টি ভোকেশনাল গাইডেন্স প্রোগ্রাম আয়োজন করা হয়েছে, যাতে অংশগ্রহণ করেছেন ৫৪০ জন কর্মসংস্থান প্রার্থী। বিদ্যালয় ও মহাবিদ্যালয় পর্যায়ে ৮২টি ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং প্রোগ্রাম পরিচালনা করা হয়েছে, যেগুলির মাধ্যমে ১২ হাজার ৯০৭ জন শিক্ষার্থী ও কর্মসংস্থান প্রার্থীদের উন্নততর জীবিকার সুযোগ ও দক্ষতা বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। ৬টি ক্যারিয়ার এক্সিবিশনের আয়োজন করা হয়েছে, যাতে অংশগ্রহণকারী ১ হাজার ৩৪২ জন শিক্ষার্থীকে বিভিন্ন পেশা ও কর্মপথ সম্পর্কে সম্যক ধারণা প্রদান করেছে। অগ্নিবীর রিক্রুটমেন্ট স্কিম সংক্রান্ত সুযোগ সুবিধা সম্পর্কে তরুণদের অবহিত করতে ৫৬টি ক্যারিয়ার অ্যাওয়ারনেস প্রোগ্রাম আয়োজন করা হয়েছে, যার মাধ্যমে ৭ হাজার ৩৪৮ জন চাকরি প্রার্থী উপকৃত হয়েছেন। ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষে যুব সমাজের জন্য উন্নততর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করার লক্ষ্যে এমন আরও ক্যারিয়ার কর্মসূচি আয়োজন করা হবে বলে অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন।
আরও পড়ুন...