আমাদের মনে যদি ধৈর্য থাকে, লক্ষ্য স্থির থাকে এবং আস্থা থাকে তবে আমরা সফল হবই : উপরাষ্ট্রপতি
নিজস্ব প্রতিবেদন
আগরতলা, মার্চ ৯, : একজন সফল ব্যক্তির বা কারোর সাফল্যের পেছনে রয়েছে কঠোর পরিশ্রম, নিয়মানুবর্তিতা, নিষ্ঠা, তার কাজের প্রতি আগ্রহ। আমরা সফল ব্যক্তিকে দেখি কিন্তু তাঁর সাফল্যের পেছনে তার পরিশ্রম, ত্যাগ, নিষ্ঠা প্রভৃতি বিষয়গুলো অনেক সময়ই খেয়াল করিনা। যারা কঠোর পরিশ্রম করেন তারাই সফল হন। আমাদের মনে যদি ধৈর্য থাকে, লক্ষ্য স্থির থাকে এবং আস্থা থাকে তবে আমরা সফল হবই। ৮ মার্চ ত্রিপুরা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্দশ সমাবর্তন অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করে উপরাষ্ট্রপতি সি পি রাধাকৃষ্ণাণ একথা বলেন। ত্রিপুরা বিশ্ববিদ্যালয়ের মহারাজা বীরবিক্রম শতবার্ষিকী ভবনের আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে রাজ্যপাল ইন্দ্রসেনা রেড্ডি নাল্লু এবং মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর (ডা.) মানিক সাহাও বক্তব্য রাখেন। অনুষ্ঠানমঞ্চ থেকে উপরাষ্ট্রপতি ত্রিপুরা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে নির্মিত মালবীয় মিশন টিচার ট্রেনিং সেন্টার এবং কর্মী আবাসনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন।
সমাবর্তন অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করে উপরাষ্ট্রপতি সি পি রাধাকৃষ্ণাণ বলেন, ছোট রাজ্য হলেও ত্রিপুরার সমৃদ্ধ ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি রয়েছে, যা ত্রিপুরার মাহাত্ম। ত্রিপুরাবাসীর ঐতিহ্যগত সংস্কৃতি, আধ্যাত্মিকতা এবং সম্প্রীতির বন্ধন ত্রিপুরাকে মহিমান্বিত করেছে। উপরাষ্ট্রপতি আজ সকালে উদয়পুরে ত্রিপুরাসুন্দরী মন্দির দর্শনের কথা উল্লেখ করে ছবিমুড়া, ডম্বুর জলাশয়, ত্রিপুরাসুন্দরী মন্দিরকে কেন্দ্র করে আধ্যাত্মিক এবং ইকো-ট্যুরিজমের উন্নয়নের কথাও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, রাজ্যের সামগ্রীক উন্নয়নে বিভিন্ন প্রকল্প দ্রুত রূপায়ণ করা হচ্ছে। এজন্য তিনি মুখ্যমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান।
উপরাষ্ট্রপতি ত্রিপুরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশংসা করে বলেন, এই বিশ্ববিদ্যালয় উন্নত পঠন পাঠন, গবেষণা এবং উদ্ভাবনীর কেন্দ্র। তিনি বলেন, বিভিন্ন ক্ষেত্রে আরও বেশি করে গবেষণা করতে হবে। তাতে নতুন নতুন জিনিস উদ্ভাবন করা যায়।
ত্রিপুরা বিশ্ববিদ্যালয়কে উচ্চ আসনে প্রতিষ্ঠিত করতে ভূমিকা নেওয়ায় তিনি রাজ্যপাল এবং মুখ্যমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান। উপরাষ্ট্রপতি বলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি উত্তর-পূর্বাঞ্চলের উন্নয়নের জন্য কাজ করছেন। বর্তমানে ত্রিপুরা সহ এই অঞ্চলের পরিকাঠামোর ব্যাপক উন্নতি হয়েছে। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হওয়ায় ভারতের বিভিন্ন জায়গার সঙ্গে এখন ত্রিপুরার সরাসরি যোগাযোগ সম্ভব হয়েছে। সারা দেশে পরিকাঠামোর ব্যাপক উন্নতি হওয়ায় দেশের অর্থনীতি আরও সুদৃঢ় হয়েছে। পরের প্রজন্মের জন্য বিভিন্ন ধরণের সুযোগ সুবিধা বাড়ছে। ছাত্রছাত্রীদের উদ্দেশ্যে উপরাষ্ট্রপতি বলেন, সময় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সময়ের সঙ্গে সাফল্যের নিবিড় যোগাযোগ রয়েছে। সময়কে কিভাবে ব্যবহার করবে তা নিজেদেরই ঠিক করতে হবে। প্রসঙ্গক্রমে তিনি নেশার কবল থেকে দূরে থাকতে ছাত্রছাত্রীদের পরামর্শ দেন। অন্যরা যেন ড্রাগ ব্যবহারের প্রতি আকৃষ্ট না হয় সেজন্য তাদের উৎসাহিত করতে তিনি পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, বর্তমান প্রজন্ম ঐতিহাসিক সময়ের মধ্য দিয়ে চলছে। আমাদের দেশ দ্রুত বিকশিত ভারতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে টেকনোলজি হল গেম চেঞ্জার। প্রযুক্তিকে মানুষের ও সমাজের কল্যাণে ব্যবহার করার জন্য তিনি ছাত্রছাত্রীদের আহ্বান জানান।
সমাবর্তন অনুষ্ঠানে রাজ্যপাল ইন্দ্রসেনা রেড্ডি নাল্লু বিশ্ববিদ্যালয়ের মহিলা অধ্যাপক অধ্যাপিকা, স্কলারদের আন্তর্জাতিক নারী দিবসের শুভেচ্ছা জানান। তিনি বলেন, এটা গর্বের বিষয় যে আজ এই দিনটিতে অনেক নারী এখানে তাদের ডিগ্রি নিতে এসেছেন, যা নারী স্বশক্তিকরণেরই প্রকাশ। উপরাষ্ট্রপতি সি পি রাধাকৃষ্ণাণ অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করায় আমরা গৌরববোধ করছি। এই সমাবর্তন উৎসব জাতীয় পর্যায়েও গুরুত্ব পাবে। তিনি বলেন, আমাদের দেশ গুরুত্বপূর্ণ আর্থনৈতিক উন্নতির পথে এগিয়ে যাচ্ছে। যারা এখানে ডিগ্রি নিতে এসেছে তারা বিকশিত ভারতের স্থপতি। তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার গুরুত্বের কথাও তুলে ধরেন।
রাজ্যপাল ছাত্রছাত্রীদের উদ্দেশ্যে বলেন, তোমাদের বড় হওয়ার পেছনে ত্রিপুরার শষ্যক্ষেত্র, জম্পুইহিলের সবুজ বনানী, আগরতলার বিভিন্ন বাজার প্রভৃতিরও অবদান রয়েছে। এই ঋণ তোমাদের ফিরিয়ে দিতে হবে। তোমাদের শিক্ষা স্থানীয় সমস্যা সমাধানে কাজে লাগাতে হবে। তোমরা সফল হয়ে অন্যদেরও সফল হতে সাহায্য করতে হবে। জাতীয় শিক্ষা নীতির চালু করার গুরুত্বের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন দীর্ঘদিন পর শিক্ষাক্ষেত্রে সংস্কার আনা হয়েছে। ২০৪৭ সালের মধ্যে আমরা বিকশিত ভারত গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ করছি। আমাদের ঐতিহ্যগত জ্ঞানের সঙ্গে আধুনিক বিজ্ঞান প্রযুক্তিকে যুক্ত করতে না পারলে আমরা উন্নত ভারত গড়ে তুলতে পারবনা। রাজ্যপাল মেডেল প্রাপক ডিগ্রি প্রাপকদের তাদের সাফল্যের জন্য উষ্ণ অভিনন্দন জানান।
ত্রিপুরা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে ছাত্রছাত্রীদের উদ্দেশ্যে মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর (ডা.) মানিক সাহা বলেন, বর্তমানে ছাত্রছাত্রীরাই আগামীদিনে ত্রিপুরা ও ভারতের নেতৃত্ব দেবে। আজকের তরুণ প্রজন্মই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির স্বপ্নের ‘বিকশিত ভারত' নির্মাণের ভবিষ্যৎ স্থপতি। মুখ্যমন্ত্রী বক্তব্যের শুরুতেই আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে উপস্থিত নারী সমাজ ও ছাত্রীদের আন্তরিক শুভেচ্ছা জ্ঞাপন করেন। তিনি বলেন, সমাবর্তন অনুষ্ঠান কেবল একটি প্রথাগত অনুষ্ঠান নয়, ছাত্রছাত্রীদের দীর্ঘদিনের ধৈর্য, একাগ্রতা এবং শ্রেষ্ঠত্বের এক মহান উদযাপন। তিনি বলেন, ত্রিপুরা বিশ্ববিদ্যালয় আজ রাজ্যের জ্ঞানচর্চা, বৌদ্ধিক বিকাশ এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের এক উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই এই বিশ্ববিদ্যালয় রাজ্যের শিক্ষাক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলছে। একসময় উচ্চশিক্ষার জন্য রাজ্যের বহু শিক্ষার্থীকে রাজ্যের বাইরে যেতে হতো। তবে ত্রিপুরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রমবিকাশ এবং সময়োপযোগী পাঠক্রম সেই প্রবনতাকে উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে এনেছে।
আজ এই বিশ্ববিদ্যালয় কেবল রাজ্যের শিক্ষার্থীদের নয়, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন রাজ্য এবং দেশের নানা প্রান্ত থেকে শিক্ষার্থী ও গবেষকদের আকৃষ্ট করছে।
মুখ্যমন্ত্রী আরও বলেন, উত্তর-পূর্বাঞ্চল উন্নয়ন মন্ত্রকের অষ্টলক্ষ্মী দর্শন মিশন-এর অগ্রগতিতেও ত্রিপুরা বিশ্ববিদ্যালয় সক্রিয় ও ইতিবাচক ভূমিকা পালন করছে। এই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ সৃষ্টির পাশাপাশি ত্রিপুরার সমৃদ্ধ সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং প্রাকৃতিক ঐশ্বর্যকে তুলে ধরার মাধ্যমে জাতীয় সংহতি সুদৃঢ় করছে।
মুখ্যমন্ত্রী ত্রিপুরা বিশ্ববিদ্যালয়ের অগ্রগতির উপরও আলোকপাত করেন। তিনি বলেন, রাজ্যের বর্তমান সরকার একটি জ্ঞানভিত্তিক ও দক্ষতামুখী ত্রিপুরা গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ করছে। যেখানে যুবসমাজ উদ্ভাবক, উদ্যোক্তা এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে নেতৃত্বদানকারী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। বর্তমানে ত্রিপুরা নতুন আত্মবিশ্বাস নিয়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা, ডিজিট্যাল প্রশাসন, স্বাস্থ্যসেবা, পর্যটন এবং বিনিয়োগের ক্ষেত্রে দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে। তবে এই অগ্রগতির মূল চাবিকাঠি দক্ষ ও মানসম্পন্ন মানবসম্পদ। ত্রিপুরা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানই সেই মানবসম্পদ গড়ে তোলার চালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করছে। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, রাজ্য সরকার আগামীতে রাজ্যে আরও নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করছে। এই উদ্যোগ ‘এক ত্রিপুরা শ্রেষ্ঠ ত্রিপুরা' গঠনের বৃহত্তর লক্ষ্য এবং বাস্তবায়নের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। মুখ্যমন্ত্রী শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে বলেন তারা এমন এক সময়ে জীবনের নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে যখন ভারত বিশ্বের অন্যতম গতিশীল ও সম্ভাবনাময় দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে।
আগামী দশকগুলো তাদেরই হবে যারা জ্ঞান ও দক্ষতার মাধ্যমে সততার সঙ্গে এগিয়ে যেতে পারবে। এই প্রসঙ্গে তিনি স্বামী বিবেকানন্দের বানী ‘উঠো জাগো এবং লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত থেমে থাকবে না' স্মরণ করে শিক্ষার্থীদের এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান। মুখ্যমন্ত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক,কর্মীদের এবং শিক্ষার্থীদের সাফল্যের পেছনে অভিভাবকদের অবিচল সমর্থনের ভূমিকাও বিশেষভাবে স্মরণ করেন। নতুন স্নাতক শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর (ডা.) মানিক সাহা বলেন, জীবনের যেখানেই তারা যাক না কেন, তারা যেন ত্রিপুরা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয় এবং ত্রিপুরাবাসীর আশা- আকাঙ্খাকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যায়। জ্ঞানের আলোকে সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে আলোকিত করে তারা যেন একটি শক্তিশালী, সমৃদ্ধ এবং উন্নত ত্রিপুরা এবং মহান ভারত গঠনে নিজেদের ভূমিকা পালন করে।
অনুষ্ঠানমঞ্চে উপস্থিত ছিলেন মুখ্যসচিব জিতেন্দ্র কুমার সিনহা। স্বাগত বক্তব্য রাখেন ত্রিপুরা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর শ্যামল দাস। তিনি অতিথিগণকে স্মারক উপহার দিয়ে সম্মানিত করেন। অতিথিগণ আনুষ্ঠানিকভাবে কয়েকজনের হাতে মেডেল ও ডিগ্রি তুলে দেন।
আরও পড়ুন...