গত এক বছরে রাজ্যে ১৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি বিনিয়োগের প্রস্তাব এসেছে : মুখ্যমন্ত্রী
নিজস্ব প্রতিবেদন
আগরতলা, ফেব্রুয়ারি ২৭, : ত্রিপুরার উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা এখন সরাসরি জাতীয় সংকল্প ‘বিকশিত ভারত-২০৪৭', আত্মনির্ভর ভারত এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে একসূত্রে গেঁথে গেলো। ত্রিপুরা স্টেট ইনোভেশন মিশনের সূচনার মাধ্যমে ত্রিপুরার উন্নয়ন যাত্রায় এক ঐতিহাসিক অধ্যায় সূচিত হলো। ২৬ ফেব্রুয়ারি হাঁপানিয়ার আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী কেন্দ্রে আনুষ্ঠানিকভাবে স্টেট ইনোভেশন মিশন-ত্রিপুরা এবং টি-নেস্ট (ত্রিপুরা নার্চারিং এন্ট্রাপ্রেনারশিপ অ্যান্ড স্টার্টআপস)-এর উদ্বোধন করে মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর (ডা.) মানিক সাহা একথা বলেন।
অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, নীতি আয়োগের সহযোগিতায় ত্রিপুরা দেশের প্রথম রাজ্য হিসেবে এই ধরনের মিশন চালু করার গৌরব অর্জন করলো। তিনি বলেন, ত্রিপুরা বর্তমানে দেশের একমাত্র রাজ্য যেখানে রাজ্য সচিবালয় থেকে শুরু করে গ্রাম পঞ্চায়েত স্তর পর্যন্ত সমস্ত সরকারি কাজ সম্পূর্ণ পেপারলেসভাবে সম্পন্ন হচ্ছে। বর্তমান রাজ্য সরকারের লক্ষ্য সুশাসনকে উন্নয়নের কৌশলের কেন্দ্রে রেখে তরুণ প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষাকে শিল্প উদ্যোগে রূপান্তরিত করা। টি-নেস্ট সম্পর্কে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, এটি রাজ্য উদ্ভাবন মিশনের একটি কার্যকরী শাখা হিসেবে কাজ করবে। কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের উদ্ভাবন বাজারের চাহিদার সাথে সংযুক্ত করবে এবং বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করবে। রাজ্যের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, নীতি আয়োগের সহায়তায় ত্রিপুরা ‘আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এ.আই.) পলিসি' আনার উদ্যোগ নেবে। আগরতলা স্মার্ট সিটিতে ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট, বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় এ.আই. প্রযুক্তি ব্যবহার করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। যার জন্য ইতিমধ্যেই একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা আগ্রহ ও প্রকাশ করেছে। এছাড়াও রাজ্যে আইটি ও ডাটা ইকোনমিক জোন স্থাপনেরও পরিকল্পনা রয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রী জানান, বিনিয়োগকারীদের আস্থার ফলে গত এক বছরে রাজ্যে ১৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি বিনিয়োগের প্রস্তাব এসেছে এবং ইতিমধ্যে ৯১টি প্রকল্পের কাজ শুরু হয়ে গেছে। রাজ্যের জি.ডি.পি. গত কয়েক বছর ধরে দুই অঙ্কের ঘরে রয়েছে এবং মাথাপিছু আয়ও জাতীয় গড়ের প্রায় সমান পর্যায়ে পৌঁছেছে। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ত্রিপুরা শুধু প্রযুক্তির দিকে এগুচ্ছে না বরং বাশভিত্তিক শিল্প, রাবার উৎপাদন, ক্যুইন আনারস এবং সুগন্ধি লেবুর মতো প্রাকৃতিক সম্পদকেও এই উদ্ভাবন মিশনের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে। এই প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী প্রবাসী ত্রিপুরাবাসী সামিটের কথাও উল্লেখ করেন।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, পরবর্তীতে সারা রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় ইনোভেশন সেন্টার খোলার পরিকল্পনা রয়েছে যা টি-নেস্ট-এর সাথে যুক্ত থাকবে। তৃণমূলস্তরের উদ্ভাবকদের উৎসাহিত করতে ‘ডিস্ট্রিক্ট ইনোভেশন ফেলোশিপ' চালু করারও পরিকল্পনা রয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী ত্রিপুরার সার্বিক উন্নয়নের সফলতার চিত্রও বক্তব্যে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নে ত্রিপুরা ‘ফ্রন্ট রানার স্টেট’ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী আরও বলেন, এই মিশন কেবল প্রযুক্তির বিষয় নয়, এটি সুশাসন প্রবর্তন, যুব সমাজকে ক্ষমতায়ন এবং ঐতিহ্যের মেলবন্ধনে এক স্বনির্ভর ও উন্নত ত্রিপুরা গড়ার অঙ্গীকার। তিনি এর পূর্ণ সফলতা কামনা করেন।
অনুষ্ঠানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, পারমাণবিক শক্তি, মহাকাশ এবং প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর সংক্রান্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী ড. জিতেন্দ্র সিং বলেন, ত্রিপুরার উন্নয়নের মানচিত্রে আজ এক ঐতিহাসিক মাইলফলক রচিত হলো। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির অ্যাক্ট-ইস্ট পলিসির দৌলতে উত্তর পূর্বাঞ্চল আজ উদ্ভাবন ও প্রযুক্তি নির্ভর উন্নয়নের ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনার দিগন্ত উন্মোচন করেছে। তিনি বলেন, প্রতিটি রাজ্যের অগ্রগতির মাধ্যমেই দেশের সার্বিক অগ্রগতি নির্ভর করে। ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে সরকার গঠন হওয়ার পর থেকেই দেশের উন্নয়ন যাত্রায় নতুন মাত্রা এসেছে। বর্তমানে ব্যবসা সরলীকরণ, যোগাযোগের ব্যবস্থার সম্প্রসারণ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ইত্যাদি সমস্ত ক্ষেত্রে এগিয়ে চলছে উত্তর পূর্বাঞ্চল। এই প্রসঙ্গে তিনি নীতি আয়োগের অধীনে অটল ইনোভেশন মিশনের একটি প্রধান উদ্যোগ অটল টিস্কারিং ল্যাব'র কথা উল্লেখ করে বলেন, এটি ছাত্রছাত্রীদের উদ্ভাবন, সৃজনশীলতা এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতা বিকাশের একটি কর্মক্ষেত্র। যার মাধ্যমে সারাদেশব্যাপী সুফলও পরিলক্ষিত হচ্ছে। তিনি আজকের এই ইনোভেশন উদ্যোগের সূচনা আত্মনির্ভর ভারত গঠনের ক্ষেত্রে একটি সময়োপযোগী পদক্ষেপ বলে অভিমত ব্যক্ত করেন।
অনুষ্ঠানে নীতি আয়োগের ভাইস চেয়ারম্যান সুমন বেরী বলেন, উদ্ভাবনই আগামীদিনের চালিকাশক্তি। বিকশিত ভারত গড়ার ক্ষেত্রে বিকশিত ত্রিপুরার অন্যতম যোগদান রয়েছে। আজকের এই সূচনা সেই লক্ষ্য পূরণে গতিশীলতা নিয়ে আসবে বলে তিনি আশাব্যক্ত করেন। তিনি বিকশিত ভারত গড়ার ক্ষেত্রে সমাজের নারী জাতির সম্মিলিত সংযোগ প্রয়োজন সেই বিষয়েও আলোকপাত করেন।
অনুষ্ঠানে এছাড়াও বক্তব্য রাখেন নীতি আয়োগের সদস্য ড. ভি. কে. সারস্বত। স্বাগত বক্তব্য রাখেন সুশাসন দপ্তরের সচিব কিরণ গিত্যে। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন অর্থমন্ত্রী প্রণজিৎ সিংহ রায়, মুখ্যসচিব জে. কে. সিনহা, নীতি আয়োগের প্রোগ্রাম ডাইরেক্টর রাজীব কুমার সেন প্রমুখ।
উল্লেখ্য, অনুষ্ঠানে টি.আই.এফ.টি. এবং নীতি আয়োগের অটল ইনোভেশন মিশনের মধ্যে একটি স্টেটমেন্ট অব ইন্টেন্ট বিনিময় করা হয়। পাশাপাশি ত্রিপুরা সরকার ও টি-হাবের মধ্যে একটি মৌ-স্বাক্ষরিত হয়, যা রাজ্যে প্রযুক্তি নির্ভর স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে সহায়ক হবে।
আরও পড়ুন...