আসু থেকে আলফা, তিপরাল্যান্ড থেকে বাংলাদেশি তকমা: উত্তর-পূর্বের রাজনীতি নতুন মোড় নিচ্ছে
চন্দন ভৌমিক
August 7, 2025
সালটা ১৯৭৯ ইং আসামে শুরু হল আসুর নেতৃত্বে (অল আসাম স্টুডেন্টস ইউনিয়ন) বিদেশি খেদা আন্দোলন যা পরবর্তীতে বাঙালি তাড়াও আন্দোলনে পর্যবসিত হয়। দীর্ঘ ১০/১২ বৎসর আসামে এক অরাজক পরিস্থিতি তৈরী করে। ১৯৮৫ সালে অসম গন পরিষদ (AGP) র প্রতিষ্টা করে আসামের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্ল মহন্তের নেতৃত্বে আসামের ক্ষমতায় আসীন হয়....
তথাকথিত ছা্ত্র সন্হা আসু থেকে বেরিয়ে চরমপন্হী একটা গোষ্টী স্বাধীন অসমের নামে জন্ম দেয় আলফা নামের উগ্রপন্থী সংগঠন পরবর্তীতে কংগ্রেসে দলের মুখ্যমন্ত্রী হিতেশ্বর শইকিয়া আলফার একটা অংশকে সারেন্ডার করে সালফা নামধারীদের ব্যাপক সরকারি সুযোগ প্রদান করে....
আসু, আলফা বা সালফা এদের মুখ্য কাজ ছিল উগ্রজাতীয়তাবাদের স্লোগানের আড়ালে বাঙালি তথা অন-অসমীয়াদের বিতারন এমনকি প্রগতিশীল অসমীয়া সমাজের বুদ্ধিজীবিদের অপহরন, হত্যা, সাম্প্রদায়িক বাতাবরণ তৈরি করা এবং সর্বোপরি অন-অসমীয়া ব্যবসায়ী, ঠিকাদার ও সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে বলপূর্বক চাঁদা আদায়ই ছিল এদের মূল লক্ষ্য...
৮০র দশকে আসুর দেখাদেখি মেঘালয়ে খাসি স্টুডেন্টস এসোসিয়েশন (খেসু), অরুনাচলে আটসু, মিজোরামে লালডেঙার নেতৃত্বে মিজো ন্যাশনেল ফ্রন্ট (MNF), নাগাল্যান্ডে (NSCN)।
একই সময়ে ত্রিপুরায় তৈরি হয় ত্রিপুরা উপজাতি যুব সমিতি (TUJS) এবং পরবর্তীতে তৈরী হয় বিজয় রাঙ্খলের নেতৃত্বে উগ্রপন্থী সংগঠন ত্রিপুরা ন্যাশনেল ভলান্টিয়ার্স (TNV)। উত্তরপূর্বের প্রায় সবকটি রাজ্যের পাশাপাশি ৮০র দশকে এইসব উগ্রজাতীয়তাবাদী সংগঠন গুলোর উদ্দেশ্য ছিল বাঙালি বিতারন, হত্যা, অপহরন,বলপূর্বক চাঁদা আদায় এবং অরাজক ও সাম্প্রদায়িক বাতাবরণ তৈরি করে ক্ষমতায় আসীন হওয়া।
ত্রিপুরায় ৮০র জুনের দাঙ্গা এবং প্রায় তিন দশক ধরে বিভিন্ন উগ্রপন্থী সংগঠন দ্বারা সাধারণ মানুষ, পুলিশ ও সামরিক-আধাসামরিককে হত্যা, অপহরণ, লুন্ঠন ও অরাজক পরিস্থিতি চলতে থাকে। এই সবকিছুই ছিল উপজাতি অংশের গুটিকয়েক শিক্ষিত অংশের মস্তিষ্কপ্রসূত যারা অর্ধশিক্ষিত ও নিরক্ষর অংশের উপজাতিদের প্রভাবিত করে, স্বাধীন ত্রিপুরার স্বপ্ন দেখিয়ে তরুন প্রজন্মের হাতে বন্দুক তুলে দিয়ে নিজেদের আখের গুছানো এবং রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করা। উত্তরপূর্বের পাশাপাশি ত্রিপুরায় এইসব উগ্রপন্থার কর্মকান্ডে পরোক্ষভাবে মদত বা নীরব প্রশ্রয় যেমন ছিল সর্বভারতীয় রাজনৈতিক দল বা আঞ্চলিক দলগুলির।
বর্তমানে আসামে যখন চলছে আড়ালে আবডালে বা প্রকাশ্যে প্রথমে মিয়া খেদা পর্যায়ক্রমে বাঙালি বিতাড়ন...
একই সময়ে সমান্তরালভাবে ত্রিপুরায় নবকলেবরে চলছে বাংলাদেশি চিন্হিতকরনের নামে বাঙালি বিতাড়নের নীল নকসা....
এইবারের নীলনকশার কারিগর প্রকাশ্যে গ্রেটার তিপরাল্যান্ডের নামে একটা বিরাট অংশের শিক্ষিত ও অর্ধশিক্ষিত উপজাতিদের বিভ্রান্ত করে নিজের এবং পরিবারের আখের গুছাতে নেমেছে। অবশ্য এই কারিগরের পেছনে অবশ্য রাজনৈতিক দলের প্রচ্ছন্ন মদত রয়েছে।
গ্রেটার ল্যান্ডের কারিগর শিলং এর আবহাওয়ায় বর্ধিত হয়েছেন। তাই বর্তমান বাঙালিহীন মেঘালয়ের সুখস্বপ্ন উনাকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে। একসময় অভিবক্ত আসামের রাজধানী ছিল শিলং এবং সকল স্তরের কর্মচারী ও ব্যবসায়ীরা ছিল অধিকাংশ বাঙালি। বিরাট অংশের বাঙালিদের নিজস্ব বাড়িঘর ছিল শিলং এ একসময়। আশির দশকে বাঙালি বিতাড়ন ও পরবর্তী সময়ে সরকারি বেসরকারি সবক্ষেত্রে সংরক্ষণের ফলে শিলং তথা মেঘালয়ের অধিকাংশ বাঙালিরা দ্বিতীয় শ্রেনীর নাগরিকে পরিনত হয়। অনেকেই ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে ভারতের অন্য শহরে পাড়ি দিতে শুরু করে।
একদিন আগরতলা তথা ত্রিপুরায় ও বাঙালিদের বিদেশি বা বাংলাদেশি তকমা দিয়ে দ্বিতীয় শ্রেনীর নাগরিক বানানোর স্বপ্নে বিভোর রাজ্যপাটহীন বা মুকুটহীন কারিগর। এই স্বপ্নকে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বর্তমান শাসকদলকে প্রভাবিত করে চলেছে এই কারিগর ও তার সাঙ্গপাঙ্গরা। আগেই বলেছি এর পেছনে প্রচ্ছন্ন মদত রয়েছে সর্বভারতীয় ও আঞ্চলিক দলের।
তার প্রমান হল এক সর্বভারতীয় রাজনৈতিক দলের জাতীয় মুখপাত্রের সাম্প্রতিক মন্তব্য....বাঙলা নাকি কোন ভাষাই নয় ! এছাড়াও সাম্প্রতিকতম ঘটনাগুলি হচ্ছে দিল্লি সহ বিভিন্ন রাজ্যে বাংলাভাষীদের বাংলাদেশি তকমা দেওয়া হচ্ছে।
প্রশ্ন হচ্ছে বাংলা ভাষা ও বাঙালিদের অস্তিত্ব কোথায় ?
আরও পড়ুন...