ব্রিকস বনাম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দ্বন্দ্ব : ভারতের অবস্থান ও ভূমিকা।

সঞ্জয় রায়

August 4, 2025

২০০১ সালে গোল্ডম্যান শ্যাক্স বিনিয়োগ ব্যাংকের একজন অর্থনীতিবিদ ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত এবং চীনের গতিশীল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির স্বীকৃতিস্বরূপ BRIC শব্দটির সংক্ষিপ্ত রূপটি তৈরি করেছিলেন। BRIC দেশগুলির নেতারা প্রথমবারের মতো রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে মিলিত হন এবং কয়েক মাস পরে ২০০৬ সালে, তারা অনানুষ্ঠানিক জোট গঠন করেন। প্রথম BRIC শীর্ষ সম্মেলন ২০০৯ সালে ইয়েকাটেরিনবার্গে অনুষ্ঠিত হয়। দক্ষিণ আফ্রিকা ২০১১ সালে BRIC-তে যোগ দেয় এবং সংক্ষিপ্ত রূপটি BRICS-এ পরিবর্তিত হয়। এই ব্লকটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার পশ্চিমা মিত্রদের আধিপত্য বিস্তারকারী প্রচলিত ব্যবস্থার বিপরীতে এক ভারসাম্য রক্ষাকারী সংস্থা হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। এর কার্যক্রম ঐতিহ্যগতভাবে তিনটি স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে আছে: ১) রাজনীতি এবং নিরাপত্তা; ২) অর্থনীতি এবং অর্থায়ন; এবং ৩) ('মানুষের সাথে যোগাযোগ'), বা নাগরিক সমাজ। ব্রিক্স ভুক্ত সমস্ত সদস্য দেশই G-20-এর অংশ, যা প্রধান অর্থনীতির একটি ফোরাম। BRICS দেশগুলির নেতারা প্রতি বছর মিলিত হন। প্রতিটি দেশ ব্রিক্স গ্রুপের এক বছরের জন্য পর্যায়ক্রমে সভাপতিত্ব করেন। ২০২৩ সালে, জোহানেসবার্গ শীর্ষ সম্মেলনের সময়, দ্বিতীয় সম্প্রসারণ করা হয়েছিল, যার ফলে ২০২৪-২৫ সালে ছয়টি নতুন সদস্য দেশ যেমন মিশর, ইথিওপিয়া, ইন্দোনেশিয়া এবং ইরান, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত নতুন সদস্য হিসাবে যোগদান করে। BRICS বর্তমানে এগারোটি দেশ নিয়ে গঠিত। জোহানেসবার্গ ঘোষণাপত্রের মাধ্যমে সম্মত হওয়া আদেশ অনুসারে, নেতারা ২০২৪ সালে কাজান শীর্ষ সম্মেলনের সময় ‘ব্রিকসে’ ‘অংশীদার দেশ’ তৈরির অনুমোদন দেন। ব্রিকসের অধীন ‘অংশীদার দেশগুলি’ হল, বেলারুশ, বলিভিয়া, কিউবা, কাজাখস্তান, মালয়েশিয়া, নাইজেরিয়া, থাইল্যান্ড, উগান্ডা এবং উজবেকিস্তান। ব্রিকস-এর অস্থায়ী সভাপতি হিসেবে ব্রাজিল সরকার ভিয়েতনামকে গ্রুপের ‘অংশীদার দেশ’ হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করার ঘোষণা দেয়। ভিয়েতনাম ব্রিকস-এর দশম অংশীদার দেশ হয়ে উঠে ।

ব্রিকস-গঠনের এর মূল উদ্দেশ্য

ব্রিকস-এর মূল উদ্দেশ্য এর সদস্য দেশ সমুহের মধ্যে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং সামাজিক সহযোগিতা জোরদার করা, সেইসাথে আন্তর্জাতিক শাসনব্যবস্থায় গ্লোবাল সাউথ দেশগুলির প্রভাব বৃদ্ধি করা। এই গ্রুপটি জাতিসংঘ, আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক এবং ডব্লিউটিও-এর মতো বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলিতে নিজেদের বৈধতা, অংশগ্রহণে ন্যায্যতা এবং দক্ষতা উন্নত করার চেষ্টা করছে। তদুপরি, এর লক্ষ্য টেকসই সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন জোরদার করা এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তি প্রচার করা। এই ব্লকটি তার সদস্যদের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক নীতির সমন্বয় সাধন করার চেষ্টা করছে। শুধু তাই নয়, ব্রিক্স গ্রুপ নিজেদের জন্য নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক নামে একটি নতুন আর্থিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে এবং মার্কিন ডলারের উপর নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা করছে। বিশ্বব্যাপী লেনদেনে ডলারের ক্রমবর্ধমান আধিপত্যের উপর অসন্তুষ্ট এবং পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখোমুখি হয়ে ব্রিকস নেতারা দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য বৃদ্ধির পক্ষে অথবা এমনকি ডলারের মূল্য হ্রাসের পক্ষে একটি সম্ভাব্য সাধারণ ব্রিকস মুদ্রা চালুর চেষ্ঠা করে আসছেন। গ্রুপটির নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এনডিবি) এবং কন্টিনজেন্ট রিজার্ভ অ্যারেঞ্জমেন্ট (সিআরএ) যথাক্রমে বিশ্বব্যাংক এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) অনুকরণে তৈরি। ব্রিকস সদস্যরা আশা করেন যে বিকল্প ঋণদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলি দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতা জোরদার করতে পারে এবং ঐতিহ্যবাহী তহবিল উৎসের উপর নির্ভরতা কমাতে পারে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ব্রিকস ভুক্ত দেশ সমূহের বিরোধিতা ও শুল্ক হুমকির কারণ

বর্তমান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ব্রিকস ভুক্ত দেশগুলির কঠোর সমালোচক। তিনি মনে করেন যে এই ব্লকটির প্রভাব বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং এমন একটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা তৈরির জন্য কাজ করছে-- যেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্বহীন। ব্রিকস আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে মার্কিন ডলারের উপর নির্ভরতা কমানোর উপায় খুঁজছে, আবার কিছু সদস্য দেশ ইতিমধ্যেই লেনদেনের জন্য তাদের নিজস্ব মুদ্রা ব্যবহার করছে। এই পদক্ষেপ ট্রাম্প এবং ওয়াশিংটনের জন্য উদ্বেগজনক, কারণ এটি আমেরিকার বৈশ্বিক আর্থিক শক্তিকে দুর্বল করে দিতে পারে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে ডলারের প্রভাবশালী ভূমিকার উপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। সম্প্রতি এই ব্লকটি ইরান, মিশর, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ইথিওপিয়ার মতো দেশগুলিকে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য সম্প্রসারিত হয়েছে। এই বৃহত্তর গোষ্ঠী, যা BRICS+ নামে পরিচিত, এমন দেশগুলির একটি ক্রমবর্ধমান জোটের প্রতিনিধিত্ব করছে যারা বৈশ্বিক বিষয়ে আরও জোরালো বক্তব্য রাখতে চায় - যা মার্কিন অগ্রাধিকারকে আগামীদিনে বিরোধিতা করবে। নতুন সদস্য এবং অংশীদারদের যোগদানের ফলে, ব্রিকস বিশ্বব্যাপী বাণিজ্য ও বিনিয়োগ প্রবাহের এক-চতুর্থাংশ নিয়ন্ত্রণ করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে এবং এর অর্থায়ন ব্যবস্থা পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন ব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে কাজ করবে। মিঃ ট্রাম্প ব্রিকস ভুক্ত দেশগুলিকে নিরন্তর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পন্য রপ্তানির ক্ষেত্রে অধিক হারে শুল্ক আরোপের হুমকি দিচ্ছেন। ‘রিও ডি জেনেইরোতে’ অনুষ্ঠিত ব্রিকস গ্রুপিং সদস্যদের উপর ১০% শুল্ক আরোপের হুমকি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ধারাবাহিক হুমকির সর্বশেষ উদাহরণ।

গত ৬ জুলাই, ২০২৫, ১৭তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের জন্য রিওতে ব্রিকস নেতারা যখন জড়ো হয়েছিলেন, ঠিক তখনই মিঃ ট্রাম্প একটি সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে বলেছিলেন যে ব্রিকসের সাথে যুক্ত যে কোন দেশকে ১০% অতিরিক্ত শুল্কের মুখোমুখি হতে হবে। পরে মিঃ ট্রাম্প বলেছিলেন যে এই শাস্তি ছিল "সদস্য হওয়ার জন্য", "শুধুমাত্র একটি জিনিসের জন্য"। মি. ট্রাম্প বরাবরই ব্রিকস সমালোচনা মুখর। দ্বিতীয়বারের মতো মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেওয়ার আগেই ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন যে তিনি ব্রিকস গ্রুপিংকে "আমেরিকা-বিরোধী" এবং ডলারের হুমকি হিসেবে দেখেন । গত বছরের ৩০ নভেম্বর, মি. ট্রাম্প বলেছিলেন যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ব্রিকস সদস্যদের প্রতিশ্রুতি দিতে বাধ্য করবে যে ‘তারা একটি নতুন ব্রিকস সাধারণ মুদ্রা তৈরি করবে না, না শক্তিশালী মার্কিন ডলারের পরিবর্তে অন্য কোনও মুদ্রা সমর্থন করবে", নয়ত তাদের উপর ১০০% শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছে। এই হুমকিটি তিনি বেশ কয়েকবার পুনরাবৃত্তি করেছেন। ২০২৩ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা এবং ২০২৪ সালে রাশিয়ায় ব্রিকস যৌথ ঘোষণা পত্রের পরও মিঃ ট্রাম্পের বিরক্তি প্রকাশ পেয়েছিল। এই ঘোষণার মূলে ছিল মিশর, ইথিওপিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ইরান এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত দেশ সমূহের ব্রিক্স ভুক্ত হওয়া এবং স্থানীয় মুদ্রা এবং অন্যান্য প্রক্রিয়া ব্যবহার করে ব্রিকস দেশগুলি নিজেদের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহজতর করার আহ্বান।

২০২৫ সালে ব্রাজিলের ‘রিও ডি জেনেইরো’তে অনুষ্ঠিত ১৭তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের কঠোর সমালোচনা করা হয় এবং ইরানের উপর মার্কিন-ইসরায়েলের আক্রমণের নিন্দা জানানো হয়। ৬ জুলাইয়ের এই ঘোষণায় শুল্ক আরোপের বিষয়ে "গুরুতর উদ্বেগ" প্রকাশ করা হয়েছে, এবং ইহাকে "বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নিয়মের সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ" বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তাছাড়াও ১০ সদস্যের এই দলটি ১৩ জুন থেকে শুরু হওয়া ইরানের উপর হামলাকে "আন্তর্জাতিক আইন এবং জাতিসংঘের সনদের লঙ্ঘন" বলে অভিহিত করেছে। ব্রিক্স সদস্যরা "আন্তর্জাতিক আইন এবং আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার প্রাসঙ্গিক রেজুলেশন লঙ্ঘন করে শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনাগুলির বিরুদ্ধে যে কোন আক্রমণের বিষয়ে গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে" এবং "বিষয়টি সম্পর্কে নিজেদেরকে অবগত রাখার" প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এর ফলে ট্রাম্প আরও বেশি ক্ষুব্ধ হন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাই ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন এবং দক্ষিণ আফ্রিকার সমন্বয়ে গঠিত ব্রিকস – এর তীব্র সমালোচনায় অবতীর্ণ হন । ট্রাম্প ব্রিকসকে "আমেরিকা-বিরোধী" বলে অভিহিত করেছেন এবং তিনি এটিকে আমেরিকান নেতৃত্বের জন্য একটি ভূ-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে মনে করেন । "আমার মতে, তারা যা করার চেষ্টা করছে তা হল ডলার ধ্বংস করা যাতে অন্য কোনও দেশের মুদ্রা সেই জায়গা দখল করতে পারে এবং মানদণ্ড হতে পারে, আর আমরা কোনও সময় মানদণ্ড হারাতে পারি না," ট্রাম্প বলেন।

মার্কিন প্রশাসন ব্রিকসকে হুমকি হিসেবে দেখে আগ্রাসী শুল্ক-ভিত্তিক প্রতিশোধের পথ বেছে নেয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি অফিস (USTR) অনুসারে, ২০২৪ সালে BRICS দেশগুলি থেকে মোট মার্কিন আমদানির পরিমাণ ছিল ৮৮৬ বিলিয়ন ডলার, যার মধ্যে চীন এবং ভারতের অবদান সবচেয়ে বেশি । এই পরিমাণের উপর ১০% শুল্ক সম্ভাব্যভাবে ৮৮ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি অতিরিক্ত শুল্ক তৈরি করবে, যা কার্যকরভাবে BRICS সম্প্রসারণ এবং ডলার বিচ্ছিন্নকরণের প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করবে। ১০% শুল্ক আরোপের হুমকির পাশাপাশি, ট্রাম্প প্রশাসন ব্রাজিলের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি জাইর বলসোনারোর বিরুদ্ধে " ডাইনি শিকার"(witch hunt) হিসাবে ব্রাজিলের উপর ৫০% শুল্ক আরোপ করেছে, যার বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান প্রচেষ্টার অভিযোগ রয়েছে। অসম বাণিজ্যের অভিযোগ এনে দক্ষিণ আফ্রিকার উপর ৩০% শুল্ক আরোপ করেছে আমেরিকা। এছাড়াও, রিপাবলিকান সিনেটররা ২০২৫ সালের রাশিয়ার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ আইন নামে একটি বিল আনার পরিকল্পনা করছেন, যাতে তেল এবং অনুমোদিত রাশিয়ান পণ্য আমদানিতে ৫০০% শুল্ক আরোপ করা হবে, যা রাশিয়ার পাশাপাশি তার দুটি বৃহত্তম আমদানিকারক ভারত এবং চীনকেও ক্ষতিগ্রস্ত করবে। শুল্কহার কেন ১০০%-এর মূল ‘হুমকি থেকে দশমাংশে’ নামিয়ে আনা হয়েছে তা স্পষ্ট নয়, এমনকি মি. ট্রাম্প ১ আগস্টের জন্য পরিকল্পিত অন্যান্য ‘পারস্পরিক শুল্কে’র সাথে ব্রিকস শুল্কের সাথেও যাবেন কিনা তাও স্পষ্ট নয়। তবে মি. ট্রাম্প যে ব্রিকসকে ডি-ফ্যাং করতে চান তাতে কোনও সন্দেহ নেই। পলিটিকো ম্যাগাজিনের মতে, "আপনি বলতে পারেন যে (মার্কিন) রাষ্ট্রপতি যখনই ব্রিকস ডি-ডলারাইজেশন প্রচেষ্টা দেখেন, তাতে মিঃ ট্রাম্প বিরক্ত বোধ করেন। বিশ্লেষকরা মনে করেন যে ট্রাম্পের শুল্ক হুমকি, সামরিক সংকেত এবং উচ্চ-স্তরের কূটনীতির মূল লক্ষ্য ব্রিকস সদস্যদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ করার ক্ষমতা নষ্ট বা সীমিত করা।

মি. ট্রাম্পের উদ্বেগ কি বৈধ?

মি. ট্রাম্পের ডলারীকরণ সম্পর্কে ট্রাম্পের উদ্বেগ প্রায় প্রতিটি ব্রিকস সদস্যই অস্বীকার করেছেন। দক্ষিণ আফ্রিকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি বিস্তারিত বিবৃতি জারি করে ব্যাখ্যা করেছে যে কেন ব্রিকস গ্রুপের মধ্যে জাতীয় মুদ্রা ব্যবহারের প্রচেষ্টা ডলার প্রতিস্থাপনের জন্য নয়। যদিও কিছু ব্রিকস নেতার মার্কিন-বিরোধী বক্তব্য কঠোর ছিল, কিন্তু জারি করা ‘ব্রিকস রিও ঘোষণা-২০২৫’ এর শব্দ সরাসরি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা ডলারকে চ্যালেঞ্জ করে না। অপারেটিভ অনুচ্ছেদ ৫০-এ, নেতারা বলেছেন যে তারা অর্থমন্ত্রী এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরদের "ব্রিকস ক্রস-বর্ডার পেমেন্টস ইনিশিয়েটিভের উপর আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার এবং ব্রিকস পেমেন্ট টাস্ক ফোর্স (বিপিটিএফ) কর্তৃক ব্রিকস পেমেন্ট সিস্টেমের বৃহত্তর আন্তঃকার্যক্ষমতার সম্ভাবনার উপর আলোচনা অব্যাহত রাখার জন্য সম্ভাব্য পথ চিহ্নিত করার অগ্রগতি স্বীকার করার জন্য" দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। অনুচ্ছেদ ১৩-এ একতরফা শুল্ক এবং অ-শুল্ক ব্যবস্থার উত্থান নিয়ে "গুরুতর উদ্বেগ" প্রকাশ করা হয়েছে কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাম উল্লেখ করা হয়নি। যদিও ব্রিকস সদস্য দেশগুলির এজেন্ডায় ডলারমুক্তকরণের বিষয়টি প্রাধান্য পায়, তবুও এই বিষয়ে ভারতের অবস্থান ভিন্ন।

ভারতের অবস্থান ও ভূমিকা

একদিকে ব্রিক্স এর সদস্য আর অন্য দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অংশীদার হিসাবে, ভারত এক নাজুক অবস্থানে খুঁজে পায়—ব্লক সংহতি এবং দ্বিপাক্ষিক নির্ভরতার মধ্যে আটকে আছে। ভারতের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই দ্বন্দ্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ কারন ‘ডলার’ বা ‘ডলার-বিকল্প’ মুদ্রার প্রবর্তন নিয়ে। ডলারমুক্ত করণের প্রতি ভারতের বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি বিবেচনা করলে ডলারের উপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে বিকল্প আর্থিক ব্যবস্থার স্বপ্ন বাস্তবায়িত করা সম্ভব আদৌ কতদুর সম্ভব , তাই পরবর্তী অনুচ্ছেদে আলোচনা করা হচ্ছে। যদিও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে একটি ‘মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদনে’ আশাবাদী ভারত সরকার, ব্রিকসকে "আমেরিকান-বিরোধী" তকমা দেওয়া মিঃ ট্রাম্পের বক্তব্যকে তীব্র আপত্তি জানিয়েছে ভারত। ২০২৫ সালের মার্চ মাসে, বিদেশমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর আরও স্পষ্ট বলেছিলেন যে ডলার প্রতিস্থাপনের কোনও ভারতীয় নীতি নেই। ডলার বিমুদ্রাকরণ বিষয়ে ভারতের ভিন্ন নীতি রয়েছে -- কারন মার্কিন ফ্যাক্টর অপরিহার্য। তাছাড়াও অন্যান্য কারণ রয়েছে যার জন্য ভারতের পক্ষে ডলারের বিমুদ্রাকরণ অনুসরণ করার সম্ভাবনা কম। প্রথম এবং প্রধান কারণ হল ডলার সহ প্রধান মুদ্রাগুলির বিপরীতে ভারতীয় মুদ্রার স্থিতিশীলতা। ভারত ইতিমধ্যেই 'রুপী নিষ্পত্তি প্রক্রিয়াটি’ ( Rupee settlement mechanism) পরীক্ষা করে দেখেছে, আর ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাংক (RBI) ভারত এবং অন্যান্য দেশের মধ্যে রুপিতে বাণিজ্য নিষ্পত্তির অনুমতি দিয়েছে। এই পদক্ষেপটি মূলত পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার ফলে বিশেষ করে রাশিয়ার সাথে বাণিজ্য পরিচালনা করার জন্য নেওয়া হয়েছিল। গত ৫ বছরের তথ্য ডলারের বিপরীতে ভারতীয় রুপির প্রবণতা পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, ২০২০ সালের জুনে এক ডলারের বিনিময় মূল্য ৭৩ রুপি ছিল আর এখন তা ৮৫-রুপি। এর ফলে রুপি নিষ্পত্তি গ্রহণকারী দেশগুলির জন্য বিনিময় হারের ঝুঁকি বৃদ্ধি পাবে, অর্থাৎ রুপির মূল্য হ্রাস পেলে বড় ক্ষতি হবে। যে কোনো মুদ্রা, তা জাতীয় মুদ্রা হোক বা 'ব্রিকস মুদ্রা', বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থায় গ্রহণযোগ্যতা অর্জনের জন্য স্থিতিশীল থাকা উচিত। তাই ভারতের জন্য ‘নিজস্ব মুদ্রার স্থিতিশীলতা’ ডলার প্রতিস্থাপনের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

দ্বিতীয়ত, ভারতের দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়ন লক্ষ্যগুলি - ডিজিটাল, অবকাঠামো, পরিষ্কার জ্বালানি রূপান্তর প্রকল্প, দারিদ্র্য বিমোচন এবং উন্নত উৎপাদন - মূলত পশ্চিমা ক্ষেত্রের সাথে জড়িত। এই সমস্ত লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য, ভারতের প্রযুক্তি, বিনিয়োগ এবং পশ্চিমা অভিমুখী বহুপাক্ষিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন, যার প্রধান প্রভাব মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উপর। ভারত সবচেয়ে বেশি ডলারাইজড দেশগুলির মধ্যে একটি, এবং ডলারাইজড সিস্টেম থেকে বেরিয়ে আসা তার ক্রমবর্ধমান অর্থনীতির উপর অপূরণীয় প্রভাব ফেলবে। ভারত তার অর্থনৈতিক আধুনিকীকরণ এবং বিশ্বব্যাপী রাজনৈতিক প্রভাবের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করে। যখন ডলারাইজেশনের মতো উদ্যোগের কথা আসে , ভারত ব্রিকস অন্তর্ভুক্ত দেশ হলেও এই বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি অনুসরণ করে। অনেকেই ইহাকে দ্বৈত-ট্র্যাক পররাষ্ট্র নীতি বলে । কিন্তু এই নীতির জন্য ভারতকে আর্থ-সামাজিক রূপান্তরের জন্য প্রয়োজনীয় বিশ্বব্যাপী মূলধন এবং প্রযুক্তিগত অ্যাক্সেসে কোন ঝুঁকির মুখে পরতে হয় নি।

তৃতীয় কারণ হলো, যদি বিকল্প মুদ্রা বিরাজ করে, তাহলে ছোট ব্রিকস দেশগুলির উপর চীনের আধিপত্য আরও বৃদ্ধি পাবে। বর্তমানে ব্রিকসের মধ্যে নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকে (এনডিবি) চীনের সবচেয়ে বড় অংশ রয়েছে। ভারত ইতিমধ্যেই ব্রিকসের মধ্যে ক্রমবর্ধমান চীনা আধিপত্যের আশঙ্কা করছে, কারণ এর ফলে বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা এবং এই অঞ্চলে চীনের প্রতি-ভারসাম্য হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার চেষ্টা চলছে। ভারত ও চীনের মধ্যে ইতিমধ্যেই অসম বাণিজ্য সম্পর্ক বিরাজমান, ফলে ভারত ছোট ব্রিকস দেশগুলির আর্থিক নীতিগুলিকে প্রভাবিত করে বিশ্ব-দক্ষিণে চীনের প্রভাব বৃদ্ধি করতে দিতে পারে না। চীনের মুদ্রা ‘ইউয়ান(Yuan)’ এর বিনিময় গ্রহণযোগ্যতা সাম্প্রতিক বৃদ্ধির কথা বিবেচনা করে, ভারত চাইবে না যে চীন বিকল্প আর্থিক ব্যবস্থায় আধিপত্য বিস্তার করুক, যদি তা হয়। অর্থাৎ ভারত ডলারের আধিপত্যকে ইউয়ানের আধিপত্য দিয়ে প্রতিস্থাপন করতে আগ্রহী নয়।

সোজাকথায়, ব্রিকসের কাঠামোর আওতায় ডলারমুক্তির বাগাড়ম্বরতা চাপ ক্রমাগত বৃদ্ধি পেলেও , এটি কেবল বাগাড়ম্বরই। বিকল্প আর্থিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বর্তমান আর্থিক ব্যবস্থায় আধিপত্য বিস্তারকারী মার্কিন ডলারের প্রভাব মোকাবেলা করার মত কোন মুদ্রাকে দাঁড় করানো অনেক কঠিন। বাণিজ্যের জন্য ডলারই এখন পর্যন্ত প্রধান মুদ্রা। বিকল্প মুদ্রার প্রাপ্যতা, গ্রহণযোগ্যতা এবং স্থিতিশীলতার অভাব থাকায়, ডলারমুক্তি বাস্তবে কঠিন। ভারত তার উন্নয়নমূলক লক্ষ্যের জন্য পশ্চিমাদের উপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। ভারতের ভারসাম্যমূলক ভুমিকা – যেমন গ্লোবাল সাউথের একটি নেতৃস্থানীয় কণ্ঠস্বর হিসেবে তার পরিচয় এবং পশ্চিমা শক্তির সাথে তার কৌশলগত সারিবদ্ধতা (Strategic alignment)- তার বৈদেশিক নীতি পছন্দগুলিতে একটি ধ্রুবক উত্তেজনা তৈরি করে। বিশ্বব্যবস্থার উন্নয়নের গতিপথ এবং কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনকে ক্ষুণ্ন না করে, বিশ্বব্যবস্থাকে পুনর্নির্মাণ করতে চায় এমন গোষ্ঠীগুলিতে অংশগ্রহণের জন্য ভারতকে অত্যন্ত সতর্কতা এবং বাস্তবসম্মতভাবে এই দ্বৈততাগুলি মোকাবেলা করতে হচ্ছে।

ভারতের সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং পশিচমাদেশের দ্বন্দ্বের এখন আরেক মুল কারন রাশিয়া থেকে জ্বালানি তেল আমদানি । এদিকে ন্যাটো প্রধান মার্ক রুট চীন, ভারত এবং ব্রাজিলকে সতর্ক করে বলেছেন যে যদি তারা রাশিয়ার সাথে বাণিজ্য চালিয়ে যায় এবং তাদের তেল ও গ্যাস কিনতে থাকে এবং মস্কো যদি শান্তি আলোচনাকে গুরুত্বের সাথে না নেয়, তাহলে ১০০ শতাংশ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে।" ভারতের বিদেশ মন্ত্রক এই হুমকিকে "দ্বৈত নীতি" হিসাবে অভিহিত করেছেন এবং বলেছে, "আমাদের জনগণের জ্বালানি চাহিদা নিশ্চিত করা আমাদের জন্য বোধগম্যভাবে একটি অগ্রাধিকার"। উল্লেখযোগ্যভাবে, ছাড়ের দাম দেওয়ার পর ভারত রাশিয়ান অপরিশোধিত তেল কিনতে শুরু করেছে। ভারত বলেছে যে তারা যেই তেল সবচেয়ে ভালো দাম দেবে (নিষেধাজ্ঞার আওতায় নয়) তার কাছ থেকে এমন তেল কেনা চালিয়ে যাবে। ভারত তার অপরিশোধিত তেলের চাহিদার প্রায় ৮৮ শতাংশ আমদানির উপর নির্ভর করে এবং রাশিয়া গত তিন বছর ধরে ভারতের তেল আমদানির প্রধান ভিত্তি, প্রায় ৪০ শতাংশ তেল এখন ভারত রাশিয়া থেকে আমদানি করে। দেশের মানুষের জ্বালানির চাহিদা মেটানোই ভারত সরকারের অগ্রাধিকার ও প্রধান লক্ষ্য। কিন্তু গত ৩০ শে জুলাই ডোনাল্ড ট্রাম্প এক ঘোষনা দিয়েছেন যে ভারত যদি রাশিয়া থেকে জ্বালানি তেল আমদানি চালিয়ে যায় তবে তাহলে ভারতকে আমেরিকায় পন্য রপ্তানির সময় ২৫% ‘পারস্পরিক শুল্ক’ ভিন্ন অতিরিক্ত পেনাল্টি প্রদান করতে হবে।

এ ক্ষেত্রে উল্লেখ্য, নেটোর একাধিক সদস্য দেশ রাশিয়া থেকে জ্বালানি ক্রয় করত। ইউরোপেও রাশিয়ার তেলের ক্রেতা ছিল প্রচুর। পরিসংখ্যান বলছে, ২০২২ সাল থেকে রাশিয়ার তরলীকৃত স্বাভাবিক গ্যাস এবং পাইপলাইন গ্যাসের সর্বোচ্চ রফতানি হয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়নে। রাশিয়ার তেল সবচেয়ে বেশি কিনেছে তুরস্ক, নেটোর অন্যতম সদস্য দেশ। "রাশিয়ান তেলের পরিমাণের এই পুনরুত্থান বাণিজ্যিক প্রণোদনা এবং ভূ-রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস উভয়কেই প্রতিফলিত করে। ছাড়, অর্থপ্রদানের ব্যবস্থা এবং বিকল্প শিপিং এবং বীমা নেটওয়ার্কের মাধ্যমে লজিস্টিকাল নমনীয়তার কারণে রাশিয়ান ব্যারেলগুলি অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক রয়ে গেছে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞাগুলি বৃদ্ধি সত্ত্বেও, ভারতীয় পরিশোধকরা রাশিয়া থেকে ক্রয় বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে - এমনকি প্রসারিতও করেছে এবং ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন এর অনেক দেশ ভারতের মাধ্যমে পরিশোধিত রাশিয়ান তেল আমদানী করত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এর তরফে রাশিয়ান তেল আমদানী নিয়ন্ত্রন করার জন্য গুরত্বপুর্ণ লজিস্টিকাল ব্যবস্থায় ব্যাঘাত করার চেষ্টা চলছে । রাশিয়া থেকে আগামী মাসগুলিতে তেল কেনা অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা থাকলেও, কিছুদিন আগে ন্যাটো ও ট্র্যাম্পের হুমকির ফলে ভারতীয় তেল কোম্পানি( নায়ারা এনার্জি) থেকে তেল ক্রয়ে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন।

উপসংহার

ভারতের অবস্থান একটু জটিল। একদিকে ব্রিকস অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্লক আর অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-- একটি প্রধান বৈশ্বিক শক্তি। ফলে দুইয়ের সাথে ভারসাম্য বজায় রাখতে হচ্ছে—একদিকে ব্রিকসের মধ্যে তার কৌশলগত স্বার্থ, বিশেষ করে অর্থনৈতিক ও উন্নয়নমূলক লক্ষ্যগুলির দৃষ্টি রাখা , আর অন্য দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তার ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব বজায় রাখা। বহুমেরু বিশ্বে ভারতের প্রবৃদ্ধি এবং প্রভাব অব্যাহত রাখার জন্য এই ভারসাম্যমূলক পদক্ষেপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারত ধারাবাহিকভাবে বহুমেরু বিশ্ব এবং বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলির গণতন্ত্রীকরণের পক্ষে কথা বলছে । ২০২৩ সালে G20-এর সভাপতিত্বে, নিজেকে "গ্লোবাল সাউথের কণ্ঠস্বর" হিসাবে স্থান দিয়েছে এবং এই প্রতিশ্রুতিকে আরও জোরদার করেছে। নির্বাচিত অংশীদারদের সাথে রুপিতে বাণিজ্য প্রচারের ভারতের প্রচেষ্টা অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বকে শক্তিশালী করার এবং ডলার নির্ভরতা হ্রাস করার একটি স্পষ্ট উদ্যোগ। তবে ভারতের পররাষ্ট্র নীতি প্রায়শই একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্যমূলক পদক্ষেপ দ্বারা চিহ্নিত করা হয়। গ্লোবাল সাউথের সাথে জড়িত থাকার ফলে তাদের স্বার্থের পক্ষে কথা বলার সময়, ভারত পশ্চিমা শক্তিগুলির সাথে গভীর অর্থনৈতিক এবং কৌশলগত সম্পর্কও বজায় রাখে। উদাহরণস্বরূপ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভারতের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার , যার সাথে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ১৯০ বিলিয়ন ডলার । ভারত আবার কোয়াডের মতো গোষ্ঠীর সদস্য (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জাপান এবং অস্ট্রেলিয়ার সাথে), যা ব্যাপকভাবে ইন্দো-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের দৃঢ়তার বিরুদ্ধে একটি প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখা হয় । এই "বহু-সারিবদ্ধকরণ"(multi-allignment) বা "সর্ব-সারিবদ্ধকরণ"(all-allignment) মনোভাব / নীতি মূলত কোন ব্লকের সাথে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ না হয়েও একাধিক ব্লকের সাথে জড়িত থাকা-- যেন দেশের জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষিত থাকে। তবে ইহা অনস্বীকার্য যে ব্রিকস সদস্যদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে এবং এই বিষয়ে গ্রুপিংয়ের কোনও ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নেই। তাই ভারত সরকারের মনোযোগ এখন ট্রাম্প প্রশাসনের সাথে শুল্ক বিরোধ সমাধানের জন্য একটি বাণিজ্য চুক্তিতে পৌঁছানোর দিকে। কিন্তু একই সাথে, ভারত ব্রিকসের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, যা এখন বিশ্বের প্রায় অর্ধেক জনসংখ্যা, বিশ্বব্যাপী জিডিপির প্রায় ৪০% এবং বিশ্বব্যাপী বাণিজ্যের এক-চতুর্থাংশ প্রতিনিধিত্ব করে। সকল চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও, ভারত ‘রিও ঘোষণা’পত্রে উল্লিখিত বিভিন্ন বিষয়ে ব্রিকস সদস্যদের মধ্যে মৌলিক সংহতি এবং ঐকমত্যের উপর জোর দিচ্ছে ।

আরও পড়ুন...


Post Your Comments Below

নিচে আপনি আপনার মন্তব্য বাংলাতেও লিখতে পারেন।

বিঃ দ্রঃ
আপনার মন্তব্য বা কমেন্ট ইংরেজি ও বাংলা উভয় ভাষাতেই লিখতে পারেন। বাংলায় কোন মন্তব্য লিখতে হলে কোন ইউনিকোড বাংলা ফন্টেই লিখতে হবে যেমন আমার বাংলা কিংবা অভ্রো কী-বোর্ড (Avro Keyboard)। আমার বাংলা কিংবা অভ্রো কী-বোর্ডের সাহায্যে মাক্রোসফট্ ওয়ার্ডে (Microsoft Word) টাইপ করে সেখান থেকে কপি করে কমেন্ট বা মন্তব্য বক্সে পেস্ট করতে পারেন। আপনার কম্পিউটারে আমার বাংলা কিংবা অভ্রো কী-বোর্ড বাংলা সফ্টওয়ার না থাকলে নিম্নে দেয়া লিঙ্কে (Link) ক্লিক করে ফ্রিতে ডাওনলোড করে নিতে পারেন।

Free Download Avro Keyboard

Fields with * are mandatory





Posted comments

Till now no approved comments is available.