প্রতুল মুখোপাধ্যায় : চিরস্মরণীয় গানের পদাতিক
সৌম্যদীপ দেব
March 29, 2025
জনমানসে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠা সাধারণ তো নয়। জন্মের দায় জীবন বইতে হয়। কিন্তু জীবনকে সইতে হবে কেনো? জীবনের থেকে আত্মা যদি বড়ো হয় তার ভার! প্রতিদিন একটু একটু করে হয়ে ওঠা, গড়ে নেওয়ার সাধনাই তো জীবন। বাংলা গানের ভুবনে একটি কথা সেকাল-একালে সমান প্রচলিত। হারমনিয়াম না বাজাতে পারলে আবার গায়ক না-কি। কিংবা রাগ ছাড়া খালি গলায় গান এটা আবার হয় না-কি। গায়ক হতে আসেননি। গায়ক হওয়ার মতো তথাকথিত সুরের শিক্ষা গ্রহণ তাঁর ছিল না বললেই হয়। কিন্তু ছিল শেখার জন্য নেশা। আর এভাবেই বঙ্গদেশে বিভিন্ন প্রজন্মের কাছে রীতিমতো সেনসেশনাল সিঙ্গার হয়ে উঠলেন প্রতুল মুখোপাধ্যায় (১৯৪২-২০২৫)। পরিবারে সাংস্কৃতিক পরিসর ছিল। তাঁর বাবা ছিলেন শিক্ষক। তবুও অভাব দেখেছেন প্রতুল। পরিবারে চারিত্রিক ও নৈতিক মূল্যবোধের উপর স্বভাবতই গুরুত্বারোপ ছিল। তাঁর বাবা গান লিখতেন, সুর দিতেন, গান নিজে গাইতেন। কবিতাও লিখতেন বেশ, মন্দ নয়। যখন মানুষ তাঁকে সেভাবে গ্রহণ করে ওঠেনি, গানের মঞ্চ তাঁর জোটেনি, বিদ্যালয়ের অনুষ্ঠানে গান কিংবা স্তোত্র পাঠ, মণিমেলায় গান, বিয়ের বাসরে গান, পথসভায়, ছাত্রদের দাবি নিয়ে কোনো মিছিলে, শ্রমিকদের লড়াইয়ের মঞ্চে, অনুরোধের আসর করতেন, বন্ধুদের আড্ডায় গান করতেন। আরও বললে বলতে হয়, প্রতুল মানুষ প্রতুল কিন্তু গায়ক প্রতুল সমাজে মান্য হয়নি বহুকাল; প্রতুল মুখোপাধ্যায় সেই সময় থেকে গায়ক। জন্ম গায়ক প্রতুল। আরো স্পষ্ট করে যদি বলি, পশ্চিমবঙ্গের বাম প্রগতিশীল আন্দোলন থেকে জোরালো ভাবে উত্থান ঘটেছিল তাঁর। অতএব সহজেই অনুমেয় গণসংগীত তাঁর কণ্ঠে বন্দিত হতো অতি সাধারণভাবে। যে কোনো রাগের তোয়াক্কা করেননি, খালি গলায় গান করতেন, বাদ্যের আড়ম্বর তাঁর প্রয়োজন রহিত; গান গাইতে গাইতেই নতুন সৃষ্টি করে ফেলতেন এটাই প্রতুল। বড়ো মঞ্চ, বড়ো বাদ্য আর আলোর ঝলকানিতে নয়, জনসাধারণ্যে যে মানুষ আজীবন গান গেয়ে গেলেন তাঁকে খুঁজে পাওয়া যাবে হৃদয়ের মঞ্চে, উৎসারিত প্রাণের আলোর ভাঁজে। নিঃশব্দে বৃহৎ হয়ে ওঠা মানুষকে সমাজ মানুষের কৃত্রিম আলোর তলায় পাওয়া যায় না। আধুনিক বাংলা গানেও তিনি অনন্য। তাঁর মতো করে আধুনিকতাকে তিনি গানে নিয়ে স্থাপন করেছেন। ‘সেই মেয়েটি’ গানটি কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘বসেছে আজ রথের তলায় স্নান যাত্রার মেলা’ কবিতার সাংগীতিক রূপ। এই গানের সুরারোপের সময় ইচ্ছাকৃত রবীন্দ্র গানের মোহ গৃহীত হয়েছিল। এছাড়াও ‘পাথরে পাথরে নাচে আগুন’ — বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা অবলম্বনে প্রতুলের কণ্ঠে গীত হওয়া একটি আলোড়িত সংগীত। সমীর রায়ের লেখা “আলু বেচো, ছোলা বেচো, বেচো বাখর খানি/ বেচোনা বেচোনা বন্ধু তোমার চোখের মণি।/ কলা বেচো, কয়লা বেচো, বেচো মটরদানা/
বুকের জ্বালা বুকেই জ্বলুক, কান্না বেচোনা।/
ঝিঙে বেচো পাঁচ সিকেতে, হাজার টাকায় সোনা/
বন্ধু তোমার লাল টুকটুকে স্বপ্ন বেচোনা।/
ঘরদোর বেচো ইচ্ছে হলে, করব নাকো মানা/
হাতের কলম জনম দুখী, তাকে বেচোনা।” প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের গানের পর তা হয়ে উঠল ‘আলু বেচো ছোলা বেচো’। আবার যখন গাইলেন “ডিঙ্গা ভাসাও সাগরে, সাথী রে/ ডিঙ্গা ভাসাও সাগরে” তখন বাংলার জনমানসে অসম্ভব উন্মাদনা তৈরি হল। আসলে শিল্পের কাছে বসে যেন ধরে ধরে শিল্পের পাঠ। তাঁর উচ্চারণের বাঙময়তা, সামাজিক অভিজ্ঞতাযাত শব্দচয়ন মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখে শ্রোতাদের। কতটা সংগীত বোধ! শিল্পকে নিজের মধ্যে বইতে জানতেন। বলি শিল্প বেত্তা। আর তাঁর হাত ধরেই বাংলা জনসংগীতের ধারা আরো পুষ্ট হল। দৃপ্ত কণ্ঠে বলতেন “কোনো ভাষার অবমাননা করবো না, মাতৃভাষার অবমাননা সহ্য করবো না।” নিজের সুরে নিজে গাইতেন। কখনো অন্যের কবিতায় সুর দিয়ে গাইতেন। আবার কখনো নিজে লিখে নিজে সুর দিতেন। কবি জীবনানন্দ দাশ ছোটবেলায় কাঁদলে মা কুসুমকুমারী দাশ ছেলেকে শান্ত করার জন্য ‘আদর্শ ছেলে’ নামে কবিতা লিখেছিলেন। এই কবিতাও তিনি স্বকণ্ঠে গান করেছেন। ঘন্টার পর ঘন্টা তিনি আড্ডা দিতে পারতেন। গল্প, আড্ডার সমান্তরালে যিনি গান করতেন তাঁর নামই প্রতুল মুখোপাধ্যায়। ক্লান্তিহীন চোখে-মুখে একমাত্র গান লেগে থাকত, আর কিছু নয়। চৌরাশি বছরের জীবন পরিক্রমায় যিনি দু’হাত উপুর করে দিয়ে গেলেন বাংলা সংগীত ও সংস্কৃতিকে। যাঁর হাত ধরে বাংলার আরো নিজস্ব এক সাংগীতিক ধারা তৈরি হয়ে গেল। তিনিই প্রতুল মুখোপাধ্যায়। বাংলা সংগীতাকাশে আশীর্বাদ।
বয়স তখন বারো। প্রথম অ্যালবাম, অ্যালবামে প্রথম গান ‘পাথরে পাথরে নাচে আগুন’ বেরিয়ে গেছে। জনমনে খুব সাড়া তা অবশ্য বলা যায় না। এই প্রথম গানের গায়ে সুর দিলেন তিনি। তখন তো বছরভর অ্যালবাম প্রকাশিত হতো। বিশেষ করে দুর্গাপূজা, নববর্ষকে উপলক্ষ করে আরো বেশি গান বেরোত। এই প্রজন্ম সেকাল দেখেনি। প্রতুল মুখোপাধ্যায় ছোট থেকেই মনযোগী শ্রোতা ছিলেন, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। গান যখন শুনতেন এমনভাবে শুনতেন কারণ দ্বিতীয়বার শোনার সুযোগ আর নেই তাঁর। রেডিও ছিল না বাড়িতে। মনে ভরসা ছিল, গানের কথাগুলো পেলে ঠিক গেয়ে নিতে পারবেন। চতুর্থ শ্রেণিতে প্রথম ভর্তি। হাতে লেখা ম্যাগাজিন করতেন, থিয়েটার করতেন, থিয়েটারে প্রতুল সিঙ্গিং ক্যারেকটার মানে তাঁকে গানওয়ালা চরিত্রে কাস্টিং করা হতো। ব্যঙ্কের পদস্থ অফিসার থেকে বাঙালি মাটির সংস্কৃতির গায়ক, কিংবদন্তি গানের পদাতিক। অর্থনীতির পাঠ শেষে হয়ে উঠলেন স্টেটিশটিশিয়ান। সমালোচকদের কেউ কেউ এবার বলতে শুরু করলেন, তাকে দিয়ে কিছু হবে না, এই রোগা চেহারা! বামপন্থী প্রগতিশীল সাহিত্যিকরা নিয়মিত বাড়িতে আসতেন। সমাজ-রাষ্ট্র-জনমন বুঝে নেওয়ার ক্ষেত্রে যা তাঁর বিশেষ সহায়ক ছিল।
প্রতুল মুখোপাধ্যায় যদি আর কোনো গান না-ও করতেন তাহলেও চিরকাল বাঙালির সংগীত চর্চায় বেঁচে থাকতেন শুধুমাত্র এই একটি গানের জন্য। বাঙালির মাতৃভাষা বন্দনার অন্যতম শ্রেষ্ঠ গান ‘আমি বাংলায় গান গাই/ আমি বাংলার গান গাই।” এই গানটি রচনার পেছনে ছোট্ট একটা গল্প আছে। ১৪০০ শতককে স্বাগত জানিয়ে কফি হাউসে অনুষ্ঠান। পীযূষ কান্তি সরকার আসবেন ওই দিনের অনুষ্ঠানে। প্রতুল মুখোপাধ্যায়কে গান করতে বলা হয়েছে। এমন আবহের উপর কী গাওয়া যায় নিজ ঘরে বসে ভাবছেন প্রতুল। তিন দশক গান গাওয়া, সুর দেওয়া ও গান লেখার ইতিহাস তখন তাঁর। সময়টা নয়ের দশক। অফিসের কাজের ফাঁকে ফাঁকে লিখছেন, এই করেই লেখা হয়ে গেল কালজয়ী এই গান। আজ যে গান উন্মাদনা তখন উপস্থিত পনেরো-ষোলোজন খুব একটা যে ভীষণ সাড়া দিয়েছিলেন তা নয়; বরং কেউ কেউ বলেছিলেন একটু নজরুল ঘেঁষা সুর। প্রতুল মুখোপাধ্যায় একান্ত সাক্ষাৎকারে নিজেই এর অবতারণা করেছেন। তখনকার বাংলায় বিখ্যাত চিকিৎসক ডা. বারিন রায় শিল্পীদের মধ্যমণি। তিনি প্রতুল মুখোপাধ্যায়কে বলেছিলেন, “ ‘বাংলার মাটি বাংলার জল’ এর পর এমন গান আর হয়নি।” বলা সমীচীন হবে, ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হল প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে। আসলে সু-সাহিত্য গ্রহণের জন্য যেমন পাঠকের প্রস্ত্ততি লাগে, তেমনি ভাল গান গ্রহণের জন্য শ্রোতার প্রস্ত্ততি প্রয়োজন হয়। জীবনবোধে ধারাবাহিক চর্চা খুব দরকার। অপরিসীম বেদনা বহনের যে ক্ষমতা তা শিল্পীর শ্রেষ্ঠ প্রতিভা। আলোচ্য গায়কও জীবনে বহু বেদনার মুখোমুখি হয়েছেন, কিন্তু গান থেকে মুখ ফিরিয়ে নেননি বলেই আজ এই স্মরণ লেখার প্রয়াস তৈরি হয়েছে। এটাও সমান্তরালে সত্য যে, কোনো লেখক বা শিল্পীর একটি সৃষ্টি বেশি জনপ্রিয় হয়ে গেলে অন্য শিল্পগুলো কখনো কখনো মর্যাদা হারায়। প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের ক্ষেত্রেও এমন হয়েছে কি-না তা-ও ভাবনাচিন্তার অবকাশ রয়েছে। প্রতুল মুখোপাধ্যায় কাদের জন্য গান করতেন? শ্রোতা কারা? শ্রোতা নিশ্চয়ই সীমায়িত। আর উচ্চবিত্তেরা তো নয়ই। সবকিছুর পরেও এটা তো স্বীকার করতেই হয়, ‘আমি বাংলার গান গাই’ তাঁকে বাণিজ্যিক করল শুধু নয়, মূলস্রোতেও ফিরিয়েছিল। শ্রোতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ও মনকে পড়ার ক্ষমতা তাঁকে সাহস দিয়েছিল গান নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে। আসলে এটাও ততোধিক সত্যি যে, নয়ের দশকে বাংলা গানের পরিমণ্ডলে যাঁরা এলেন প্রত্যেকেই এলেন অত্যন্ত জোরালো ভাবে। নিজস্ব গতি ও রীতি নিয়ে। পূর্বের চলতি ধারায় এঁরা কেউ গান বাঁধেননি। কবীর সুমন, অঞ্জন দত্ত, নচিকেতা তাঁদের হাত ধরে বাংলা সংগীতের পরিমন্ডলে সুরের যে সম্প্রসারণ ঘটেছিল তা তো ইতিহাস। আর এই ধারায় ‘আমি বাংলার গান গাই’ দুই বাংলার মানুষের কাছে বিপুল গ্রহণযোগ্যতা পেল নিজস্বতার উপলব্ধি ও অন্বেষণে। মঞ্চে তাঁর স্বর আর না ধ্বনি হলেও, মানব-মানবীর হৃদয়ের তানপুরায় প্রতুল বারবার ধ্বনিত হবে। সমালোচকদের তথাকথিত আখ্যা দেওয়া ‘বেসুরো’ লোকটিই ক্রমে ক্রমে হয়ে উঠলেন সুরের সম্রাট। একেবারেই অন্যভাবে একটু ভাবতে চাওয়া, বাঁচতে চাওয়া মানুষের প্রাণের প্রতুল। একটি আস্ত জীবন জোরা গান, গানের মানুষ। আর এই গানেই বেঁচে থাকবেন প্রতুল মুখোপাধ্যায়।
(The editor of tripurainfo.com warmly invites students and aspiring writers to share their thoughts, ideas, and creativity through articles. Understanding that every great writer starts somewhere, tripurainfo.com is committed to providing a platform where young minds can express themselves without fear of judgment.
This initiative is not about perfection but about encouragement, growth, and giving voice to new perspectives. We believe that by supporting young talents today, we are shaping the storytellers, journalists, and thought leaders of tomorrow.
So, if you have a story to tell or an idea to share, don’t hesitate—send in your articles. Let your words inspire others, and let tripurainfo.com be the stage where your voice is heard!)
আরও পড়ুন...