ইতিহাস ঐতিহ্য আধ্যাত্মিকতার মেলবন্ধন শ্রীনগর কালীবাড়ি ( ১৯৭৭ থেকে ২০২৬)

ড. রাজেশ ভট্টাচার্য

November 8, 2026

ত্রিপুরার আগরতলা, সেই আগরতলারই একটা পাড়া শ্রীনগর। আজ শ্রীনগরে গেলে দেখা যাবে ব্যস্ত রাস্তা, দোকানপাট, স্কুল থেকে ফেরা ছেলেমেয়ের দল, ওএনজিসির কোয়ার্টার, স্টেডিয়ামের মাঠে খেলতে থাকা ছেলেরা। কিন্তু আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগে এই ছবিটা ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। তখন শ্রীনগর ছিল প্রায় জনশূন্য একটা অঞ্চল। সবে মাত্র ওএনজিসির কর্মকর্তারা এসে এখানে বাড়িঘর করতে শুরু করেছেন। পাশে স্টেডিয়ামের জন্য রাজ্য সরকার জায়গা দেখা শুরু করেছে। রাস্তা বলতে কাঁচা মাটির পথ, আলো বলতে হ্যারিকেনের আলো, আর চারদিকে শুধু ফাঁকা জমি আর ঝোপঝাড়। একটা জনপদ তখন সবে জন্ম নিচ্ছে, কিন্তু তার প্রাণ তখনও প্রতিষ্ঠা হয়নি। কারণ একটা জনপদের প্রাণ শুধু বাড়িঘর দিয়ে হয় না, রাস্তাঘাট দিয়ে হয় না। একটা জনপদের প্রাণ হয় তার মন্দির দিয়ে, তার মিলনক্ষেত্র দিয়ে, যেখানে মানুষ একসঙ্গে বসতে পারে, একসঙ্গে প্রার্থনা করতে পারে, একসঙ্গে কাঁদতে পারে, একসঙ্গে হাসতে পারে। শ্রীনগরে সেই প্রাণের প্রতিষ্ঠা হয়েছিল উনিশশো সাতাত্তর সালে, দীপাবলীর রাতে। সেদিন গোটা দেশ যখন আলোয় ভরে উঠেছিল, সেদিন শ্রীনগরের এই ফাঁকা জমিতেও জ্বলে উঠেছিল এক নতুন আলো। স্থাপিত হয়েছিল শ্রীনগর কালী বাড়ী।

সেই সময় এই অঞ্চলে ধর্মীয় ভাবাবেগ নিয়ে মাতৃ মন্দির প্রতিষ্ঠা করার কথা কেউই ভাবেনি। মানুষ তখন নিজের বাড়ি বানাতে ব্যস্ত, নিজের চাকরি বাঁচাতে ব্যস্ত, নিজের সংসার গোছাতে ব্যস্ত। কিন্তু কিছু মানুষ থাকেন যারা স্রোতের উল্টো দিকে হাঁটেন, যারা শুধু নিজের কথা ভাবেন না, সবার কথা ভাবেন। তেমনই এগিয়ে এলেন গোপাল সূত্রধর, প্রদীপ চক্রবর্তী আর সুনীল চন্দ্র সাহা। গোপাল সূত্রধর ছিলেন তৎকালীন নেতাজি স্কুলের প্রধান শিক্ষক। মাস্টারমশাই মানে শুধু স্কুলের মাস্টারমশাই নন, তিনি ছিলেন গোটা পাড়ার মাস্টারমশাই। তাঁর কথায় মানুষ ভরসা করত, তাঁর ডাকে মানুষ সাড়া দিত। গোপাল বাবু বুঝেছিলেন ছেলেমেয়েরা স্কুলে পড়বে, বড় হবে, চাকরি করবে, কিন্তু তাদের শিকড়টা কোথায় থাকবে, তাদের সংস্কৃতি কোথায় থাকবে। একটা মন্দির ছাড়া একটা জনপদ বাঁচতে পারে না। তাই তিনিই প্রথম স্বপ্নটা দেখলেন, মায়ের মন্দির বানাতে হবে। একজন শিক্ষকের এই ভাবনাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ, কারণ শিক্ষক শুধু বই পড়ান না, শিক্ষক সমাজ গড়েন। গোপাল সূত্রধর সেই সমাজ গড়ার কাজটাই করেছিলেন মন্দির দিয়ে। তাঁর সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এগিয়ে এলেন প্রদীপ চক্রবর্তী। তিনি ছিলেন উদ্যমী, কর্মঠ। একটা ভালো কাজের জন্য দশ জনের কাছে যাওয়া, দশ জনকে বোঝানো, এই কাজটা তিনি হাসিমুখে করতেন। মন্দিরের জন্য জায়গা দেখা, লোক জড়ো করা, চাঁদা তোলা, পূজার জোগাড়, এই সব কাজে প্রদীপ বাবু ছিলেন সামনের সারিতে। আর ছিলেন সুনীল চন্দ্র সাহা, এলাকার বিখ্যাত নাগরিক। তাঁর নাম শুনলে মানুষ সম্মান করত। তাঁর উপস্থিতি মানেই কাজটা হবে। তিনি এগিয়ে আসায় মন্দিরের কাজটা গতি পেল। এই তিনজনের উদ্যোগেই উনিশশো সাতাত্তর সালে শ্রীনগর কালীবাড়ির প্রতিষ্ঠা ঘটে। তাঁরা শুধু মন্দিরের ভিত্তি স্থাপন করেননি, তাঁরা শ্রীনগরের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন।

মন্দির বানালেই তো হলো না, মায়ের বিগ্রহ চাই। তাঁরা দেবী ত্রিপুরা সুন্দরী কালীর বিগ্রহটিকে এনে এখানে প্রতিষ্ঠা করেন। কেন ত্রিপুরা সুন্দরী কালী, কারণ এই মা-ই ত্রিপুরার মা। তাঁর নামেই এই রাজ্যের পরিচয়। সেই মায়েরই এক রূপকে শ্রীনগরে আনা হলো, যাতে শ্রীনগরের মানুষের সঙ্গে ত্রিপুরার মূল ধারার একটা যোগ থাকে। সেই মা-ই আজও শ্রীনগরের মা। একটা বড় কাজ তিনজন মিলে হয় না, আরও অনেকের হাত লাগে। প্রতিষ্ঠার সময় আরও কয়েকজন ছিলেন, যাদের নাম ইতিহাসে লেখা থাকা উচিত। গৌতম সাহা প্রতিষ্ঠার সময় থেকে সঙ্গে ছিলেন। মন্দিরের প্রতিটা কাজে তিনি ছিলেন, কখনো ইট বইছেন, কখনো পূজার জোগাড় করছেন, কখনো মানুষকে ডাকছেন। পুতুল দেব তিনিও শুরুর দিন থেকে যুক্ত ছিলেন। মায়ের মন্দিরে মায়েদের ভূমিকা সবচেয়ে বড়, পুতুল দেব সেই ভূমিকাটাই পালন করেছিলেন নীরবে, নিষ্ঠার সঙ্গে। দীনেশ চক্রবর্তী ছিলেন মুখ্য পুরোহিত। তাঁর হাত দিয়েই মায়ের প্রথম পূজা শুরু হয়। প্রথম প্রদীপ, প্রথম আরতি, প্রথম ভোগ, সবই তাঁর হাত দিয়ে। একজন পুরোহিতের হাত দিয়ে মন্দিরের প্রাণ প্রতিষ্ঠা হয়। প্রদীপ কুমার দাস ছিলেন তৎকালীন থানার বিখ্যাত অফিসার ইনচার্জ এবং পুলিশ আধিকারিক। তিনি এই মন্দির প্রতিষ্ঠায় সহযোগিতা করেন। একজন পুলিশ অফিসার যখন একটা মন্দির প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে আসেন, তখন বোঝা যায় কাজটা কতটা সৎ, কতটা সবার। তাঁর উপস্থিতি মন্দিরকে একটা নিরাপত্তা দিয়েছিল, একটা ভরসা দিয়েছিল। এই মানুষদের হাত ধরে শ্রীনগর কালী বাড়ীর যাত্রা শুরু হলো। সেই দীপাবলীর রাতে ছোট্ট মন্দির, সাদামাটা আয়োজন, কিন্তু ভক্তি ছিল অসীম। সেই রাতের কথা আজ যারা বেঁচে আছেন, তারা এখনও বলেন, মাটির প্রদীপের আলোয় মায়ের মুখটা যেন আরও উজ্জ্বল লাগছিল। মনে হচ্ছিল মা হাসছেন।

কোনো মন্দির একদিনে বড় হয় না। ধীরে ধীরে, বছরের পর বছর ধরে, একটু একটু করে বড় হয়। পরবর্তী সময় বয়ে যায়, আস্তে আস্তে মন্দিরটির বিকাশ হয়। বিকাশের পর মন্দিরে নতুন নেতৃত্ব আসেন। এই সময়টা খুব গুরুত্বপূর্ণ, কারণ প্রথম যারা শুরু করেছিলেন, তাঁরা বয়সের কারণে ধীরে ধীরে সরে যান। তখন দরকার হয় নতুন প্রজন্মের, নতুন উদ্যমের। শ্রীনগর কালী বাড়ীতে সেই নতুন প্রজন্ম এসেছিলেন, আর তাঁরা মন্দিরকে আরও বড় করেছিলেন। শিবুলাল সেন ছিলেন সেই সময়ের অন্যতম নেতৃত্ব। মন্দিরের কাজকে সংগঠিত করা, কমিটি বানানো, হিসাব রাখা, এই কাজগুলো তিনি খুব নিষ্ঠার সঙ্গে করতেন। দয়াময় চন্দ্র, নামের মধ্যেই যার দয়া-মায়া, তিনি ছিলেন ভক্তদের খুব প্রিয়। মন্দিরে এলে কেউ খালি হাতে ফিরত না, প্রসাদ হোক, আশীর্বাদ হোক, ভালো কথা হোক, কিছু না কিছু নিয়ে ফিরত। শংকর লস্কর ছিলেন অফিস সেক্রেটারি। মন্দিরের অফিস সেক্রেটারি মানে মন্দিরের খাতা-কলমের দায়িত্ব তাঁর হাতে। কে কত দিল, কোথায় কত খরচ হলো, কোন পূজা কবে হবে, সব হিসাব তাঁর কাছে থাকত। শংকর বাবু সেই দায়িত্ব খুব সততার সঙ্গে পালন করতেন। আদেশ দত্ত ছিলেন কোষাধ্যক্ষ। কোষাধ্যক্ষ মানে মন্দিরের টাকার দায়িত্ব। এই দায়িত্বটা সবচেয়ে কঠিন, কারণ এখানে বিশ্বাসের প্রশ্ন জড়িয়ে থাকে। আদেশ বাবু সেই বিশ্বাস রক্ষা করেছিলেন। কাজল রানী দেবনাথ ছিলেন বিখ্যাত মাতৃশক্তির আরাধিকা। এই নামটা আলাদা করে মনে রাখতে হবে। তিনি শুধু মন্দিরে আসতেন না, তিনি মায়ের সাধনা করতেন। তাঁর গলায় মায়ের গান, তাঁর হাতে মায়ের পূজা, তাঁর চোখে মায়ের প্রতি অগাধ ভক্তি, এটা দেখে অনেকেই মায়ের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন। মন্দিরে মাতৃশক্তির যে ধারা, সেটা তাঁর হাত দিয়েই আরও শক্ত হয়েছিল। শম্পা সাহা, চম্পা পাল, সুব্রত সাহা, প্রতিমা গোলদার, এই মানুষরাও ছিলেন সেই সময়ের নেতৃত্ব। এরা মন্দিরের সাংস্কৃতিক দিকটা দেখতেন, পূজার আয়োজন করতেন, মহিলাদের জড়ো করতেন, ছোটদের নাচ-গান শেখাতেন। একটা মন্দির শুধু পূজার জায়গা নয়, একটা মন্দির একটা সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, এই ভাবনাটা এদের হাত ধরেই শ্রীনগরে শুরু হয়েছিল।

বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জনের পৃষ্ঠপোষকতা এই মন্দির পেয়েছে। মন্দিরের বিভিন্ন কমিটিতে থেকে যারা মন্দিরটিকে তার বিকাশে সহায়তা করেছেন, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন কাজল বণিক, মানিক পাল, শ্যামল মজুমদার, অনিল দেবনাথ, দীনেশ চক্রবর্তী, নিরঞ্জন গিরি, আশুতোষ শীল শর্মা আর অনিল চন্দ্র ভট্টাচার্য। এই নামগুলো হয়তো বড় বড় হরফে ফলকে লেখা নেই, কিন্তু এদের ছাড়া মন্দিরের বিকাশ হতো না। এরা কেউ টাকা দিয়েছেন, কেউ সময় দিয়েছেন, কেউ শ্রম দিয়েছেন, কেউ বুদ্ধি দিয়েছেন। মন্দিরের একটা ইটও যদি কেউ দান করে থাকে, সেটাও ইতিহাস। এই সময়ে আমরা দেখতে পাই তৎকালীন সময়ে মন্দিরটিকে অ্যাম্বুলেন্সও দেওয়া হয় এবং রোগী ব্যবস্থাপনার জন্য ব্যবস্থা করা হয়। এই কথাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। একটা মন্দির শুধু পূজা করবে তা নয়, একটা মন্দির মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়াবে। রাত-বিরেতে কারো শরীর খারাপ হলে মন্দিরের অ্যাম্বুলেন্স ছুটে যাবে। এটাই তো আসল ধর্ম। মানুষের সেবাই মায়ের সেবা। শ্রীনগর কালী বাড়ী সেই সেবার কাজটা তখন থেকেই শুরু করেছিল। অনেকেই হয়তো জানেন না, সেই সময় গ্রামে অ্যাম্বুলেন্স পাওয়া কত কঠিন ছিল। হাসপাতাল দূরে, গাড়ি নেই। সেই সময় মন্দিরের অ্যাম্বুলেন্স অনেক প্রাণ বাঁচিয়েছে। সেই সেবার কথা আজও বয়স্ক মানুষেরা মনে রেখেছেন।

সময় গড়ালো, পুরনো মন্দির ছোট হয়ে গেল। ভক্ত বাড়লো, পূজার আয়োজন বড় হলো। তখন দরকার হলো নতুন মন্দিরের। নবনির্মিত কালী মন্দিরের শুভ দ্বারোদ্ঘাটন হলো নয়ই নভেম্বর, দুই হাজার সাত ইং তারিখে। উদ্বোধক ছিলেন স্বামী পূর্ণত্মানন্দ মহারাজ, সম্পাদক, রামকৃষ্ণ মঠ আশ্রম, ত্রিপুরা। রামকৃষ্ণ মঠের একজন মহারাজ যখন একটা মন্দির উদ্বোধন করেন, তখন সেই মন্দিরের মর্যাদা বেড়ে যায়। স্বামী পূর্ণানন্দ মহারাজের হাত ধরে মন্দির পেল নতুন ঠিকানা, নতুন সাজ, নতুন পরিচয়। সেদিনের সেই অনুষ্ঠান আজও অনেকের মনে আছে, ঢাকের বাজনা, শঙ্খধ্বনি, ভক্তদের ভিড়। কালী মন্দিরের প্রাঙ্গণেই এরপর প্রতিষ্ঠিত হলো শিবলিঙ্গ। ফলকে লেখা আছে একুশে ফাল্গুন চোদ্দশো চোদ্দ বাং, পাঁচই মার্চ দুই হাজার আট ইং, বুধবার। প্রতিষ্ঠা করেছিলেন শ্রীমৎ স্বামী পূর্ণাত্মানন্দজী মহারাজ, অধ্যক্ষ, ত্রিপুরা রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন। সেদিন থেকে মন্দিরটা শুধু কালী মন্দির রইল না, হয়ে উঠল শিব-শক্তির মিলনক্ষেত্র। শিব ছাড়া শক্তি অসম্পূর্ণ, শক্তি ছাড়া শিব অসম্পূর্ণ, এই তত্ত্বটাই শ্রীনগর কালী বাড়ীতে বাস্তব রূপ পেল।

মন্দিরের সবচেয়ে বড় মুহূর্তটা এলো সতেরই অক্টোবর, দুই হাজার নয় ইং তারিখে। সেদিন প্রস্তরের মায়ের প্রতিমা স্থাপন করা হলো। এই মূর্তি এমনি এমনি আসেনি। এই মূর্তির পেছনে আছে একজনের ত্যাগ, পরিশ্রম আর ভক্তি। সুব্রত সাহা, মন্দিরের অন্যতম বিখ্যাত উদ্যোক্তা, তিনিই বিহার থেকে কষ্টিপাথরের এই মূর্তিটি এখানে এনে দিয়েছিলেন। বিহার থেকে কষ্টিপাথরের মূর্তি এনে শ্রীনগরে প্রতিষ্ঠা করা, এটা মুখের কথা নয়। কষ্টিপাথর মানে কালো, ভারী, দামি পাথর। সেই পাথরের মূর্তি বিহার থেকে ত্রিপুরা পর্যন্ত এনে, এখানে স্থাপন করা, এর পেছনে কতটা দৌড়ঝাঁপ, কতটা খরচ, কতটা ভক্তি লেগেছে, সেটা ভাবলেই বোঝা যায়। আগে মাটির মূর্তি ছিল, যা প্রতি বছর বদলাতে হতো। সুব্রত সাহার হাত ধরে পাথরের মা এলেন, যিনি চিরস্থায়ী, যিনি ঝড়-বৃষ্টি-রোদে নষ্ট হবেন না, যিনি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ভক্তদের দেখবেন। এখন যে মাকে আমরা দেখি, সেই মা-ই সেদিন থেকে এখানে বিরাজ করছেন। ভক্তরা যখন মায়ের সামনে দাঁড়ান, তখন তাঁরা হয়তো জানেন না এই মূর্তি কত দূর থেকে এসেছে। কিন্তু সুব্রত সাহা জানেন, তাঁর মনে আছে, বিহারের কোন কারিগরের হাতে এই মূর্তি তৈরি হয়েছিল, কত যত্ন করে প্যাক করে আনা হয়েছিল, কত রাত জেগে পাহারা দিয়ে আনা হয়েছিল। সেই দিন থেকে মা স্থায়ীভাবে বসে গেলেন ভক্তদের হৃদয়ে।

মন্দিরের এক কোণে আছে একটা সাদা পাথরের ফলক। সেখানে লেখা পিতার স্মৃতির উদ্দেশ্যে। স্বর্গীয় হিমাংশু রঞ্জন সাহা, স্বর্গীয় রূপেন্দু ঘোষ, তাঁদের স্মরণে এই ফলক। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে লেখাগুলো একটু ঝাপসা হয়ে গেছে, কিন্তু ভালোবাসা ঝাপসা হয়নি। যারা এই মন্দিরকে ভালোবেসেছিলেন, তাঁরা আজ নেই, কিন্তু তাঁদের নামটা মন্দিরের দেওয়ালে থেকে গেছে। এই ফলকটা আমাদের শেখায়, মন্দির শুধু দেবতার জন্য নয়, মন্দির পূর্বপুরুষদের স্মৃতির জন্যও। আমরা যাদের কাছ থেকে এই মন্দির পেয়েছি, তাদের মনে রাখা আমাদের কর্তব্য।

দুই হাজার আঠারোর পরে মন্দিরে এলো আরেকটা বড় অধ্যায়। রাজ্যের গভর্নর ইন্দ্রসেনা রেড্ডি নাল্লু এই মন্দিরটির কলেবর এবং তার চারপাশের শান্ত সমাহিত আশ্রমের এই পরিবেশ দেখে মুগ্ধ হন। একজন রাজ্যপাল যখন একটা পাড়ার মন্দিরে আসেন, তখন বোঝা যায় মন্দিরটা কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তিনি শুধু এসে চলে যাননি, তিনি ভক্তদের জন্য কিছু করে গেছেন। তিনি ভক্তদের বসার জন্য বিখ্যাত শেড ঘর তৈরি করে দেন। পাশাপাশি আরও একটি বিখ্যাত শেড এবং নাট মঞ্চ, যেটা মন্দিরের সামনে রয়েছে, সেটাও তৈরি হয়। আজও সেই শেডের নিচে বসে ভক্তরা পূজা দেখেন, গরমের দিনে ছায়া পান, বৃষ্টির দিনে আশ্রয় পান। আর সেই নাট মঞ্চে বিভিন্ন ধরনের সাংস্কৃতিক কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হয়।

শ্রীনগর কালীবাড়ি সোশ্যাল কালচারাল ওয়েলফেয়ার সোসাইটি, এটি শুধুমাত্র মন্দির নয়, ধর্ম চর্চার কেন্দ্র নয়। এখানে সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন আধ্যাত্মিকতার সাথে জারি থাকে বিভিন্ন ভাবে। এখানে নাচ, গান, বসে আঁকো প্রতিযোগিতা, গীতা পাঠ, বিভিন্ন কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হয়। একটা ছোট বাচ্চা যখন মন্দিরের নাট মঞ্চে প্রথমবার নাচ করে, তখন সে শুধু নাচ শেখে না, সে সংস্কৃতি শেখে। একটা বাচ্চা যখন বসে আঁকো প্রতিযোগিতায় মায়ের ছবি আঁকে, তখন সে শুধু ছবি আঁকে না, সে মায়ের প্রতি ভালোবাসা শেখে। এর মাধ্যমে মন্দিরটির বিকাশ, ব্যবস্থাপনা, তত্ত্বাবধান ও উন্নয়নের বিষয়গুলিকেও তুলে ধরা হয়। মন্দির মানে শুধু ঘণ্টা বাজানো নয়, মন্দির মানে সমাজ গড়া। শ্রীনগর কালী বাড়ী সেই সমাজ গড়ার কাজটাই করে চলেছে।

উনিশশো সাতাত্তর থেকে দুই হাজার সাতাশ, এই দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরে অঞ্চলে অনেক বিখ্যাত মানুষ এসেছেন। যাদব মজুমদার থেকে শুরু করে বর্তমানে মীনারানী সরকার, দিলীপ সরকারের মতো বিখ্যাত লোকেরা, রাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন, বর্তমানে মাননীয় বিধায়িকা দিলীপ সরকারেরই ছোট বোন, এরা মন্দিরটিতে মায়ের টানে বারবার এসেছেন। রাজনীতি, পদ, ক্ষমতা, এসবের ঊর্ধ্বে হলো মায়ের টান। একজন মন্ত্রী হোন বা সাধারণ মানুষ, মায়ের সামনে সবাই সমান, সবাই মাথা নত করে। এই মন্দিরে সেই সমতার দৃশ্যটাই বারবার দেখা গেছে।

আজও প্রতিদিন নিয়ম মেনে মন্দির খোলে, প্রাতঃ সাতটায়, সকাল নয়টা থেকে এগারোটা, সন্ধ্যা ছয়টা থেকে আটটা। অমাবস্যা আর পূর্ণিমায় পূজার সময় বদলে যায়, ভিড় বাড়ে। সকালবেলা যখন মন্দিরের দরজা খোলে, তখন পাড়ার মানুষের দিন শুরু হয়। সন্ধ্যাবেলা যখন আরতি হয়, তখন পাড়ার মানুষের দিন শেষ হয়। মন্দিরটা শ্রীনগরের ঘড়ি হয়ে গেছে। সন্ধ্যায় যখন ধূপের গন্ধে চারদিক ভরে যায়, যখন শঙ্খ বাজে, যখন মায়ের আরতি হয়, তখন মনে হয়, উনিশশো সাতাত্তর সালের সেই ছোট্ট মন্দিরের আলোটা আজও নিভে যায়নি, বরং আরও উজ্জ্বল হয়েছে।

অনেক মন্দির তৈরি হয়, অনেক মন্দির ভেঙে যায়, কিন্তু শ্রীনগর কালী বাড়ী পঞ্চাশ বছর ধরে বেঁচে আছে কেন। কারণ এই মন্দিরটা একজন বানায়নি, অনেকজন মিলে বানিয়েছে। গোপাল সূত্রধর থেকে শুরু করে ইন্দ্রসেনা রেড্ডি নাল্লু পর্যন্ত, সবার নাম আমরা পেলাম, কিন্তু এর বাইরেও আরও শত শত নাম আছে, যারা ইট দিয়েছে, টাকা দিয়েছে, সময় দিয়েছে, শ্রম দিয়েছে, যাদের নাম ফলকে লেখা নেই, কিন্তু যাদের ছাড়া মন্দির হতো না। এই মন্দির বেঁচে আছে কারণ এটা শুধু পূজার জায়গা নয়, এটা সেবার জায়গা, অ্যাম্বুলেন্সের সেবা, সাংস্কৃতিক সেবা, শিক্ষার সেবা। এই মন্দির বেঁচে আছে কারণ এটা শুধু বড়দের নয়, ছোটদেরও, বসে আঁকো প্রতিযোগিতা, নাচ-গান, গীতা পাঠ, ছোটরা এখানে বড় হয়। এই মন্দির বেঁচে আছে কারণ এখানে মা আছেন, দেবী ত্রিপুরা সুন্দরী কালী, যিনি উনিশশো সাতাত্তর সালে এসেছিলেন, দুই হাজার নয় সালে বিহার থেকে কষ্টিপাথর রূপে স্থায়ী হলেন, আজও আছেন, আগামী পঞ্চাশ বছরও থাকবেন। যারা একবার এই মন্দিরের সামনে দাঁড়ায়, তারা বুঝতে পারে, ইতিহাস বইয়ে থাকে না, ইতিহাস থাকে মানুষের ভক্তিতে, ফলকের লেখায়, আর সন্ধ্যার ধূপের গন্ধে। জয় মা কালী, জয় শ্রীনগর কালী বাড়ী।

আরও পড়ুন...


Post Your Comments Below

নিচে আপনি আপনার মন্তব্য বাংলাতেও লিখতে পারেন।

বিঃ দ্রঃ
আপনার মন্তব্য বা কমেন্ট ইংরেজি ও বাংলা উভয় ভাষাতেই লিখতে পারেন। বাংলায় কোন মন্তব্য লিখতে হলে কোন ইউনিকোড বাংলা ফন্টেই লিখতে হবে যেমন আমার বাংলা কিংবা অভ্রো কী-বোর্ড (Avro Keyboard)। আমার বাংলা কিংবা অভ্রো কী-বোর্ডের সাহায্যে মাক্রোসফট্ ওয়ার্ডে (Microsoft Word) টাইপ করে সেখান থেকে কপি করে কমেন্ট বা মন্তব্য বক্সে পেস্ট করতে পারেন। আপনার কম্পিউটারে আমার বাংলা কিংবা অভ্রো কী-বোর্ড বাংলা সফ্টওয়ার না থাকলে নিম্নে দেয়া লিঙ্কে (Link) ক্লিক করে ফ্রিতে ডাওনলোড করে নিতে পারেন।

Free Download Avro Keyboard

Fields with * are mandatory





Posted comments

Till now no approved comments is available.