ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা আইন: সংবাদসূত্রে খবর করা যাবেনা, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ অন্ধকার!
জয়ন্ত দেবনাথ
October 29, 2026
ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা আইনে বিপন্ন হতে চলেছে দেশের সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা! নতুন আইনে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা কঠিন আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে চলেছে। নতুন আইনে দুর্নীতি, আর্থিক কেলেঙ্কারি, সরকারি অনিয়ম কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ প্রকাশ করতে গিয়ে সাংবাদিকদের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সম্মতি নিয়ে তবেই সংবাদ প্রতিবেদন প্রকাশ করতে হবে। এই আইন অমান্য করলে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘনের দায়ে একাধিক আইনি বাধার মুখে পড়তে হবে সাংবাদিকদের। ডিজিটাল যুগে সংবাদ সংগ্রহ ও প্রকাশের স্বাধীনতা অবাধ হবার পরিবর্তে নতুন আইন আগামী দিনে কঠিন পরিস্থিতির শিকার হতে হবে সাংবাদিকদের।
ভারতের ডিজিটাল ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা আইন, ২০২৩ (Digital Personal Data Protection Act, 2023) এবং তার অধীনে প্রণীত ২০২৫ সালের বিধিকে ঘিরে সংবাদমাধ্যমের মধ্যে ইতিমধ্যেই উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সাংবাদিকতার জন্য পৃথক ও সুস্পষ্ট আইনি ছাড় না থাকার বিষয়টি এই বিতর্কের অন্যতম প্রধান কারণ। ইতিমধ্যেই দেশের একাধিক বড় সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিত্বকারী ডিজিটাল নিউজ পাবলিশার্স অ্যাসোসিয়েশন (DNPA) এই আইনের কয়েকটি বিধানের সাংবিধানিক বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছে।
গত ২৭ অক্টোবর ২০২৬-এ সুপ্রিম কোর্ট কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে জবাব চেয়ে নোটিশ জারি করেছে। তবে আদালত এই পর্যায়ে চ্যালেঞ্জ করা বিধান গুলির কার্যকারিতা স্থগিত করেনি। পরবর্তী শুনানির জন্য ১৭ নভেম্বর তারিখ নির্ধারিত হয়েছে। তবে এখনই বলা যাচ্ছেনা আদালতের রায় কি হবে। কিন্তু এই মামলা স্বাধীন সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় বিতর্ক সামনে নিয়ে এসেছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষার অধিকারকে সম্মান জানিয়েও কি সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, জনগণের তথ্য জানার অধিকার এবং জনস্বার্থে সত্য অনুসন্ধানের পথ সুরক্ষিত রাখা সম্ভব নয়? কেননা, মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষার জন্য ইতিমধ্যেই আই টি এক্ট সহ একাধিক আইন আছে। ভারতীয় ন্যায় সংহিতা, নাগরিক সুরক্ষা সংহিতা, ভারতীয় সাক্ষ্য অধিনিয়াম, ২০২৩ এ একাধিক সুরক্ষা কবজ রয়েছে মিথ্যা খবর প্রকাশের বিরুদ্ধে। এই অবস্তাতে নতুন করে ডিজিটাল পার্সোনাল ডাটা সুরক্ষা আইনের নামে সাংবাদিকদের অভিযুক্তদের মতামত ছাড়া তাদের ছবি ও সংবাদ প্রকাশে এমন কঠোর আইনী নিষেধাজ্ঞার কি প্রয়োজন হয়ে পড়েছে স্বাভাবিক ভাবেই এই প্রশ্ন উঠেছে। এর আগে কেন্দ্রীয় সরকার একাধিক সংশোধনীর মাধ্যমে তথ্য জানার অধিকার আইনের অনেক সুযোগ সংকুচিত করেছে। আর টি আই এক্টের চার নং ধারাতে বিভিন্ন সরকারী তথ্য না চাইতেই জনগনের জন্য সরকারী ওয়েব সাইটের মাধ্যমে প্রকাশ করার বিধি থাকলেও তা অচল। জনগণের জানার অধিকার দিন দিন সংকুচিত করে এখন ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষার নামে মিডিয়ার অনুসন্ধানমূলক খবর প্রকাশে বাধা সৃষ্টি কার এবং কীসের স্বার্থে এই প্রশ্ন উঠেছে।
একথা ঠিক কোনও ব্যক্তির ব্যক্তিগত জীবন, আর্থিক তথ্য, পরিচয় কিংবা অশ্লীল ছবি সহ ব্যক্তিগত সংবেদনশীল তথ্য অকারণে প্রকাশ করা সংবাদমাধ্যমের কাজ নয়। ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহার রোধ করা এবং ডিজিটাল মাধ্যমে তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আধুনিক রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
কিন্তু সমস্যা দেখা দেয় তখনই, যখন ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার আইন এবং তার প্রয়োগ জনস্বার্থে তথ্য সংগ্রহ ও প্রকাশের পথে মিডিয়ার জন্য অনিশ্চয়তা তৈরি করে।
ধরা যাক, কোনও সরকারি প্রকল্পে কয়েক কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্পের বরাদ্দ, ঠিকাদারি চুক্তি, বিল, আর্থিক লেনদেন, সরকারি চিঠিপত্র এবং সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের ভূমিকা নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করলেন একজন সাংবাদিক। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে তাঁকে বিভিন্ন নথি সংগ্রহ করতে হবে, তথ্যদাতাদের সঙ্গে কথা বলতে হবে এবং প্রাপ্ত তথ্যের মধ্যে অসংগতি খুঁজে বের করতে হবে। নতুন আইনে ওই ব্যক্তির সম্মতি না থাকলে তার অনাচার প্রকাশ করা যাবেনা। তাহলে সাংবাদিকের কী করার থাকবে?
দুর্নীতি বা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তি স্বাভাবিকভাবেই নিজের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশে সহযোগিতা নাও করতে পারেন। সেই ক্ষেত্রে তাঁর সম্মতিকে তথ্য সংগ্রহ ও প্রকাশের অপরিহার্য শর্ত হিসেবে বিবেচনা করা হলে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার কাজ কঠিন হয়ে পড়তে পারে। ফলে সাংবাদিকতা করাটাই কঠিন হয়ে পড়বে।
মূল উদ্বেগ হল, জনস্বার্থে সাংবাদিকতার জন্য স্পষ্ট ও কার্যকর সুরক্ষা না থাকলে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে তথ্য সংগ্রহ, ব্যবহার ও সংরক্ষণের বৈধতা নিয়ে বিরোধ তৈরি হতে পারে।
নতুন আইনের উদ্দেশ্য কী, আর সাংবাদিকদের উদ্বেগ কোথায়?
ভারতের ডিজিটাল ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা আইন, ২০২৩ রাষ্ট্রপতির অনুমোদন লাভ করে ১১ আগস্ট ২০২৩। আইনটির ঘোষিত উদ্দেশ্য হল ব্যক্তিগত ডিজিটাল তথ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং আইনসম্মত উদ্দেশ্যে সেই তথ্য ব্যবহারের জন্য একটি কাঠামো তৈরি করা।
আইনের বিভিন্ন বিধানে ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহারের বৈধতা, সম্মতি, তথ্যের নিরাপত্তা, তথ্য সংশোধন ও মুছে ফেলার অধিকার এবং তথ্য সুরক্ষার দায়িত্ব নির্ধারণ করা হয়েছে। আইনের তফসিলে নির্দিষ্ট ধরনের লঙ্ঘনের জন্য সর্বোচ্চ ২৫০ কোটি টাকা পর্যন্ত আর্থিক জরিমানার বিধান রয়েছে।
এখানে দুটি বিষয় আলাদা করে বোঝা জরুরি। প্রথমত, আইনটির উদ্দেশ্য ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা করা। দ্বিতীয়ত, এই উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের পদ্ধতি সংবাদমাধ্যমের জনস্বার্থমূলক কাজের ওপর কী প্রভাব ফেলতে পারে, সেটিই বর্তমান বিতর্কের বিষয়।
বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি সংবাদমাধ্যমের ক্ষেত্রে আইনি অনিশ্চয়তা এবং বিপুল অঙ্কের জরিমানার আশঙ্কা বড় সমস্যা হয়ে উঠতে পারে। কোনও প্রতিবেদনে ব্যবহৃত তথ্যের বৈধতা নিয়ে অভিযোগ উঠলে দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের খরচ বহন করা সব সংবাদমাধ্যমের পক্ষে সম্ভব নয়।
এমন পরিস্থিতিতে সাংবাদিকেরা গুরুত্বপূর্ণ নথি হাতে পাওয়ার পরও আইনি ঝুঁকির ভয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ থেকে অনেক সাংবাদিক পিছিয়ে যেতে পারেন। এই ধরনের পরিস্থিতিকে সাংবাদিকতার ভাষায় ‘চিলিং এফেক্ট’ বা ভীতিজনিত প্রভাব বলা হয়। অর্থাৎ, কোনও আইনি বিধানের সম্ভাব্য কু-পরিণতির আশঙ্কায় সাংবাদিকেরা বৈধ ও জনস্বার্থমূলক সংবাদ প্রকাশেও সতর্ক হয়ে পড়তে পারেন। জরিমানার ভয়ে অনেকেই দুর্নীতির সংবাদ প্রকাশ থেকে বিরত থাকতে পারেন।
সুপ্রিম কোর্টে বড় সংবাদমাধ্যমের চ্যালেঞ্জ
ডিজিটাল ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা আইন এবং ২০২৫ সালের বিধির কয়েকটি অংশের সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে ডিএনপিএ-র আবেদন নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
২৭ অক্টোবর ২০২৬-এ প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন তিন বিচারপতির বেঞ্চ কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে জবাব চেয়ে নোটিশ জারি করেছে। বেঞ্চের অন্য দুই সদস্য হলেন বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি. মোহনা।
ডিএনপিএ-র সঙ্গে যুক্ত সংবাদমাধ্যমগুলির মধ্যে রয়েছে দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, দ্য হিন্দু, ইন্ডিয়া টুডে, টাইমস গ্রুপ, জি, এনডিটিভি এবং নেটওয়ার্ক১৮-সহ একাধিক বড় সংবাদপ্রকাশক।
আবেদনকারীদের মূল উদ্বেগ হল, নতুন আইনে সাংবাদিকতার জন্য পৃথক আইনি ছাড় না থাকলে সংবাদ সংগ্রহ, অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, তথ্যদাতার পরিচয় রক্ষা এবং জরুরি সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হতে পারে।
আদালত ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকার এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার গুরুত্বের বিষয়টি সামনে এনেছে। তবে অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশের আবেদন মঞ্জুর করা হয়নি এবং কেন্দ্রীয় সরকারের বক্তব্য শোনার পরই পরবর্তী পদক্ষেপের প্রশ্ন উঠবে। ১৭ নভেম্বর ২০২৬-এ নির্ধারিত পরবর্তী শুনানি তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে আদালত শেষ পর্যন্ত কী সিদ্ধান্ত নেবে, তা এখনই অনুমান করা সম্ভব নয়।
এই মামলার গুরুত্ব শুধু বড় সংবাদমাধ্যমের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, সরকারি তথ্যের স্বচ্ছতা, নাগরিকের গোপনীয়তা এবং গণতান্ত্রিক জবাবদিহির সঙ্গে যুক্ত প্রশ্নগুলির প্রভাব দেশের প্রতিটি সংবাদ প্রতিষ্ঠানের ওপর পড়তে পারে।
২০১৭ সালে কে এস পুট্টস্বামী বনাম ভারত সরকার মামলায় সুপ্রিম কোর্ট ব্যক্তিগত গোপনীয়তাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এই রায় ভারতীয় সাংবিধানিক ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু গোপনীয়তার অধিকার স্বীকৃত হওয়ার অর্থ এই নয় যে অন্যান্য মৌলিক অধিকার অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাবে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং জনগণের জানার অধিকারও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অপরিহার্য অংশ।
নতুন আইনে মত প্রকাশের বর্তমান স্বাধীনতাও ক্ষুন্ন হবে
সংবিধানের ১৯(১)(ক) অনুচ্ছেদে বাক্ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এই সাংবিধানিক অধিকারের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। অন্যদিকে, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদের অধীনে জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকারের সঙ্গে সম্পর্কিত।
ফলে বর্তমান বিতর্কে একাধিক সাংবিধানিক অধিকারের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার প্রশ্ন সামনে এসেছে। ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষার উদ্দেশ্য বৈধ হলেও তার প্রয়োগ যেন সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতাকে প্রয়োজনের অতিরিক্ত সীমিত না করে, সেটি নিশ্চিত করা জরুরি।
আবার সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার নামে কোনও ব্যক্তির ব্যক্তিগত জীবন নির্বিচারে অশ্লীল ভাবে প্রকাশ করাও গ্রহণযোগ্য নয়। প্রকৃত চ্যালেঞ্জ হল, কোন তথ্য ব্যক্তিগত, কোন তথ্য জনস্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ এবং কোন পরিস্থিতিতে প্রকাশের পক্ষে বৃহত্তর জনস্বার্থ রয়েছে, তা ন্যায্যভাবে নির্ধারণ করা।
সংবাদমাধ্যমের কাজ শুধু সরকারি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা নয়। অনেক সময় কোনও হাসপাতালের চিকিৎসা পরিষেবায় গুরুতর অনিয়ম, সরকারি প্রকল্পে দুর্নীতি, নির্বাচনী অনিয়ম, আর্থিক কেলেঙ্কারি কিংবা প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহারের তথ্য দ্রুত প্রকাশ করা প্রয়োজন হয়।
এই ধরনের ঘটনায় সাংবাদিককে বিভিন্ন সূত্র থেকে তথ্য সংগ্রহ করতে হয়। কখনও ডিজিটাল নথি, কখনও ছবি বা ভিডিও, আবার কখনও সরকারি চিঠিপত্র ও আর্থিক রেকর্ডের সাহায্যে ঘটনার সত্যতা যাচাই করতে হয়।
যদি সাংবাদিকের কাছে গুরুত্বপূর্ণ নথি পৌঁছনোর পরই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সম্মতি, তথ্য সংরক্ষণ, তথ্য ব্যবহারের বৈধতা এবং সম্ভাব্য আইনি পরিণতি নিয়ে দীর্ঘ অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, তাহলে জরুরি সংবাদ প্রকাশে বিলম্ব হতে পারে।
নতুন আইনে তথ্যদাতার পরিচয় গোপন রাখাও কঠিন হবে
তথ্যদাতার পরিচয় রক্ষা করাও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অনেক সরকারি কর্মচারী বা প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ সূত্র অনিয়মের তথ্য প্রকাশ করতে চান, কিন্তু পরিচয় প্রকাশ পেলে তাঁদের চাকরি, নিরাপত্তা কিংবা ব্যক্তিগত জীবনে সমস্যা হতে পারে বলে আশঙ্কা করেন।
সাংবাদিকতার জন্য স্পষ্ট সুরক্ষা না থাকলে এই ধরনের তথ্যদাতারা সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে যোগাযোগ করতে দ্বিধাবোধ করতে পারেন। ফলে যে তথ্য জনস্বার্থে প্রকাশ করা সম্ভব ছিল, তা অপ্রকাশিত থেকে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে তথ্যদাতার পরিচয় গোপন রাখার অজুহাতে সংবাদমাধ্যম যেকোনও তথ্য যাচাই ছাড়া প্রকাশ করতে পারবে। তথ্যের সত্যতা যাচাই, অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ সংগ্রহ এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য নেওয়া পেশাদার সাংবাদিকতার অপরিহার্য শর্ত।
সঠিক পথ হল এমন একটি আইনি ব্যবস্থা তৈরি করা, যেখানে সাংবাদিকদের দায়িত্বশীলভাবে কাজ করার সুযোগ থাকবে এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকারও সুরক্ষিত থাকবে।
তাই এক্ষেত্রে ভারত সরকারে ব্যক্তিগত ডিজিটাল তথ্য সুরক্ষা আইনে ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার নামে অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদন প্রকাশ নিয়ে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। কিন্ত অন্যান্য দেশে সংবাদমাধ্যমের সুরক্ষা ভারতের চেয়ে অনেক বেশী। বিশেষত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের প্রথম সংশোধনীতে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার স্পষ্ট সুরক্ষা রয়েছে। যুক্তরাজ্যে মানবাধিকার আইন এবং সাংবাদিকদের গোপন সূত্র রক্ষার বিশেষ আইনি ব্যবস্থা রয়েছে। জার্মানির সংবিধানের ৫ নম্বর অনুচ্ছেদে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে। কিন্ত ভারতের মতো পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার দেশে কেন আইন করে অনুসন্ধানমূলক সংবাদ প্রতিবেদন প্রকাশে বাধা সৃষ্টির চেষ্টা চলছে তা সত্যিই আমাকে অবাক করেছে। (লেখক একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও ত্রিপুরাইনফো-র সম্পাদক)
আরও পড়ুন...