মানভূম আন্দোলনঃবাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষার এক অনন্য মহাকাব্য
সমর চক্রবর্তী
October 28, 2026
"শুন বিহারী ভাই,
তোরা রাখতে লারবি ডাংদেখাই।
বাংলা ভাষার পদবীতে কোন ভেদের কথা নাই,
এক ভারতে ভাইয়ে ভাইয়ে
মাতৃ ভাষার রাজ্য চাই"।
অথবা-
"আমার বাংলা ভাষা প্রাণের ভাষা- রে
( ও ভাই) মারবি তোরা কে তারে।
এই ভাষাতেই কাজ চলেছে সাত পুরুষের আমলে,
এই ভাষাতেই মায়ের কোলে মুখ
ফুটেছে "মা"- বলে"।
অথবা- সামাজিক পট ভূমিকায়-
"পুরুলিয়ার মাঠে মাঠে
টুসু পরব কেমন কাটে
নতুন ধানের চালের গুঁড়ো
পিঠে বানায়
কচি- বুড়ো।
মাদল বাজে ধিনতা ধিন
কাটবে টুসু সারাদিন"।
মূলতঃ টুসু একটি পরব বা উৎসব। পুরুলিয়া,ঝাড়খন্ড ও ওড়িষ্যা রাজ্যের একটি জনপ্রিয় কৃষিভিত্তিক লোক উৎসব এই টুসু উৎসব।
এই জনপ্রিয় টুসু উৎসবের লোকগান একসময়ে মানভূমের প্রথম সাংসদ ভজহরি মাহাতোর লেখা-"শুন বিহারী ভাই,
তোরা রাখতে লারবি ডাংদেখাই,,,,,মাতৃভাষার রাজ্য চাই"।এই গানটি বাংলা ভাষা আন্দোলনে এক অভূতপূর্ব জোয়ার এনেছিল সেদিন।
রাঢ় বাংলার বাংলা ভাষাভাষী মানুষ হিসেবে একটি বেদনাবোধ আজও
আমাদের পীড়া দেয়।পূর্ব বাংলার ভাষা আন্দোলনের চার দশক আগে ১৯১২ থেকে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত মানভূমে সংঘঠিত বাংলা ভাষা আন্দোলনের কথা কি আমরা তেমনভাবে স্মরণে রেখেছি?
১ লা নভেম্বর মানভূম দিবস। মাতৃভাষার সম্মান রক্ষা করার জন্য শুধুমাত্র বাংলাদেশ বা শিলচরের বুকেই বাঙালীরা রক্ত ও ঘাম ঝরিয়েছেন-বিষয়টা কিন্তু তেমন নয়।মানভূম দিবস হল- সেই বীর আন্দোলনকারীদের শ্রদ্ধা জানানোর দিন।যারা চরম অত্যাচারের মুখে
দাঁড়িয়েও নিজেদের বাঙালী পরিচয় এবং বাংলা ভাষাকে হারিয়ে যেতে দেননি।
মানভূম ভাষা আন্দোলন হল- বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষা করা এবং তৎকালীন বিহারের অন্তর্ভুক্ত মানভূম জেলাকে পশ্চিমবঙ্গের সাথে যুক্ত করার একটি ঐতিহাসিক ও রক্তক্ষয়ী আন্দোলন।১৯১২ থেকে ১৯৫৬ সাল অবধি চলা এই সংগ্রামকে পৃথিবীর ইতিহাসের দীর্ঘতম ভাষা আন্দোলন হিসেবে গণ্য করা হয়।
বঙ্গ ভঙ্গের পর পশ্চিমবঙ্গ থেকে যখন ১৯১২ সালে বিহার ও উড়িষ্যা প্রদেশ গঠিত হয়,তখন বাংলা ভাষাভাষি অঞ্চল- মানভূম জেলাকে বিহারের অন্তর্ভুক্ত করা হয়।এসময়ে এই মানভূম জেলার প্রায় ৮৮% মানুষের মাতৃভাষা ছিল বাংলা।১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর মানভূম বিহারের অংশ থেকে যায়।১৯৪৮ সালে বিহার সরকার রাজ্য জুড়ে হিন্দি ভাষাকে বাধ্যতামূলক ঘোষণা করে এবং বাংলা স্কুল- কলেজ এবং সরকারি দপ্তরে জোর পূর্বক হিন্দি চাপানোর চেষ্টা করে।
১৯৪৮ সালে অতুল চন্দ্র ঘোষ,লাবণ্য প্রভা ঘোষ এবং ভজহরি মাহাতো সহ বেশ ক'জন মিলে "লোক সেবক সংঘ"গঠন করেন পাকবিড়রা গ্রামে।এই সংগঠন তখন তিনটি ধারায় আন্দোলন সংগঠিত করেন বিহার সরকারের দমন পীড়নের মধ্য দিয়েও।
সত্যাগ্রহ,হাল-জোয়াল ও টুসু সত্যাগ্রহ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে।আন্দোলনের ফলে অতুল চন্দ্র ঘোষ গ্রেপ্তার হন।রাঘব চর্মকার নামে এক সত্যাগ্রহী জেলবন্দী অবস্হায় শহীদ হন।হাল- জোয়াল অর্থাৎ ভূমি ও কৃষকের অধিকার রক্ষার সাথে ভাষাগত আত্মমর্যাদার লড়াই যুক্ত করা হয়। এরপরে ১৯৫৪ সালে মানভূমের ঐতিহ্যবাহী টুসু গানকে আন্দোলনের প্রধান হাতিয়ার করা হয়।ঐ সময়ে টুসু গান গেয়ে হাজার হাজার বাঙালী তখন জেলে যান।
১৯৫৬ সালের ২০ এপ্রিল লোক সেবক সংঘের নেতৃত্বে
আন্দোলনকারীরা পুরুলিয়ার পাকবিড়রা গ্রাম থেকে কোলকাতার উদ্দশ্যে প্রায় ৩৬০ কিলোমিটার এক ঐতিহাসিক পদযাত্রা করেন।৬ মে এই পদযাত্রা কোলকাতায় এসে পৌঁছলে তাতে বাংলায় এক আলোড়ন সৃষ্টি হয়।
অবশেষে আন্দোলনকারীদের এই সংগ্রামের কাছে মাথা নত করতে বাধ্য হল কেন্দ্রীয় সরকার।কেন্দ্রীয় সরকার "রাজ্য পুনর্গঠন কমিশন"
গঠন করেন।কমিশনের সুপারিশে ১৯৫৬ সালের ১ লা নভেম্বর মানভূম জেলা ভেঙে বাংলা ভাষাভাষি অংশ নিয়ে পুরুলিয়া জেলা গঠিত হয় এবং তা পশ্চিমবঙ্গের অন্তর্ভুক্ত হয়।
মানভূমের এই সংগ্রাম কেবল ভৌগলিক অধিকারের লড়াই ছিলনা।এটি ছিল- বাঙালীর
নিজের ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষার এক অনন্য মহাকাব্য।
বিগত কয়েক বছর ধরে ত্রিপুরায় এই মানভূম দিবসটি যথাযোগ্য শ্রদ্ধা ও মর্যাদায় পালন ও উদযাপন করে আসছে আন্তর্জাতিক বাংলা ভাষা পরিষদের উদয়পুর শাখা।গত বছর(২০২৫)আন্তর্জাতিক বাংলা পরিষদের তৃতীয় কেন্দ্রীয় সম্মেলন উপলক্ষে আয়োজিত উদয়পুর সম্মেলনে এসেছিলেন এই মানভূম আন্দোলনের অন্যতম অংশগ্রহণকারী নেতা কাজল সেন মহোদয়।উনাকে সেদিন সম্বর্ধিত করেন রাজ্যের মন্ত্রী প্রণজিৎ সিংহ রায়।
এ বছর থেকে এই কর্মসূচিটি পালনে বদ্ধপরিকর হয়ে উঠেছে
বাংলা ভাষা পরিষদের অপর শাখা- আগরতলা এডভাইজার চৌমুহনী শাখাও। আগামী ১ লা নভেম্বর এই দিবসটিকে সামনে রেখে এডভাইজার চৌমুহনী শাখা আলোচনাচক্র,বীর আন্দোলনকারীদের শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে দিনটি উদযাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
পাশাপাশি আগরতলা শহরের ঐতিহ্যবাহী সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংস্হা- মৈত্রী সংসদ এবং বাংলা একাডেমী যৌথভাবে ১ লা নভেম্বর আগরতলা প্রেস ক্লাবে মানভূম দিবস দিনটিকে উদযাপন করতে যাচ্ছে।
,,,,,,,,।
(The editor of tripurainfo.com warmly invites students and aspiring writers to share their thoughts, ideas, and creativity through articles. Understanding that every great writer starts somewhere, tripurainfo.com is committed to providing a platform where young minds can express themselves without fear of judgment.
This initiative is not about perfection but about encouragement, growth, and giving voice to new perspectives. We believe that by supporting young talents today, we are shaping the storytellers, journalists, and thought leaders of tomorrow.
So, if you have a story to tell or an idea to share, don’t hesitate—send in your articles. Let your words inspire others, and let tripurainfo.com be the stage where your voice is heard!)
আরও পড়ুন...