"সমালোচকেরা আমার লেখা নিয়ে ভাবেন, এই কথাটি জেনে আমি আপ্লুত ।"

লেখক অরিন্দম নাথে'র সাথে একান্ত আলাপচারিতায় আলোচক সৌম্যদীপ দেব

সৌম্য : লেখক হিসেবে আপনার যে পরিচিতি তা ব্যক্তিগত কাজের পরিচিতিকেও ছাপিয়ে গেছে। বর্তমানে আপনি রাজ্য পুলিশের IGP পদে রয়েছেন। কখনো মনে পড়ে নিজের লেখা প্রথম ছাপার অক্ষরে দেখার সেই আনন্দঘন মুহূর্তের কথা?

অরিন্দম : পুলিশের পরিচিতির বাইরে লেখক হিসেবে একটু হলেও দাগ কাটতে পেরেছি । এই অনুভূতি আমাকে ভীষণই আনন্দ দেয় । সামাজিক অনুষ্ঠানে, শপিংমলে, রেস্তোরাঁয়, জনারণ্যে অনেক সময়ই অপরিচিত পাঠক-পাঠিকা দেখা হলে আমার লেখার প্রসঙ্গ ধরে আনন্দচ্ছ্বাস ব‍্যক্ত করেন । আমার লেখক সত্তা জিইয়ে রাখার অনুপ্রেরণা যোগান ।ছাপার অক্ষরে নিজের লেখা দেখার অনুভূতি সত্যি অসাধারণ । আজ থেকে তিন দশকেরও আগের কথা । সালটা ১৯৮৯, এপ্রিল মাস । আমি তখন কমলপুর দ্বাদশ শ্রেণী স্কুলের শিক্ষক । আমার বন্ধু, বিশিষ্ট সাংবাদিক মানস পাল কমলপুরের ছেলে । বেকার যুবক । কয়েকজন সাহিত‍্যানুরাগী মিলে মানস পালে'র সম্পাদনায় জন্ম দিলাম একটি ত্রৈমাসিক সাহিত্য পত্রিকা 'সংকেত' । বাকিরা চাকুরিজীবী । প্রথম সংখ‍্যায় লিখেছিলাম 'আকাশে হেলান দিয়ে পাহাড় ঘুমায় যবে' । ছাপার অক্ষরে আমার প্রথম লেখা । রবিবারের এক দুপুরে লংতড়াই পাহাড়ের চূড়াতে ওঠার গল্প । ভ্রমণ কাহিনি । লেখাটি ছোট্ট শহরের পাঠক-পাঠিকাদের কাছে খুবই আদৃত হয়েছিল । দেখা হলে উচ্ছ্বাস ব‍্যক্ত করত । লেখক হিসেবে নিজেকে ভাবার আত্মবিশ্বাস জাগ্রত হয় । এর পরের বছর আমি পুলিশের চাকুরিতে যোগ দিই । 'সংকেত'-ও দুইটি বা তিনটি সংখ‍্যার পর হারিয়ে যায় ।

সৌম্য : ' সাব- ইন্সপেক্টর করমচাঁদের ডায়েরি ' লেখার পূর্ব প্রেক্ষাপট জানতে চাই।

অরিন্দম : আমি ধর্মনগরের ছেলে । এম বি বি কলেজে পড়াশোনা এবং পরবর্তীতে কর্মসূত্রে আগরতলার সঙ্গে পরিচিতি । ভালোবাসা । উনিশশো তিরানব্বই থেকে আটানব্বই আমি আগরতলায় ডি এস পি (সেন্ট্রাল) হিসেবে পোস্টেড ছিলাম । বর্তমানের পূর্ব, পশ্চিম, এন সি সি এবং বোধজ‌ংনগর থানার সম্মিলিত এলাকা । আমার পুলিশ জীবনের স্মরণীয় সময় । বহু-বিচিত্র ঘটনা এবং মামলার সাক্ষী । রাতদিন পরিশ্রম করেছি । পাশাপাশি সাফল্য পেয়েছি । যশ পেয়েছি । অরিন্দম নাথ হিসেবে পরিচিতি । পুলিশের চাকুরিতে আমি সবচেয়ে বেশি আনন্দ পাই একদম ব্লাইন্ড চুরি-ডাকাতির কেইস সলভ করে । আর এই কাজে আমি সহযোগী হিসেবে পেয়েছিলাম একজন সাব-ইন্সপেক্টরকে । পুলিন বিহারী দেব । ভদ্রলোক মারা গিয়েছেন । পড়াশোনা বেশি ছিল না । কিন্তু অজানা চুরি-ডাকাতির মামলা নিষ্পত্তি করার অদ্ভুত এক সহজাত জুনুন কাজ করত । ওনার সঙ্গে চলতে চলতে এই আগ্রহ আমার মধ্যেও সংক্রামিত হয়েছে । পুলিন বাবুর চেহারার সঙ্গে পঙ্কজ কাপুরের চেহারার মিল খুঁজে পেতাম । পঙ্কজ কাপুর তখন দূরদর্শনে 'করমচাঁদ' নামে গোয়েন্দা সিরিয়ালে অভিনয় করছেন । সেই থেকে 'সাব-ইন্সপেক্টর করমচাঁদের ডায়েরি' । আগরতলায় আমার পুলিশ জীবনের কিছু ঘটনার আলোকে লেখা । জ্ঞান বিচিত্রা থেকে প্রকাশ দুইহাজার চৌদ্দ সালে । এর আগে 'আজকের ফরিয়াদ' পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ পেয়েছিল । মোট চৌত্রিশটি ঘটনা । সব কয়টিতেই যে রক্তমাংসের করমচাঁদ ছিলেন এমনটা নয় । কিছু ঘটনায় তিনি আমার মননে উপস্থিত থাকতেন ।

সৌম্য : পুলিশের চোখ দিয়ে 'মহাভারত' দেখার সাধ কেনো তৈরি হয়েছিল যদি বলেন।

অরিন্দম : 'পুলিশের চোখে মহাভারত' আমারই লেখা 'Bridging Souls, a Journey from Mahabharata to Bharata' ইংরেজি বইয়ের বাংলা ভাষান্তর । অনুবাদ আমার নিজের । বইটি বলতে পারেন এক দীর্ঘ রিচার্সের ফসল । এর সূত্রপাত নব্বইয়ের দশকের প্রথম দিকে । মহাভারতের উপর লেখা গজেন্দ্র কুমার মিত্রের 'পাঞ্চজন্য' বইটি পড়ে । তারপর মহাভারতের উপর লেখা বই পেলেই সংগ্রহ করতাম । যখনই সময় পেতাম বইগুলি পড়তাম । আর তখনই ভাবতাম, মহাভারতের সময়কার ঘটনা আজকের দিনে ঘটলে কি প্রতিক্রিয়া হতো ? আইনের কি কি ধারা আকর্ষণ করতো ? বস্তুত আমার পুলিশ জীবনের অর্ধেকের বেশি সময় কেটেছে এই গবেষণায় । আমার বন্ধু সাংবাদিক মানস পালে'র সঙ্গে এই নিয়ে আলোচনা করতাম । মানসই আমাকে উৎসাহিত করে ইংরেজিতে বইটি লেখার জন্য । ইউনিক আইডিয়া । ইংরেজিতে লিখলেই বৃহৎ এক অংশের পাঠকের দরবারে পৌঁছে যাবে । ইতিমধ্যে টি এস আরে লোক নিয়োগের পরীক্ষা নেওয়ার সুবাদে ভারতবর্ষের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরার সুযোগ মেলে । সেটা দুইহাজার আট সাল । এই ভ্রমণের অভিজ্ঞতাকে পূঁজি করে লেখা 'Bridging Souls, a Journey from Mahabharata to Bharata', ইংরেজি উপন্যাস । কুড়িদিনের ছুটি নিয়ে লেখা । প্রকাশ পায় দু'হাজার এগারো সালে । দিল্লির আটলান্টিক পাবলিকেশন থেকে । 'পুলিশের চোখে মহাভারত' প্রকাশ পায় দু'হাজার উনিশে । প্রকাশক কলকাতার গাঙচিল ।

সৌম্য : আপনার সম্প্রতি প্রকাশিত 'বনজোছনায় ' উপন্যাসকে কেউ কেউ বলেন শিশু কিশোর উপন্যাস আবার এই উপন্যাসে জীবনানন্দ এতো বেশি রয়েছে যা ঠিক শিশু কিশোরকালীন বলে মনে হয় না। কি বলবেন?

অরিন্দম : 'বনজোছনায়' করোনা মহামারীর শুরুর দিকে লেখা । সত্যিকার অর্থে কিশোর উপন্যাস নয় । আবার একদিক থেকে ভাবতে গেলে কিশোর উপন্যাস । এখনকার কিশোর-কিশোরীরা জৈবিক চেতনাবোধে তাদের আগের প্রজন্ম থেকে এগিয়ে । তারা হয়তো রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ খুব কমই পড়ে । বরঞ্চ এই বইয়ে লেখক তাঁর কৈশোর-যৌবনের সন্ধীক্ষণে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন । টাইম-স্কেলের বিচারে ঘনঘন ওঠানামা করেছেন । রূপকধর্মী উপন্যাস । ঈশপের গল্পের মত । বইটির প্রকাশক নীহারিকা । করোনা আবহের মধ্যে প্রকাশ করায় বইটি খুবই সমাদৃত হয়েছে।

সৌম্য : আমরা জানি লেখক অরিন্দম নাথ ভ্রমণ বিলাসী। কোথায় কোথায় যেতে চাইবেন?

অরিন্দম : হ্যাঁ, আমি ঘুরতে ভালোবাসি । ভারতবর্ষের চার-পাঁচটি রাজ্য ছাড়া সবগুলিতেই গিয়েছি । অনেক জায়গায় দুতিনবার করে । আজকাল টুরিস্ট স্পটগুলোতে এতো ভিড় হয় যে ঠিক করে উপভোগ করা যায় না । তাই অখ্যাত জায়গাগুলো দেখতে আমি বেশি আগ্রহী । বছর খানেকের মধ্যে অবসরে যাব । তখন প্রতিবেশী বাংলাদেশ এবং শ্রীলংকা দেখতে যাওয়ার ইচ্ছে আছে । পাশাপাশি একবার ইউরোপ ঘুরে আসার বাসনাও রয়েছে ।

সৌম্য : সমালোচকদের কেউ কেউ বলেন আপনার গদ্য মুক্ত গদ্য, গল্প নয়। কেনো 'গল্প' নয়। আত্মবিশ্লেষণে কি বলবেন?

অরিন্দম : সমালোচকেরা আমার লেখা নিয়ে ভাবেন, এই কথাটি জেনে আমি আপ্লুত । আমি তাঁদের সঙ্গে সহমত পোষণ করছি । সত্যিকার অর্থে আমার অধিকাংশ লেখা গল্প নয় । জীবন আলেখ্য । সঙ্গে কিছু কল্পনার সংমিশ্রণ ।

সৌম্য : আপনার ইংরেজি ভাষাতে করা কাজগুলো সম্পর্কে জানতে চাই।

অরিন্দম : 'Bridging Souls, a Journey from Mahabharata to Bharata' সম্পর্কে বিস্তারিত আগেই বলেছি । আমার লেখা দ্বিতীয় ইংরেজি বই 'I Adore' চেন্নাইয়ের নোশন প্রেস থেকে দু'হাজার বারো সালে প্রকাশিত হয় । মোট একশো দু'টি ছোটগল্পের সংকলন । মূলত আমার লেখা 'তরমুজ পাগলা ও অন‍্যান‍্য গল্প' এবং 'দুই ভুবন' বইয়ের গল্পগুলোর অনুবাদ ।

সৌম্য : কবিতা লিখেছেন কখনো? কার কবিতার কাছে মানসিক আশ্রয় লাভ করেন?

অরিন্দম : কবিতা কখনও লিখিনি । কলেজ জীবনের শেষ দিকে মহালয়ার সময় ধর্মনগরে কয়েকজন বন্ধু-বান্ধব মিলে কার্টুনের প্রদর্শনী করতাম । থিম বলে দিতাম । ছবি আকতো শুভেন্দু নাগ । অকালে চলে গেছে । 'সোনার কাছাড়' পত্রিকায় কাজ করতো । কবি সুনীল ভৌমিক এবং আমি কার্টুনের সঙ্গে মিলিয়ে ছড়া লিখতাম । সুনীলবাবুর কবিতার বই নীহারিকা থেকে প্রকাশ পেয়েছে । তিনিও না ফেরার দেশে চলে গেছেন।

রবিঠাকুর এবং জীবনানন্দে'র কবিতা পড়তে ভালোবাসি । এর বাইরে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, নাজিম হিকমত, পাবলো নেরুদা, বিষ্ণু দে, বিনয় মজুমদার, জয় গোস্বামী এমনি সব কবিদের কবিতা পড়ি । স‍্যোসাল মিডিয়ায়ও অনেক সময় কবিতা পড়ে মনের খোরাক পাই ।

সৌম্য : পছন্দের উপন্যাস তালিকা জানতে চাই।

অরিন্দম : পছন্দের উপন্যাসের তালিকা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পাল্টে যায় । ছোটবেলায় ছিল শরৎচন্দ্রে'র 'শ্রীকান্ত' এবং 'পথের দাবী' । কৈশোরে দীনেশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ে'র 'ভাবা', বিভূতিভূষণের 'আরণ‍্যক' । যৌবনে মৈত্রেয়ী দেবী'র 'নহন‍্যতে' । মহাশ্বেতা দেবী'র 'হাজার চুরাশির মা' । বুদ্ধদেব বসু'র 'অনুমতির জন‍্য' । বুদ্ধদেব গুহ'র 'কোজাগরী' ও 'মাধুকরী' । পাশাপাশি সমরেশ বসু, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, হুমায়ুন আহমেদ, সতীনাথ ভাদুড়ী , রমা রলা, ঝুম্পা লাহিড়ী, শরদিন্দু বন্দোপাধ্যায়, প্রতিভা বসু প্রভৃতি লেখকের উপন্যাসও ভালো লাগে । সংগ্রহে রাখি ।

সৌম্য : আইন নিয়ে যাপন আর সাহিত্য যাপন - কোনটা আপনাকে বেশি মানসিক শান্তি দেয়?

অরিন্দম : আমাদের জীবনটা রেলযাত্রার মত । আমি এখন চাকুরির ট্রেনে চেপেছি । আর তেরো মাস পরে এই যাত্রা শেষ করবো । এর আগেও কোনও স্টেশনে নেমে পড়তে পারি । কর্ড-লাইনের ট্রেন ধরবো । অবসর জীবনের ট্রেন । নিঃসঙ্গতার পাশাপাশি সাহিত্য নিয়ে মেতে থাকবো । সাম্প্রতিক অসুস্থতার কথা বাদ দিলে এখন অবধি মনে হচ্ছে আমার ট্রেন টাইম-টেবিল মেনে চলছে ।

সৌম্য : ত্রিপুরায় বর্তমানে তরুণ প্রজন্মের কাজ নিয়ে আপনি কতটা আশাবাদী? কার কার কাজ ভালোলাগে?

অরিন্দম : বর্তমান তরুণ প্রজন্মের গদ্য পড়ার খুব একটা সুযোগ আমার হয়নি । যাদের লেখা পড়েছি, যেমন বিমলেন্দ্র চক্রবর্তী, শ‍্যামল বৈদ‍্য, অশোক দেব, মাধুরী লোধ, অরুণোদয় সাহা, সুধীর সরকার, নন্দকুমার দেববর্মা, খগেশ দেববর্মা প্রমুখ প্রতিষ্ঠিত লেখক । আমার আগে থেকেই লিখছেন । তাঁরা আমার কাছে নতুন প্রজন্ম নন ।

সৌম্য : শেষ প্রশ্নে জানতে চাই , নতুন কি কি কাজ চলছে আপনার ?

অরিন্দম : ইতিমধ্যে প্রকাশ পাবে 'Moonless Moonlight', 'বনজোছনায়' বইয়ের ইংরেজি অনুবাদ । বইটির ভূমিকা লিখেছেন উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিশিষ্ট সাহিত‍্যিক ধ্রুব হাজারিকা ।

এরবাইরে কিছু ইংরেজিতে লেখা গল্প নিয়ে একটি বই প্রকাশের ইচ্ছে আছে । প্রফেসর সরোজ চৌধুরী ভূমিকা লিখে দিয়েছেন ।

বাংলাতে অপ্রকাশিত প্রচুর লেখা রয়েছে । এইগুলিকে একটু ঠিকঠাক করে থিম-ভিত্তিক গ্রন্থ প্রকাশের ইচ্ছে আছে।


You can post your comments below  
নিচে আপনি আপনার মন্তব্য বাংলাতেও লিখতে পারেন।  
বিঃ দ্রঃ
আপনার মন্তব্য বা কমেন্ট ইংরেজি ও বাংলা উভয় ভাষাতেই লিখতে পারেন। বাংলায় কোন মন্তব্য লিখতে হলে কোন ইউনিকোড বাংলা ফন্টেই লিখতে হবে যেমন আমার বাংলা কিংবা অভ্রো কী-বোর্ড (Avro Keyboard)। আমার বাংলা কিংবা অভ্রো কী-বোর্ডের সাহায্যে মাক্রোসফট্ ওয়ার্ডে (Microsoft Word) টাইপ করে সেখান থেকে কপি করে কমেন্ট বা মন্তব্য বক্সে পেস্ট করতে পারেন। আপনার কম্পিউটারে আমার বাংলা কিংবা অভ্রো কী-বোর্ড বাংলা সফ্টওয়ার না থাকলে নিম্নে দেয়া লিঙ্কে (Link) ক্লিক করে ফ্রিতে ডাওনলোড করে নিতে পারেন।
 
Free Download Avro Keyboard  
Name *  
Email *  
Address  
Comments *  
 
 
Posted comments
Till now no approved comments is available.