ভারতের কৃষি-আখ্যানের পুনর্লিখন : রূপান্তরের এক দশক

শ্রী শিবরাজ সিং চৌহান

October 25, 2026

২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শ্রী নরেন্দ্র মোদীর দায়িত্বভার গ্রহণের পর, ভারতের উন্নয়ন এজেন্ডার কেন্দ্রবিন্দুতে কৃষি ও কৃষক কল্যাণকে স্থান দেওয়া হয়েছে৷ ২০১৫ সাল থেকে এই অঙ্গীকারটি একটি বৃহত্তর রূপান্তরের পথে এগিয়ে চলেছে৷ উৎপাদন বৃদ্ধি ও কৃষকের আয় বাড়ানোর পাশাপাশি এমন একটি কৃষি খাত গড়ে তোলার দিকে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে, যা উৎপাদনশীল, প্রতিকূলতা সহনশীল, প্রযুক্তি-চালিত এবং সুস্থায়ী হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বারবার জোর দিয়ে বলেছেন, “একটি ‘বিকশিত ভারত’ গড়ার জন্য ভারতীয় কৃষিরও উন্নয়ন প্রয়োজন।”

তিনি আহ্বান জানিয়েছেন যেন ভারত কেবল নিজের খাদ্য চাহিদাই পূরণ না করে, বরং বিশ্বজুড়ে খাদ্য সরবরাহকারী দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর “জয় জওয়ান, জয় কিষাণ” এবং অটল বিহারী বাজপেয়ীর “জয় বিজ্ঞান”-এর ধারায় প্রধানমন্ত্রী যোগ করেছেন “জয় অনুসন্ধান”। এই শব্দবন্ধটির মাধ্যমে তিনি ভারতের কৃষি ভবিষ্যতের কেন্দ্রবিন্দুতে গবেষণা

ও উদ্ভাবনকে স্থাপন করেছেন। তাঁর এই কথাগুলো কেবল একটি নীতিগত দিকনির্দেশনা ছিল না; বরং এটি ছিল এক বাস্তবসম্মত দূরদর্শী চিন্তা, যার যথার্থতা ও প্রজ্ঞা এক দশক পরের ঘটনাপ্রবাহে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে।

খাদ্য নিরাপত্তা থেকে কৃষির এক নতুন ধারায় উত্তরণ এই দৃষ্টিভঙ্গি ভারতীয় কৃষির প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে এক নির্ণায়ক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। ‘সবুজ বিপ্লব’ ভারতকে খাদ্য নিরাপত্তা দিয়েছিল। আজ আমাদের দায়িত্ব হলো পুষ্টি নিরাপত্তা, কৃষকের সমৃদ্ধি, সম্পদের সুরক্ষা এবং বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার মতো একটি মজবুত ভিত্তি গড়ে তোলা। ভারতের কৃষিযাত্রার ইতিহাস হল এক অসাধারণ সাফল্যের গল্প।

একসময় যে দেশ খাদ্যের জন্য আমদানির ওপর নির্ভরশীল ছিল, কয়েক দশকের মধ্যেই ভারত প্রধান খাদ্যশস্যের ক্ষেত্রে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে ওঠে।

বিজ্ঞান, উন্নত বীজ, সেচ ব্যবস্থা, পরিকাঠামো, প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ, কৃষি সম্প্রসারণ পরিষেবা এবং নীতিগত সহায়তার ওপর ভিত্তি করেই সফল হয়েছিল সবুজ

বিপ্লব। এটি প্রমাণ করেছে যে, যখন বৈজ্ঞানিক সক্ষমতা এবং রাজনৈতিক অঙ্গীকার একটি জাতীয় লক্ষ্যের পেছনে ঐক্যবদ্ধ হয়, তখন কী অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করা সম্ভব। তবে কৃষি খাত অতীতের অগ্রাধিকারগুলোর গণ্ডিতে আটকে থাকতে পারে না। আমাদের কৃষকদের আকাঙ্ক্ষা বদলেছে, নাগরিকদের খাদ্যাভ্যাস ও ভোগের ধরন পরিবর্তিত হয়েছে, বাজারের চিত্র বদলেছে এবং এমনকি জলবায়ুও পরিবর্তিত হচ্ছে।

কৃষিক্ষেত্রে ব্যাপকভিত্তিক প্রবৃদ্ধির এক দশক ২০১৫ সাল থেকে যে রূপান্তর প্রক্রিয়া চলছে, তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ১৯৯৫-৯৬ এবং ২০১৪-১৫ এই দুটি সময়কালকে ভারতীয় কৃষির বিবর্তনের ক্ষেত্রে কাঠামোগত পরিবর্তনের সন্ধিক্ষণ হিসেবে চিহ্নিত করা যায়, কারণ এগুলো ভারতীয় কৃষির বিকাশে ভিন্ন ভিন্ন পর্যায়কে নির্দেশ করে। প্রথম পর্যায়টি অর্থনৈতিক উদারীকরণ, বাজারের বৃহত্তর সংহতি, খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন এবং শস্যের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির হার ধীর হয়ে যাওয়ার মতো বিষয়গুলোর প্রভাবকে প্রতিফলিত করে। অন্যদিকে, দ্বিতীয় পর্যায়টি একটি অধিকতর বৈচিত্র্যময়, প্রযুক্তি-নির্ভর এবং সহনশীল কৃষি ব্যবস্থার উত্থানকে তুলে ধরে; যা সেচ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ব্যবহার, বাজার সংস্কার এবং সুস্থায়ী উন্নয়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। ১৯৬৭ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত কৃষিখাতে গড় প্রবৃদ্ধির হার ছিল প্রায় ২.৭ শতাংশ এবং ১৯৯৬ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত তা ছিল প্রায় ৩.০ শতাংশ; যা ২০১৫ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বেড়ে প্রায় ৪.৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে (এর মধ্যে খাদ্যশস্যের ক্ষেত্রে বার্ষিক ৮.৪ মিলিয়ন টন, ফল ও শাকসবজির ক্ষেত্রে ৭.৬ মিলিয়ন টন এবং দুধের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৃদ্ধি ঘটেছে)। গত দুই বছরে খাদ্যশস্য উৎপাদনে অসাধারণ প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে- বার্ষিক ২২.১ মিলিয়ন টন- যা পূর্ববর্তী বছরগুলোর তুলনায় অনেক বেশি। এই অর্জনটি হলো কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের মধ্যে শক্তিশালী সমন্বয়, বিভিন্ন কর্মসূচির কার্যকর সমন্বয়সাধন, জলবায়ু-সহনশীল প্রযুক্তির গ্রহণ, সুনির্দিষ্ট বিনিয়োগ এবং কৃষকদের জন্য বর্ধিত সহায়তার সম্মিলিত ফল। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই প্রবৃদ্ধি এখন আরও ব্যাপকভিত্তিক হয়েছে৷ এটি কেবল খাদ্যশস্যের ওপরই নির্ভরশীল নয়, বরং উদ্যানপালন, দুগ্ধ উৎপাদন, মৎস্য চাষ, পোল্ট্রি এবং অন্যান্য উচ্চমূল্যের কৃষি কার্যক্রম থেকেও শক্তি অর্জন করছে। এই ধরনের কৃষি ব্যবস্থাই ভারতের উন্নয়নের পরবর্তী পর্যায়কে গতিশীল করবে।

আমাদের লক্ষ্য এখন কেবল ‘আরও বেশি উৎপাদন’ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। আমাদের কম সম্পদ- যেমন কম জল, কম জমি, কম জ্বালানি এবং অপ্রয়োজনীয় উপকরণের ব্যবহার কমিয়ে আরও বেশি উৎপাদন করতে হবে। একই সাথে নিশ্চিত করতে হবে যেন উৎপাদিত খাদ্য উন্নত মানের, নিরাপদ এবং অধিক পুষ্টিকর হয়। ভারতের ভোগ বা ব্যবহারের ধরনে যে পরিবর্তন এসেছে, তা একটি শক্তিশালী ব্যবস্থার ইঙ্গিত দিচ্ছে। যেমন, ১৯৭২-৭৩ সালে গ্রামীণ ভারতে খাদ্য ব্যয়ের প্রায় ৫৭ শতাংশই ব্যয় হতো খাদ্যশস্যের পেছনে। ২০২২–২৩ সাল নাগাদ এটি কমে প্রায় ১১ শতাংশে নেমে এসেছে। একই সময়ে দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্য, ফল, শাকসবজি, ডিম, মাংস এবং মাছের অংশ প্রায় ২০ শতাংশ থেকে বেড়ে প্রায় ৪৮ শতাংশে পৌঁছেছে।

শহরাঞ্চলেও ভোগের ধরন অনেকটা একই রকম। আমাদের কৃষি খাতকে এই ‘নতুন ভারত’-এর চাহিদার সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে। এর অর্থ হলো- ডাল, তৈলবীজ, ফল, শাকসবজি, দুগ্ধজাত পণ্য, মৎস্য, পোল্ট্রি এবং অন্যান্য উচ্চমূল্যের পণ্যের ওপর আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়া। এর মানে হলো- খাদ্য নিরাপত্তার সংকীর্ণ ধারণা থেকে বেরিয়ে পুষ্টি নিরাপত্তার দিকে এগিয়ে যাওয়া। এর অর্থ হলো- কৃষকদের এমন সব ভ্যালু চেইন বা মূল্য সংযোজন শৃঙ্খলে যুক্ত হওয়ার সুযোগ করে দেওয়া,

যেখানে গ্রেডিং, প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্যাকেজিং, ব্র্যান্ডিং, লজিস্টিকস এবং রপ্তানির মতো ক্ষেত্রগুলোতে প্রকৃত অর্থনৈতিক সম্ভাবনা নিহিত রয়েছে।

কৃষক-কেন্দ্রিক প্রবৃদ্ধির কাঠামো গড়ে তোলা

ভারত সরকার এই রূপান্তরের জন্য ইতিমধ্যেই একটি গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো তৈরি করেছে। ‘প্রধানমন্ত্রী কৃষি সিঞ্চাই যোজনা’ জলের দক্ষ ব্যবহারকে উৎসাহিত করছে। ‘সয়েল হেলথ কার্ড’ (মৃত্তিকা স্বাস্থ্য কার্ড) উদ্যোগটি মাটি পরীক্ষা এবং সুষম পুষ্টি ব্যবস্থাপনাকে কৃষকদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে। ‘পিএম-কুসুম’

প্রকল্প কৃষিকে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সাথে যুক্ত করছে। ‘ফার্মার প্রডিউসার অর্গানাইজেশন’ (কৃষক উৎপাদক সংগঠন) কৃষকদের পণ্য একত্রিত করার সক্ষমতা ও দরকষাকষির শক্তি বৃদ্ধি করছে। ‘ই-ন্যাম’ কৃষি বাজারগুলোকে ডিজিটালভাবে সংযুক্ত করছে; অন্যদিকে ‘এগ্রিকালচার ইনফ্রাস্ট্রাকচার ফান্ড’, ‘পিএম কিষান সম্পদ যোজনা’ এবং ‘পিএমএফএমই’ ফসল তোলার পরবর্তী পরিকাঠামো ও প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করছে। এই উদ্যোগগুলোকে এখন একটি একক

কৃষক-কেন্দ্রিক মূল্য শৃঙ্খলে একত্রিত হতে হবে- বীজ থেকে মাটি, খামার থেকে বাজার এবং গবেষণাগার থেকে জীবিকা পর্যন্ত। এই রূপান্তরের মূলে থাকবে প্রযুক্তি। ভারতীয় কৃষি গবেষণা এখন কেবল ফলন বাড়ানোর প্রথাগত লক্ষ্যের গণ্ডি পেরিয়ে অনেক দূর এগিয়েছে। ২০০৩ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে ১,৫৪০টি ফসলের জাত অবমুক্ত করা হয়েছিল, যেখানে ২০১৪ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ৩,২৩৬টি নতুন জাত অবমুক্ত করা হয়েছে। সাম্প্রতিক জাতগুলোর একটি বড় অংশ জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার উপযোগী করে তৈরি করা হয়েছে এবং ‘বায়োফোর্টিফিকেশন’ (পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধকরণ)-এর ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তাই পরবর্তী কৃষি বিপ্লব হতে হবে নির্ভুলতা, সহনশীলতা এবং জ্ঞানের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা একটি বিপ্লব। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রিমোট সেন্সিং, ড্রোন, জিনোমিক্স,

জৈবপ্রযুক্তি, ডিজিটাল পরামর্শ ব্যবস্থা এবং ভূ-স্থানিক প্রযুক্তি কৃষকদের বীজ বপন, সেচ, পুষ্টি ব্যবস্থাপনা, কীটপতঙ্গ নিয়ন্ত্রণ, আবহাওয়া ও বাজার সংক্রান্ত

বিষয়ে আরও ভালো সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করতে পারে। ডিজিটাল কৃষি উদ্যোগ, ‘এগ্রিস্ট্যাক’ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-চালিত পরামর্শমূলক প্ল্যাটফর্মগুলো কৃষি সেবাকে আরও সুনির্দিষ্ট ও সহজলভ্য করে তুলতে পারে। তবে প্রযুক্তি তখনই প্রকৃত সুফল বয়ে আনবে, যখন তা কৃষকের কাছে সহজ, সাশ্রয়ী এবং স্থানীয় পরিস্থিতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ রূপে পৌঁছাবে।

গবেষণাগার থেকে প্রান্তিক পর্যায় পর্যন্ত

এই প্রেক্ষাপটে গবেষণা ও সম্প্রসারণ পরিষেবার ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ করা প্রতিটি টাকা উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক সুফল বয়ে আনে৷ অন্যদিকে, সম্প্রসারণ পরিষেবা বৈজ্ঞানিক জ্ঞানকে কৃষিক্ষেত্রে ব্যবহারিক উন্নতির রূপ প্রদান করে। আমাদের গবেষণাগার, বিশ্ববিদ্যালয়, কৃষি বিজ্ঞান কেন্দ্র, স্টার্টআপ, বেসরকারি উদ্ভাবক এবং কৃষকদের মধ্যে সংযোগ আরও জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে, আমাদের সম্পদের সীমাবদ্ধতা বা চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করতে হবে। জল, সার, শক্তি ও জমির ব্যবহার বাড়িয়ে ভারত অনির্দিষ্টকাল ধরে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি করতে পারবে না। ভূগর্ভস্থ জলের স্তর হ্রাস, মাটির গুণমান নষ্ট হওয়া, জলবায়ুর পরিবর্তন এবং চরম আবহাওয়া পরিস্থিতির মতো বিষয়গুলো একটি নতুন উৎপাদন মডেলের দাবি রাখে। তথ্য-প্রমাণ বলছে, সাম্প্রতিক কৃষি প্রবৃদ্ধির পর্যায়ে উচ্চ উৎপাদনশীলতার পাশাপাশি অধিকতর স্থিতিশীলতা অর্জিত হয়েছে- যা বৈচিত্র্যকরণ, সম্পদের দক্ষ ব্যবহার, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ু সহনশীলতার ক্রমবর্ধমান গুরুত্বকেই তুলে ধরে। এ কারণেই সুস্থায়ী কৃষি কেবল পরিবেশগত বিলাসিতা নয়, বরং কৃষকের জন্য এটি একটি অর্থনৈতিক প্রয়োজনীয়তা।

আমাদের নীতিমালায় জল, পুষ্টি উপাদান এবং শক্তির প্রতিটি ইউনিটের দক্ষ ব্যবহারকে উৎসাহিত করতে হবে।

গবেষণার ক্ষেত্রে জলবায়ু-সহনশীল জাত, জল ও পুষ্টির সাশ্রয়ী ব্যবহার উপযোগী ফসল, উন্নত মৃত্তিকা জীববিজ্ঞান, সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা, সংরক্ষণমূলক কৃষি এবং প্রিসিশন ফার্মিং বা নিখুঁত কৃষি পদ্ধতির ওপর অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। ডাল ও তৈলবীজের দিকে বিশেষ নজর দেওয়া দরকার, কারণ এগুলোর উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি ভারতের পুষ্টিগত ও অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা জোরদার করার জন্য অপরিহার্য।

দক্ষ বাজার ব্যবস্থা এবং বৈশ্বিক মূল্য শৃঙ্খল

একজন কৃষক যিনি দক্ষতার সঙ্গে ফসল উৎপাদন করেন, তাকে অবশ্যই তা লাভজনকভাবে বিক্রি করতে সক্ষম হতে হবে। উৎপাদনের পাশাপাশি কৃষি বাজার, সংরক্ষণ ব্যবস্থা, কোল্ড চেইন, লজিস্টিকস, পণ্যের মান নির্ধারণ (গ্রেডিং), প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের বিকাশ ঘটা জরুরি। কৃষি উৎপাদনের প্রসার এবং পচনশীল পণ্যের চাষাবাদ বৃদ্ধির ফলে কার্যকরভাবে পণ্য একত্রিত করা ও বাজারের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের নতুন প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়েছে।

কৃষকদের সংগঠন, সমবায় সমিতি এবং কৃষক উৎপাদক সংস্থা (এফপিও)-গুলো লেনদেনের খরচ কমিয়ে, দরকষাকষির সক্ষমতা বাড়িয়ে এবং কৃষকদের সুসংগঠিত মূল্য শৃঙ্খলের অংশীদার করে তোলার মাধ্যমে এক যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করতে পারে। ভারতকে এখন কেবল স্থানীয় 'মান্ডি' বা বাজারের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না থেকে বিশ্ববাজারের দিকে নজর দিতে হবে।

আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত- এমন ভারতীয় কৃষি পণ্য তৈরি করা, যা বিশ্বস্বীকৃত মান, ট্রেসেবিলিটি (উৎপত্তি শনাক্তকরণ), নিরাপত্তা এবং ব্র্যান্ডিংয়ের দিক থেকে উন্নত। পরবর্তী ধাপে কৃষকদের কেবল অভ্যন্তরীণ ভোক্তাদের সঙ্গেই নয়, বরং আন্তর্জাতিক মূল্য শৃঙ্খলের সঙ্গেও যুক্ত করতে হবে। এটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে, গ্রামীণ উদ্যোক্তা তৈরিতে উৎসাহ জোগাবে এবং কৃষি থেকে অর্জিত মূল্যের একটি বড় অংশ গ্রামীণ ভারতেই থেকে যেতে সাহায্য করবে। তবে এই রূপান্তর কেবল কেন্দ্রীয়

সরকারের পক্ষে এককভাবে আনা সম্ভব নয়। কৃষি একটি সম্মিলিত জাতীয় দায়িত্ব। রাজ্য সরকার, স্থানীয় প্রশাসন, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, কৃষক উৎপাদক সংস্থা (এফপিও), সমবায় সমিতি, বেসরকারি উদ্যোগ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং সুশীল সমাজ- সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। ভবিষ্যতের জন্য কৃষি, জল, জ্বালানি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, পুষ্টি, জলবায়ু, বাণিজ্য এবং গ্রামীণ উন্নয়নের মধ্যে সমন্বয় সাধন করা প্রয়োজন।

এখানেই 'সমবায়মূলক যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো' বা 'কোঅপারেটিভ ফেডারেলিজম'-এর চেতনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ভারতের কৃষি-পরিবেশগত বৈচিত্র্য এমন সব সমাধানের দাবি রাখে, যা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে স্থানীয় হলেও দৃষ্টিভঙ্গির দিক থেকে জাতীয়। 'বিকশিত কৃষি' থেকে 'বিকশিত ভারত'-এর পথে যাত্রার সাফল্য কেবল কত টন ফসল উৎপাদিত হলো তার ওপর নির্ভর করবে না, বরং তা পরিমাপ করা হবে আমাদের কৃষকদের জীবনযাত্রার মানের ভিত্তিতে। একজন সমৃদ্ধ কৃষকই একটি সমৃদ্ধ গ্রামীণ অর্থনীতির ভিত্তি। একটি সহনশীল বা স্থিতিস্থাপক কৃষি খামার হলো একটি শক্তিশালী খাদ্য ব্যবস্থার ভিত্তি। আর একটি প্রতিযোগিতামূলক কৃষি মূল্য শৃঙ্খল হলো বিশ্বমঞ্চে প্রতিযোগিতামূলক ভারতের ভিত্তি। তাই আমাদের আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এই ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে যে- "আমরা কতটা উৎপাদন করতে পারি?" এবং তার পরিবর্তে মনোনিবেশ করতে হবে- "আমরা কতটা দক্ষতার সঙ্গে, সুস্থায়ী উপায়ে এবং লাভজনকভাবে উৎপাদন করতে পারি?"

সবুজ বিপ্লব ভারতের খাদ্য নিরাপত্তার ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করেছিল। পরবর্তী কৃষি রূপান্তরকে নিশ্চিত করতে হবে ভারতের সমৃদ্ধি, পুষ্টি, প্রাকৃতিক সম্পদের সুরক্ষা এবং বিশ্বমঞ্চে ভারতের নেতৃত্ব দিয়ে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশবাসীদের একটি স্পষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়েছেন: ভারতীয় কৃষিকে অবশ্যই 'বিকশিত ভারত'-এর একটি অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হয়ে উঠতে হবে। আমাদের কাজ হলো বিজ্ঞান, উদ্ভাবন, পরিকাঠামো, বাজার ও প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এবং সর্বোপরি প্রতিটি কৃষি নীতিতে ভারতীয় কৃষককে কেন্দ্রবিন্দুতে স্থাপন করে সেই দৃষ্টিভঙ্গিকে বাস্তবে রূপ দেওয়া। ২০৪৭ সালের ‘বিকশিত ভারত’-এর দিকে এগিয়ে যাওয়ার পথে, কৃষক কেবল উন্নয়নের সুবিধাভোগী হয়ে থাকবেন না; বরং তিনি হবেন ভারতের উন্নত ভবিষ্যতের রূপকার। ভারতের জন্য এখন প্রয়োজন এই ধরনের কৃষি রূপান্তর- আর এটিই হবে সেই ভিত্তি, যার ওপর দাঁড়িয়ে থাকবে ২০৪৭ সালের ভারত।

(লেখক ভারত সরকারের কৃষি ও কৃষক কল্যাণ এবং গ্রামীণ উন্নয়ন বিষয়ক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী। মতামত ব্যক্তিগত।)

আরও পড়ুন...


Post Your Comments Below

নিচে আপনি আপনার মন্তব্য বাংলাতেও লিখতে পারেন।

বিঃ দ্রঃ
আপনার মন্তব্য বা কমেন্ট ইংরেজি ও বাংলা উভয় ভাষাতেই লিখতে পারেন। বাংলায় কোন মন্তব্য লিখতে হলে কোন ইউনিকোড বাংলা ফন্টেই লিখতে হবে যেমন আমার বাংলা কিংবা অভ্রো কী-বোর্ড (Avro Keyboard)। আমার বাংলা কিংবা অভ্রো কী-বোর্ডের সাহায্যে মাক্রোসফট্ ওয়ার্ডে (Microsoft Word) টাইপ করে সেখান থেকে কপি করে কমেন্ট বা মন্তব্য বক্সে পেস্ট করতে পারেন। আপনার কম্পিউটারে আমার বাংলা কিংবা অভ্রো কী-বোর্ড বাংলা সফ্টওয়ার না থাকলে নিম্নে দেয়া লিঙ্কে (Link) ক্লিক করে ফ্রিতে ডাওনলোড করে নিতে পারেন।

Free Download Avro Keyboard

Fields with * are mandatory





Posted comments

Till now no approved comments is available.