পথ হারায়নি প্রজন্ম, হারিয়েছে পাঠের ভাষা
ড. জন্টু দাস
October 9, 2026
প্রতিটি প্রজন্মেরই কোনো না কোনো দুর্ভাগ্য থাকেই। তারা যখন বর্তমান, তখন তাদের নিয়ে অভিযোগের শেষ থাকে না; আর যখন তারা ইতিহাস, তখন তারাই হয়ে ওঠে আদর্শ। আজকের 'জেনারেশন জেড'-ও যেন সেই পুরোনো নিয়তিরই উত্তরাধিকারী। তাদের সম্পর্কে প্রচলিত অভিযোগের তালিকা দীর্ঘ—তারা নাকি মোবাইল-নির্ভর, ধৈর্যহীন, আত্মকেন্দ্রিক, বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন এবং সম্পর্কের প্রতি উদাসীন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পর্দায় ডুবে থাকা এই তরুণদের দেখে অনেকেই ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন হন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সত্যিই কি এই প্রজন্ম পথ হারিয়েছে? নাকি তাদের বোঝার ভাষাটাই আমরা হারিয়ে ফেলেছি?
যে প্রজন্মকে আমরা বিচার করছি, তারা এমন এক সময়ে জন্মেছে, যখন পৃথিবী অভূতপূর্ব গতিতে বদলেছে। তাদের শৈশবের খেলনা ছিল স্মার্টফোন, তাদের পাঠশালা শুধু শ্রেণিকক্ষ নয়, সমগ্র বিশ্ব। তারা এমন এক পৃথিবীর নাগরিক, যেখানে জ্ঞানের জন্য লাইব্রেরির তাক ঘাঁটতে হয় না; একটি স্পর্শেই পৃথিবীর নানা প্রান্তের তথ্য তাদের সামনে উন্মুক্ত হয়ে যায়। ফলে তাদের চিন্তার গতি দ্রুত, কৌতূহল প্রবল, এবং প্রশ্ন করার প্রবণতা স্বাভাবিক। কিন্তু আমরা প্রায়ই প্রশ্নকে অবাধ্যতা বলে ভুল করি, সংশয়কে মূল্যবোধহীনতা বলে মনে করি, আর স্বাধীন চিন্তাকে বিদ্রোহ বলে ব্যাখ্যা করি।
বিগত কয়েক বছর ধরে তরুণ প্রজন্ম নিয়ে গবেষণা ও প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণের অভিজ্ঞতায় আমার একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে যে জেনারেশন জেডকে একক কোনো বৈশিষ্ট্যে ব্যাখ্যা করা যায় না। তারা একই সঙ্গে আশাবাদী ও উদ্বিগ্ন, সংযুক্ত অথচ একাকী, বিশ্বমুখী কিন্তু পরিচয়-সন্ধানী। প্রযুক্তির সঙ্গে তাদের সহজাত বন্ধুত্ব রয়েছে, কিন্তু সেই প্রযুক্তিই কখনও কখনও তাদের মানসিক নিঃসঙ্গতার কারণ হয়ে ওঠে। তারা পরিবেশ নিয়ে উদ্বিগ্ন, সমাজ নিয়ে সচেতন, বৈচিত্র্যকে সম্মান করতে শেখে; আবার সেই সচেতনতা সবসময় বাস্তব জীবনের অনুশীলনে প্রতিফলিত হয় না। তারা শিক্ষা অর্জন করতে চায়, কিন্তু শিক্ষাকে অনেক সময় জীবনবোধের চেয়ে কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার সিঁড়ি হিসেবেই বেশি দেখে। এই বৈপরীত্য কোনো ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়; বরং দ্রুত পরিবর্তনশীল সময়ের প্রতিচ্ছবি।
সমস্যা হলো, আমরা এখনও তাদেরকে আমাদের মানদণ্ডে বিচার করি। আমরা চাই তারা আমাদের মতো ভাবুক, আমাদের মতো জীবনযাপন করুক, আমাদের মতো স্বপ্ন দেখুক। অথচ সময়ের প্রতিটি বাঁকে নতুন প্রজন্ম পুরোনো প্রজন্মের সঙ্গে মতভেদ তৈরি করেছে। যে তরুণ একসময় সমাজের কাছে বেপরোয়া ছিল, কালক্রমে তিনিই সমাজের দিশারী হয়েছেন। ইতিহাসে নতুন চিন্তা, নতুন প্রশ্ন এবং প্রতিষ্ঠিত ধারণার সমালোচনা প্রায় সব সময়ই অস্বস্তির কারণ হয়েছে। তাই আজকের তরুণদের প্রশ্নপ্রবণতাকে শুধু অবক্ষয়ের লক্ষণ হিসেবে দেখা ইতিহাসবোধেরও অভাব।
তবে এই প্রজন্মকে নিয়ে উদ্বেগের কোনো কারণ নেই, এমন বলাও ভুল হবে। দ্রুত ফল পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা, মনোযোগের বিচ্ছুরণ, ভার্চুয়াল স্বীকৃতির প্রতি নির্ভরতা এবং ক্রমবর্ধমান মানসিক চাপ তাদের সামনে বাস্তব চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। কিন্তু এই সমস্যাগুলোর সমাধান নিয়ন্ত্রণে নয়, সংলাপে; শাসনে নয়, সহযাত্রায়। কারণ কোনো প্রজন্মকে আদেশ দিয়ে গড়ে তোলা যায় না, তাকে বুঝতে হয়, তার সঙ্গে কথা বলতে হয়, তার সম্ভাবনার উপর বিশ্বাস রাখতে হয়।
আজকের তরুণেরা আসলে দিকনির্দেশনার চেয়ে বেশি খুঁজছে অর্থবহতা। তারা জানতে চায় কেন কোনো কাজ গুরুত্বপূর্ণ, কীভাবে তাদের শ্রম সমাজের কাজে লাগবে, কেন কোনো মূল্যবোধকে ধারণ করা প্রয়োজন। তারা শুধু চাকরি নয়, পরিচয়ও খোঁজে; শুধু আয় নয়, অর্থপূর্ণতাও খোঁজে। তাই তাদের সামনে যদি কেবল প্রতিযোগিতার ভাষা তুলে ধরা হয়, তবে তারা ক্লান্ত হবে; কিন্তু যদি তাদের সামনে দায়িত্ব, সৃজনশীলতা এবং মানবিক অবদানের স্বপ্ন তুলে ধরা যায়, তবে তারাই সমাজের সবচেয়ে বড় শক্তিতে পরিণত হবে।
আমরা প্রায়ই বলি, নতুন প্রজন্মকে পথ দেখাতে হবে। কথাটি আংশিক সত্য। কারণ পথ দেখানোর আগে পথিককে চিনতে হয়। জেনারেশন জেডকে বদলে দেওয়ার প্রয়োজন নেই; প্রয়োজন তাদের বোঝার। তারা কোনো হারিয়ে যাওয়া প্রজন্ম নয়, বরং পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠা এক প্রজন্ম। তাদের মধ্যে যেমন বিভ্রান্তির সম্ভাবনা আছে, তেমনি রয়েছে সৃষ্টির শক্তি; যেমন অনিশ্চয়তা আছে, তেমনি রয়েছে নতুন ভবিষ্যৎ নির্মাণের সাহস।
জেনারেশন জেডের এই বিকাশ আসলে কোনো সাময়িক অবক্ষয় বা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি মানব সভ্যতার বিবর্তনেরই এক প্রগতিশীল পর্যায়। তারা চিরাচরিত নিয়মের বৃত্ত ভেঙে নিজেদের এক স্বতন্ত্র স্রোত তৈরি করেছে, যাকে অবমূল্যায়ন করার কোনো সুযোগ নেই। তাই আমাদের দায়িত্ব তাদের জোর করে পুরোনো ছাঁচে বাঁধা নয়, বরং তাদের এই অনন্য বৈশিষ্ট্য ও নিজস্বতাকে স্বীকার করে নেওয়া। আমাদের দায়িত্ব তাদের ওপর পুরোনো চিন্তার বোঝা না চাপিয়ে তাদের সৃজনশীলতাকে বিকশিত হওয়ার মুক্ত আকাশ করে দেওয়া। আমাদের উচিত পারস্পরিক অবিশ্বাসের দেয়াল ভেঙে সুস্থ সংলাপ, মেন্টরশিপ ও সহমর্মিতার সেতু তৈরি করা, যাতে তারা নিজেদের সম্ভাবনাকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারে। এর জন্য প্রথাগত মুখস্থ বিদ্যার দেয়াল ভেঙে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটাতে হবে এবং এমন এক আধুনিক ও মানবিক শিক্ষাকাঠামো গড়ে তুলতে হবে, যা তাদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও সূক্ষ্ম চিন্তন ক্ষমতাকে সঠিক দিশা দেবে। তাদের অদম্য সৃষ্টিশীলতাকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে হলে শাসন নয়, প্রয়োজন পরিচর্যা। তরুণদের এই অমিত সম্ভাবনাকে উপযুক্ত ক্ষেত্র ও স্বাধীনতা দিলে, তারা বিভ্রান্তির চোরাবালিতে না হারিয়ে নিজেদের আপন মহিমায় এক নতুন পৃথিবীর রূপকার হয়ে উঠবে।
হয়তো সমস্যাটা প্রজন্মের নয়। সমস্যাটা হলো, আমরা এখনও তাদের পড়তে শিখিনি। যে দিন সেই পাঠের ভাষা আমরা ফিরে পাব, সেদিন দেখব—যাদের নিয়ে আজ এত উদ্বেগ, তারাই আগামী দিনের সবচেয়ে বড় আশার নাম।
আরও পড়ুন...