সোনার দৌড়ে শর্বরী
নন্দিতা দত্ত
October 4, 2026
লাদাখের পডিয়ামে দাঁড়িয়ে চোখে জল এসেছিল শর্বরী দেবনাথের। সামনে সোনার পদক। আর মনে পড়ছিল দীর্ঘ অনুশীলন, পরিবারের কথা, সেই ভোরবেলার দৌড়। ২১ কিলোমিটার পথ পেরিয়ে নিজের বয়সভিত্তিক বিভাগে প্রথম হওয়ার মুহূর্তে মনে হয়েছিল—এত দিনের পরিশ্রম সার্থক। নিজের মনেই বলেছিলেন, “আমি পেরেছি।”
ত্রিপুরার মেয়ে শর্বরী এখন জয়পুরের বাসিন্দা। স্ত্রী, মা ও উদ্যোক্তা হিসেবে তাঁর পরিচয় বহু দিনের। গত দু’বছরে তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন পরিচয়—endurance athlete। সদ্য শেষ হওয়া লাদাখ ম্যারাথনে ২১ কিলোমিটার দৌড়ে বয়সভিত্তিক বিভাগে সোনা জিতেছেন তিনি। প্রতিযোগিতায় জয়পুরের হয়ে নামলেও শিকড়ের কথা উঠলেই গলায় অন্য আবেগ, “আমি ত্রিপুরার মেয়ে। এক দিন ত্রিপুরার হয়ে ম্যারাথনে অংশ নেওয়া আমার স্বপ্ন।”৫২+ বিভাগে
প্রায় ১১,৫০০ ফুট উচ্চতায় লাদাখের দৌড় সহজ ছিল না। সমতলের তুলনায় কম অক্সিজেন, তার সঙ্গে দীর্ঘ পথ। শর্বরীর কথায়, এই দৌড়ে শরীরের পাশাপাশি মনকেও নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়। “কঠোর ও সঠিক অনুশীলনের জন্যই আমি আমার বয়সভিত্তিক বিভাগে প্রথম হতে পেরেছি।”
অথচ দৌড়ের এই অধ্যায় শুরু হয়েছে মাত্র ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে। অনুপ্রেরণা ছেলে। তাকে প্রতিদিন দৌড়ে ফিরে নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলতে শুনতেন শর্বরী। এক দিন হঠাৎ মনে হয়েছিল, “আমি কি দৌড়ে অংশ নিতে পারি না?” প্রশ্নটি ধীরে ধীরে বদলে যায় সংকল্পে।
স্কুলজীবনে খেলাধুলার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল সীমিত। বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় কোনও একটি খেলায় অংশ নেওয়া—সেই পর্যন্ত। পরে জয়পুরে এসে শরীরচর্চার প্রতি আগ্রহ বাড়ে। জিমে শুরু করেন strength training। পরে নিজের জিম খোলেন। সেখানে মহিলাদের MMA প্রশিক্ষণ দেখে আগ্রহী হন। প্রায় দু’বছর MMA অনুশীলনের পর শুরু করেন বক্সিংও।
তার পর দৌড়। “শুরু থেকেই দৌড়ানোর সময় আলাদা একটা এনার্জি অনুভব করতাম,” বলেন শর্বরী। ভোরের রানিং প্র্যাকটিস এখন তাঁর জীবনের নিয়মিত ছন্দ।
এই ছন্দের পাশাপাশি চলছে সংসার ও ব্যবসা। প্রায় আড়াই বছর আগে শখ থেকে শুরু করা তাঁর জিমে এখন চার জন ট্রেনার, একজন Zumba instructor ও একজন কর্মী রয়েছেন। তাঁদের নিয়মিত বেতনের পাশাপাশি অতিরিক্ত আর্থিক সহায়তাও করেন তিনি। তাঁর কাছে সাফল্য শুধু নিজের উপার্জন নয়, অন্যের জন্য কাজের সুযোগ তৈরি করাও। “নিজে রোজগার করা যেমন সাফল্য, তেমনি অন্যের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করাটাও আমার সাফল্য।”
সংসার, সন্তান, জিম, দৌড় ও বক্সিং—সবকিছুর মধ্যে ভারসাম্য রাখার জন্য শর্বরীর ভরসা রুটিন। পরিবারের সমর্থনও তাঁর বড় শক্তি। বিশেষ করে ছেলে, যে তাঁকে ফিটনেসের জগতে ঢোকার প্রথম সাহসটা দিয়েছিল।
দৌড়ের প্রথম অফিসিয়াল প্রতিযোগিতাতেই পডিয়াম। কাদামাটি, জঙ্গল, কংক্রিট—বিভিন্ন পথ পেরিয়ে সেই সাফল্যের পর ধীরে ধীরে বড় হয়েছে তাঁর আত্মবিশ্বাস।
এরই মধ্যে আসে HYROX। দৌড় ও functional fitness-এর মিশেলে তৈরি এই প্রতিযোগিতায় প্রথম অংশ নিয়েই নিজের বয়সভিত্তিক বিভাগে দ্বিতীয় হন শর্বরী। আট কিলোমিটার দৌড়ের সঙ্গে ছিল আটটি স্টেশন। ৭৮ কেজি ওজন টেনে নিয়ে যাওয়া এবং ৬ কেজির বল নিয়ে ১০০টি wall ball ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। শরীর ক্লান্ত হয়েছে, কিন্তু থামার কথা মনে আসেনি। মাথায় ছিল—“পারতেই হবে।”
এই মানসিক দৃঢ়তাকেই নিজের বড় শক্তি মনে করেন শর্বরী। তাঁর বিশ্বাস, endurance শুধু শরীরে তৈরি হয় না, মনেও তৈরি হয়। তাই অনুশীলনের সঙ্গে খাদ্যাভ্যাস, ঘুম এবং মানসিক প্রস্তুতিকেও গুরুত্ব দেন।
বয়স তাঁর কাছে থেমে যাওয়ার কারণ নয়। তাঁর রানিং সার্কেলে ৬০ থেকে ৮০ বছর বয়সের অনেকেই রয়েছেন, যাঁদের কেউ কেউ অবসরের পর দৌড় শুরু করেছেন। তাঁদের দেখে তাঁর বিশ্বাস আরও দৃঢ় হয়েছে—শুরু করার জন্য কোনও নির্দিষ্ট বয়স নেই।
তাই ২০২৪ সালের নিজের কাছে আজ যদি কিছু বলতে পারতেন, শর্বরীর হয়তো একটাই কথা থাকত—শুরুটা দেরিতে হয়েছে, কিন্তু পথ এখনও অনেক বাকি।
আগামী দু’বছরে দেশ-বিদেশের আরও বড় ম্যারাথন ও প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে তাঁর। আর মনের এক কোণে রয়ে গেছে সবচেয়ে আপন স্বপ্ন—এক দিন ত্রিপুরার হয়ে ম্যারাথনে নামবেন।
লাদাখের সোনা তাই তাঁর কাছে শেষ নয়, বরং আর-একটি শুরুর চিহ্ন। পথ এখনও বাকি।
আরও পড়ুন...