শেষ চিঠি

শ্রেষ্ঠা দত্ত বনিক, দশম শ্রেনি

October 4, 2026

মেজর কৌস্তভ প্রকাশ কুমার রানে ছিলেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর ৩৬ রাষ্ট্রীয় রাইফেলসের একজন কর্মকর্তা। আর পাঁচ জন লোকের মত কৌস্তভ রানে ও ছিলেন একজন ছেলে , ভাই , স্বামী ও পিতা। একটি সৈন্যের দেশ রক্ষার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জীবন ও কাটাতে হয় --কারণ আমরা যেমন মানুষ তারাও ঠিক তেমনি মানুষ ,যারা সারাক্ষণ আমাদের জীবন বাঁচানোর জন্য লড়ে যাচ্ছে। তাঁর স্ত্রী কণিকা রানে ছিলেন একজন দেশপ্রেমী-- স্বামীর মত তিনিও দেশের সেবা করার পথ বেছে নেন। পরবর্তী সময়ে, ২০১৬ সালে তাদের পুত্র সন্তান অগস্ত্য রানের জন্ম হয়। বাবা ভারতীয় সেনাবাহিনীর সাথে যুক্ত থাকায়, অগস্ত্যকে বেশিরভাগ সময়ই তার মায়ের সাথে কাটাতে হয়েছে। দেশের প্রতি কর্তব্য পালনের পাশাপাশি তিনি স্ত্রী কণিকা এবং ছোট ছেলে অগস্ত্যের প্রতি গভীরভাবে যত্নশীল ছিলেন। তার পরিবারে তিনি ছিলেন ভরসা, ভালোবাসা ও নিরাপত্তার প্রতীক। দেশের পরিচর্যায় কৌস্তভ রানের দিন ভালই যাচ্ছিল, আর এই দিকে ছোট্ট ছেলে অগস্ত্যকে নিয়ে মা কণিকার দিনও ভালোই কাটছিল। ইতিমধ্যে ২০১৮ সালের ৭ আগস্ট জম্মু-কাশ্মীরের গুরেজ সেক্টরে, নিয়ন্ত্রণরেখার (LoC) কাছে একটি অনুপ্রবেশ প্রতিহত করার অভিযানে অংশ নেন মেজর কৌস্তভ রানে। ততক্ষণ অব্দি সব ঠিকই ছিল। ৮ আগস্ট ২০১৮ , সকালের দিকে যখন সবাই যার যার নিত্য রোজকার কাজে ব্যস্ত __ তখন হঠাৎ দরজায় কেউ একজন মেজর কৌস্তভ রানের বাড়ির লোক আছে কিনা বলে ডাকছে। কনিকা তখন দৌঁড়ে দরজায় গিয়ে দেখল একটি পোস্ট মেন দাঁড়িয়ে আছেন। তার হাতে একটা সদ্য চিঠি। চিঠিটা দেখে স্ত্রী কণিকার কিছুক্ষণের জন্য আতঙ্ক মনে হয় , তারপর যখন চিঠিটা পড়ে তাতে লেখা ছিল__

"অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে জানানো যাচ্ছে যে, ভারতীয় সেনাবাহিনীর ৩৬ রাষ্ট্রীয় রাইফেলসের মেজর কৌস্তভ প্রকাশ কুমার রানে কর্তব্যরত অবস্থায় ৭ আগস্ট ২০১৮, তারিখে জম্মু ও কাশ্মীরের গুড়েজ সেক্টরে প্রাণ হারিয়েছেন।

ভারতীয় সেনা বাহিনীর শোকসন্তপ্ত পরিবার_ তাঁর স্ত্রী কণিকা রানে এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করছে। দেশের সেবায় মেজর কৌস্তভ রানের আত্মত্যাগ চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।……"

এটা পড়ার পর স্ত্রী কণিকা কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে। সে যেন মাঝসমুদ্রে একা দাঁড়িয়ে ছিল । তাকে সমুদ্র পার করাবার কেউ ছিল না তখন। তখন পুত্র অগস্ত্যের বয়স মাত্র দু'বছর। আর মৃত্যুর সময় কৌস্তভ রানের বয়স ছিল ২৯ বছর। অতি অল্প বয়সে স্ত্রী ও ছেলেকে এই পৃথিবীতে একা রেখে মেজর কৌস্তভ রাণে নিজেকে তিরঙ্গায় মুড়িয়ে নেয়। সেইদিন অর্থাৎ ২০১৮ সালের ৭ আগস্ট, প্রায় রাত ১:০০ টার দিকে শুরু হওয়া একটি অনুপ্রবেশ প্রতিহত করার অভিযানে কৌস্তুভ রানে প্রাণ হারান। ঘটনাস্থল ছিল গুরেজ সেক্টর, বন্দিপোরা জেল , জম্মু-কাশ্মীরের নিয়ন্ত্রণরেখার (LoC) কাছে। দুই বছরের শিশু বাবাকে মৃত্যু শয্যায় দেখে কিছুই অনুভব করতে পারল না। তাঁর শেষকৃত্য ৯ আগস্ট ২০১৮ সালে মীরা রোডে , সামরিক মর্যাদায় সম্পন্ন হয়। তাঁর বাবা প্রকাশ কুমার রানে তাঁর চিতায়  আগুন দেন। একটি বাবা হয়ে তার ছেলের চিতায় আগুন দেওয়ার চেয়ে কষ্টের অনুভূতি আর কিছুই হতে পারে না। আর এই ভাবেই ২০১৮ সালের ৮ আগস্ট এর একটি চিঠি , মেজর কৌস্তভ রানের পরিবারের জীবন পাল্টে দেয়। আর সেই চিঠি হয়ে উঠে তাঁর জীবনের "শেষ চিঠি"। তাঁর আত্মত্যাগ আজও ভারতের ইতিহাসে চিরস্মরণীয়, তাঁর নিরাপত্তা ও মাতৃভূমির প্রতি কর্তব্য নিষ্ঠা আজও আমাদের সকলের জন্য অনুপ্রেরণা।

আরও পড়ুন...


Post Your Comments Below

নিচে আপনি আপনার মন্তব্য বাংলাতেও লিখতে পারেন।

বিঃ দ্রঃ
আপনার মন্তব্য বা কমেন্ট ইংরেজি ও বাংলা উভয় ভাষাতেই লিখতে পারেন। বাংলায় কোন মন্তব্য লিখতে হলে কোন ইউনিকোড বাংলা ফন্টেই লিখতে হবে যেমন আমার বাংলা কিংবা অভ্রো কী-বোর্ড (Avro Keyboard)। আমার বাংলা কিংবা অভ্রো কী-বোর্ডের সাহায্যে মাক্রোসফট্ ওয়ার্ডে (Microsoft Word) টাইপ করে সেখান থেকে কপি করে কমেন্ট বা মন্তব্য বক্সে পেস্ট করতে পারেন। আপনার কম্পিউটারে আমার বাংলা কিংবা অভ্রো কী-বোর্ড বাংলা সফ্টওয়ার না থাকলে নিম্নে দেয়া লিঙ্কে (Link) ক্লিক করে ফ্রিতে ডাওনলোড করে নিতে পারেন।

Free Download Avro Keyboard

Fields with * are mandatory





Posted comments

Till now no approved comments is available.