উত্তর-পূর্ব ভারত, ত্রিপুরা ও মহাত্মা গান্ধী : ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য বন্ধন

বিপ্লব চক্রবর্তী

October 2, 2026

দুই অক্টোবর মহাত্মা গান্ধীর জন্মজয়ন্তী আমাদের কেবল একটি দিন নয়, এটি সত্য ও অহিংসার চিরন্তন আদর্শকে স্মরণ করার দিন। উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে গান্ধীজির সম্পর্ক নিয়ে অনেক ভুল ধারণা থাকলেও ইতিহাস প্রমাণ করে ত্রিপুরাই ছিল উত্তর-পূর্বে গান্ধী-চেতনার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র।

ত্রিপুরার গান্ধী-চেতনার সূচনা হয়েছিল অবিভক্ত কুমিল্লা ও শ্রীহট্টকে কেন্দ্র করে। উনিশশো আট সালে জন্ম নেওয়া শচীন্দ্রনাথ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অন্নদা স্কুল এবং কুমিল্লার ঈশ্বর পাঠশালায় পড়াশোনা করে উনিশশো একুশ সালের অসহযোগ আন্দোলনে সরাসরি গান্ধীজির সংস্পর্শে আসেন। ষাটনলা গ্রামের জগৎবন্ধু চক্রবর্তী গান্ধীজির কুমিল্লা সফরে অনুপ্রাণিত হয়ে ত্রিপুরার গ্রামে গ্রামে চরকা ও খাদির প্রচার শুরু করেন। সর্বোদয় নেতা খিরোদ সেন ছিলেন বিনোবা ভাবের শিষ্য, যিনি লবণ আইন অমান্য ও ভারত ছাড়ো আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন।

শ্রীহট্টের ধর্মঘর গ্রামের ক্ষিতীশ চন্দ্র ভট্টাচার্য ও কুমুদবন্ধু চক্রবর্তীর আদর্শের ফলেই ত্রিপুরার বামুটিয়ায় গান্ধীগ্রামের প্রতিষ্ঠা হয়, যা আজও গান্ধীজির গ্রাম-স্বরাজের জীবন্ত প্রতীক। বামাচরণ ভট্টাচার্যের পুত্র সুরজিৎ ভট্টাচার্য গান্ধীজির সাথে হিজলি জেলে বন্দী ছিলেন। আইন অমান্য আন্দোলনে ত্রিপুরার বীর সন্তান বীরেন্দ্র কুমার ভট্টাচার্য ওরফে বেদান্ত শাস্ত্রী উনিশশো তিরিশ সালে ছয় মাস জেল খাটেন। তাঁর সাথে ছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র সেনগুপ্ত, বংশী ঠাকুর, তেজেন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত, দেবপ্রসাদ সেনগুপ্ত, জগৎজ্যোতি গুপ্ত সহ আরও অনেকে। ভারত ছাড়ো আন্দোলনে অমরচন্দ্র পাল, মহেন্দ্র কুমার ঢালি, মণিদেবী, মনোরঞ্জন মজুমদার, বীরেন্দ্র কুমার নাগের ভূমিকা ছিল উজ্জ্বল।

উনিশশো ছেচল্লিশ সালের নোয়াখালী দাঙ্গা ছিল ভারতের ইতিহাসে এক কলঙ্কময় অধ্যায়। দেশ যখন সাম্প্রদায়িক হিংসায় জর্জরিত, তখন মহাত্মা গান্ধী কলকাতা ও নোয়াখালীতে শান্তি মিশন নিয়ে পায়ে হেঁটে গ্রাম থেকে গ্রামে ঘুরেছিলেন। এই শান্তি মিশনের অন্যতম সদস্য ছিলেন ত্রিপুরার গর্ব সতীনাথ ভরদ্বাজ। তিনি গান্ধীজির সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে শান্তি স্থাপনের কাজ করেছিলেন। গান্ধীজির এই নোয়াখালী পদযাত্রা উত্তর-পূর্ব ভারতের মানুষের মনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। এটি প্রমাণ করেছিল যে গান্ধীজি উত্তর-পূর্বকে ভারতের মূল স্রোত থেকে আলাদা ভাবতেন না, বরং এই অঞ্চলের শান্তি ও সম্প্রীতিই ছিল তাঁর কাছে ভারতের ঐক্যের প্রতীক। তাঁর এই অহিংসার বার্তাই পরবর্তীতে উত্তর-পূর্বে শান্তির ভিত্তি তৈরি করে।

দেশভাগের পর এবং উনিশশো সাতচল্লিশ থেকে পরবর্তী কয়েক দশক ধরে পূর্ব পাকিস্তান থেকে লক্ষ লক্ষ বাঙালি হিন্দু শরণার্থী হিসেবে ত্রিপুরায় এসে আশ্রয় নেন। ত্রিপুরা তখন ছিল জনজাতি অধ্যুষিত একটি ছোট রাজ্য। কিন্তু মহারাজা বীর বিক্রম কিশোর দেববর্মা ,কালু চন্দ,অমরেন্দ্র দেববর্মা,প্রভাত রায় ,তড়িৎ দাস গুপ্ত,শচীন্দ্র লাল্ সিং ,উমেশ লাল সিং এবং পরবর্তীতে ত্রিপুরার সাধারণ মানুষ অত্যন্ত উদারতার সাথে এই শরণার্থীদের গ্রহণ করেছিলেন। এই ঘটনা গান্ধীজির সর্বোদয় এবং সর্বধর্ম সমন্বয়ের আদর্শেরই এক জীবন্ত উদাহরণ। গান্ধীজি সবসময় বলতেন, ভারত সবার জন্য। ত্রিপুরা সেই আদর্শকে বুকে ধারণ করে শরণার্থীদের নিজের করে নিয়েছিল, তাঁদের জমি দিয়েছিল, আশ্রয় দিয়েছিল। আজ ত্রিপুরার যে মিশ্র সংস্কৃতি, তা গান্ধীজির দেখানো মানবতার পথেরই ফসল।

আজ যখন আমরা এক ভারত শ্রেষ্ঠ ভারত এবং আত্মনির্ভর ত্রিপুরার স্বপ্ন দেখি, তখন গান্ধীজির দেখানো সত্য, অহিংসা এবং মানবতার পথই আমাদের পাথেয়। ত্রিপুরার এই অকথিত বীর গান্ধীবাদীদের এবং শরণার্থীদের আশ্রয়দানকারী ত্রিপুরার উদার মানবিকতাকে স্মরণ করাই হবে গান্ধী জয়ন্তীর প্রকৃত শ্রদ্ধাঞ্জলি।

(সভাপতি, ভারতীয় জনতা পার্টি, সিপাহীজলা উত্তর জেলা)

(The editor of tripurainfo.com warmly invites students and aspiring writers to share their thoughts, ideas, and creativity through articles. Understanding that every great writer starts somewhere, tripurainfo.com is committed to providing a platform where young minds can express themselves without fear of judgment.

This initiative is not about perfection but about encouragement, growth, and giving voice to new perspectives. We believe that by supporting young talents today, we are shaping the storytellers, journalists, and thought leaders of tomorrow.

So, if you have a story to tell or an idea to share, don’t hesitate—send in your articles. Let your words inspire others, and let tripurainfo.com be the stage where your voice is heard!)

আরও পড়ুন...


Post Your Comments Below

নিচে আপনি আপনার মন্তব্য বাংলাতেও লিখতে পারেন।

বিঃ দ্রঃ
আপনার মন্তব্য বা কমেন্ট ইংরেজি ও বাংলা উভয় ভাষাতেই লিখতে পারেন। বাংলায় কোন মন্তব্য লিখতে হলে কোন ইউনিকোড বাংলা ফন্টেই লিখতে হবে যেমন আমার বাংলা কিংবা অভ্রো কী-বোর্ড (Avro Keyboard)। আমার বাংলা কিংবা অভ্রো কী-বোর্ডের সাহায্যে মাক্রোসফট্ ওয়ার্ডে (Microsoft Word) টাইপ করে সেখান থেকে কপি করে কমেন্ট বা মন্তব্য বক্সে পেস্ট করতে পারেন। আপনার কম্পিউটারে আমার বাংলা কিংবা অভ্রো কী-বোর্ড বাংলা সফ্টওয়ার না থাকলে নিম্নে দেয়া লিঙ্কে (Link) ক্লিক করে ফ্রিতে ডাওনলোড করে নিতে পারেন।

Free Download Avro Keyboard

Fields with * are mandatory





Posted comments

Till now no approved comments is available.