মণিপুরে অশান্তি, ত্রিপুরাতে ভোট উত্তাপ
পান্নালাল রায়
October 1, 2026
সরকারি স্তরে নানা উদ্যোগ এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা সুদৃঢ় করা সত্ত্বেও মণিপুরে জাতি সংঘাতের মাত্রা হ্রাস পাবার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।কুকি-জো এবং নাগা সম্প্রদায়ের মধ্যে জাতি বিদ্বেষ প্রবল আকার ধারণ করেছে।এই দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে চোরাগুপ্তা হামলার ঘটনা ঘটছে এবং মৃত্যুর সংখ্যাও বেড়ে চলেছে।মণিপুরে শান্তি ফেরাতে সরকার ও শাসকদল তৎপর রয়েছে বলে ঘোষণা দিলেও শেষপর্যন্ত তার সফলতা নিয়ে মানুষ প্রবল সন্দিহান। এদিকে ত্রিপুরাতে জেলাপরিষদ এলাকায় ভিলেজ ভোটের ফলাফলের পর ত্রিপাক্ষিক চুক্তি রূপায়নের ইস্যুতে তিপ্রা মথা আবার যে সোচ্চার হবে তার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
২০২৩ সালে মৈতেই ও কুকি-জো সংঘাতে মণিপুরের অবস্থা প্রবল ভাবে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল।এই সংঘাতের কারণ ছিল মৈতেইদের জনজাতি হিসেবে ঘোষণার প্রস্তাব ঘিরে উত্তেজনা।সে বছরের ৩ মে জনজাতি ছাত্র সংগঠনের মিছিল ঘিরে দুই জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘাত ছড়িয়ে পড়েছিল। বিভিন্ন অঞ্চলে খুন,জখম ও লুঠতরাজ সহ ব্যাপক হারে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটতে থাকে।বাড়তে থাকে মৃত্যুর সংখ্যাও। মৈতেই ও কুকি-জো উভয় সম্প্রদায়ের বহুসংখ্যক মানুষ গৃহহারা হয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ছুটে যান।আশ্রয় নেন ত্রাণ শিবিরে।তাদের মধ্যে আবার কেউ কেউ ভিন্ন রাজ্যেও আশ্রয় নেন।এই সংঘাতের ফলে মণিপুরে সংশ্লিষ্ট দুই জাতি গোষ্ঠীর মধ্যে দূরত্ব ক্রমেই বাড়তে থাকে।কুকি-জো জনগোষ্ঠীর মানুষ তাদের জন্য পৃথক প্রশাসনিক ব্যবস্থার দাবি জানাতে থাকে।যদিও তাদের এই পৃথক প্রশাসনিক ব্যবস্থার দাবি মোটেই নতুন নয়,তবু,তিন বছর আগে শুরু হওয়া জাতি সংঘাতের পর তা আরও তীব্রতা লাভ করে।মণিপুরের ঘটনার প্রভাব পড়ে পাশাপাশি রাজ্যেও।দৃষ্টি আকর্ষণ করে গোটা দেশেরও।ওয়াকিবহাল মহলের মতে মণিপুরের মৈতেই ও কুকি-জো সংঘাতের কারণ শুধু জনজাতি ইস্যুই নয়।পাহাড়ি এলাকা ও সমতলে বসবাসকারী মানুষের মধ্যে ভূমি ও রাজনৈতিক অধিকার,জনসংখ্যাগত উদ্বেগ ইত্যাদিও রয়েছে এই সংঘাতের মূলে।কার্যত বারুদের স্তুপে বিস্ফোরণের জন্য তখন জনজাতি ইস্যুটি ছিল একটি দেশলাই'র কাঠি মাত্র!
কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার যে মণিপুরে শান্তি ফিরিয়ে আনতে উদ্যোগ নেয়নি বিষয়টি কিন্তু তা নয়।এই জাতি সংঘাত সামাল দেওয়ার জন্য কেন্দ্র রাজ্যকে যথাযথ সাহায্য করেছে।পর্যাপ্ত বাহিনি পাঠিয়েছে।নানা কমিটি হয়েছে,বৈঠকের পর বৈঠক হয়েছে।কিন্তু তারপরও অবস্থা সামাল দেয়া সম্ভব হয়নি।মণিপুরের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বীরেন সিং বলেছিলেন রাজ্যটিতে জাতিসংঘাত জনিত দীর্ঘস্হায়ী অশান্তির মূলে রয়েছে মায়ানমার থেকে আসা সন্ত্রাসবাদীদের তৎপরতা,অনুপ্রবেশ, বেআইনি আফিম চাষ ও মাদক পাচারের যোগসূত্র। উল্লেখ করা যায় যে,মণিপুরের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের সদস্যরাও জড়িয়ে পড়েছিল এই সংঘাতে।নির্বিচারে লুঠ হয়েছিল রাজ্য পুলিশের অস্ত্রাগারের অস্ত্র। বিবদমান গোষ্ঠীর সকলের হাতেই ছিল অস্ত্রশস্ত্র। একদিকে পুলিশের লুন্ঠিত অস্ত্র ও অপরদিকে সন্ত্রাসবাদীদের অস্ত্র। তাই পরিস্থিতি যে কতটা ভয়াবহ এবং তা সামাল দেয়া যে কতটা কঠিন ছিল তা বলার অপেক্ষা রাখে না।শুধু জীবন আর সম্পদ হানি নয়,দুই জাতি গোষ্ঠীর মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টিও রাজ্যটির পক্ষে এক অশনি সংকেত!
যাইহোক,২০২৩ সালে মণিপুরে জাতি সংঘাত শুরু হবার প্রায় দুই বছর পর মুখ্যমন্ত্রী বীরেন সিং পদত্যাগ করলে ২০২৫ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি রাজ্যটিতে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হয়।রাষ্ট্রপতি শাসনাধীন অবস্থায় মণিপুরের অবস্থার উন্নতি ঘটলেও পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছিল এমনটা বলা যাবে না।তবে রাষ্ট্রপতি শাসনের এক বছরে শান্তি ফেরার লক্ষণ স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। সীমান্ত এলাকায় সন্ত্রাসবাদীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থার পাশাপাশি বিভিন্ন সম্প্রদায়ের দুষ্কৃতীদেরও জনবিচ্ছিন্ন করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল।কিন্তু রাষ্ট্রপতি শাসন তো আর সমাধানের পথ হতে পারে না!জনগণের দাবি মেনেই আবার ২০২৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি রাজ্যে প্রতিষ্ঠিত হয় নির্বাচিত সরকার। মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন খেমচাঁদ সিং।তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হিসেবে তিনি তাঁর দু'জন ডেপুটি নেন,যাদের একজন কুকি-জো এবং অপরজন নাগা সম্প্রদায়ের। মৈতেই সম্প্রদায়ের মুখ্যমন্ত্রী এবং কুকি-জো ও নাগা সম্প্রদায় থেকে উপমুখ্যমন্ত্রী নিয়োগ ছিল ক্ষমতার এক ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা।কিন্তু সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতায় দেখা যাচ্ছে তাও ফলপ্রসূ হচ্ছে না।নতুন সরকার প্রতিষ্ঠার পর মৈতেই-কুকি জো সংঘাতের মাত্রা স্তিমিত হয়ে এলেও নতুন করে মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে কুকি-নাগা সংঘাত। এই দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে অপহরণ ও খুনের ঘটনা ঘিরে রাজ্যে প্রবল উত্তেজনার সৃষ্টি হয়।বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় পথ অবরোধের জন্য রাজ্যে তীব্র পণ্য সংকট দেখা দেয়।এইসব সংঘাতে ভূমির অধিকার, রাজনৈতিক দাবি, মাদক পাচার, সন্ত্রাসবাদীদের তৎপরতা ইত্যাদি প্রসঙ্গ উঠে আসে।পাল্টা পাল্টি খুনের ঘটনা ঘটতে থাকে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে।সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি 'কুকি ব্ল্যাক ডে'তে তামেলং ও নোনি জেলায় পৃথক হামলায় চারজন কুকি-জো নিহত হন।কয়েকদিন পর আরও দুই কুকি-জো নারী নিহত হন। ২৪ সেপ্টেম্বর মায়ানমার সীমান্ত সংলগ্ন কামজং জেলায় তাংখুল নাগা সম্প্রদায়ের চারজনকে গুলিবিদ্ধ করে হত্যা করা হয়।মায়ানমার থেকে আসা সশস্ত্র জঙ্গিরা এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করেছে এমন অভিযোগও উঠে।
পরে সেনাপতি জেলাতেও বন্দুকবাজদের গুলিতে নাগা সম্প্রদায়ের আরও তিনজনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। ২৭ আগস্ট থেকে ২৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মণিপুরে কুকি-নাগা সংঘাতে উভয় সম্প্রদায়ের অন্যূন ২১জনের মৃত্যু ঘটেছে বলে সংবাদ।ফেব্রুয়ারি থেকে এই সংখ্যাটি ৪০। কুকি-নাগা সংঘাত যেন নব্বই দশকের ভয়াবহ স্মৃতি উসকে দিচ্ছে।উল্লেখ করা যায় যে,নব্বই দশকে কুকি-নাগা সংঘাতে মণিপুরে বহুসংখ্যক মানুষের প্রাণহানি এবং বাস্তুচ্যুতি ঘটেছিল।এই দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাসবোধ অবশ্য স্বাধীনোত্তর কাল থেকেই চলে আসছিল। সম্প্রতি তা আবার চাগা দিয়ে উঠেছে।একাধিক অপহরণ ও চোরাগুপ্তা হত্যার ঘটনায় কুকি জো ও নাগা সম্প্রদায়ের মধ্যে আবার অবিশ্বাসবোধ বাড়ছে,বাড়ছে দূরত্ব।আর মণিপুরও যেন জটিল সমস্যার আবর্তে জড়িয়ে পড়ছে।মণিপুরের বর্তমান কুকি-নাগা জাতি বিদ্বেষের মাঝেই আবার কুকি-জোদের জন্য পৃথক কেন্দ্র শাসিত অঞ্চলের দাবিও উঠছে।এদিকে মুখ্যমন্ত্রী খেমচাঁদ সিং বলেছেন,মণিপুরে শান্তি ফেরাতে রাজ্যের বিজেপি সরকার তৎপর রয়েছে।শান্তির লক্ষ্যে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে আলাপ আলোচনা চলছে।মুখ্যমন্ত্রী বলেন,রাজ্যের সকল জনগোষ্ঠীর প্রত্যেককে সুরক্ষা দেয়া এবং রাজ্যের সর্বত্র মানুষের স্বাভাবিক ও অবাধ চলাচলের মত অবস্থা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। মুখ্যমন্ত্রী আরও বলেছেন, রাজ্যের চলমান অশান্তির ফলে বিজেপি সরকারের উন্নয়ন মূলক কাজের সুফল সাধারণ রাজ্যবাসীর কাছে পৌঁছতে পারছে না।যাইহোক, মণিপুরে হিংসাত্মক ঘটনার অবসান ও শান্তি প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মাঝে পারস্পরিক অবিশ্বাসবোধ দূর করাও সর্বাধিক জরুরি।রাজ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার একটা চেষ্টা যে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মাঝে এক ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে এটা মেনে নিয়েও বলা যায় যে,তৃণমূল স্তরে তা কার্যকরে আরও উদ্যোগ চাই।সর্বাগ্রে প্রয়োজন বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাসবোধ দূর করা।এই অবিশ্বাসবোধ কমলেই মানুষের ভয় কমবে।কমবে বন্দুকের গোলাগুলির শব্দও!এদিকে জনগণনা বর্তমানে স্হগিত রেখে ১৯৫১ সালের ভিত্তিতে রাজ্যের নাগরিকপঞ্জি নবায়ন সম্পন্ন করার দাবিতে মণিপুরে আবার আন্দোলন শুরু হয়েছে।সম্প্রতি ইম্ফলে এই দাবিতে বিশাল মিছিল বের হয়।জাতি সংঘাতে যারা বাস্তুচ্যুত হয়েছেন তাদের ঘরে ফেরার ব্যবস্থা না হওয়া পর্যন্ত জনগণনা স্থগিত রাখার দাবি উঠেছে।
এবার ত্রিপুরার কথায় আসা যাক।ত্রিপুরার উপজাতি স্বশাসিত জেলাপরিষদ এলাকায় ভিলেজ ভোট হয়ে যাবার পর রাজ্যে এবার পুরভোট নিয়ে তৎপরতা শুরু হতে চলেছে।রাজ্যের আগামী বিধানসভা নির্বাচনের আগে এই দুটি নির্বাচনের ফলাফল যে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ তা আর নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না।জেলাপরিষদ এলাকায় ভিলেজ ভোটে এক তৃতীয়াংশ আসনে তিপ্রা মথার বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়লাভ নির্বাচনী ফলাফলের একটা আগাম ইঙ্গিত দিচ্ছে বললে ভুল হবে না।এই ভোটের ফলাফল প্রকাশের পর তিপ্রা মথা ত্রিপাক্ষিক চুক্তি রূপায়নের দাবিতে যে আরও সরব হবে তা এখনই বলে দেয়া যায়। এদিকে মথা সুপ্রিমো প্রদ্যোত কিশোর সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যমে এক বক্তব্যে সক্রিয় রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছেন। তবে তিপ্রাসা সমাজের মানোন্নয়নে তিনি কাজ করে যাবেন বলে জানিয়েছেন।আজ যারা জয় শ্রীরাম বলছেন, দিল্লিতে সরকার বদলালে দুমিনিটের মধ্যে তাঁরা লাল সেলাম বলবেন-সামাজিক মাধ্যমে মথা সুপ্রিমোর এমন বক্তব্যে রাজ্য রাজনীতিতে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে।রাজ্যে বিজেপি এবং কংগ্রেস নেতাদের উদ্দেশ্যেই তাঁর এমন বক্তব্য বলে মনে করা হচ্ছে।যাইহোক,ত্রিপাক্ষিক চুক্তি রূপায়নে তিনি যে বিজেপি'র কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের উপর এখনও আস্হাশীল তাও প্রকাশ পায় তাঁর বক্তব্যে।ভিলেজ ভোটের ফলাফল প্রকাশের পর রাজ্যে রাজনৈতিক তৎপরতা বাড়বে।শহরে পুরভোটের বাঁশি বেজে যাবে। পাহাড়ে মথার তৎপরতা ভিন্ন গতি পাবে।ত্রিপাক্ষিক চুক্তি রূপায়নের জন্য তারা আরও সোচ্চার হবে।বলাই বাহুল্য তিপ্রা মথা ইতিমধ্যেই ত্রিপুরার এক বৃহৎ রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে।ত্রিপুরার ডান-বামের রাজনীতি যখন রাম-বামের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পর্যবসিত হল তখন থেকেই মথার প্রবল উত্থান। আগামী দিনে রাজ্য রাজনীতিতে তিপ্রা মথা কি ভূমিকা নেয় সেদিকেই নজর রাখছেন রাজনৈতিক ওয়াকিবহাল মহল!
আরও পড়ুন...