হাজার হাজার বাঙালি পরিবারের করুণ আর্তি : পেচারথলের মাটি থেকে শিকড় বাঁচানোর শেষ লড়াই
অসীম সরকার
September 26, 2026
পেছারথল শুধু একটি ব্লকের নাম নয়, এটি জাতি জনজাতির দীর্ঘ আশি বছরের সহাবস্থানের এক জীবন্ত দলিল। সেই দলিলের পাতা থেকেই আজ তিনশো তিনটি পরিবার তাদের ভিটেমাটির অধিকার সুনিশ্চিত করার জন্য রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর কাছে এক আবেদন জানিয়েছে। তাদের এই আবেদন কোনো বিরোধিতা নয়, কোনো দাবির বিরুদ্ধে দাবি নয়, এটি তাদের অস্তিত্বকে বাঁচিয়ে রাখার এক করুণ আর্তি।
পেছারথলের বুকে বাঙালিদের বসতি আজকের নয়। দেশভাগের অনেক আগে থেকেই এই মাটিতে সাহা, নাথ, দাস, দেবনাথ, কাপালী পদবীর মানুষজন বসবাস করে আসছে। পেছারথল বাজার, মাছমারা বাজার, নালকাটা বাজার, রামগুনা বাজারের প্রতিটি দোকান, প্রতিটি রাস্তা তার সাক্ষী। পেছারথল ব্লকের প্রায় প্রতিটি গ্রাম পঞ্চায়েত যেমন উত্তর মাছমারা, দক্ষিণ মাছমারা, নালকাটা, নবীনছড়া, করাইছড়া, রামগুনা, বাগাইছড়া, অন্ধারছড়া, ধনিছড়া থেকে শুরু করে কৃষ্ণটিলা, শান্তিপুর, নারায়ণপুর, লক্ষ্মীপুরের মতো পাড়ায় পাড়ায় বাঙালি ও জনজাতি মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বসবাস করছে ১৯৪৭ সালের দেশভাগ থেকে শুরু করে ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা পর্যন্ত দীর্ঘ সময় ধরে।
তারা যে এই মাটিরই ভূমিপুত্র, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো এখানকার রাজনৈতিক ইতিহাস। ১৯৮৩ সালের বিধানসভা নির্বাচনে এই পেছারথল কেন্দ্র থেকেই বাঙালি সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে নির্দল প্রার্থী হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন রত্নপ্রভা দাস। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটিই প্রমাণ করে যে পেছারথল চিরকালই একটি মিশ্র জনপদ ছিল। আজও এই পেছারথল কেন্দ্রের নির্বাচিত এমডিসি মঞ্জুরানী সরকার, তিনি মাছমারা এলাকারই বাসিন্দা এবং কাপালী সম্প্রদায় অর্থাৎ বাঙালি সমাজের প্রতিনিধি। ফলে বাঙালিদের এই এলাকায় বসবাস কোনো নতুন বা অবৈধ অনুপ্রবেশ নয়, এটি আশি বছরের এক ঐতিহাসিক সত্য।
সমস্যার সূত্রপাত হয় ১৯৭৯ সালের পর। ওই বছর ত্রিপুরা উপজাতি এলাকা স্বশাসিত জেলা পরিষদ আইন পাশ হয় এবং ১৯৮২ সালের ১৫ জানুয়ারি পরিষদ গঠিত হয়। পরে ১৯৮৪ সালের ২৩ আগস্ট ৪৯তম সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে ১৯৮৫ সালের ১লা এপ্রিল থেকে এই পরিষদকে ষষ্ঠ তফসিলের মর্যাদা দেওয়া হয়। এর ফলে রাজ্যের প্রায় ৬৮ শতাংশ ভূমি অর্থাৎ ৭১৩২ বর্গ কিলোমিটার এলাকা পরিষদের অধীনে চলে যায়। আবেদনকারীদের অভিযোগ, এই সীমানা নির্ধারণ ছিল সম্পূর্ণ অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে করা, যেখানে ৩০ শতাংশ মানুষের জন্য ৭০ শতাংশ জমি বরাদ্দ করা হয়। এই অবৈজ্ঞানিক ভাগাভাগিই আজকের ভূমিকে কেন্দ্র করে স্থায়ী জটিলতার মূল কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই জটিলতা আরও গভীর হয়েছে ত্রিপুরা ভূমি রাজস্ব ও ভূমি সংস্কার আইন ১৯৬০ এর কারণে। এই আইনের ১৮৭ ধারা অনুযায়ী কোনো জনজাতি ব্যক্তি তার জমি জেলা শাসকের লিখিত অনুমতি ছাড়া অ-জনজাতি ব্যক্তির কাছে বিক্রি করতে পারবে না। ১৯৯৪ সালে আরও কঠোর ১৮৭বি ধারা যোগ করা হয়, যেখানে স্পষ্ট বলা হয়েছে ১৯৬৯ সালের ১লা জানুয়ারির পর যদি কোনো জনজাতির জমি বেআইনিভাবে হস্তান্তর হয়ে থাকে তবে সরকার তা উদ্ধার করে আসল মালিককে ফিরিয়ে দেবে। এই আইন জনজাতিদের জমি রক্ষার জন্য অত্যন্ত জরুরি এবং প্রয়োজনীয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো যারা ১৯৬৯ সালের বহু আগে থেকে বৈধ কাগজে জমি কিনে সত্তর আশি বছর ধরে বসবাস করছেন তাদের কী হবে। যদি নতুন করে আরও কঠোর ভূমির অধিকার আইন আসে তাহলে কি তাদের ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করা হবে। বিগত দিনে হাজার হাজার অ-জনজাতি মানুষ তাদের ভিটেমাটি ফেলে অন্যত্র শ্রমিকের জীবন যাপন করতে বাধ্য হয়েছে, সেই আতঙ্কই আজ পেছারথলবাসীকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে।
তাই পেছারথলবাসীর এই আবেদনে কোনো হিংসা নেই, কোনো বিদ্বেষ নেই। তারা তাদের আবেদনপত্রে স্পষ্ট লিখেছে, কেউ যদি তার অস্তিত্ব বা স্বার্থের প্রশ্নে ভূমির অধিকার পায়, সেটা তার মৌলিক অধিকার, তাতে অন্যের হিংসা থাকা উচিত নয়। তারা কারো বিরোধিতা করছে না, তারা শুধু নিজেদের অধিকারটুকু চাইছে। তাদের দাবি অত্যন্ত পরিষ্কার, জনজাতিদের ভূমির অধিকার সুনিশ্চিত করার পাশাপাশি সত্তর আশি বছর ধরে বসবাসকারী বাঙালি ও অন্যান্য অ-জনজাতিদেরও ভূমির অধিকার সুনিশ্চিত করা হোক। যদি স্বশাসিত জেলা পরিষদ এলাকার ভেতরে তা সম্ভব না হয়, তবে ভারত সরকার যেন তাদের অন্যত্র পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করে ভূমির অধিকার দেয়। এই তিনশো তিনটি স্বাক্ষর শুধু একটি আবেদন নয়, এটি আশি বছরের সম্প্রীতির ইতিহাসকে বাঁচিয়ে রাখার এক আকুতি, এটি তাদের শিকড়কে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকার শেষ চেষ্টা।
আরও পড়ুন...