২০২৬ এডিসি ভিলেজ কমিটি নির্বাচন: পাহাড়ের নিয়ন্ত্রণ ও অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই
সঞ্জয় রায়
September 25, 2026
ত্রিপুরা ট্রাইবাল এরিয়াস অটোনমাস ডিস্ট্রিক্ট কাউন্সিল (TTAADC)-এর অধীন ভিলেজ কমিটিগুলির বহু প্রতীক্ষিত নির্বাচন আগামী ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ অনুষ্ঠিত হতে চলেছে। প্রায় এক দশক পর অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই নির্বাচনে মোট ৫৮৭টি ভিলেজ কমিটি, ২,৬৩৪টি নির্বাচনী এলাকা এবং ৪,৫৯৭টি আসন রয়েছে। এর মধ্যে ৫২টি উন্নয়ন ব্লকের আওতায় থাকা এলাকায় ভোটগ্রহণ হবে। প্রায় ৯ লক্ষ ৬১ হাজার ৯৭৭ জন ভোটার—৪,৮২,০৪১ জন পুরুষ, ৪,৭৯,৯৩০ জন মহিলা এবং ০৬ জন তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার—এই নির্বাচনে ভোট দেবেন। মোট ১,৫৫০টি ভোটকেন্দ্রে সকাল ৭টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ হবে। ভোট গণনা হবে ৫ অক্টোবর। এই ভিলেজ কমিটিগুলি মূলত এডিসি এলাকার তৃণমূল স্তরের স্থানীয় প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান। এডিসি এলাকার বাইরে যেমন গ্রাম পঞ্চায়েত রয়েছে, তেমনই উপজাতি এলাকায় ভিলেজ কমিটিগুলি স্থানীয় শাসনব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ফলে এই নির্বাচন শুধু কয়েকটি গ্রামের স্থানীয় নির্বাচন নয়; এর মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলি উপজাতি অধ্যুষিত অঞ্চলের একেবারে তৃণমূল স্তরে নিজেদের সাংগঠনিক শক্তিরও পরীক্ষা দিতে চলেছে।
সর্বশেষ ভিলেজ কমিটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে। নির্বাচিত কমিটিগুলির মেয়াদ শেষ হয় ২০২১ সালের ৮ মার্চ। কিন্তু কোভিড-১৯ অতিমারি এবং পরবর্তী বিভিন্ন আইনি জটিলতার কারণে সময়মতো নির্বাচন করা সম্ভব হয়নি। ফলে প্রায় দশ বছর পর এবার নির্বাচন হচ্ছে। এই দীর্ঘ ব্যবধানের কারণে ২০২৬-এর নির্বাচনকে শুধু আর একটি স্থানীয় নির্বাচন হিসেবে দেখলে পুরো বিষয়টি বোঝা যাবে না। গত এক দশকে ত্রিপুরার রাজনৈতিক মানচিত্রে যে বড় পরিবর্তন ঘটেছে, এই নির্বাচন তারই একটি গুরুত্বপূর্ণ তৃণমূল পরীক্ষা। ২০১৬ সালের পরিস্থিতিও ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। সে সময় বামফ্রন্ট ৫৮৭টির মধ্যে ৫২০টি ভিলেজ কমিটি দখল করেছিল। আইপিএফটি ২৫টি, আইএনপিটি ২০টি, কংগ্রেস ৯টি এবং বিজেপি ৪টি কমিটি পেয়েছিল।
জোটের হিসাব ও তৃণমূল স্তরের বাস্তব চিত্র
দশ বছর পর সেই রাজনৈতিক সমীকরণ আমূল বদলে গেছে। এবারের নির্বাচনের অন্যতম উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হল বিজেপি, তিপ্রা মথা এবং আইপিএফটি-র বৃহত্তর রাজনৈতিক সমঝোতা। রাজ্য রাজনীতিতে এই দলগুলি এনডিএ-র শরিক। মুখ্যমন্ত্রী মানিক সাহা জানিয়েছেন যে তিনটি দল একসঙ্গে ভিলেজ কমিটি নির্বাচনে লড়বে এবং আসন সমঝোতা নিয়ে রাজ্য ও তৃণমূল স্তরে আলোচনা হয়েছে। চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা অনুযায়ী তিপ্রা মথাই সবচেয়ে বেশি সংখ্যক আসনে প্রার্থী দিয়েছে। মনোনয়ন প্রত্যাহারের পর চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা অনুযায়ী তিপ্রা মথা ২৭৩১টি আসনে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে এবং ১৫৪৮টি আসনে তাদের প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হয়েছেন (সব মিলিয়ে ৪২৭৯টি আসনে তাদের প্রাধান্য রয়েছে)। নির্বাচনে সরাসরি ভোটে মোট প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী প্রার্থীর সংখ্যা ৯,৮২০ জন। এর মধ্যে দলীয়ভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী প্রার্থীর সংখ্যা হলো: তিপ্রা মথা—২৭৩১, সিপিআই(এম)—২১৫১, বিজেপি—১৮৫৩, কংগ্রেস—৪২৫, আইপিএফটি—৩৫৬ এবং অন্যান্য/নির্দল—৭৫৬ জন।
এই নির্বাচনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হল ভোটের আগেই বিপুল সংখ্যক আসনের ফল নির্ধারিত হয়ে যাওয়া। ১,৬৩০টি আসন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নিষ্পত্তি হয়। এর মধ্যে তিপ্রা মথা ১,৫৪৮টি এবং বিজেপি ৮২টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হয়েছে। অর্থাৎ ২৮ সেপ্টেম্বর ভোট হবে ২,৯৬৭টি আসনে। হিসাব করলে দেখা যায়, মোট আসনের প্রায় ৩৫.৫ শতাংশ আসন ভোটগ্রহণের আগেই নির্ধারিত হয়ে গেছে। বাকি প্রায় ৬৪.৫ শতাংশ আসনে ভোটাররা তাঁদের পছন্দের প্রার্থী বেছে নেওয়ার সুযোগ পাবেন। তবে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়কে সরাসরি ভোটার সমর্থনের পরিমাপক হিসেবে দেখা যায় না; কারণ ওই আসনগুলিতে ভোটারদের সামনে একাধিক প্রার্থীর মধ্যে বেছে নেওয়ার সুযোগই থাকছে না। পশ্চিম ত্রিপুরা জেলায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত আসনের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য—প্রায় ৫৯৫টি আসন, যার মধ্যে ৫৭৪টি তিপ্রা মথা এবং ২১টি বিজেপি পেয়েছে বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা থেকে দেখা যাচ্ছে, এই রাজনৈতিক সমঝোতা সর্বত্র সম্পূর্ণ আসন সমঝোতায় পরিণত হয়নি। বেশ কিছু আসনে বিজেপি, তিপ্রা মথা এবং আইপিএফটি-র প্রার্থীরা পরস্পরের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। অর্থাৎ, রাজ্য স্তরে রাজনৈতিক জোট থাকলেও স্থানীয় স্তরে প্রতিযোগিতা পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি।
পাহাড়ের জনভিত্তি ও এনডিএর কৌশলগত সমীকরণ
২০২৬-এর নির্বাচনে তিপ্রা মথা একটি বিশেষ অবস্থানে রয়েছে। তিপ্রা মথা তুলনামূলকভাবে নতুন রাজনৈতিক শক্তি হলেও গত কয়েক বছরে ত্রিপুরার উপজাতি রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে উঠে এসেছে। এবার ভিলেজ কমিটি নির্বাচনে তাদের বিপুল সংখ্যক প্রার্থী এবং বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয় সেই সাংগঠনিক বিস্তারেরই একটি দিক তুলে ধরেছে। ১,৫৪৮টি আসনে ইতিমধ্যেই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয় তিপ্রা মথাকে নির্বাচনের শুরুতেই একটি উল্লেখযোগ্য অবস্থানে নিয়ে গেছে। তবে আসল রাজনৈতিক পরীক্ষা হবে সেই ২,৯৬৭টি আসনে, যেখানে ভোটাররা সরাসরি ভোট দেবেন। জোটের প্রধান শরিক দলের এই দুর্বলতা সম্পর্কে 'তিপ্রা মথা' ভালোভাবেই অবগত। তাই আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের কথা মাথায় রেখে, তারা এই এডিসি ভিলেজ কমিটি নির্বাচনকে নিজেদের জনভিত্তি যাচাইয়ের একটি ক্ষেত্র হিসেবে দেখছে এবং এতেই সর্বশক্তি নিয়োগ করছে। 'মথা' নেতাদের বক্তব্যে ভিলেজ কমিটি নির্বাচনের চেয়ে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের ওপরই বেশি জোর দেওয়া হচ্ছে। শুধুমাত্র উপজাতি-কেন্দ্রিক বিষয়গুলোর মধ্যে নিজেদের বক্তব্য সীমাবদ্ধ না রেখে, উপজাতি ও অ-উপজাতি—উভয় সম্প্রদায়ের সম্মিলিত স্বার্থের কথা যেভাবে 'মথা' নেতারা বলতে শুরু করেছেন, তাতে একটি বিষয় স্পষ্ট: তারা ২০২৮ সালের বিধানসভা নির্বাচনের জন্য নিজেদের স্বাধীন শক্তি সুসংহত করার দিকেই মনোযোগ দিচ্ছে। তা না হলে, ভিলেজ কমিটি নির্বাচনের প্রচারে '২০২৮'-এর প্রসঙ্গটি উঠে আসত না।
'তিপ্রা মথা'-র অভিযোগ হলো, জোটের প্রধান শরিক হওয়া সত্ত্বেও বিজেপি জোটের নীতি বা শিষ্টাচার মানছে না। তারা এনডিএ (NDA)-র কথা বলে ঠিকই, কিন্তু কাজের বেলায় জোটের অন্য দুই শরিক দলের বিরুদ্ধে প্রার্থী দাঁড় করিয়ে নিজেরাই জোটের শর্ত ভঙ্গ করছে। পাহাড়ি এলাকায় 'তিপ্রা মথা'-র আধিপত্য নিয়ে কারও কোনো সন্দেহ নেই। বিশেষ করে, 'বুবাগরা' প্রদ্যোত কিশোরের গ্রহণযোগ্যতা সেখানে অপ্রতিদ্বন্দ্বী। তাঁর আবেগঘন ভাষণ আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে উল্লেখযোগ্যভাবে আকৃষ্ট করে চলেছে। এর বিপরীতে, পাহাড়ি অঞ্চলে আইপিএফটি বা বিজেপির 'জনজাতি মোর্চা'-র প্রভাব খুব একটা উল্লেখযোগ্য নয়।
ঐতিহাসিকভাবে, ত্রিপুরায় বিজেপির সাংগঠনিক শক্তি মূলত বাঙালি-প্রধান সমতলভূমি এবং এডিসি এলাকার কিছু নির্দিষ্ট অংশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। ২০২৬ সালের ১২ এপ্রিলে অনুষ্ঠিত টিটিএএডিসি (TTAADC) জেলা পরিষদ নির্বাচনে ২৮টি আসনের মধ্যে তিপ্রা মথা ২৪টি আসনে জয়লাভ করে এবং বিজেপি মাত্র ৪টি আসনে নেমে আসে। এর ফলে পাহাড়ি এলাকায় বিজেপি নিজেদের সীমাবদ্ধতা ও সাংগঠনিক চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠে। তাই উপজাতীয় এলাকায় সম্মানজনক অবস্থান ধরে রাখা এবং আগামী ভিলেজ কমিটির নির্বাচনে শোচনীয় পরাজয় এড়ানোর লক্ষ্যে ‘তিপ্রা মথা’-র সাথে জোটবদ্ধ আলোচনার কৌশলগত পথ গ্রহণ করা হয়েছে, বিশেষজ্ঞদের মতামত। তবে, এই কৌশলটি মূলত বুমেরাং হয়েছে। তৃণমূল স্তরে তিপ্রা মথার ব্যাপক প্রভাবের কারণে অনেক বুথেই বিজেপি প্রার্থীরা কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন এবং প্রচারের গতি বাড়াতে হিমশিম খাচ্ছেন। আগরতলায় দলীয় সদর দপ্তরে বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব উচ্চপর্যায়ের কৌশলগত বৈঠক চালিয়ে গেলেও, পাহাড়ি এলাকায় তাদের প্রচার কার্যক্রম জোটসঙ্গী তিপ্রা মথার প্রাণবন্ত প্রচার-যন্ত্রের তুলনায় বেশ মন্থর। পাহাড়জুড়ে জোরদার প্রচার অভিযানের প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও, স্থানীয় প্রতিবেদন অনুযায়ী—কিছু সাম্প্রতিক উদ্যোগ ছাড়া— প্রচারণার গুরুত্বপূর্ণ দিনগুলোতেও মাঠপর্যায়ে কার্যত কোনো তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না। জোটের শৃঙ্খলা বজায় রাখা কিংবা বিদ্রোহী প্রার্থীদের নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষেত্রে দলের ব্যর্থতা তাদের দুর্বল অবস্থানকে প্রকট করে তুলেছে। পাহাড়ি এলাকার এই নির্বাচনে বিজেপি যদি খারাপ ফলাফল করে, তবে দলের কৌশলবিদ ও রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা যে, এর নেতিবাচক প্রভাব উৎসবের মরসুমের ঠিক পরেই অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া পৌরসভা নির্বাচনেও পড়তে পারে।
বিরোধী দলগুলির ভুমিকা ও অবস্থান
অন্যদিকে ২০১৬ সালের তুলনায় এবারের নির্বাচনে সিপিআই(এম) সম্পূর্ণ ভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থানে রয়েছে। দশ বছর আগে বামফ্রন্ট ভিলেজ কমিটিগুলিতে অত্যন্ত শক্তিশালী ছিল। সমকালীন রিপোর্ট অনুযায়ী, তারা ৪,৫৯৭টি আসনের মধ্যে ৩,৮৩৮টি আসন জিতেছিল। এরপর ত্রিপুরার রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে। বিজেপির উত্থান, বামফ্রন্টের সাংগঠনিক দুর্বলতা এবং উপজাতি এলাকায় তিপ্রা মথার উত্থান আগের রাজনৈতিক সমীকরণকে অনেকটাই বদলে দিয়েছে। তবে এবারের নির্বাচনে সিপিআই(এম) ২১৫১ আসনে প্রার্থী দিয়েছে। এর ফলে দলটি তৃণমূল স্তরে তার সাংগঠনিক উপস্থিতি ধরে রাখার চেষ্টা করছে বলেই বোঝা যায়। অবশ্য কতগুলি আসনে প্রার্থী দেওয়া হয়েছে এবং কতগুলি আসনে জয় এসেছে—এই দুটি বিষয় এক নয়। প্রার্থীর সংখ্যা সাংগঠনিক বিস্তারের একটি ইঙ্গিত দিতে পারে, কিন্তু জনগণের প্রকৃত সমর্থনের পরিমাণ বোঝা যাবে নির্বাচনের ফলাফলের পরেই।
এরই মধ্যে, সিপিআই(এম)-এর নেতৃত্ব প্রশ্ন তুলেছেন যে, যারা এডিসিই ঠিকমতো চালাতে পারছে না, তাদের 'গ্রেটার তিপ্রা-ল্যান্ড'-এর শাসনভার পরিচালনার দাবি করার কোনো অধিকার বা ভিত্তি নেই। সিপিআই(এম)-এর ধারাবাহিক দাবি হলো, এডিসি এলাকার মানুষের দৈনন্দিন সমস্যা ও অনুন্নয়ন এবং নাগরিক সুযোগ-সুবিধার বিষয়গুলো সমাধানে 'মথা'-র নেতৃত্ব পুরোপুরি ব্যর্থ। জোটবদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও তিনটি দলের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়ার যে চরম অভাব রয়েছে—তা তৃণমূল স্তরেই স্পষ্ট। তৃণমূল স্তরে দৃশ্যমান এই সমন্বয়ের অভাবকে রাজনৈতিক ইস্যু হিসেবে তুলে ধরতে সিপিআই(এম) কোনো কসুর ছাড়ছে না। সিপিআই(এম) নেতারা এই জোটকে 'স্বার্থান্বেষী সুবিধাবাদীদের জোট' আখ্যা দিতেও দ্বিধা করেননি। নির্বাচনের মাত্র এক সপ্তাহ আগে কোনো রাজনৈতিক জোট ( এনডিএ) যদি ঐক্যবদ্ধভাবে প্রচার চালাতে ব্যর্থ হয়, তবে নির্বাচনী ফলাফলের ওপর তার প্রভাব নিঃসন্দেহে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কংগ্রেস মাত্র ৪২৫টি আসনে প্রার্থী দিলেও তারা প্রধানত ২০২৮ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পটভূমি তৈরিতে এবং আঞ্চলিক অস্তিত্ব রক্ষায় মনোযোগ দিচ্ছে। অন্যদিকে, অন্যান্য দল ও নির্দল প্রার্থী মাঠে থাকায় শাসক জোটের ভোট কাটাকাটিতে স্থানীয় ও আঞ্চলিক ফ্যাক্টর হিসেবে তারা বেশ কিছু আসনে প্রভাব ফেলতে পারে।
ফলাফলের রাজনৈতিক তাৎপর্য ও উপসংহার
এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল, ভিলেজ কমিটি নির্বাচনের ফলাফল বিজেপি ও তিপ্রা মথার পারস্পরিক রাজনৈতিক সম্পর্কের ওপর কী প্রভাব ফেলবে। দুই দল বৃহত্তর রাজনৈতিক ক্ষেত্রে জোটসঙ্গী হলেও তাদের রাজনৈতিক ইতিহাস ও সাংগঠনিক ভিত্তি এক নয়। তিপ্রা মথার বিশেষ শক্তি উপজাতি এলাকায়, অন্যদিকে বিজেপি গত কয়েক বছরে সমগ্র ত্রিপুরায় তার রাজনৈতিক ভিত্তি প্রসারিত করেছে। এই কারণে জোটের অংশীদার হওয়া সত্ত্বেও কিছু আসনে তাদের মধ্যে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা যাচ্ছে। এটি দেখায় যে বৃহত্তর রাজনৈতিক জোটের সঙ্গে স্থানীয় স্তরের নির্বাচনী প্রতিযোগিতা একই সঙ্গে চলতে পারে। এডিসি এলাকার বিস্তীর্ণ ভৌগোলিক পরিসর এবং রাজনৈতিক গুরুত্বের কারণে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ২৮ সেপ্টেম্বরের ভোটে ১৫,০০০-এর বেশি কেন্দ্রীয় ও রাজ্য নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েনের কথা জানা গেছে।
সমসাময়িক রাজনৈতিক বিশ্লেষণে এই নির্বাচনটি বেশ কয়েকটি কারণে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। প্রথমত, প্রায় এক দশক পর এডিসি এলাকায় নির্বাচিত তৃণমূল প্রতিষ্ঠানগুলি নতুন করে গঠিত হতে চলেছে। দ্বিতীয়ত, ২০১৬ সালের পর ত্রিপুরার রাজনৈতিক মানচিত্রে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে এবং বামফ্রন্টের তৎকালীন আধিপত্য আজ আর একই অবস্থায় নেই। তৃতীয়ত, উপজাতি রাজনীতিতে তিপ্রা মথার উত্থান রাজনৈতিক সমীকরণকে ব্যাপকভাবে বদলে দিয়েছে। চতুর্থত, বিজেপি–তিপ্রা মথা–আইপিএফটি-র বৃহত্তর রাজনৈতিক সমঝোতা তৃণমূল স্তরে কতটা কার্যকর হয়, এই নির্বাচন তারও এক বড় পরীক্ষা। পরিশেষে, বিপুল সংখ্যক আসনে প্রার্থী দিয়ে সিপিআই(এম) এবং অন্যান্য বিরোধী দলগুলি তাদের তৃণমূল সংগঠন কতটা ধরে রাখতে পেরেছে, তারও একটি স্পষ্ট ধারণা এই ফলাফলে পাওয়া যাবে।
২০২৬-এর ভিলেজ কমিটি নির্বাচনকে তাই শুধুমাত্র একটি সাধারণ স্থানীয় নির্বাচন হিসেবে দেখলে ভুল হবে। দশ বছর পর অনুষ্ঠিত এই নির্বাচন ত্রিপুরার উপজাতি এলাকার পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ তৃণমূল পরীক্ষা। এই ফলাফল থেকে কয়েকটি মূল প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে—তিপ্রা মথা তার তৃণমূল সাংগঠনিক ভিত্তি কতটা সুসংহত করতে পেরেছে, বিজেপি তার রাজ্যব্যাপী রাজনৈতিক উপস্থিতিকে উপজাতি এলাকার গ্রামস্তরে কতটা বিস্তার করতে পেরেছে, সিপিআই(এম) তার পুরনো সাংগঠনিক শক্তির কতটা পুনরুদ্ধার করতে পেরেছে এবং বিজেপি–তিপ্রা মথা–আইপিএফটি জোট স্থানীয় স্তরে কতটা কার্যকরভাবে কাজ করতে পারে।
সেই অর্থে ৫ অক্টোবর গণনার দিনটি ২৮ সেপ্টেম্বর ভোটগ্রহণের দিনের চেয়েও বেশি রাজনৈতিক তাৎপর্য বহন করবে। কারণ বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয় মূলত সাংগঠনিক উপস্থিতি ও মনোনয়ন প্রক্রিয়ার ছবি তুলে ধরে; কিন্তু প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনের ফলাফলই ভোটারদের প্রকৃত পছন্দের তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরবে। অতএব, ২০২৬-এর ভিলেজ কমিটি নির্বাচন শুধু ৪,৫৯৭টি আসনের ফলাফল নয়—এটি গত এক দশকে ত্রিপুরার উপজাতি রাজনীতির যে পরিবর্তন ঘটেছে, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রতিফলনও হতে চলেছে।
আরও পড়ুন...