মেসোবাড়ির তিনতলার ভূত
মিনহাজুল হক, ষষ্ঠ শ্রেণী
September 24, 2026
অরিত্র গ্রাম থেকে নতুন কলকাতায় এসেছে কলেজে পড়তে। হাতে টাকা কম, তাই অনেক খুঁজে শ্যামবাজারে একটা একশো বছরের পুরোনো মেসোবাড়ির তিনতলায় একটা ঘর পেল। ভাড়া মাত্র দুই হাজার টাকা।
বাড়িওয়ালা চাবি দিতে দিতে বললেন, “শোনো বাবা, ওই ঘরটা পাঁচ বছর ধরে তালা বন্ধ, একটু ঝেড়ে মুছে নিও। রাতে একটু আওয়াজ-টাওয়াজ হলে ভয় পেয়ো না, পুরোনো বাড়ি তো।”
অরিত্রর একটু সন্দেহ হলো, কিন্তু সস্তায় ঘর ছাড়লো না। প্রথম দিন ঘর পরিষ্কার করতে গিয়ে সে দেওয়ালে একটা নাম দেখলো, পেন্সিল দিয়ে লেখা — “সৌম্য, ২০১৮, JEE” আর একটা তাক ভর্তি পুরোনো ফিজিক্স, কেমিস্ট্রির বই।
প্রথম রাত দুইটার সময় অরিত্রর ঘুম ভেঙে গেল। দেখল তার টেবিলের সব বই কেমন সুন্দর করে সাজিয়ে রাখা, খাতা এলোমেলো করে কেউ যেন কিছু লিখেছে। দ্বিতীয় রাতে সে স্পষ্ট শুনল কেউ ফিসফিস করে অঙ্ক বোঝাচ্ছে— “sin theta র সূত্র... E ইকুয়াল টু mc স্কয়ার...” অরিত্র ভয়ে চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়ল। তৃতীয় রাতে সে সাহস করে বলল, “কে ওখানে?” হঠাৎ উত্তর এলো, টেবিলের খাতাটা নিজে নিজে খুলে গেল আর একটা পেন উঠে লিখল— “আমি সৌম্য।”
পরদিন অরিত্র বাড়িওয়ালার কাছে গেল। বাড়িওয়ালা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “সৌম্য খুব গরিব ঘরের ছেলে ছিল। এখানেই থেকে JEE পড়ত, দিনরাত আলো নিভাত না। ২০১৮ সালে পরীক্ষার ৭ দিন আগে জ্বরে মারা যায়। তারপর থেকে কেউ এই ঘরে এক মাসের বেশি থাকতে পারে নি, সবাই বলে রাতে কেউ পড়ায়, কাঁদে।”
সেদিন রাতে অরিত্র আর ভয় পায় না। সে টেবিলে বই রাখল, নিজের অঙ্কের খাতা খুলে বলল, “সৌম্য, তুমি যদি পারো আমাকে একটু সাহায্য করো, আমারও সামনে পরীক্ষা।” অমনি ঘরটা উজ্জ্বল আলোয় ভরে উঠল, বই-খাতাগুলো নিজে নিজে উল্টাতে লাগল। তারপর থেকে তারা দুজনে পড়া শুরু করল। দিনে অরিত্র পড়ত, রাতে সৌম্য তাকে নোট দিয়ে সাহায্য করত, ভুল হলে মাঝে মাঝে লাল কালি দিয়ে দাগিয়ে দিত।
পরীক্ষার আগের রাতে খাতায় লেখা ছিল— “আমার স্বপ্নটা তুমি পূরণ করে দিও ভাই, আমি এবার যাই।” পরীক্ষায় অরিত্র পাশ করল, এখন সে IIT তে পড়ে, কিন্তু আজও প্রতি বছর সে সেই তিনতলায় গিয়ে একটা মোমবাতি জ্বালিয়ে আসে। কারণ সে জানে, কিছু ভূত ভয় দেখাতে আসে না, তারা তাদের অসমাপ্ত স্বপ্ন অন্য কারো মাধ্যমে পূরণ করতে আসে।
আরও পড়ুন...