নজর এখন ভিলেজ ভোট ও পুর ভোটের দিকে
পান্নালাল রায়
September 23, 2026
ত্রিপুরার আসন্ন উপজাতি স্বশাসিত জেলাপরিষদ এলাকার ভিলেজ ভোট ঘিরে রাজ্যে রাজনৈতিক তৎপরতা বর্তমানে তুঙ্গে উঠেছে।এদিকে নভেম্বরের শেষ সপ্তাহ নাগাদ রাজ্যে সম্ভাব্য পুরভোটের প্রস্তুতিও শুরু হয়ে গেছে।২০২৮ সালে অনুষ্ঠিতব্য রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনের আগে রাজ্য-রাজনীতির গতি প্রকৃতি বোঝার জন্য মানুষ ভিলেজ ভোট ও পুর ভোটের দিকে গভীর আগ্রহের সঙ্গে তাকিয়ে আছেন।
আসন্ন ভিলেজ ভোটে বিজেপি ও তিপ্রা মথার মধ্যে জোট হলেও তৃণমূল স্তরে এই জোট কতটা কার্যকর হবে তা নিয়ে রাজনৈতিক ওয়াকিবহাল মহলের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে। অবশ্য দুই দলের শীর্ষ স্তরের নেতাদের মধ্যে বৈঠকের পর বৈঠক হচ্ছে জোট কার্যকর করার জন্য । এর মধ্যে বিরোধীদল সিপিএম জনজাতি অধ্যুষিত এলাকায় মাটি ফিরে পেতে লড়াই'র ময়দানে অবতীর্ণ হয়েছে।তিপ্রা মথা ও বিজেপি'র সঙ্গে তারা কতটা লড়াই দিতে পারে সেদিকে তাকিয়ে রয়েছে সবাই।
উল্লেখ করা যায় যে,ত্রিপুরার রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের জন্য জনজাতি অধ্যুষিত এলাকার ভোট খুবই গুরুত্বপূর্ণ। রাজ্য বিধানসভার ৬০টি আসনের মধ্যে ২০টি আসন জনজাতি সংরক্ষিত।এক সময় এই ২০টি আসনে সিপিএম তথা বামেদের আধিপত্য ছিল। ২০১৮ সালের বিধানসভা ভোটে এই অবস্থার পরিবর্তন ঘটে।শোচনীয় ভাবে তারা হেরে যায় ভোটে।ক্ষমতাসীন হয় বিজেপি জোট। এরপর থেকে জনজাতি এলাকায় সিপিএম আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি।বর্তমানে ত্রিপুরার জনজাতি ভিত্তিক আঞ্চলিক দল তিপ্রা মথার প্রায় একচ্ছত্র আধিপত্য রয়েছে রাজ্যের জনজাতি অধ্যুষিত এলাকায়।উপজাতি জেলাপরিষদ অর্থাৎ এডিসি-তে তারা ক্ষমতাসীন।বিধানসভাতেও তাদের ১৩ জন বিধায়ক রয়েছেন।তারা শাসক জোটেরও শরিক।তাই বলা যায় বর্তমানে ত্রিপুরার রাজনীতিতে সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে তিপ্রা মথা।মথা সুপ্রিমো প্রদ্যোত কিশোর রাজ্য রাজনীতিতে এক নির্ণায়ক ভূমিকা নিতে চাইছেন যাতে জনজাতি অংশের মানুষের দাবি দাওয়া আরও সহজ ভাবে পূরণ করা যায়।ত্রিপুরার রাজনীতির গতি প্রকৃতি দেখে এমনটাই ধারণা হয় যে,তিপ্রা মথা তাদের লক্ষ্য থেকে খুব একটা দূরে নেই। তাই এবার ভিলেজ ভোটে জোট গঠনের ক্ষেত্রেও দৃশ্যত বিজেপি-কেই বেশি আগ্রহী মনে হয়েছে।গত এডিসি'র ভোটে মথা ও বিজেপি'র মধ্যে জোট না হওয়াতে বিজেপি'র ফলাফল খারাপ হয়েছে বলা যায়।জেলাপরিষদ অর্থাৎ এডিসি'র ২৮টি আসনের মধ্যে তিপ্রা মথা পেয়েছে ২৪টি আসন এবং বিজেপি পেয়েছে মাত্র ৪ টি আসন। ভিলেজ ভোটে যাতে এ ধরণের ফলাফলের পুনরাবৃত্তি না ঘটে সে জন্য জোটের জন্য বিজেপি-কেই এগিয়ে আসতে দেখা গেছে।শেষপর্যন্ত ত্রিপাক্ষিক চুক্তি পূরণে মথার দাবিকে কিছুটা মান্যতা দিয়ে দিল্লি বৈঠকে জোট গঠন করা হয়েছে।কিন্তু জোট হলেও তৃণমূল স্তরে সেই জোট কতটা কার্যকরী হবে এটাই হচ্ছে প্রশ্ন!
রাজ্যে ৫৮৭ টি ভিলেজ কমিটির জন্য ৪,৫৯৭ টি আসন রয়েছে।কিন্তু এর মধ্যে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ১,৬৩০টি আসনের প্রার্থীরা জয়লাভ করেছেন।এর মধ্যে তিপ্রা মথার রয়েছে ১,৫৪৮ এবং বিজেপি'র ৮২ টি আসন।অর্থাৎ এই আসনগুলোতে অন্য দলের প্রার্থীরা মনোনয়নপত্র পেশ করেন নি।তাহলে দেখা যাচ্ছে ভোটের আগেই এক বৃহৎ সংখ্যক আসনের ফলাফল নির্দ্ধারিত হয়ে গেল।আগামী ২৮ সেপ্টেম্বর ভিলেজ কমিটির মাত্র ২,৯৬৭টি আসনে ভোট গ্রহণ হবে।লড়াই'র ময়দানে প্রার্থীর সংখ্যাতেও দেখা যাচ্ছে অন্যদের চেয়ে অনেক এগিয়ে আছে তিপ্রা মথা।তাদের প্রার্থী রয়েছেন ২,৭৩১জন,বিজেপি'র ১,৮৫৩, সিপিএম'র ২,১৫১, কংগ্রেসের ৪২৫,আইপিএফটি'র ৩৫৬ এবং নির্দল সহ অন্যদের রয়েছেন ৭৫৩ জন প্রার্থী। যে আসন গুলোতে নির্বাচন হচ্ছে তার মধ্যে তিপ্রা মথার পরেই রয়েছে সিপিএম। বিজেপি'র চেয়েও তাদের প্রার্থী সংখ্যা বেশি,যা কিনা ভোটের আগেই শাসকদলের উপর একটা চাপ সৃষ্টি করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।যদি ভিলেজ ভোটে সিপিএম সামান্য হলেও সুবিধা করতে পারে তা হলে রাজ্যের পুরভোটেও সেটা তাদের পক্ষে অসামান্য প্রভাব ফেলবে। আসলে তিপ্রা মথা ও বিজেপি'র মধ্যে জোট সমীকরণের অন্যতম রসায়ন হচ্ছে দু'দলেরই প্রবল সিপিএম বিরোধিতা। বামেরা আবার পাহাড়ে শেকড় ছড়াক এটি তাদের কেউই চাইছে না।সিপিএম-কে তাই পাহাড়ে আজ মাটি কামড়ে লড়াই করতে হচ্ছে।যদিও তারা ক্ষমতাসীন দলের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ উত্থাপন করছে,তথাপি শেষপর্যন্ত নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও এই ভোটে তারা কতটা সফল হয় সেদিকে সকলের নজর রয়েছে।
জেলাপরিষদ এলাকার গ্রাম পাহাড়ের উন্নয়ন মূলক কাজ রূপায়নের ক্ষেত্রে ভিলেজ কমিটির এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকলেও ইতিপূর্বে এই ভোট নিয়ে রাজ্য রাজনীতিতে এমন তৎপরতা কিন্তু আগে পরিলক্ষিত হয়নি যেমনটা এবার হচ্ছে।এই ভোট ঘিরে এবারের মতো এমন কৌতুহল ও আলাপ আলোচনা ইতিপূর্বে দেখা যায়নি।ভিলেজ কমিটির ভোট এবার প্রায় এক দশক পর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।এমনকি এ জন্য মথাকে আদালতেরও দ্বারস্থ হতে হয়েছিল।শীর্ষ আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী শেষপর্যন্ত হতে যাচ্ছে এই নির্বাচন। একদিকে ভিলেজ কমিটি ভোটের জন্য মথার চাপ এবং অপরদিকে বিজেপি ও মথার মধ্যে সম্পর্কের টানাপোড়েন এই নির্বাচনকে আলোচনার কেন্দ্রে এনে দিয়েছিল আগেই। স্বাভাবিকভাবেই বিরোধীদল সিপিএম এবং কংগ্রেস এই সুযোগটা নিয়েছে।জোট সরকারের বিরুদ্ধে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তারা বারবার ভিলেজ ভোটের প্রসঙ্গ টেনে আনছে। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকারও অভিযোগ করেছেন,বিজেপি ভিলেজ ভোট এড়িয়ে যেতে চেয়েছিল। ভিলেজ ভোটের এক নির্বাচনী সভায় তিনি বলেছেন, দীর্ঘ দশ বছর পর আদালতের রায়ের ফলে বর্তমান সরকার এই নির্বাচন করতে বাধ্য হচ্ছে।প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বলেন,ভয় ভীতির কারণে সিপিএম অনেক আসনে প্রার্থী দিতে পারেনি।অনেকে প্রার্থীপদ প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়েছে।তারপরও যারা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন তাদের জয়ী করার আহ্বান জানান তিনি।এদিকে বিজেপি'ও রাজ্যের জনজাতি অধ্যুষিত এলাকায় ভিলেজ ভোট ঘিরে তাদের তৎপরতা সংহত করছে।ভিলেজ কমিটির ভোট ঘিরে তারা বিভিন্ন স্তরে সাংগঠনিক বৈঠক করে চলেছে।
তবে বিগত এডিসি ভোটের মতো ভিলেজ ভোটেও যে তিপ্রা মথা অন্যদের তুলনায় অনেক এগিয়ে আছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তারা প্রায় এক তৃতীয়াংশ আসনে জয়লাভ করেছে।এবার যে আসন গুলোতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে তার মধ্যে বিভিন্ন দলের সম্ভাবনা নিয়ে আলাপ আলোচনা চলছে।আর বিজেপি ও মথার জোট তৃণমূল স্তরে কতটা কার্যকর হয় তা নিয়েও চলছে আলাপ আলোচনা,চলছে রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ।অবশ্য দু'দলের নেতৃবৃন্দ তৃণমূল স্তরে জোট কার্যকর করার জন্য চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। শেষপর্যন্ত তাদের উদ্যোগ কতটা সফল হ ল তা আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই স্পষ্ট হবে।তবে বিভিন্ন এলাকা থেকে রাজনৈতিক উত্তেজনার খবরাখবর আসছে।আসছে শরিকী সংঘর্ষের খবরও।সম্প্রতি ধনপুরের কাইচ্ছাখলা এডিসি ভিলেজ এলাকায় বিজেপি ও মথার সংঘর্ষে উভয় দলের কয়েকজন কর্মী আহত হয়েছেন বলে জানা যায়।এ রকম ঘটনা যে আরও ঘটছে না বা আর ঘটবে না তা মোটেই নিশ্চিত করে বলা যায় না।একদিকে তৃণমূল স্তরে সর্বত্র জোট কার্যকর করা যেমন মথা ও বিজেপি উভয়ের কাছে একটা চ্যালেঞ্জ, তেমনই সিপিএম তথা বামেদের মোকাবিলা করাও তাদের কাছে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।পাহাড়ে এই ভোটের মাধ্যমে সিপিএম ঘুরে দাঁড়াতে চাইছে।নিছক হারজিত বা ভিলেজ কমিটি দখলই নয়,এই ভিলেজ ভোটের ফলাফল রাজ্যের আসন্ন পুরভোটের আগে এক বড় বার্তাও দেবে। তাই ক্ষমতাসীন বা বিরোধী দল সকলের কাছেই ভিলেজ ভোট খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
আরও পড়ুন...