পুস্তক পর্যালোচনা- "গানের রাজা সুরের রাজপুত্র"-বাংলা সাহিত্যের এক অনবদ্য উপাখ্যান
সমর চক্রবর্তী
September 20, 2026
"আগরতলার আকাশে মেঘ জমেছে।ঋতুর নাম বর্ষা,তাই বর্ষণ তো হতেই পারে। সূর্য ধীরে ধীরে হেলে পড়ছে পশ্চিমে।গাছগাছালির মাথায় ফড়িং উড়ছে।কোথাও পাখনা মেলছে প্রজাপতি।কখনো মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে একঝাঁক পাখি।মোরাম বিছানো সড়কে কোনো ব্যস্ততা নেই।যেন হেলেদুলে গজেন্দ্র গমনে চলেছে দু- চারজন পথচারী।সড়কে যানবাহনের দেখা নেই।সে এক অনন্য আগরতলা। নিস্তরঙ্গ আগরতলা।সাত-আট দশক প্রায় শতাব্দী আগেকার আগরতলা।
কিন্তু এই সড়ক ধরে হেঁটে যাচ্ছেন কে?উজ্জ্বল গাত্রবর্ণ।চেহারায় রাজকীয় গাম্ভীর্য।রাজপথে এ কার দৃপ্ত পদচারণা?কে তিনি?,,,,দিন কয়েক আগে কুমিল্লা থেকে আগরতলার বাড়িতে এসেছেন তিনি। হ্যাঁ,তিনি রাজপুরুষ।কর্তা।
শচীন কর্তা। পরবর্তী কালে তিনিই হয়ে উঠেছিলেন দেশখ্যাত এস ডি বর্মণ"। তর তর করে একের পর এক অধ্যায় পড়ছিলাম আর ভাবছিলাম- এটি কি কোন আখ্যান মঞ্জরী,না কোন এক চেনা ছন্দের কাব্য সংকলন- বলা মুশকিল।তবে নির্দিধায় এটা বলা যায় এ এক অনন্য ও অনবদ্য এবং বাংলা সাহিত্যের এক সমৃদ্ধ আখ্যান বা উপাখ্যান পর্ব বলা যেতেই পারে।
"গানের রাজা- সুরের রাজপুত্র"-উপমহাদেশের দুই কিংবদন্তী পিতা- পুত্রের মোহময়ী তাল-লয় ও সুরের রাজকীয় সংস্কৃতির জীবনবোধকে নিয়ে যে সাহিত্য ঘরাণার বিভিন্ন অধ্যায়ে ভাগ করে একে পাঠকের দরবারে একেবারে প্রাঞ্জল ভাষায় রূপ দেয়া যায়- তা এই "গানের রাজা,সুরের রাজপুত্র" পুস্তক খানি হাতে না পেলে বুঝতেই পারতাম না।রাজ্য তথা উত্তর পূর্বাঞ্চলের বিশিষ্ট কথা সাহিত্যিক ও কবি- লেখক পান্নালাল রায়ের লেখা এই বইখানা ২০২৫ সালে লন্ডনের একটি সংস্হার উদ্যোগে প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল।ত্রিপুরার মতো জায়গা থেকে কোন লেখকের একটি অনবদ্য সাহিত্য সম্ভার লন্ডনের মতো একটি সংস্হার হাত ধরে তার আত্মপ্রকাশ করার বিষয়টি অত্যন্ত গৌরবের বিষয়।তাই,এই সমৃদ্ধ পুস্তকটির প্রতি একটা বাড়তি আগ্রহ অবশ্যই ছিল।শেষ পর্যন্ত বাংলা প্রকাশনা জগতের প্রথম সারির প্রকাশন সংস্হা- পারুল প্রকাশনীর তরফ থেকে পুস্তকটি পেয়ে অত্যন্ত মন ও হৃদয় দিয়ে বইটি পড়লাম।
শচীন দেববর্মণ ও রাহুল দেববর্মণ।পিতা যদি গানের রাজা হন,পুত্র তবে সুরের রাজপুত্র।ত্রিপুরার গৌরব উভয়েই।ভারতের গৌরব তো বটেই।
২০৬ পাতায় ৫৩ টি অধ্যায়ে বিভক্ত এই পুস্তক সম্ভারের প্রতিটি অধ্যায়ে শচীন কর্তার ছোটবেলা থেকে সঙ্গীতের উচ্চ শিখরে পৌঁছা এবং সেইসাথে বাংলা ও হিন্দি গানের কবে কখন কোথায় কোন অবস্হানে কোন পরিবেশে একের পর এক শচীন কর্তার অমর সৃষ্টির অকপট কাহিনীগুলোকে এক জীবন্ত উজ্জ্বল রূপ দিয়ে লেখক পান্নালাল রায় পাঠকের মনি কোঠায় অবলীলায় আবারো স্হান করে নিয়েছেন-বলা যায়।
গোটা পুস্তকটিকে সমৃদ্ধতর করে তুলতে লেখক পান্নালাল রায় যে কঠোর পরিশ্রম করে তাকে পাঠকের দরবারে তুলে ধরেছেন- এতে দুই কিংবদন্তী শিল্পীর জীবন আলেখ্যই শুধু প্রাধান্য পায়নি, পাশাপাশি তৎকালীন সময়কার আগরতলা- কুমিল্লা- কোলকাতা ও মুম্বাইয়ের মধুর চরিত্রগুলোও জীবনবোধের মধ্য দিয়ে চিত্রায়িত হবার সুযোগ ঘটেছে বলা যায়।
আগরতলা ও কোলকাতার ঐতিহ্যবাহী প্রকাশনা সংস্হার একটি সমৃদ্ধ প্রকাশন সংস্হা- পারুল প্রকাশনী সংস্হাকেও অজস্র প্রশংসা জানাতেই হয়- এ ধরণের একটি সমৃদ্ধ ও মনোমুগ্ধকর পুস্তক প্রকাশ করিয়ে পাঠকের সামনে হাজির করার জন্য।
বইটির মলাট সজ্জা, প্রচ্ছদ অলংকরণ, ঝকঝকে ও নির্ভুল এবং অনিন্দ্যসুন্দর ছাপা বা অক্ষর বিন্যাস সেইসাথে প্রাঞ্জল ও তথ্য সমৃদ্ধ লেখনী দিয়ে পুস্তকটিকে
যে উচ্চতায় নেওয়া হয়েছে,সে তুলনায় পুস্তক মূল্য যথেষ্ট কমই রাখা হয়েছে।মাত্র- ৩৮০ টাকা। সকল স্তরের পাঠকের কাছে গ্রন্থটিকে পৌঁছে দিতে পারুল প্রকাশনীর এই চিন্তাচেতনার প্রশংসা করতেই হয়।
সবশেষে বলবো-প্রকাশন সংস্হার কর্মকর্তারা উত্তরপূর্বাঞ্চলের বিশিষ্ট লেখক- যার হাত ধরে ইতিমধ্যে ৫৪ টির উপর গ্রন্থ প্রকাশিত হয়ে গেছে,এমন লেখককে দিয়ে রাজ্য তথা দেশের দুই কৃতি সন্তান- এসডি ও আর ডি বর্মণের মতো দুই কিংবদন্তীর এক অনন্য উপাখ্যানের আত্মপ্রকাশ ঘটানো।লেখক পান্নালাল রায়ের লেখনীর সহজাত বৈশিষ্ট্য হল-সহজ-সরল গদ্যে জটিল বিষয়ের উপস্হাপনাই তার কলমের একমাত্র প্রধান বৈশিষ্ট্য।
"গানের রাজা সুরের রাজপুত্র"গ্রন্থখানি বাংলা সাহিত্যের এক অনবদ্য ও ঐতিহাসিক সৃষ্টিশীল দলিল হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।আর রাজ্য ও দেশের মনি কোঠায় সুরের জগতের দুই কিংবদন্তীকে নিয়ে যে উপাখ্যান রচিত হয়েছে- তা এর আগে এমনভাবে একই ফ্রেমে হাতের নাগালে পেয়ে যাবো- এটা কখনো ভাবা যায়নি।এই পুস্তকের সব চেয়ে বড় পাওনা তৎকালীন সময়ের অনেক অমূল্য সম্পদের স্হির চিত্রগুলো।এই ছবিগুলো লেখনীর সাথে দারুণ প্রাণবন্ত ও জীবন্ত রূপ পেয়ে গেছে বলা যায়।
তাই-স্যালুট জানাতেই হয় এই পুস্তকের লেখক পান্নালাল রায় ও প্রকাশন সংস্হার পারুল প্রকাশনীকে।
আরও পড়ুন...