ষষ্ঠ তফসিল-এর অধীন ত্রিপুরার এডিসি-কে ডাইরেক্ট ফান্ডিং ও জমির অধিকার প্রদানের সুযোগ সীমিত।

জয়ন্ত দেবনাথ

September 13, 2026

ত্রিপুরার উপজাতি জনগোষ্ঠীর ভূমির অধিকার, রাজনৈতিক অধিকার, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, পরিচয়, সংস্কৃতি ও ভাষার প্রশ্নে ২ মার্চ ২০২৪-এ ভারত সরকার, ত্রিপুরা সরকার এবং দ্য ইন্ডিজিনিয়াস প্রোগ্রেসিভ রিজিওন্যাল এলায়েন্স বকলমে তিপ্রা মথার মধ্যে স্বাক্ষরিত ত্রিপাক্ষিক চুক্তির বাস্তবায়ন ইস্যুতে ত্রিপুরা জুড়ে একটি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। চুক্তিতে এই বিষয় গুলির সমাধানের জন্য একটি যৌথ কার্যদল/কমিটি (Joint Working Group/Committee)-এর মাধ্যমে পারস্পরিক ভাবে সম্মত বিষয় গুলি সময় নির্দিষ্ট ভাবে বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু দুই বছর অতিক্রান্ত হবার পরেও এখন পর্যন্ত চুক্তির শর্ত যথাযথ বাস্তবায়ন হয়নি। এডিসির ভিলেজ কাউন্সিল ভোটের মুখে গত ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ-এর সাথে বৈঠকে নাকি আগামী এক মাসের মধ্যে এডিসিকে সরাসরি অর্থ প্রদান ও জমির অধিকার প্রদানের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। দিল্লীতে অমিত শাহ-র সাথে বৈঠক করে এসে তিপ্রামথার ফাউন্ডার প্রদ্যুত কিশোর ও বিধায়ক রঞ্জিত দেববর্মা একথা বলেছেন। তাই প্রশ্ন উঠেছে, এই প্রতিশ্রুতি ও এই চুক্তির সব শর্ত এত দ্রুত ও সরাসরি বাস্তবায়ন সম্ভব কিনা? ত্রিপুরার ষষ্ঠ তফসিল ও সংবিধান বিশেষজ্ঞদের অনেকের সাথে আমি এই বিষয়ে কথা বলেছি। তাদের প্রত্যেকেরই বক্তব্য - ত্রিপুরার উপজাতীয় এলাকা (Tribal Areas)-এর সাংবিধানিক কাঠামো ভারতের সংবিধানের ষষ্ঠ তফসিল এর অধীনে পরিচালিত হয়। ষষ্ঠ তফসিলে ত্রিপুরার উপজাতি এলাকা স্বায়ত্তশাসিত জেলা পরিষদের সাংবিধানিক যে ভিত্তি রয়েছে তাতে সরাসরি এডিসিকে অর্থ প্রদান কিংবা জমির ভাগ, বন্টন, হস্তান্তরের পূর্ন অধিকার দেওয়ার কোন সুযোগ আপাতত নেই।

ভারতের সংবিধান প্রণয়নের আগে ভূমি ও ভূমি সংস্কার বা রাজস্ব সংক্রান্ত কোন সুনির্দিষ্ট আইন রাজ্য ভিত্তিক বা সর্বভারতীয় ভিত্তিক ছিল বলে আমার জানা নেই। তবে জমিদারী ও তালুকদারি প্রথার প্রচলন ছিল বলে জানা যায়। সংবিধান প্রণয়নের পর ভূমি রাজস্ব, ভূমি সংস্কার, ভূমি বিলি বন্টন ইত্যাদি সম্পূর্ন বিষয় সংবিধানের সপ্তম তপশিলের স্টেট লিস্টের ৪৫ নম্বর আইটেমে রাজ্য তালিকাভুক্ত বিষয় বলে বর্নিত হয়। যেহেতু ভূমি ও ভূমি সংক্রান্ত যাবতীয় বিষয় রাজ্যের অধিকারভুক্ত তাই ত্রিপুরার ভূমি রাজস্ব, ভূমি সংস্কার আইন ১৯৬০ ভারতের পার্লামেন্ট কর্তৃক পাশ করা হয়। কারন ত্রিপুরা রাজ্য ওই সময় কেন্দ্র শাসিত অঞ্চল ছিল। এই আইনে এবং তৎ সম্বন্ধীয় নিয়মাবলীতে ভূমি রাজস্ব, ভূমি সংস্কার, ভূমির বিলি বন্টন ইত্যাদি বিষয় সুষ্ঠুভাবে বর্ণিত হয় এবং প্রয়োগে আনা হয়। এই আইন প্রণয়নের পর ত্রিপুরার ভূমির তালুকদারি প্রথা বিলুপ্ত করা হয়। তালুকদারদের অধীন যেসব কৃষক বা জমির মালিকানা কৃষক বা ভাগচাষী অথবা যারা তালুকদারদের খাজনা দিয়ে জমির ভোগ দখল করতেন তাদের রায়ত হিসাবে গন্য করা হয়।

এটাও বলা আবশ্যক যে ত্রিপুরা ভূমি রাজস্ব ও ভূমি সংস্কার আইন সংবিধানের ৩১-এর বি ধারা মোতাবেক নবম তপশীলে বর্ণিত হয়ে এই আইনের সম্পূর্ন বিধান গুলিকে ভেলিডেট করা হয়। এটা মনে রাখা প্রয়োজন যে এই আইন ত্রিপুরা রাজ্যের ভূমি ও ভূমি সংক্রান্ত সমস্ত বিষয়ে সারা রাজ্যে প্রযোজ্য।

ত্রিপুরা উপজাতি স্বশাসিত জেলা পরিষদ পরবর্তীকালে ১৯৮৫ সালে গঠিত হয় এবং ষষ্ঠ তপশিলের তিন নং অনুচ্ছেদ (Paragraph) অনুযায়ী ভূমি সংক্রান্ত কিছু বিষয় আইন করার ক্ষমতা দেওয়া হয়। এই আইন প্রণয়নের ক্ষমতা কোন অবস্থাতেই পার্লামেন্ট কর্তৃক পাশ হওয়ায় ত্রিপুরা ভূমি রাজস্ব ও ভূমি সংস্কার আইন ১৯৬০ এর পরিপন্থী বা বিরোধক হতে পারেনা। এটা মনে রাখা প্রযোজ্য যে ১৯৬০ সালের আইন প্রয়োগে আসার পর যারা রায়ত হিসাবে ভূমির বিলি বন্টন প্রাপ্ত তাদেরকে কোন ভাবেই বিঘ্ন করা সম্ভব নয়। এছাড়া এডিসি এলাকাতেও ভূমির মধ্যে রিজার্ভ ফরেস্ট বা প্রোটেক্টেড ফরেস্ট –এর বিষয়েও কোন প্রকারের আইন প্রণয়ন সম্ভব নয়। এর বাইরে খাস জমি যদি কিছু থাকে তার বিলি বন্টন যা ১৯৬০ এর আইন অনুযায়ী করা হয়নি এই বিষয়ে বিলি বন্টন করতে পারে। তবে এক্ষেত্রেও ষাট ইংরেজি সনের মূল আইনের সঙ্গে যেসকল বিধি বা নিয়মাবলী প্রস্তুত হয়েছে এবং যে অনুযায়ী খাস জমির বিলি বন্টন হয়, তাহা সুনির্দিষ্ট ভাবে প্রয়োগে আনা অবশ্যম্ভাবী। মুখে মুখে বলে দিলেই ভূমির উপরে অধিকার জন্মাতে পারে না। এতে বিস্তর আইনী জটিলতা এবং মামলা মোকদ্দমার সৃষ্টি হতে বাধ্য।



এডিসি-কে ডাইরেক্ট ফান্ডিং দিতে সরকার কী করতে পারে ?

সংবিধানের ষষ্ঠ তফশিলভুক্ত জেলা পরিষদ-কে স্বশাসনের নামে ডাইরেক্ট ফান্ডিং এর কোন সুবিধা আইনে নেই। তাই ত্রিপক্ষীয় চুক্তি (Tripartite Agreement)-এর অর্থনৈতিক উন্নয়ন (economic development) অংশ বাস্তবায়নের জন্য একটি সম্ভাব্য আইনসম্মত কাঠামো হতে পারে—এডিসি-র জন্য নির্দিষ্ট, স্বচ্ছ ও পৃথক উপজাতি উন্নয়ন কর্মসূচি (tribal development package/programmes) এবং নির্দিষ্ট প্রকল্পের ভিত্তিতে নির্দিষ্ট কাজের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ বছর ভিত্তিক (earmarked funds) প্রদান করা। ত্রিপুরা সরকারের উপজাতি কল্যাণ (Tribal Welfare) দপ্তরের মাধ্যমে বর্তমান ব্যবস্থাতেও (Article 275(1))-এ সংক্রান্ত নির্দেশিকাতে বিভিন্ন আর্থিক কর্মসূচি ইতিমধ্যে রয়েছে। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনগত সীমা বদ্ধতা রয়েছে। ত্রিপুরা সরকার নিজের ক্ষমতায় কেন্দ্রের অর্থকে “সেন্ট্রাল ডাইরেক্ট ফাউন্ডিং” (“Central Direct Funding”) হিসেবে ঘোষণা করতে পারে না। কেন্দ্র থেকে সরাসরি অর্থ ত্রিপুরার উপজাতীয় এলাকা স্বায়ত্তশাসিত জেলা পরিষদে যাবে কি না, তা কেন্দ্রীয় সরকার (Union Government)-এর অর্থ বরাদ্দ, প্রকল্পের নির্দেশিকা, প্রযোজ্য সাংবিধানিক বা বিধিবদ্ধ বিধানাবলি এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক প্রক্রিয়া (administrative mechanism)-এর ওপর নির্ভর করবে।

ত্রিপাক্ষিক চুক্তিতে কথিত ত্রিপুরার ট্রাইবেল কালচার বা সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য- ত্রিপুরা সরকার আইনসম্মত ভাবে আদিবাসী সংস্কৃতি (indigenous culture)-এর জন্য পৃথক সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, জাদুঘর, সংগ্রহশালা, গবেষণা কেন্দ্র ও ঐতিহ্যবাহী শিল্পকলা প্রচারের কর্মসূচি এবং বার্ষিক সাংস্কৃতিক অনুদান দিতে পারে। ত্রিপুরা সরকারের নিজস্ব প্রশাসনিক কাঠামোতেও উপজাতি গবেষণার জন্য একটি ট্রাইভাল রিসার্চ ইনস্টিটিউট রয়েছে। যার মাধ্যমে এডিসি-র মানুষের জন্য বিশেষভাবে এই কাজটি করা যেতে পারে। আর উপজাতি অংশের বিভিন্ন ভাষার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো— এডিসি-এর প্রাথমিক শিক্ষা এবং প্রাথমিক বিদ্যালয় (primary schools)-এ ভাষার ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা এডিসি প্রশাসনের হাতে সম্পূর্নভাবে প্রদান করা যেতে পারে। অর্থাৎ আদিবাসী ভাষা (indigenous languages)-এর মান উন্নয়নে প্রাথমিক শিক্ষা, পাঠ্যবই তৈরি, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, অভিধান ও ব্যাকরণগত দক্ষতা উন্নয়ন, ডিজিটাল বিষয়বস্তু এবং সরকারি সাংস্কৃতিক নথি সংরক্ষণের মতো ব্যবস্থা সম্পূর্ন ভাবে এডিসি প্রশাসনের হাতে দেওয়া যেতে পারে। এটি ত্রিপক্ষীয় চুক্তি (Tripartite Agreement)-এর ভাষা ও পরিচিতি (language and identity) সংক্রান্ত প্রতিশ্রুতিকে বাস্তব রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ হতে পারে।



রাজনৈতিক অধিকারের ক্ষেত্রে কী করা সম্ভব?

কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, বিধানসভা বা লোকসভায় আসন বৃদ্ধি বা পুনর্বিন্যাস, নতুন সাংবিধানিক সংস্থা সৃষ্টি বা নির্বাচনী কাঠামোর বড় পরিবর্তন শুধু রাজ্য সরকারের নির্বাহী আদেশ (executive order)-এর মাধ্যমে করা যাবে না। এর জন্য সংশ্লিষ্ট সাংবিধানিক ও আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে এবং কিছু ক্ষেত্রে সংসদে বা সাংবিধানিক ধারা সংশোধনের প্রয়োজন হতে পারে।

অন্যদিকে এডিসি-র প্রশাসনিক ক্ষমতা, আর্থিক ক্ষমতা, গ্রাম-পর্যায়ের প্রতিষ্ঠানসমূহ (village-level institutions) এবং ষষ্ঠ তফশিলের বিদ্যমান কাঠামো (existing Sixth Schedule framework)-এর মধ্যে কিছু উন্নতি রাজ্য আইন, নিয়ম বা প্রশাসনিক ব্যবস্থার মাধ্যমে রাজ্যপাল-এর অনুমোদনক্রমে করা যেতে পারে যেই সুবিধা সংবিধানের আর্টিকেল ৩৭১-এ বিধিবদ্ধ আছে। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো ত্রিপুরাকে কি অনুচ্ছেদ ৩৭১ (Article 371)-এর মতো বিশেষ ব্যবস্থা দেওয়া সম্ভব কিনা ?

ভারতীয় সংবিধানের ৩৭১ ধারা:

ভারতীয় সংবিধানের ৩৭১ ধারা এবং এর বিভিন্ন উপধারা (Article 371 to 371-J) দেশের কয়েকটি রাজ্যের বিশেষ সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করে বিশেষ সাংবিধানিক ব্যবস্থা প্রদান করেছে। এই বিধান গুলোর মূল উদ্দেশ্য হলো সংশ্লিষ্ট রাজ্য বা অঞ্চলের স্থানীয় সংস্কৃতি, প্রথা, ভূমির অধিকার, শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং সুষম আঞ্চলিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা।

এই বিধান গুলো সংবিধানের Part XXI- Temporary, Transitional and Special Provisions-এর অন্তর্ভুক্ত। তবে ৩৭১ ধারার অধীনে থাকা সব রাজ্যের জন্য একই ধরনের বিশেষ সুবিধা প্রযোজ্য নয়। প্রতিটি রাজ্যের ঐতিহাসিক ও আঞ্চলিক প্রয়োজন অনুযায়ী আলাদা আলাদা সাংবিধানিক ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।



সংবিধানের ৩৭১ ধারার আওতায় কোন কোন রাজ্য?

৩৭১ থেকে ৩৭১-জে পর্যন্ত বিভিন্ন উপধারার আওতায় বর্তমানে মোট ১২টি রাজ্য বিশেষ সাংবিধানিক ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত। এগুলি হলো- মহারাষ্ট্র, গুজরাট, নাগাল্যান্ড, আসম, মণিপুর, অন্ধ্রপ্রদেশ, তেলেঙ্গানা, সিকিম, মিজোরাম, অরুণাচল প্রদেশ, গোয়া এবং কর্ণাটক। এই তালিকায় ত্রিপুরার নাম নেই।

তবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই রাজ্য গুলির প্রত্যেকটির ক্ষেত্রে বিশেষ ব্যবস্থার প্রকৃতি এক নয়। কোথাও স্থানীয় প্রথা ও আইন রক্ষার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কোথাও ভূমি ও সম্পদের অধিকার, আবার কোথাও শিক্ষা, সরকারি চাকরি বা আঞ্চলিক উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

সংবিধানের ৩৭১ ধারা কি কোনও রাজ্যকে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন দেয়?

এখানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন। ৩৭১ ধারা কোনও রাজ্যকে ভারতের বাইরে বা সংবিধানের ঊর্ধ্বে কোনও বিশেষ স্বায়ত্তশাসন দেয় না।

এটি ভারতীয় সংবিধানের কাঠামোর মধ্যেই বিশেষ ব্যবস্থা প্রদান করে। কোথাও স্থানীয় প্রথা ও আইনকে সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে, কোথাও ভূমি ও সম্পদের অধিকার রক্ষা করা হয়েছে, আবার কোথাও শিক্ষা, সরকারি চাকরি বা আঞ্চলিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে বিশেষ ব্যবস্থা করা হয়েছে।

অর্থাৎ, ৩৭১ ধারার মূল দর্শন হলো—“একই দেশের মধ্যে বিভিন্ন অঞ্চলের বিশেষ বাস্তবতাকে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দিয়ে জাতীয় ঐক্যের সঙ্গে আঞ্চলিক স্বার্থের ভারসাম্য বজায় রাখা।”

অর্থাৎ বর্তমানে সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩৭১ (Article 371) ত্রিপুরার জন্য প্রযোজ্য নয়। ত্রিপুরার জন্য নতুন কোনও অনুচ্ছেদ বা বিদ্যমান সাংবিধানিক ব্যবস্থায় বিশেষ ব্যবস্থা তৈরি করতে হলে প্রয়োজন হতে পারে সংবিধান সংশোধন, যার জন্য সংসদে সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।

২ মার্চ ২০২৪-এর চুক্তি (Agreement)-এ বলা হয়েছে, ভারত সরকার, ত্রিপুরা সরকার এবং তিপ্রা মথা ত্রিপুরার আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ইতিহাস, ভূমি অধিকার, রাজনৈতিক অধিকার, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, পরিচয়, সংস্কৃতি এবং ভাষা (indigenous people-এর history, land rights, political rights, economic development, identity, culture এবং language) -সংক্রান্ত বিষয়গুলি সৌহার্দ্যপূর্ণভাবে সমাধান (amicably resolve) করবে। এরপর পারস্পরিকভাবে সম্মত বিষয়সমূহ (mutually agreed points) বাস্তবায়নের জন্য যৌথ কার্যদল/কমিটি (Joint Working Group/Committee) গঠনের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু জয়েন্ট ওয়াকিং গ্রুপ গত দুই বছরে এ লক্ষ্যে কিছুই করেনি। এখন এডিসি-র ভিলিজ কমিটির ভোটের মুখে তিপ্রামথার শীর্ষ নেতাদের দিল্লীতে ডেকে নিয়ে গিয়ে চুক্তির সব শর্ত আগামী এক মাসের মধ্যে মেনে নেওয়ার যে প্রতিশ্রুতি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী অমিত শাহ-র উপস্থিতিতে দেওয়া হয়েছে বলে তিপ্রামথার শীর্ষ নেতৃত্ব বলেছেন- বাস্তবে তার কোন সহজ রাস্তা দ্রুত বাস্তবায়নে যে নেই তা এরাজ্যের আইন বিশেষজ্ঞ অনেকের সাথে কথা বলে স্পষ্ট বোঝা গেছে।

ত্রিপুরার একাধিক আইন ও সংবিধান বিশেষজ্ঞের সাথে কথা বলে এটা স্পষ্টতই বোঝা গেছে যে, ভারতের সংবিধানই দেশের সর্বোচ্চ আইন। রাষ্ট্র পরিচালনার সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সংবিধানে বিস্তারিতভাবে নির্ধারিত রয়েছে। সংবিধান একই সঙ্গে আংশিক ভাবে কঠোর এবং আংশিকভাবে নমনীয়। কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারকে সংবিধানে নির্ধারিত নিজ নিজ সীমার মধ্যে থেকে কাজ করতে হয়। বহুদলীয় গণতন্ত্রে কখনও কখনও আঞ্চলিকতাবাদ, জাতপাত ও সাম্প্রদায়িক কারণে অস্থিরতার সৃষ্টি হতে পারে। এর ফলে জাতীয় ঐক্য ও গণতান্ত্রিক কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এদিকে লক্ষ্য রেখে ভারতের পঞ্চম ও ষষ্ঠ তফসিল সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৪৪ এবং ২৪৪(এ) তফসিলভুক্ত ও উপজাতীয় এলাকাগুলির প্রশাসন এবং সেখানকার মানুষের স্বার্থ সুরক্ষার জন্য বিশেষ কিছু সাংবিধানিক সুযোগ প্রদানের কথা বলা আছে। এই অনুযায়ী অনুচ্ছেদ ২৪৪-এর অধীনে পঞ্চম তফসিল এবং ২৪৪(এ)-এর অধীনে ষষ্ঠ তফসিলে উপজাতিদের জন্য বিশেষ কিছু সুবিধার কথা বলা আছে। এই দুই তফসিলকে সংবিধানের মধ্যে এক ধরনের বিশেষ সাংবিধানিক ব্যবস্থা হিসেবে দেখা হয়। তবে জেলা পরিষদ বা আঞ্চলিক পরিষদকে কেন্দ্র বা রাজ্য সরকারের সমপর্যায়ের সরকার হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। এগুলি স্থানীয় স্বশাসনের প্রতিষ্ঠান হিসাবে বিবেচিত হয়, যেমন গ্রাম পঞ্চায়েত, পঞ্চায়েত সমিতি, জেলা পরিষদ, নগর পঞ্চায়েত বা পৌরসভার মত। ফলে স্বশাসিত জেলা পরিষদ গুলির ক্ষমতা সংবিধান ও সংশ্লিষ্ট আইনের কাঠামোর মধ্যেই প্রয়োগ করতে হয়। তবে এটা ঠিক, ষষ্ঠ তফসিলের অনুচ্ছেদ ৩ স্বশাসিত জেলা পরিষদকে নির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর কিছু আইন প্রণয়নের ক্ষমতা দেয়। তবে এই ক্ষমতা সীমাহীন নয়। স্বশাসিত জেলা পরিষদ যে আইন প্রণয়ন করবে, তা সংবিধান এবং কেন্দ্র বা রাজ্যের আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারবে না। অন্যথায় সাংবিধানিক সংকট তৈরি হতে পারে। তবে এই আইন রাজ্যপালের ও মন্ত্রিসভার পরামর্শ ক্রমেই লাগু করতে হবে। অর্থাত ষষ্ঠ তফসিলের অনুচ্ছেদ ৩(৩) অনুযায়ী জেলা পরিষদের প্রণীত আইন রাজ্যপালের কাছে পাঠাতে হবে এবং রাজ্যপাল অনুমোদন করলে তা কার্যকর করতে হয়। তবে সংবিধান অনুযায়ী রাজ্যপালকে রাজ্যের মন্ত্রিসভার পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করতে হয়। তাই কোনও স্বশাসিত জেলা পরিষদ কোনও আইন প্রণয়ন করলে, সেই আইনের বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে রাজ্যপালের সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে মন্ত্রিসভার পরামর্শ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অর্থাৎ ত্রিপুরার ভূমি রাজস্ব আইন ১৯৬০-এর সংশোধন করে এডিসিকে জমির অধিকার ও সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে সরাসরি অর্থ বরাদ্দ পেতে হলে ঘুরিয়ে তা রাজ্য সরকার ও রাজ্যপালের অনুমোদন ক্রমেই এডিসির হাতে যাবে।



ভূমির ওপর স্বশাসিত জেলা পরিষদের আইন তৈরির ক্ষমতা

ষষ্ঠ তফসিলের অনুচ্ছেদ ৩(এ) স্বশাসিত জেলা পরিষদ-অধীন এলাকায় বসবাস, কৃষি এবং অন্যান্য অনুমোদিত কাজে ব্যবহারের জন্য জমি সংক্রান্ত বিষয়ে পরিষদকে আইন তৈরির ক্ষমতা প্রদান করে। কিন্ত এই আইনী ক্ষমতা ত্রিপুরার ভূমি সংস্কার আইন ১৯৬০ (TLR & LR Act)-এর অনুচ্ছেদ-১৪-এ নির্ধারিত ক্ষমতার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ হতে হবে। ত্রিপুরার ভূমি রাজস্ব আইন এবং সংশ্লিষ্ট বিধির মাধ্যমে রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে জমি বণ্টন ও ব্যবহারের একটি নির্দিষ্ট ব্যবস্থা রয়েছে। এই আইনী ব্যবস্থা জেলা পরিষদ-অধীনস্থ এলাকায় প্রয়োগ করার জন্যও প্রযোজ্য। অর্থাৎ টি এল আর এল আর এক্ট –এর সেকশন ১৪ এর বাইরে গিয়ে এডিসি-র হাতে সরাসরি জমির অধিকার রক্ষার নামে বিশেষ কোন সুবিধা প্রদানের সুযোগ নেই।



অর্থ ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা

কেন্দ্র, রাজ্য এবং স্থানীয় স্বশাসিত প্রতিষ্ঠান গুলির আর্থিক শৃঙ্খলাও সংবিধানের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত। সংবিধানের পার্ট-১২ (Part XII)-তে অর্থ, সম্পত্তি, কর প্রভৃতি বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। আইনের কর্তৃত্ব ছাড়া কোনও কর আরোপ করা যায় না। ষষ্ঠ তফসিল অনুযায়ী পরিষদ নির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর আইন করতে পারে। তবে কর, শুল্ক বা অন্যান্য রাজস্ব সংগ্রহের ক্ষেত্রে সংবিধান নির্ধারিত আর্থিক ব্যবস্থাই অনুসরণ করতে হবে। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৬৬ (Article 266) অনুযায়ী সংগৃহীত অর্থ এবং সরকারের প্রাপ্ত অনুদান নির্দিষ্ট সাংবিধানিক ও আইনি ব্যবস্থার মাধ্যমে রাজ্য সরকারের কোষাগারে (Consolidated Fund of State)-এ জমা হয় এবং আইন অনুযায়ী তা এডিসির কোষাগারে যায় এবং ব্যয় করা হয়। ষষ্ঠ তফসিলে এমন কোন অনুচ্ছেদ নেই যেখানে এডিসি-র হাতে সরাসরি অর্থ প্রদানের সুযোগ আছে। তাই ডাইরেক্ট ফান্ডিং ব্যবস্থা চালুর জন্যেও আপাতত কোন ব্যবস্থা নেই।

তাই এখন দেখার দিল্লির বৈঠকে এডিসিকে সরাসরি অর্থ প্রদান ও দ্রুত জমির অধিকার প্রদানের যে প্রতিশ্রুতি অমিত শাহ দিয়েছেন বলে তিপ্রামথার ফাউন্ডার প্রদ্যুৎ কিশোর ও তার দলের বিধায়ক রঞ্জিত দেববর্মা বলে বেড়াচ্ছেন কোন পথে রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকার সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন করেন। (লেখক- একজন সিনিয়ার সাংবাদিক ও ত্রিপুরাইনফো-র সম্পাদক)।

আরও পড়ুন...


Post Your Comments Below

নিচে আপনি আপনার মন্তব্য বাংলাতেও লিখতে পারেন।

বিঃ দ্রঃ
আপনার মন্তব্য বা কমেন্ট ইংরেজি ও বাংলা উভয় ভাষাতেই লিখতে পারেন। বাংলায় কোন মন্তব্য লিখতে হলে কোন ইউনিকোড বাংলা ফন্টেই লিখতে হবে যেমন আমার বাংলা কিংবা অভ্রো কী-বোর্ড (Avro Keyboard)। আমার বাংলা কিংবা অভ্রো কী-বোর্ডের সাহায্যে মাক্রোসফট্ ওয়ার্ডে (Microsoft Word) টাইপ করে সেখান থেকে কপি করে কমেন্ট বা মন্তব্য বক্সে পেস্ট করতে পারেন। আপনার কম্পিউটারে আমার বাংলা কিংবা অভ্রো কী-বোর্ড বাংলা সফ্টওয়ার না থাকলে নিম্নে দেয়া লিঙ্কে (Link) ক্লিক করে ফ্রিতে ডাওনলোড করে নিতে পারেন।

Free Download Avro Keyboard

Fields with * are mandatory





Posted comments

Till now no approved comments is available.