মথা নির্ভরশীলতায় রাজ্য বিজেপি আরো দুর্বল হবে
সমর চক্রবর্তী
September 7, 2026
২০২১ সালে বিগত পুরসভা নির্বাচনের আগে একদিন প্রয়াত বিজেপি নেতা তথা ত্রিপুরা বিধানসভার প্রাক্তন অধ্যক্ষ এবং রাজ্যের একজন বরীষ্ঠ রাজনৈতিক ব্যাক্তিত্ব বিশ্ববন্ধু সেনকে একটি ঘরোয়া ও ব্যাক্তিগত আলোচনাকালে আমি বলেছিলাম-এই যে পুরসভার ভোট আসছে,সেখানে আপনি ভোটটাকে অবাধ ও সুষ্ঠু হতে আপনার লোকেরা যাতে কোন ধরণের ভয়ভীতি বা কোন বাধার অভিযোগ না উঠে সে দিকটাতে লক্ষ্য নিলে ভালো হবে।অবাধ ভোট হলে- আপনি বুঝতে পারবেন-আপনার জনসমর্থনটা কোন জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে,যা আপনার পরবর্তী বিধানসভা ভোটে সেভাবে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করতে পারবেন।২০১৮ সালে তিনি প্রায় সাড়ে ৭ হাজার ভোটে বিধানসভা নির্বাচনে এই ধর্মনগর কেন্দ্র থেকে জয়লাভ করেছিলেন।আর ২০২১ সালের নভেম্বর মাসে পুরসভার ভোট হয়।
এবং বিরোধীদের তরফ থেকে পুরসভায় ভোটদানে ব্যাপক বাধা দানের অভিযোগ উঠে। পাশাপাশি ধর্মনগর পুরসভার ২৫ আসনের সকল আসনগুলো বিজেপির দখলে এল।
পুরসভা ভোটের দেড় বছরের মাথায় অর্থাৎ ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে যখন বিধানসভার ভোট হয়,তখন এই বিশ্ববন্ধু সেন মাত্র ১০৯২ ভোটে জয়লাভ করেন।
১৮ সালে সাড়ে ৭ হাজার ভোটে জয়।২১ সালে সকল পুরসভার আসন নিজেদের দখলে।আর ২৩ বিধানসভায় বলা যায় হারার মুখ থেকে রক্ষা পেয়ে যান তিনি।
এবারে আসি মূল আলোচ্য বিষয়ে।সেদিন যদি বিশ্ববন্ধু সেন একটু যাচাই করে নিতে পারতেন পুরসভা ভোটে মানুষের জনসমর্থনটা কোন অবস্হানে রয়েছে,তখন তিনি পরবর্তী কর্মসূচি বা জনগণের সমর্থন বাড়াতে তৎপর হতে পারতেন। এবং ২০২৩ এ ভোটের ফারাক অবশ্যই বাড়াতে পারতেন।
এবারে আসি মূল আলোচ্য বিষয়ে। গত ১৫ দিন যাবত রাজ্য রাজনীতিতে ক্ষমতাসীন বিজেপি দল তিপ্রামথার সাথে যেভাবে হত্যে দিয়ে শেষ পর্যন্ত দিল্লীতে গিয়ে মথা দলের নেতৃত্বের মানভঞ্জন ও বিশেষ চুক্তির বিষয়ে একপ্রস্থ পাকা কথা দিয়ে যেভাবে ভিলেজ ভোটে জোট করে নিলেন- এতে রাজ্য বিজেপি দলে যেন ভরা চৈত্রে অঝোরে বৃষ্টি নামার মতো একরাশ আনন্দ ভেসে এল দলের মধ্যে।
প্রশ্ন এক- নিজ দলের সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধি না করে,পাহাড়ে নিজেদের ব্যাপক জন সমর্থন বাড়াতে উদ্যোগ না নিয়ে শুধু ভোট এলেই ক্ষমতা ধরে রাখতে এভাবে আর কতদিন একটি আঞ্চলিক দলের কাছে বলা যায় একপ্রকার আত্মসমর্পণ করে চলা? ২৮ সেপ্টেম্বর ভিলেজ ভোটে মথা যেহেতু সমর্থন করছে- ধরে নেয়া যায়-মথা যেকটি আসন বিজেপিকে ছাড়বে- এতে বিজেপি জয়লাভ করবে। কিন্তু এই যে দয়া- দাক্ষিণ্য ও মথার সাহায্যে ওপরে ওপরে লোক দেখানো এগিয়ে যাবার বিষয়টি মূলতঃ নিজেদের সাংগঠনিক দুর্বলতাকে ভবিষ্যতে আরো বড় দুর্বলতায় ফেলে দেবেনা তো? এভাবে একটার পর একটা ভোট এলে আর বিভিন্ন শর্তের কাছে চাপের রাজনীতিতে পড়ে,জোটের রাজনীতি করতে করতে অপরদিকে যে সমতলের ভোট ব্যাঙ্কে ভয়ানক ফাটল দেখা দেবে না তো? ২০১৮ সালে গোটা রাজ্যের মানুষ বিজেপিকে যে ম্যান্ডেট দিয়ে ক্ষমতায় এনেছে- গত সাড়ে আট বৎসরে কেন পাহাড়ে নিজেদের সংগঠনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া গেল না?দিল্লীতে নিজেদের সরকার। রাজ্যে নিজেদের সরকার।তারপরেও শুধু শরীকের চাপ নিতে নিতে রাজ্য বিজেপি মূলতঃ নাজেহাল।
ত্রিপুরার ইতিহাসে একমাত্র বিজেপির শাসনকালে শরীক দলের চাপের কাছে এতটা নতি স্বীকার করে শাসন ক্ষমতা চালাতে এর আগে কোন সরকারকে দেখা যায়নি।যদিও বিজেপি দল বলার চেষ্টা করবে- এটা নতি স্বীকার নয়।এটা শরীক দলের সাথে জোট রাজনীতি।তবে একথা বলে মূল বিষয়টাকে কিন্তু চেপে রাখা যায়না।রাজ্যবাসী সবই লক্ষ্য করছে।
সে যাই হোক- তিন দলের জোটের খবর চাউর করে রাজ্য বিজেপির মন্ত্রী ও দলীয় নেতারা যেভাবে উল্লাস ও আত্মপ্রসাদ লাভ করছেন-এতে আগামী দিন পাহাড়ে রাজ্য বিজেপি আরো বেশী না দুর্বল এবং নির্ভরশীল রাজনীতির শিকার হয়ে পড়ছেন- সেটা ভবিষ্যতই ব্যাখ্যা দেবে।
রাজ্য বিজেপি যত বেশী মথা নির্ভরশীল দলে পরিণত হবে,তত বেশি সমতলের ভোট সমর্থন কিন্তু বিরোধীদের পালে বেড়ে যাবার সম্ভাবনা থাকছে।জোট করে ভিলেজ ভোটে রাজ্য বিজেপি পাশ করে গেলেও সিপিএম- কংগ্রেস যদি জোট করে আগামী পুরসভা ভোটে লড়াই দেয়- তাহলেই বিজেপি মালুম করতে পারবে,সমতলেও তাদের সত্যি অবস্থানটা কোন জায়গায় দাঁড়িয়ে রয়েছে।তাই,রাজ্য বিজেপিকে রাজ্যের মানুষের যথার্থ সার্বিক উন্নয়ন ও সেই সাথে দলের নিজেদের সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধি না করতে পারলে-সমস্যা কিন্তু আরো অনেক বাড়বে বই কমবে না।
আরও পড়ুন...