বঙ্গদর্শন : বঙ্কিমচন্দ্র , রবীন্দ্রনাথ ও ত্রিপুরা
পান্নালাল রায়
August 30, 2026
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগের বাংলা সাহিত্য তথা বাঙালির মননশীলতা নিয়ে আলোচনায় অন্যতম অবলম্বন বঙ্কিমচন্দ্রের 'বঙ্গদর্শন'। ১৮৭২ খ্রিস্টাব্দে বঙ্কিমচন্দ্রের সম্পদনায় প্রকাশিত হয়েছিল মাসিক সাহিত্য পত্রিকা 'বঙ্গদর্শন'।এই পত্রিকা প্রকাশের ঘটনাকে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন,"...বঙ্গভাষা সহসা বাল্যকাল হইতে যৌবনে উপনীত হইল।" পত্রিকা প্রকাশে বঙ্কিমচন্দ্রের উদ্দেশ্য ছিল ইংরেজি শিক্ষিত নব্য বাঙালিদের মধ্যে বঙ্গভাষা চর্চার প্রসার এবং সাধারণ বাঙালিদের সঙ্গে তাদের সংযোগ বৃদ্ধি।বলাই বাহুল্য এই উদ্যোগ সেদিন বাংলা সাহিত্য চর্চার ক্ষেত্রে আলোড়ন তুলেছিল। অবশ্য বঙ্কিমচন্দ্র চার বছর পর পত্রিকার সম্পাদনার ভার পরিত্যাগ করেন।১৮৭৮ খ্রিস্টাব্দে সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় 'বঙ্গদর্শন' আবার প্রকাশিত হয়।কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই পত্রিকাটির প্রকাশ অনিয়মিত হয়ে পড়ে।তার হৃত গৌরবও পুনরুদ্ধার সম্ভব হয়নি।১৮৮৩ খ্রিস্টাব্দে 'বঙ্গদর্শন' পত্রিকার প্রকাশ বন্ধ হয়ে যায়।এবার বিংশ শতাব্দীর শুরুতে পত্রিকাটির সম্পাদনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। রবীন্দ্রনাথ সম্পাদিত 'বঙ্গদর্শন' প্রসঙ্গে আলোচনায় ত্রিপুরার রাজা রাধাকিশোর মাণিক্যের নাম এসে পড়ে।আসে জগদীশচন্দ্র বসুর নামও।রাধাকিশোর 'বঙ্গদর্শন' প্রকাশের ব্যাপারেও রবীন্দ্রনাথকে সাহায্য করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন।
রবীন্দ্রনাথ কর্তৃক বঙ্গদর্শনের সম্পাদনার ভার গ্রহণ উপলক্ষ্যে পত্রিকার স্বত্বাধিকারী শ্রীশচন্দ্র মজুমদার লিখেছিলেন-"...রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মহাশয় বঙ্গদর্শনের সম্পাদনার ভার গ্রহণ করিতে স্বীকৃত হওয়ায় আমি নিশ্চিন্ত হইয়াছি।তিনি যে উপকার করিলেন তাহা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।" রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে সাময়িক পত্রের যোগাযোগ ছিল আগে থেকেই। অল্প কিছুদিনের জন্য এর আগে তিনি 'সাধনা' ও 'ভারতী' পত্রিকা সম্পাদনা করেছিলেন।এ ছাড়া অল্প বয়স থেকেই তিনি বিভিন্ন সাময়িক পত্রে লিখেছেন। রবীন্দ্রনাথ ১৯০১ থেকে ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত পাঁচ বছর 'নব পর্যায়-বঙ্গদর্শন' সম্পাদনা করেন। উল্লেখ্য, রবীন্দ্রনাথ সম্পাদিত পত্রিকাটির নামের আগে প্রথম থেকেই 'নব পর্যায়' লেখা ছিল। রবীন্দ্রনাথের সম্পাদনায় যখন 'বঙ্গদর্শন' প্রকাশিত হয় তখন বাংলা সাহিত্য জগতে আরও কিছু সাময়িক পত্রিকা ছিল। ফলে নব পর্যায়ে 'বঙ্গদর্শন'কে কিছুটা প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে হয়েছিল।একদিকে ছিল বঙ্কিমচন্দ্রের ঐতিহ্য বয়ে নিয়ে চলা এবং অপরদিকে আর্থিক প্রতিকূলতা।সেজন্য কবি ত্রিপুরার মহারাজার সহায়তার কথা ভেবেছিলেন বলে উল্লেখ পাওয়া যায়।আবার রাজ পারিষদবর্গের আপত্তির কথা শুনে রবীন্দ্রনাথ পত্রিকাটির জন্য রাজানুকূল্য গ্রহণের পথ থেকে পিছিয়ে আসেন বলেও জানা যায়।অবশ্য মহারাজ রাধাকিশোর যে 'বঙ্গদর্শন'-এর ব্যাপারে উৎসাহী ছিলেন এবং এ জন্য কবিকে সাহায্য করতে আগ্রহী ছিলেন তা জানা যায় কবিকে লেখা রাজার চিঠিতে।মহারাজা রবীন্দ্রনাথকে লিখেছিলেন-"...বঙ্কিমের বঙ্গদর্শনের পুনঃপ্রকাশের সংবাদ অতি সুসংবাদ। প্রসিদ্ধ লেখকদের উৎসাহ আরও সুসংবাদ। আমার মতে আপনি অগৌণে এবং অবিচারিত চিত্তে ইহার সম্পাদকীয় ভার গ্রহণ করুন এবং আমাকে কি কি করিতে হইবে বলুন। আমি সর্ব্বতোভাবে ইহার ভার গ্রহণ করিতে প্রস্তুত রহিলাম।..."
যাইহোক, বঙ্কিমচন্দ্র যখন 'বঙ্গদর্শন' সম্পাদনা করেন এবং রবীন্দ্রনাথ যখন নব পর্যায়ে এর দায়িত্বভার গ্রহণ করেন,এই দুই সময়কালে অনেক ফারাক। আগে লেখক কম ছিল,পাঠক কম ছিল। পরে দুটো ক্ষেত্রেই সংখ্যাবৃদ্ধি ঘটেছে।বেড়েছে সাময়িক পত্রের সংখ্যা।প্রতিযোগিতার পাশাপাশি নব পর্যায়ে 'বঙ্গদর্শন'কে সমালোচনার মুখেও পড়তে হয়েছে।সমসাময়িক পত্রিকায় এর কঠোর সমালোচনা হয়েছে। মূল অভিযোগ ছিল সাহিত্য ক্ষেত্রে বঙ্কিমচন্দ্রের আসন দখল নিয়ে।সমালোচকদের মতে তাঁর আসনে অন্য কারও বসার অধিকার নেই। সমালোচনার লক্ষ্য যে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন এটা বলার অপেক্ষা রাখে না।
বঙ্কিমচন্দ্র সম্পাদিত 'বঙ্গদর্শন'-এর মতো রবীন্দ্রনাথ সম্পাদিত নবপর্যায়ের 'বঙ্গদর্শন'ও প্রবন্ধ সাহিত্যের জন্য স্মরণীয় হয়ে আছে। সুবিখ্যাত প্রকাশন সংস্থা পারুল প্রকাশনী প্রকাশিত 'রবীন্দ্রনাথ সম্পাদিত বঙ্গদর্শন' নামে একটি গ্রন্থ সম্প্রতি হাতে এল যাতে রবীন্দ্রনাথের নবপর্যায়ের 'বঙ্গদর্শন' থেকে বেশ কিছু মূল্যবান প্রবন্ধ সংকলিত হয়েছে।গ্রন্থটি সম্পাদনা করেছেন পশ্চিমবঙ্গের বিশিষ্ট গবেষক লেখক অলোক রায়।গ্রন্হটির শুরুতেই তিনি 'বঙ্গদর্শন'-এর ইতিহাস, বঙ্কিমচন্দ্র ও রবীন্দ্রনাথের সম্পাদনাকালের সাহিত্য কর্ম,সাময়িক পত্র ইত্যাদি সবিস্তারে তুলে ধরেছেন। তাঁর এই মূল্যবান ভূমিকাটি থেকে তদানীন্তন সময়ের বাংলা সাহিত্য চর্চা সম্পর্কে একটা ধারণা করতে আমাদের সুবিধা হবে।বঙ্কিমচন্দ্র ও রবীন্দ্রনাথ, দুই সময়কালের 'বঙ্গদর্শন' নিয়ে আলোচনাকালে তিনি বাংলা সাহিত্যে পরিবর্তন, সাহিত্য রুচি ও সাহিত্য রীতি নিয়ে আলোকপাত করেছেন। দুই সময়কালের 'বঙ্গদর্শনে'ই ধর্ম,ইতিহাস, বিজ্ঞান বিষয়ক প্রবন্ধ গুরুত্বের সঙ্গে স্হান পেয়েছে।আলোচ্য গ্রন্হটির সম্পাদক অলোক রায় লিখেছেন, বিজ্ঞান বিষয়ক প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথের আগ্রহের কারণ ছিল আচার্য জগদীশচন্দ্রের জয়বার্তা প্রচার। ত্রিপুরার রাজার সঙ্গে কবির চিঠিপত্রে 'বঙ্গদর্শন' প্রসঙ্গেও এসে যায় জগদীশচন্দ্রের কথা।১৩০৮ বঙ্গাব্দের ২৪ শে শ্রাবণ(১৯০১ খ্রিঃ)রবীন্দ্রনাথ ত্রিপুরার মহারাজা রাধাকিশোরকে লিখেছেন-"...মহারাজের সহিত আমি এমন কোন সম্বন্ধ রাখিতে ইচ্ছা করিনা যাহাতে লোকে স্বার্থসিদ্ধির অপবাদ দিতে পারে।আমার সাধ্য যৎ সমান্য হইলেও এবং উদ্দেশ্য লোকহিতকর হইলেও, যে কাজ নিজের হাতে লইয়াছি সে সম্বন্ধে মহারাজের নিকট হইতে আর্থিক সহায়তা লইব না ইহা আমি স্থির করিয়াছি।কষ্ট এবং ত্যাগ স্বীকার ব্যতীত কোন মহৎ কর্ম্মের মূল্য থাকে না-আমার যতদূর সাধ্য আছে বঙ্গদর্শন পরিচালনায় তাহার সীমা অতিক্রম করিলেই গৌরব লাভ করিব। এবারে জগদীশবাবুর পত্র পড়িয়া এই বিষয়ে মনে মনে বল লাভ করিয়াছি- জগদীশবাবুর প্রতিভায় পাণ্ডিত্য এবং সহৃদয়তার আশ্চর্য্য মিলন হইয়াছে বলিয়া এ সকল ব্যাপারে তাঁহার মত আমার কাছে সর্ব্বাগণ্য।..." কবি এই চিঠিতে জগদীশচন্দ্রের একটি চিঠির প্রসঙ্গও তুলে ধরেছেন। নবপর্যায়ের 'বঙ্গদর্শন'-এর দুই সংখ্যা পেয়ে জগদীশচন্দ্র যে খুবই খুশি হয়েছেন কবি রাজার কাছে তার উল্লেখ করেন।এখানে উল্লেখ করা যায় যে,রবীন্দ্রনাথের অনুরোধে আচার্য জগদীশচন্দ্রের বিজ্ঞান গবেষণার জন্য ত্রিপুরার রাজা রাধাকিশোর অর্থ সাহায্য করেছিলেন।কিন্তু বিভিন্ন সময়ে রবীন্দ্রনাথের অনুরোধে রাজার এ ধরণের আর্থিক সহায়তার জন্য কবির বিরুদ্ধে ত্রিপুরার রাজপ্রাসাদ পরিমণ্ডলে গুঞ্জন উঠেছিল। কবি ব্যথিত হয়েছিলেন। কবির এই চিঠিতে যেন ধরা পড়েছে তাঁর অভিমান!
নবপর্যায়ের 'বঙ্গদর্শন' নিয়ে আলোচ্য গ্রন্হটির ভূমিকায় সম্পাদক অলোকবাবু প্রমথনাথ বিশীর উদ্ধৃতি দিয়েছেন-' দ্বিতীয় পর্যায় 'বঙ্গদর্শন'-এর সম্পাদকতা গ্রহণের মুখে কবির একটি প্রধান অভিপ্রায় ছিল হিন্দুত্বের ব্যাখ্যা,-যে হিন্দুত্ব শাস্ত্রসংহিতা ও বর্ণাশ্রমধর্ম মানিয়াও কিংবা মানিয়াই মহৎ।' 'হিন্দুত্ব' প্রসঙ্গেও জগদীশচন্দ্রের চিঠির উল্লেখ ক্রমে কবি ত্রিপুরার রাজাকে সেদিন লিখেছিলেন-"জগদীশবাবুর এই পত্র আমার পক্ষে পারিতোষিক। আমি যাহা বলিতে চেষ্টা করিয়াছি তিনি তাহা বুঝিয়াছেন।হিন্দুর যথার্থ গৌরব কি,এবং হিন্দুর উন্নতি সাধনের প্রকৃত পথ কোন্ দিকে বঙ্গদর্শনে তাহাই সম্যক আলোচিত হইলে আমি চরিতার্থ হইব।হিন্দুত্ব কি তাহাই আমি ক্রমশঃ দেখাইতেছি এবং সেই সঙ্গে একথাও জানাইতেছি যে,য়ুরোপীয় সভ্যতায় যাহাকে ন্যাশনাল মহত্ত্ব বলে তাহাই মহত্ত্বের একমাত্র আদর্শ নহে।..."
পারুল প্রকাশনীর 'রবীন্দ্রনাথ সম্পাদিত বঙ্গদর্শন' গ্রন্হটির ভূমিকায় দুই আমলের প্রকাশিত লেখার এক সংক্ষিপ্ত চিত্রও তুলে ধরা হয়েছে।ভূমিকায় সম্পাদক লিখেছেন-"বঙ্কিমচন্দ্রের 'বঙ্গদর্শন' বাংলা সাহিত্যে মননচর্চার অত্যুচ্চ আদর্শ স্হাপন করে।সেই আদর্শ রবীন্দ্রনাথ সম্পাদিত 'বঙ্গদর্শন' পত্রিকায় কতটা রক্ষিত হয়েছে, দেখানোর জন্য এই প্রবন্ধ সংকলনের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।"রবীন্দ্রনাথের নবপর্যায়ের 'বঙ্গদর্শন' থেকে মোট ৪৭ টি প্রবন্ধ গ্রন্হটিতে সংকলিত হয়েছে।এর মধ্যে ১৭টি প্রবন্ধ রয়েছে রবীন্দ্রনাথের। সূচির প্রথমেই রয়েছে ব্রহ্মবান্ধব উপাধ্যায়ের 'হিন্দুজাতির একনিষ্ঠতা' প্রবন্ধ। রয়েছে তাঁর 'বর্ণাশ্রমধর্ম্ম','বেদান্তের প্রথম কথা' ইত্যাদি শিরোনামের প্রবন্ধও,রয়েছে রবীন্দ্রনাথের 'ভারতবর্ষের ইতিহাস','ধর্ম্মের সরল আদর্শ','দেশীয় রাজ্য' ইত্যাদি প্রবন্ধ। বিপিন চন্দ্র পালের 'বঙ্গচ্ছেদে বঙ্গের অবস্হা',রামেন্দ্র সুন্দর ত্রিবেদীর 'স্বদেশী বিশ্ববিদ্যালয়',সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'গীতার দর্শন' ইত্যাদি শিরোনামের নানা মূল্যবান প্রবন্ধ সংকলিত হয়েছে আলোচ্য গ্রন্হটিতে,যাতে প্রতিফলিত হয়েছে তদানীন্তন বাংলা তথা ভারতের মনন।
এখানে উল্লেখ করা যায় যে,অধুনা দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্যের অনেক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান সংগ্রহ ও সংকলনে পারুল প্রকাশনী যত্নবান রয়েছে।ইতিপূর্বেও তারা এ ধরণের নানা গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্হ প্রকাশ করেছে।তার মধ্যে রয়েছে 'সন্দেশ','বন্দেমাতরম' ইত্যাদি।প্রায় সাড়ে চারশ পৃষ্ঠার আলোচ্য সুবৃহৎ গ্রন্হটিও এর এক উল্লেখযোগ্য সংযোজন।
আরও পড়ুন...