কবিকে ভারত ভাস্কর, রাজার ভারত বোধ
পান্নালাল রায়
August 23, 2026
ত্রিপুরার মহারাজা বীরবিক্রম ছিলেন এক দূরদর্শী রাজা।মৃত্যুর অল্প কিছুদিন আগে তিনি ভারতভুক্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তটি নিয়েছিলেন।দেশ বিদেশ সফর করে তিনি ত্রিপুরার কথা পৌঁছে দিয়েছিলেন সর্বত্র। ত্রিপুরার উন্নয়নে তিনি বহুমুখী উদ্যোগ নিয়েছিলেন। পূর্বপুরুষদের মতো এই রাজাও ছিলেন সাহিত্য সংস্কৃতির এক বড় পৃষ্ঠপোষক। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে তাঁর 'ভারত ভাস্কর' উপাধি প্রদানের মধ্যেই দেশীয় রাজ্যের এই রাজার ভারত বোধ চেতনার প্রকাশ উপলব্ধি করা যায়।
সেটা ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দ। যুবরাজ বীরবিক্রমের বয়স মাত্র পনের। পড়াশোনা করছিলেন শিলং।হঠাৎ একদিন মৃত্যু ঘটল পিতা মহারাজ বীরেন্দ্র কিশোর মাণিক্যের।পিতার মৃত্যুর পর স্বাভাবিক ভাবেই রাজ্যাধিকারী হলেন যুবরাজ বীরবিক্রম।কিন্তু রাজা নাবালক। তাই বীরবিক্রমের পক্ষে শাসন পরিচালনার জন্য একটি শাসন পরিষদ গঠিত হয়েছিল,রাজ্য পরিচালনায় যার ক্ষমতা ছিল সর্বাত্মক। অবশ্য যাবতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ইংরেজ পলিটিক্যাল এজেন্টের পরামর্শ ছিল অপরিহার্য। ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দে বিশ বছর বয়সে বীরবিক্রম রাজ্যভার গ্রহণ করেন। ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দের ২৯ জানুয়ারি শাস্ত্রীয় অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তাঁর রাজ্যাভিষেক ঘটে।এই উপলক্ষ্যে সেদিন রাজধানী আগরতলায় বিরাট অনুষ্ঠানের আয়োজন হয়েছিল। বিপুল সংখ্যক মানুষ তা উপভোগ করেন। এক সুসজ্জিত হাতির মিছিল রাজধানীর বিভিন্ন পথ পরিক্রমা করেছিল সেদিন।
রাজ্যভার গ্রহণের পর বীরবিক্রম ত্রিপুরার সার্বিক উন্নয়নে মনোনিবেশ করেন।প্রশাসনিক সংস্কারেও বিভিন্ন উদ্যোগ নেন রাজা।নিজ রাজ্যের বিভিন্ন এলাকা সহ দেশ বিদেশের বিভিন্ন অঞ্চল সফর করে তিনি নানা অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেন এবং তা তাঁর রাজ্যের উন্নয়নের কাজে লাগাতে চেষ্টা করেন। বীরবিক্রম তাঁর পারিষদবর্গ নিয়ে তিনবার বিদেশ সফরে বেরিয়েছিলেন।রাজা ১৯৩০ সালে প্রথম ইউরোপ সফরে বের হন।প্রায় নয় মাস রাজা তাঁর সঙ্গীদের নিয়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ সফর করেন। এই সফরকালে তাঁরা রোম,ফ্লোরেন্স,মিলান,প্যারিস,লন্ডন,বার্লিন,ভেনিস,এডিনবার্গ,
বুদাপেষ্ট ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোতে গিয়েছিলেন। এই সফরকালে ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গেও বীরবিক্রম সাক্ষাৎ করেন। ১৯৩৬ সালে সপার্ষদ রাজা দ্বিতীয়বারের মতো ইউরোপ সফরে বের হন।সেবার বার্লিনে জার্মান চ্যান্সেলর এডলফ্ হিটলারের সঙ্গে রাজার সাক্ষাত ঘটে।নানা বিষয়ে তাদের মধ্যে আলোচনা হয়।বার্লিনে ত্রিপুরার রাজাকে যথোচিত সম্মান প্রদর্শন করা হয়। রাজাকে গার্ড অফ অনার দেয়া হয়।দ্বিতীয়বারের এই ইউরোপ সফরকালে বীরবিক্রম ইংল্যান্ডের রাজার জন্মদিনটি তাঁর সঙ্গে বাকিংহাম প্রাসাদে অতিবাহিত করেন। ১৯৩৯ সালের জুন মাসে বীরবিক্রম তৃতীয়বারের মতো বিদেশ সফরে বের হন।প্রথমে ইউরোপ সফরের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলেও শেষপর্যন্ত তা বিশ্ব সফরের রূপ নিয়েছিল।২য় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে যাওয়ায় রাজার তৃতীয় বিদেশ সফর নানা আশঙ্কা আর উদ্বেগের মধ্যে কাটে।তবে এই সফরের উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের সঙ্গে রাজার সাক্ষাত। ৩১ জুলাই ওয়াশিংটনে হোয়াইট হাউসে মহারাজা বীরবিক্রম প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের সঙ্গে সাক্ষাত করেন। প্রেসিডেন্ট হুইলচেয়ারে বসে হোয়াইট হাউসের বারান্দায় রাজাকে অভ্যর্থনা জানান।সম্ভবত বীরবিক্রমই প্রথম কোনও ভারতীয় রাজা যিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রাষ্ট্রীয় অতিথির মর্যাদা পেয়েছিলেন।
বীরবিক্রম ছিলেন এক কর্ম তৎপর দূরদর্শী নৃপতি। তিনি রাজ্যে নানা নির্মাণ কাজ করিয়েছেন, শিক্ষার সম্প্রসারণ সহ যোগাযোগ-শিল্প-কৃষির উন্নয়নে উদ্যোগ নিয়েছেন। ব্রিটিশ বাংলার রেলপথের সঙ্গেও ত্রিপুরাকে জুড়ে দিতে চেয়েছিলেন রাজা। জুমিয়াদের জন্য তিনি সমতলে বিস্তীর্ণ ভূমি সংরক্ষণের আওতায় এনেছেন। আবার পূর্ববঙ্গ থেকে আসা দাঙ্গা দুর্গত বাঙালি শরণার্থীদেরও রাজা পরম মমতায় তাঁর রাজ্যে আশ্রয় দিয়েছেন। রাজা তাঁর রাজত্বকালে ত্রিপুরায় শিক্ষা সম্প্রসারণেও বহুমুখী উদ্যোগ নিয়েছিলেন। নতুন নতুন স্কুল প্রতিষ্ঠা,প্রাথমিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা,গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয় স্হাপনের উদ্যোগ, শিক্ষায় উৎসাহ দানের জন্য নানারকম স্কলারশিপ-স্টাইপেন্ড ইত্যাদির মতো বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়েছিলেন রাজা।শিক্ষাকে আরও ব্যাপক ও অর্থবহ করার জন্যও সচেষ্ট ছিলেন তিনি।রাজ্যে বিভিন্ন স্তরের স্কুলের শিক্ষক সংখ্যাও বাড়িয়েছিলেন তিনি।বীরবিক্রম ১৯৩১ খ্রিস্টাব্দে ত্রিপুরায় প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করেছিলেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে একটি আদেশপত্রের কিছু অংশ এখানে উল্লেখ করা হচ্ছে--
"... যেহেতু এ রাজ্যের প্রজা সাধারণের সর্ব্বাঙ্গীন কল্যাণ কামনায় বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা প্রচলন করা এ পক্ষের অভিপ্রেত অতএব কার্য্যে পরিণত করা হউক, ইতি।সন ১৩৪১ ত্রিপুরাব্দ,তারিখ ২০শে ভাদ্র"
সম্ভবত রাজার এই অভিপ্রায় সর্বত্র বাস্তব রূপ পেতে কিছু বিলম্ব ঘটেছিল। কারণ দেখা যাচ্ছে কয়েক বছর পরে ১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দে সদর বিভাগে বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষার প্রবর্তন বিষয়ে এক আদেশনামা জারি হয়েছিল।তাতে হাওড়া নদীর উপত্যকা ও বিভাগীয় শহর সমূহের কিছু সীমিত এলাকায় প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়।ত্রিপুরায় উচ্চ শিক্ষা প্রসারেও রাজা বিরাট পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিলেন। ১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দে গঠিত হয়েছিল বিদ্যাপত্তন গভর্ণিং কমিটি।শুধুমাত্র একটি কলেজ প্রতিষ্ঠা নয়,রাজার পরিকল্পনা ছিল 'বিদ্যাপত্তন' প্রকল্পের অধীনে একটি গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয় স্হাপন।তাঁর ইচ্ছা ছিল এই গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে থাকবে সাধারণ ডিগ্রি কলেজ,মেডিক্যাল কলেজ,কৃষি,চারুকলা ও ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ। কিন্তু রাজার অকাল মৃত্যুর জন্য এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হতে পারেনি। অবশ্য রাজার মৃত্যুর পর মহারাজ বীরবিক্রম কলেজ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বিদ্যাপত্তন প্রকল্পের কিছুটা বাস্তবায়িত হয়।
এবার আসা যাক বীরবিক্রমের সাহিত্য-সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতার কথায়।উল্লেখ করা যায় যে,ত্রিপুরার মাণিক্য রাজাগণ সর্বদাই সাহিত্য সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতা করে গেছেন। রাজা এবং রাজপরিবারের লোকেরা নিজেরাও সাহিত্য সংস্কৃতির চর্চা করেছেন।পঞ্চদশ শতকে মহারাজ ধর্ম মাণিক্য 'রাজমালা' রচনা করান।বলা যায় এর মাধ্যমেই ত্রিপুরার মাণিক্য রাজাদের সাহিত্য পৃষ্ঠপোষকতার সূচনা ঘটে।পূর্বতন রাজাদের মতো বীরবিক্রমও সাহিত্য সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক ছিলেন।তাঁর উদ্যোগে 'শ্রীরাজমালা' প্রকাশিত হয়েছিল। তিনি 'রাজমালা' সংক্রান্ত গবেষণা ও প্রকাশনা কার্যালয় স্হাপন করেছিলেন। 'রবি' সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশেও রাজা পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন। বীরবিক্রম নিজেও এক কবি ও নাট্যকার ছিলেন। অবশ্য তাঁর সাহিত্য বিষয়ক তৎপরতা মূলত রাজপরিবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।
বীরচন্দ্র থেকে বীরবিক্রম ত্রিপুরার চারজন মাণিক্য রাজার সঙ্গেই ছিল রবীন্দ্রনাথের সম্পর্ক। এক রাজবংশের চারজন রাজার সঙ্গে কবির এই সম্পর্কের ধারাবাহিকতা নিঃসন্দেহে এক আশ্চর্য ঘটনা। প্রথম যোগাযোগের সময় মহারাজ বীরচন্দ্র প্রৌঢ়,কবি তরুণ বয়স্ক। আর শেষবেলায় বীরবিক্রম যখন যুবক রাজা কবি তখন প্রৌঢ়।বীরবিক্রমের সঙ্গে কবির বার কয়েক সাক্ষাত ঘটেছে।ত্রিপুরার পুরাতাত্ত্বিক সম্পদ সংরক্ষণে কবি রাজাকে পরামর্শ দিয়েছেন। কবিকে 'ভারত ভাস্কর' উপাধি দিয়েছেন রাজা। কলকাতায় রবীন্দ্র মেলার উদ্বোধন করেছেন বীরবিক্রম। শুধু তাই নয়,রবীন্দ্রানুরাগী হিসেবে সারা দেশেই পরিচিতি লাভ করেছিলেন বীরবিক্রম। পুরীতেও রবীন্দ্র জয়ন্তীর অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করার ডাক পেয়েছিলেন তিনি।
১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দে বীরবিক্রম শান্তিনিকেতন সফর করেন। ৭ জানুয়ারি আম্রকুঞ্জে আনুষ্ঠানিক সম্বর্ধনা জানানো হয় রাজাকে।বিশ্বভারতীর অধ্যাপক,ছাত্র ছাত্রী সহ আশ্রমবাসীরা সবাই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। রাজাকে সম্বর্ধনা জ্ঞাপন করে কবি তাঁর ভাষণে সেদিন বলেছিলেন,দেশের মধ্যে প্রথম সম্মান তিনি পেয়েছিলেন ত্রিপুরার রাজা বীরচন্দ্রের কাছ থেকে।শান্তিনিকেতন অবস্থানকালে বিশ্বভারতীর বিভিন্ন বিভাগ এবং শ্রীনিকেতন ঘুরিয়ে দেখানো হয় বীরবিক্রমকে।অধ্যাপকবৃন্দের সঙ্গেও এক বৈঠকে মিলিত হন তিনি। ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দের ২৫শে বৈশাখ বীরবিক্রম রবীন্দ্রনাথকে 'ভারত ভাস্কর' উপাধি প্রদান করেন। এই উপলক্ষ্যে আগরতলার উজ্জয়ন্ত প্রাসাদের খাস দরবার হলে অনুষ্ঠিত হয় 'রবীন্দ্র জয়ন্তী' বিশেষ দরবার। তারপর শান্তিনিকেতনে কবির হাতে 'ভারত ভাস্কর' অভিজ্ঞান পত্র তুলে দেবার বিশেষ ব্যবস্থা করা হয়।ত্রিপুরার ভারতভুক্তির অনেক আগেই যে মহারাজা বীরবিক্রমের অন্তরে প্রবল ভারত বোধ জাগ্রত ছিল তার প্রমাণ পাওয়া যায় কবিকে রাজার 'ভারত ভাস্কর' উপাধি প্রদানের মাধ্যমে।
মাত্র ৩৯ বছর বয়সে ত্রিপুরার দূরদর্শী রাজা বীরবিক্রমের মৃত্যু ঘটেছিল। তবে মৃত্যুর আগে তিনি ত্রিপুরার ভারতভুক্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তটি নিয়েছিলেন। অবশ্য রাজার অকাল মৃত্যু নিঃসন্দেহে ত্রিপুরার কাছে এক বিপর্যয়কর পরিস্থিতি ছিল।রাজার মৃত্যুর পর আনুষ্ঠানিক ভাবে ভারতভুক্তির আগে পর্যন্ত ত্রিপুরা এক গভীর সংকটের সম্মুখীন হয়েছিল। ত্রিপুরাকে পাকিস্তানের দিকে ঠেলে দেয়ার ষড়যন্ত্রের অঙ্গ হিসেবে ওপারে শুরু হয়েছিল মিছিল, মিটিং সহ হিংসাত্মক তৎপরতা।স্বাভাবিকভাবেই এপারেও তার প্রভাব পড়েছিল। কিন্তু ত্রিপুরার শুভবুদ্ধি সম্পন্ন কিছু মানুষ এবং রাজমাতা কাঞ্চনপ্রভা দেবীর তৎপরতায় শেষপর্যন্ত পাকিস্তানপন্হীদের সেই ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হয়।ত্রিপুরার রাজাদের সুদীর্ঘকালের জমিদারি এলাকা চাকলা রোশনাবাদের পাকিস্তান ভুক্তিও এপারে বিপুল সংখ্যক মানুষের দুর্ভোগের কারণ বলে অনেকে মনে করেন। তাদের মতে মহারাজ বীরবিক্রম আরও কিছুদিন জীবিত থাকলে পরিস্থিতি হয়তো অন্যরকম হতো!
আরও পড়ুন...