বার্ধক্যের নতুন বাস্তবতা : একাকিত্বের সমাজ ও আমাদের দায়
রিদ্ধিমান দাস
August 22, 2026
শিশু যখন প্রথমবার হাঁটতে শেখে, তখন তার আঙুল ধরে রাখে বাবা-মা। জীবনের প্রতিটি ধাপে—স্কুলে ভর্তি, অসুস্থতা, স্বপ্ন দেখা—তাঁরাই সন্তানের প্রথম আশ্রয়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই সন্তানই যখন বড় হয়ে দূরে চলে যায়, ব্যস্ত হয়ে পড়ে নিজের জীবন নিয়ে, তখন অনেক বাবা-মা ধীরে ধীরে একা হয়ে পড়েন। এই একাকিত্ব আজ শুধু ব্যক্তিগত নয়, এটি একটি সামাজিক পরিবর্তনের প্রতিচ্ছবি।
আগে গ্রামবাংলা বা শহরের পুরনো পাড়াগুলিতে দেখা যেত, বাড়ির উঠোনে বসে দাদা-দিদিমারা নাতি-নাতনিদের গল্প শোনাচ্ছেন। কিন্তু এখন সেই দৃশ্য অনেকটাই বদলে গেছে। ফ্ল্যাট সংস্কৃতি, কর্মসূত্রে অন্য শহরে চলে যাওয়া, ছোট পরিবার—সব মিলিয়ে প্রবীণদের জীবনে তৈরি হয়েছে এক নতুন নীরবতা।
ভারতের জনসংখ্যা কাঠামোও দ্রুত বদলাচ্ছে। সরকারি ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন রিপোর্ট বলছে, আগামী কয়েক দশকে প্রবীণ মানুষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। অর্থাৎ ভবিষ্যতে সমাজে বৃদ্ধদের উপস্থিতি আরও বেশি হবে, কিন্তু সেই অনুপাতে কি তাঁদের জন্য মানসিক ও সামাজিক সহায়তা বাড়ছে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে দেখা যায়, সমস্যাটি শুধু অর্থনৈতিক নয়, বরং আবেগগত। অনেক প্রবীণ মানুষ আজ আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হলেও তাঁদের সবচেয়ে বড় সংকট হলো—কথা বলার মানুষ নেই, সময় দেওয়ার মানুষ নেই, পাশে বসে হাত ধরার মানুষ নেই।
ত্রিপুরার মতো রাজ্যেও এই পরিবর্তনের ছাপ স্পষ্ট। শহর আগরতলা থেকে শুরু করে ছোট শহরগুলিতেও এখন অনেক প্রবীণ একা থাকেন। কেউ সন্তানদের সঙ্গে অন্য রাজ্যে, কেউ আবার বৃদ্ধাশ্রমে। সমাজকল্যাণমূলক ভাতা বা সরকারি সহায়তা থাকলেও, মানবিক সম্পর্কের শূন্যতা পূরণ করা কঠিন।
এই বাস্তবতার মধ্যেই জন্ম নিচ্ছে নতুন ধরনের সামাজিক উদ্যোগ। কোথাও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন প্রবীণদের জন্য নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করছে, কোথাও তরুণরা সপ্তাহান্তে বৃদ্ধদের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছে, আবার কোথাও ডিজিটাল প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাঁদের প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে। এই ছোট ছোট উদ্যোগগুলোই ধীরে ধীরে একাকিত্বের বিরুদ্ধে একটি সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলছে।
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—বৃদ্ধাশ্রম বা প্রবীণ সেবা কেন্দ্রকে শুধুমাত্র “শেষ আশ্রয়” হিসেবে দেখা ঠিক নয়। অনেক ক্ষেত্রে এটি নিরাপদ, সুশৃঙ্খল এবং যত্নশীল জীবনযাপনের একটি বিকল্প হতে পারে। কিন্তু আদর্শ সমাজে এটি হওয়া উচিত শেষ বিকল্প, প্রথম পছন্দ নয়।
সরকারও বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে প্রবীণদের জীবনমান উন্নত করার চেষ্টা করছে। স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক নিরাপত্তা, আইনি সুরক্ষা—সব ক্ষেত্রেই কিছু অগ্রগতি হয়েছে। কিন্তু নীতি যতই শক্তিশালী হোক, পরিবারের ভিতরের সম্পর্ক যদি দুর্বল হয়, তাহলে প্রবীণদের একাকিত্ব পুরোপুরি দূর করা সম্ভব নয়।
আসলে সমস্যার মূল সমাধান লুকিয়ে আছে আমাদের দৈনন্দিন আচরণে। একজন বৃদ্ধ বাবা-মায়ের জন্য সবচেয়ে বড় উপহার হতে পারে একটি ফোন কল, একটি দেখা করা, বা শুধু কিছুটা সময়। তাঁদের জীবনের গল্প শোনা মানে শুধু অতীত জানা নয়, বরং নিজের শিকড়কে অনুভব করা।
আমাদের সমাজকে এখন একটি নতুন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হচ্ছে—আমরা কি এমন একটি ভবিষ্যৎ চাই যেখানে বার্ধক্য মানেই নিঃসঙ্গতা? নাকি এমন একটি সমাজ গড়তে চাই যেখানে বয়স বাড়া মানেই সম্মান, যত্ন এবং ভালোবাসার নতুন অধ্যায়?
কারণ শেষ পর্যন্ত, একটি সমাজের প্রকৃত উন্নয়ন বোঝা যায় তার বৃদ্ধদের মুখের হাসিতে। আর সেই হাসি যদি হারিয়ে যায়, তাহলে উন্নয়নের সব পরিসংখ্যানই অসম্পূর্ণ থেকে যায়। (রিদ্ধিমান দাস, শ্রেণি:- দশম, ভবনস্ ত্রিপুরা বিদ্যামন্দির)
(The editor of tripurainfo.com warmly invites students and aspiring writers to share their thoughts, ideas, and creativity through articles. Understanding that every great writer starts somewhere, tripurainfo.com is committed to providing a platform where young minds can express themselves without fear of judgment.
This initiative is not about perfection but about encouragement, growth, and giving voice to new perspectives. We believe that by supporting young talents today, we are shaping the storytellers, journalists, and thought leaders of tomorrow.
So, if you have a story to tell or an idea to share, don’t hesitate—send in your articles. Let your words inspire others, and let tripurainfo.com be the stage where your voice is heard!)
আরও পড়ুন...