সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পরও ত্রিপুরায় ফুটপাত বেদখল, নতুন রাস্তার ফুটপাতেও অব্যবস্থা

জয়ন্ত দেবনাথ

August 9, 2026

ফুটপাত কোনও বিলাসিতা নয়, কোনও সৌন্দর্যায়নের অতিরিক্ত অংশও নয়। একটি শহরের নাগরিক জীবনে নিরাপদ ও দখলমুক্ত ফুটপাত মানুষের মৌলিক চলাচলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো। একজন শিশু স্কুলে যাবে, একজন প্রবীণ হাসপাতালে যাবেন, একজন নারী কর্মস্থলে যাবেন কিংবা একজন প্রতিবন্ধী নাগরিক হুইলচেয়ার নিয়ে স্বাধীনভাবে চলাচল করবেন—এই স্বাভাবিক নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার জন্যই ফুটপাতের প্রয়োজন। অথচ ত্রিপুরার রাজধানী আগরতলা সহ বিভিন্ন শহর ও নগর এলাকায় ফুটপাতের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠছে। কোথাও ফুটপাত বেদখল, কোথাও ফুটপাতের উপর গাড়ি পার্কিং, কোথাও নির্মাণসামগ্রী পড়ে রয়েছে, আবার কোথাও নতুন করে ফুটপাত নির্মাণ করা হলেও তার নকশা ও নির্মাণ এমন যে সাধারণ পথচারী তো বটেই, হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী বা বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুর পক্ষেও সেটি ব্যবহার করা কঠিন।

ভারতের সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক গুরুত্বপূর্ণ রায় এই বিষয়টিকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে। ১৯ জুন ২০২৬-এর ঐতিহাসিক রায়ে সর্বোচ্চ আদালত নিরাপদে হাঁটার অধিকারকে সংবিধানের ১৯(১)(ডি)-এর স্বাধীনভাবে চলাফেরার অধিকার এবং ২১ নম্বর ধারায় জীবন ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অধিকারের সঙ্গে যুক্ত করেছে। আদালত স্পষ্ট করেছে যে যেখানে রাস্তা রয়েছে, সেখানে পথচারীদের জন্য উপযুক্ত ও নিরাপদ পরিকাঠামো নিশ্চিত করা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব।

সুপ্রিম কোর্টের এই অবস্থান ত্রিপুরার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ রাজ্যের রাজধানী আগরতলা বর্তমানে দ্রুত নগরায়ণের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। নতুন রাস্তা তৈরি হচ্ছে, পুরনো রাস্তা সংস্কার হচ্ছে, স্মার্ট সিটি প্রকল্পের অধীনে বিভিন্ন পরিকাঠামোগত কাজ হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে। কিন্তু এই সমস্ত উন্নয়ন প্রকল্পের কেন্দ্রে পথচারীর নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্য কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে, সেই প্রশ্ন এখন নতুন করে সামনে এসেছে।

লিচুবাগান থেকে বিমানবন্দর হয়ে রাজধানীর বিভিন্ন নির্মীয়মাণ ও উন্নয়নাধীন সড়কপথের দিকে তাকালেই বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। রাস্তা উন্নয়নের পাশাপাশি ফুটপাত তৈরি করা হচ্ছে, কিন্তু সেই ফুটপাত বাস্তবে কতটা ব্যবহারযোগ্য, তা নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ স্বাধীন মূল্যায়ন অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে প্রতিবন্ধী শিশু ও হুইলচেয়ার ব্যবহারকারীদের কথা মাথায় রেখে ফুটপাতের নকশা করা হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা দরকার। একটি ফুটপাত তৈরি হলেই সেটি প্রতিবন্ধীবান্ধব হয়ে যায় না। ফুটপাতের প্রস্থ, ঢাল, কার্ব কাট, র‌্যাম্প, ড্রেনেজ, রাস্তা পারাপারের ব্যবস্থা এবং পুরো পথের ধারাবাহিকতা—সবকিছুকেই বৈজ্ঞানিকভাবে পরিকল্পনা করতে হয়।

বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, আগরতলা শহরের কোথাও ফুটপাতের উচ্চতা এত বেশি যে হুইলচেয়ার নিয়ে ওঠা সম্ভব নয়, কোথাও ফুটপাত মাঝপথে শেষ হয়ে গেছে, কোথাও বৈদ্যুতিক খুঁটি বা গাছ চলাচলের জায়গা আটকে রেখেছে, কোথাও দোকানের সিঁড়ি ফুটপাত দখল করে রয়েছে এবং কোথাও আবার গাড়ি বা বাইক পার্ক করে পথচারীর জায়গা দখল করা হয়েছে। একজন হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী যদি ফুটপাত ছেড়ে ব্যস্ত সড়কে নামতে বাধ্য হন, তাহলে সেই ফুটপাতকে কতটা নাগরিকবান্ধব বলা যায়, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকবেই।

একইভাবে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী নাগরিকদের জন্যও ফুটপাতের নকশায় বিশেষ ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তি যদি হঠাৎ ফুটপাথে একটি বৈদ্যুতিক খুঁটি, খোলা ড্রেন, নির্মাণসামগ্রী বা পার্ক করা মোটরবাইকের সামনে পড়েন, তাহলে সেই পরিকাঠামো তাঁর জন্য নিরাপদ নয়। তাই এখন সময় এসেছে ত্রিপুরায় ফুটপাত নির্মাণের ধারণাটিকেই নতুন ভাবে দেখার এবং বৈজ্ঞানিক ভিত্তিতে বাস্তবায়নের।

শুধু রাস্তা তৈরি করলেই উন্নয়ন সম্পূর্ণ হয় না। রাস্তার সঙ্গে পথচারীর নিরাপদ চলাচলের ব্যবস্থা না থাকলে সেই উন্নয়ন অসম্পূর্ণ থেকে যায়। একটি শহরের রাস্তা যতই প্রশস্ত হোক, যতই সুন্দর আলো জ্বলমলে হোক, যতই আধুনিক ডিভাইডার তৈরি করা হোক, যদি সাধারণ মানুষকে হাঁটার জন্য গাড়ির সঙ্গে একই রাস্তা ভাগ করে নিতে হয়, তাহলে সেই শহরের নগর পরিকল্পনায় বড় ধরনের ঘাটতি থাকবে এটা বলার অপেক্ষা থাকেনা।

আগরতলাকে স্মার্ট সিটি হিসেবে গড়ে তোলার যে প্রচেষ্টা চলছে, তার ক্ষেত্রেও এই প্রশ্নগুলি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্মার্ট সিটির অর্থ শুধুমাত্র আধুনিক রাস্তা, সৌন্দর্যায়ন, আলো, ডিভাইডার বা প্রযুক্তিনির্ভর পরিষেবা নয়। একজন সাধারণ নাগরিক কতটা নিরাপদে এবং স্বাধীনভাবে শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যেতে পারেন, সেটিও একটি স্মার্ট শহরের গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি।

তাই ফুটপাত নির্মাণের পাশাপাশি ফুটপাত রক্ষা করার স্থায়ী ব্যবস্থা তৈরি করা জরুরি। একদিন অভিযান চালিয়ে দখলমুক্ত করে কয়েকদিন পর আবার দখল হতে দেওয়া কোনও স্থায়ী সমাধান নয়। সংশ্লিষ্ট পুরসভা, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাকে নিয়মিত নজরদারি চালাতে হবে এবং দখলমুক্ত ফুটপাতকে দখলমুক্তই রাখতে হবে।

এই বিষয়টি শুধু আগরতলা শহরের প্রধান সড়কগুলির মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। পাড়ার সরু অলিগলি, আবাসিক এলাকা, স্কুলের আশপাশ, হাসপাতাল, বাজার এবং জনবহুল এলাকাতেও পথচারীদের নিরাপদ চলাচলের ব্যবস্থা থাকা দরকার। যেখানে প্রচলিত অর্থে ফুটপাত তৈরি করা সম্ভব নয়, সেখানে রাস্তার নির্দিষ্ট অংশকে পথচারী চলাচলের জন্য চিহ্নিত করা, গাড়ি পার্কিং নিয়ন্ত্রণ করা, ব্যারিয়ার বা বোলার্ড ব্যবহার করা কিংবা অন্যান্য ট্রাফিক-ক্যালমিং ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। অর্থাৎ রাস্তা সরু—এই কারণে পথচারীর নিরাপত্তার দায়িত্ব থেকে প্রশাসন মুক্ত হতে পারে না।

ত্রিপুরার স্থানীয় ক্লাব, যুবসমাজ, নাগরিক সংগঠন এবং বাসিন্দাদেরও এই কাজে যুক্ত করা যেতে পারে। কোনও এলাকায় ফুটপাত দখল হলে, নির্মাণসামগ্রী পড়ে থাকলে, বিপজ্জনক রাস্তা পারাপারের জায়গা থাকলে বা ফুটপাত ভেঙে গেলে স্থানীয় নাগরিকরা তা প্রশাসনের নজরে আনতে পারেন। পুর নিগম এজন্য একটি টোলফ্রি নম্বর চালু করে তা সবার গোচরে নিয়ে আসুক। প্রতিটি পাড়াকে ধীরে ধীরে নিরাপদ পথচারী এলাকা হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে জনসম্পৃক্ততা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।

রাজ্য সরকার চাইলে ত্রিপুরার জন্য একটি দীর্ঘ মেয়াদি 'হাঁটার উপযোগী ত্রিপুরা’ (Walkable Tripura) কর্মসূচি গ্রহণ করতে পারে। এর মাধ্যমে আগরতলা সহ রাজ্যের সমস্ত পুরসভা ও নগর পঞ্চায়েত এলাকায় ফুটপাতের পূর্ণাঙ্গ ম্যাপিং, দখল শনাক্তকরণ এবং সংস্কারের পরিকল্পনা করা যেতে পারে। ভবিষ্যতে কোনও নতুন রাস্তা নির্মাণের আগে থেকেই পথচারী ও প্রতিবন্ধী নাগরিকদের চলাচলের ব্যবস্থা নকশায় অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। রাস্তার কাজ শেষ হওয়ার পরে শুধু রাস্তার গুণমান নয়, ফুটপাতের ব্যবহারযোগ্যতাও পরীক্ষা করা উচিত।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, ভবিষ্যতের রাস্তা নির্মাণ প্রকল্পে ফুটপাতকে কোনও আনুষঙ্গিক কাজ হিসেবে দেখা যাবে না। রাস্তা এবং ফুটপাতকে একই প্রকল্পের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখতে হবে। একটি রাস্তা নির্মাণের বাজেট, নকশা এবং অনুমোদনের সময় পথচারীর নিরাপত্তা ও প্রতিবন্ধী নাগরিকের চলাচলের বিষয়টিকে বাধ্যতামূলকভাবে বিবেচনা করা দরকার।

সুপ্রিম কোর্ট যে ঘটনাকে সামনে রেখে নিরাপদে হাঁটার অধিকারের সাংবিধানিক গুরুত্ব তুলে ধরেছে, তার পেছনে রয়েছে একটি শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু। সেই ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, কোনও দুর্ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার চেয়ে দুর্ঘটনা যাতে না ঘটে, তার ব্যবস্থা করাই প্রশাসনের প্রকৃত দায়িত্ব।

ত্রিপুরার ক্ষেত্রেও তাই এখনই পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। আর একটি দুর্ঘটনা, আর একটি শিশুর মৃত্যু, আর একজন প্রবীণ নাগরিকের আহত হওয়া কিংবা একজন প্রতিবন্ধী নাগরিকের রাস্তার উপর পড়ে যাওয়ার অপেক্ষা করা উচিত নয়।

ত্রিপুরা বর্তমানে উন্নয়নের নতুন পথে এগোচ্ছে। রাজ্যকে আরও সংযুক্ত, আধুনিক, বিনিয়োগবান্ধব এবং প্রযুক্তিনির্ভর করার প্রচেষ্টা চলছে। কিন্তু উন্নয়নের আসল মাপকাঠি শুধু বড় রাস্তা, বড় ভবন, বিনিয়োগ বা সৌন্দর্যায়ন নয়। উন্নয়নের প্রকৃত পরিচয় তখনই পাওয়া যায়, যখন সমাজের সবচেয়ে দুর্বল নাগরিকটিও নিরাপদে এবং মর্যাদার সঙ্গে চলাফেরা করতে পারেন।

একজন হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী যদি ফুটপাত ব্যবহার করতে না পারেন, তাহলে উন্নয়ন অসম্পূর্ণ। একজন বৃদ্ধ যদি ফুটপাতের বদলে ব্যস্ত রাস্তায় হাঁটতে বাধ্য হন, তাহলে উন্নয়ন অসম্পূর্ণ। একজন শিশু যদি স্কুলে যাওয়ার সময় দ্রুতগতির গাড়ির সঙ্গে একই রাস্তা ভাগ করে নিতে বাধ্য হয়, তাহলে উন্নয়ন অসম্পূর্ণ। একজন নারী যদি নিরাপদে হাঁটার জায়গা না পান, তাহলে উন্নয়ন অসম্পূর্ণ।

সুপ্রিম কোর্ট পথ দেখিয়েছে। এখন সেই সাংবিধানিক নীতিকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার দায়িত্ব রাজ্য প্রশাসনের।

ত্রিপুরা সরকার, আগরতলা পুর নিগম, পূর্ত দফতর, নগর উন্নয়ন দফতর, ট্রাফিক পুলিশ এবং স্মার্ট সিটি প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত সমস্ত সংস্থাকে সমন্বিত ভাবে এগিয়ে আসতে হবে।

( লেখক একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও ত্রিপুরাইনফো-র সম্পাদক)

আরও পড়ুন...


Post Your Comments Below

নিচে আপনি আপনার মন্তব্য বাংলাতেও লিখতে পারেন।

বিঃ দ্রঃ
আপনার মন্তব্য বা কমেন্ট ইংরেজি ও বাংলা উভয় ভাষাতেই লিখতে পারেন। বাংলায় কোন মন্তব্য লিখতে হলে কোন ইউনিকোড বাংলা ফন্টেই লিখতে হবে যেমন আমার বাংলা কিংবা অভ্রো কী-বোর্ড (Avro Keyboard)। আমার বাংলা কিংবা অভ্রো কী-বোর্ডের সাহায্যে মাক্রোসফট্ ওয়ার্ডে (Microsoft Word) টাইপ করে সেখান থেকে কপি করে কমেন্ট বা মন্তব্য বক্সে পেস্ট করতে পারেন। আপনার কম্পিউটারে আমার বাংলা কিংবা অভ্রো কী-বোর্ড বাংলা সফ্টওয়ার না থাকলে নিম্নে দেয়া লিঙ্কে (Link) ক্লিক করে ফ্রিতে ডাওনলোড করে নিতে পারেন।

Free Download Avro Keyboard

Fields with * are mandatory





Posted comments

Till now no approved comments is available.