রবীন্দ্রনাথ যখন অপ্রাসঙ্গিক হবেন

অশেষ সেনগুপ্ত

August 8, 2026

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৮৯৫ সালে রচিত তাঁর বিখ্যাত '১৪০০ সাল' কবিতায় ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে এক অমোঘ প্রশ্ন রেখেছিলেন: "আজি হতে শত বর্ষ পরে/ কে তুমি পড়িছ বসি আমার কবিতাখানি/ কৌতূহল ভরে?" এক শতাব্দীরও বেশি সময় পার হয়ে যাওয়ার পর আজ আমরা জানি, তিনি কেবল প্রাসঙ্গিকই নন, বরং আমাদের মনন, সমাজ ও রাজনৈতিক সংকটের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছেন। কিন্তু তাঁরই প্রয়াণ দিবসে যদি একটি দুঃসাহসিক প্রশ্ন করা হয়—রবীন্দ্রনাথ ঠিক কখন অপ্রাসঙ্গিক হবেন?রবীন্দ্রনাথের অপ্রাসঙ্গিক হওয়ার শর্তগুলো তাঁর নিজের দর্শনের মধ্যেই লুকিয়ে আছে। মূলত দুটি সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী এবং চরম পরিস্থিতিতে রবীন্দ্রনাথ তাঁর প্রাসঙ্গিকতা হারাতে পারেন।

প্রথমত, তাঁর আদর্শের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে।

রবীন্দ্রনাথ তখনই অপ্রাসঙ্গিক হবেন, যখন তাঁর স্বপ্নের 'আদর্শ সমাজ' বা ইউটোপিয়া পুরোপুরি বাস্তবায়িত হবে। তিনি এমন এক পৃথিবীর স্বপ্ন দেখেছিলেন, যেখানে সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদ বা পশ্চিমা ধাঁচের 'Nation'-এর যান্ত্রিক স্বার্থপরতা থাকবে না। তিনি তাঁর চিঠিতে অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে জানিয়েছিলেন যে দেশপ্রেম কখনোই মানুষের চূড়ান্ত আধ্যাত্মিক আশ্রয় হতে পারে না; মানুষের আশ্রয় হলো সমগ্র মানবতা। তিনি হীরের দামে কাঁচ না কিনে, আজীবন মানবতাকেই দেশপ্রেমের ঊর্ধ্বে রাখতে চেয়েছেন।

যেদিন এই পৃথিবীতে আর কোনো যুদ্ধ থাকবে না, কোনো উগ্র জাতীয়তাবাদী উন্মাদনা মানুষকে খণ্ডিত করবে না; যেদিন বিশ্ব সত্যি অর্থেই সীমানাহীন হয়ে উঠবে এবং তাঁর বিখ্যাত উক্তি— "যেখানে পৃথিবী সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদী বা বিভেদের দেওয়াল তুলে খণ্ড খণ্ড হয়ে যায়নি"—বাস্তবে রূপ নেবে, সেদিন উপমহাদেশে বিশ্বমানবতার অন্যতম প্রবক্তা হিসেবে তাঁর আর আলাদা করে প্রয়োজন পড়বে না। পাশাপাশি, 'স্বদেশী সমাজ' প্রবন্ধে তিনি সমাজের 'আত্মশক্তি'র জাগরণের কথা বলেছিলেন। যেদিন সমাজ তার নিজের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কল্যাণের দায়িত্ব স্বতঃস্ফূর্তভাবে পালন করবে এবং প্রতিটি সামাজিক প্রয়োজনের জন্য রাষ্ট্রের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকবে না, সেদিন রবীন্দ্রনাথের এই সমাজনৈতিক সতর্কবাণীগুলোর প্রাসঙ্গিকতা ফুরোবে।

দ্বিতীয়ত, যন্ত্রের চূড়ান্ত জয় এবং মানবিকতার বিলুপ্তিতে। রবীন্দ্রনাথের সবচেয়ে বড় ভয় ছিল মানুষের ওপর যন্ত্র ও যান্ত্রিকতার আধিপত্য বিস্তার। আধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং 'পোস্ট-হিউম্যানিজম'-এর যুগে রবীন্দ্রনাথের চিরতরে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ার এক ভয়ংকর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের মানবতাবাদের মূল ভিত্তি ছিল মানুষের আত্মিক সম্পর্ক ও সৃজনশীলতা। কিন্তু পশ্চিমা যান্ত্রিক সভ্যতার আগ্রাসন নিয়ে তিনি 'Nationalism' গ্রন্থে চরম উদ্বেগ প্রকাশ করে লিখেছিলেন যে এই যান্ত্রিক সভ্যতা তার নৈতিক দুর্নীতির উল্লাসনৃত্য চালিয়ে যাবে, ইস্পাতের সঙ্গে ইস্পাত এবং যন্ত্রের সঙ্গে যন্ত্রকে যুক্ত করে; আর অত্যন্ত নির্মমভাবে পদদলিত করবে মানুষের সহজ বিশ্বাসের সুমিষ্ট ফুল এবং চিরন্তন জীবন্ত আদর্শগুলোকে।

যেদিন মানুষের আবেগ, নৈতিকতা এবং সৃজনশীলতা পুরোপুরি অ্যালগরিদম ও যন্ত্রের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হবে; যেদিন প্রযুক্তি মানবিক মূল্যবোধের অধীনস্থ না থেকে মানবিকতাকেই সম্পূর্ণ গ্রাস করে নেবে, সেদিন রবীন্দ্রনাথের মানবতাবাদ এক অর্থহীন প্রলাপে পরিণত হবে। যেদিন যান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা মানুষকে পুরোপুরি 'গণনার বস্তুতে' বা নিছক পরিসংখ্যানে পরিণত করবে এবং মানুষের সৃজনশীলতাকে কৃত্রিম জড়তায় রূপান্তরিত করবে, সেদিন সেই অন্ধ ও বধির সমাজে রবীন্দ্র-দর্শন শোনার বা বোঝার মতো আর কোনো 'মানুষ' অবশিষ্ট থাকবে না।

প্রকৃতপক্ষে, রবীন্দ্রনাথ কেবল বিশ্বকবি ছিলেন না; তিনি ছিলেন মানুষের চেতনার রূপকার এবং এক সর্বজনীন মানবিকতার প্রবক্তা। যতদিন মানবসমাজে লোভ, হানাহানি, ধর্মের বা জাতপাতের নামে বিভেদ এবং আগ্রাসনের মতো অন্ধকার দিকগুলো থাকবে, ততদিন রবীন্দ্রনাথ এক অমোঘ আলোকবর্তিকা হয়ে প্রাসঙ্গিক থাকবেন। তাঁর গুরুত্ব বা তাঁর প্রতিষ্ঠিত বিশ্বভারতীর আদর্শ আগামী দিনে কতটা বাস্তবে প্রসারিত হবে, সেই উত্তর লুকিয়ে আছে বর্তমান প্রজন্মের চেতনায়।

রবীন্দ্রনাথ অপ্রাসঙ্গিক কেবল সেই দিনই হবেন—যেদিন মানুষ হয় দেবতার স্তরে উন্নীত হবে এবং একটি নিখুঁত সমাজ গড়বে; অথবা লোভ ও উগ্রতার কাছে আত্মসমর্পণ করে নিজের মনুষ্যত্বকেই চিরতরে বিসর্জন দেবে। এই দুই মেরুর মাঝামাঝি যেকোনো ক্রান্তিলগ্নে বা সংকটে, রবীন্দ্রনাথ থাকবেন মানবতার অন্যতম বিবেক এবং আশ্রয় হয়ে।

আরও পড়ুন...


Post Your Comments Below

নিচে আপনি আপনার মন্তব্য বাংলাতেও লিখতে পারেন।

বিঃ দ্রঃ
আপনার মন্তব্য বা কমেন্ট ইংরেজি ও বাংলা উভয় ভাষাতেই লিখতে পারেন। বাংলায় কোন মন্তব্য লিখতে হলে কোন ইউনিকোড বাংলা ফন্টেই লিখতে হবে যেমন আমার বাংলা কিংবা অভ্রো কী-বোর্ড (Avro Keyboard)। আমার বাংলা কিংবা অভ্রো কী-বোর্ডের সাহায্যে মাক্রোসফট্ ওয়ার্ডে (Microsoft Word) টাইপ করে সেখান থেকে কপি করে কমেন্ট বা মন্তব্য বক্সে পেস্ট করতে পারেন। আপনার কম্পিউটারে আমার বাংলা কিংবা অভ্রো কী-বোর্ড বাংলা সফ্টওয়ার না থাকলে নিম্নে দেয়া লিঙ্কে (Link) ক্লিক করে ফ্রিতে ডাওনলোড করে নিতে পারেন।

Free Download Avro Keyboard

Fields with * are mandatory





Posted comments

Till now no approved comments is available.