কখনও দাবদাহ, কখনও মেঘভাঙ্গা বৃষ্টি, বাড়ছে বিপর্যয়
পান্নালাল রায়
August 3, 2026
যদিও বর্তমানে দেশে বর্ষার ধুন্দুভি বেজে গেছে,তবু,গ্রীষ্মের দাবদাহের টাটকা স্মৃতি যেন আগামী দিনের জন্য বয়ে আনছে এক অশনি সংকেত। এবার তাপ প্রবাহে ইউরোপের মৃত্যুর মিছিল আমাদের জন্যও নিঃসন্দেহে এক বড় সতর্কিকরণ।শুধু গ্রীষ্মের তাপ প্রবাহ নয়,প্রাক বর্ষাতেও অকাল বর্ষণে বানভাসি হচ্ছে গ্রাম-শহর।কখনও অনাবৃষ্টি,কখনও অতিবৃষ্টির কবলে পড়ে দেশের নানা অঞ্চলে জীবন ও সম্পদহানি ঘটছে।ক্লাউডবার্স্ট বা মেঘের বিস্ফোরণের ঘটনায় সাম্প্রতিককালে উত্তর পূর্বাঞ্চলেও মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে।
এবার গ্রীষ্মে দাবদাহের ঘটনায় দেশে বিদেশে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।উল্লেখ করা যায় যে,২০২৪ সাল ছিল ১৯০১ সালের পর ভারতের সবচেয়ে উষ্ণ বছর।সে বছর গ্রীষ্মে ৪১ হাজারেরও মতো সন্দেহজনক হিটস্ট্রোকের ঘটনা ঘটেছিল এবং তাতে বহু মানুষের মৃত্যুও ঘটেছিল।দেশের সর্বাধিক তাপ প্রবাহের কবলে পড়া রাজ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে রাজস্থান,গুজরাট,দিল্লি, উত্তর প্রদেশ, বিহার, মধ্যপ্রদেশ।সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের উপকূলবর্তী অঞ্চল সহ আমাদের উত্তর পূর্বাঞ্চলও প্রবল গরমের মুখে পড়ছে।কোনও অঞ্চলের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেশি হলে এবং তা নির্দিষ্ট সময় ধরে স্হায়ী হলে তাকে তাপ প্রবাহ বলে ধরে নেয়া হয়।সাম্প্রতিককালে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এমনটাই ঘটছে।জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বিভিন্ন অঞ্চলে তাপ প্রবাহের তীব্রতা ও স্হায়ীত্ব উল্লেখযোগ্য ভাবে বেড়েছে।
এবার ইউরোপের তীব্র দাবদাহের ঘটনা সংবাদ মাধ্যমের শিরোনাম কেড়ে নিয়েছে। ইউরোপে ভয়াবহ তাপ প্রবাহে ইতিমধ্যেই ১৩০০ মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।তার মধ্যে শুধু ফ্রান্সেই সহস্রাধিক মৃত্যু ঘটেছে।বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও এই পরিস্থিতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।গত জুন মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে ইউরোপে এই অস্বাভাবিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক বলেছেন, প্রায় ১৫ কোটি মানুষ এই তাপ প্রবাহের কবলে পড়েছেন।সাম্প্রতিক কালে প্রায় প্রতিবছরই এমনটা ঘটছে।এই পরিস্থিতির জন্য জলবায়ু পরিবর্তনকেই দায়ী করেছেন তিনি। ফ্রান্সের মতো জার্মানির অবস্থাও উদ্বেগজনক। সংবাদে প্রকাশ সেখানে কোনও কোনও জায়গায় মানুষকে ঠান্ডার আবেশ দিতে জল ছিটোবার জন্য জলকামান ব্যবহার করা হচ্ছে।তাপ প্রবাহের জেরে জার্মানির অরণ্যাঞ্চলে দাবানলও ছড়িয়ে পড়েছে।বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে প্রতি বছর সারা বিশ্বে তাপ প্রবাহ সংশ্লিষ্ট কারণে ৪.৯ লক্ষ মানুষের মৃত্যু ঘটে থাকে।এর ৪৫ শতাংশই ঘটে এশিয়া মহাদেশে। তাপ প্রবাহকে এখন আর আবহাওয়ার বিচ্ছিন্ন কোনও ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে না।বিশ্বে জনস্বাস্থ্যের পক্ষে এখন এটা সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।জলবায়ু পরিবর্তন এবং দ্রুত নগরায়নের জন্য তাপ প্রবাহ বাড়ছে বলে মনে করা হচ্ছে।ভারতে তাপ প্রবাহের জন্য প্রতি বছর ৩৪০০ থেকে ৩০ হাজার মতো অতিরিক্ত মৃত্যুর ঘটনা ঘটে থাকে।তাপ প্রবাহের মাত্রা ও তার স্হায়ীত্বের উপর নির্ভর করে মৃত্যুর সংখ্যা।ভারতে কোটি কোটি মানুষ গ্রীষ্মের দাবদাহের দিনে ঘরের বাইরে খোলা জায়গায় ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে কাজ করে থাকে।দেশের উষ্ণ অঞ্চলে তাপ প্রবাহের মাত্রা বাড়ছে।বাড়ছে তার এলাকাও। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে তাপ প্রবাহ আজ ভয়াবহ আকার ধারণ করছে।সাম্প্রতিক তথ্যে প্রকাশ, পৃথিবীর প্রায় দুইশো কোটি মানুষের কাছে তীব্র গরম থেকে বাঁচার মতো প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেই। সুরক্ষার অভাব সত্ত্বেও একশো কোটি মানুষ নিজেদের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দিতে বাধ্য হচ্ছেন।
এই তাপ প্রবাহের কবল থেকে মুক্ত নয় আমাদের উত্তর পূর্বাঞ্চল এবং উত্তর পূর্বাঞ্চলের ত্রিপুরাও।গত পাঁচ বছরের তথ্যে দেখা যায় গ্রীষ্মকালে (মার্চ থেকে মে মাস)আগরতলার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ক্রমাগত বেড়ে চলেছে।২০২১ সালে গ্রীষ্মে আগরতলার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৯.০ ডিগ্রি সেলসিয়াস,২০২২ সালে তা দাঁড়ায় ৩৯.৫ ডিগ্রি,২০২৩ সালে ৩৯.৮ ডিগ্রি,২০২৪ সালে ৪০.৫ ডিগ্রি এবং ২০২৫ সালে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা দাঁড়িয়েছিল ৪০.২ ডিগ্রি।দশ বছর আগে ২০১৬ সালে গ্রীষ্মে আগরতলার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৮.৮ ডিগ্রি।সব মিলিয়ে গত এক দশকে আগরতলায় গ্রীষ্মে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে যা কিনা জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
তাপ প্রবাহের কারণে শুধু মানুষের মৃত্যুই নয়,কৃষি উৎপাদন, অর্থনৈতিক অবস্থা,জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রেও বিরাট বিরূপ প্রভাব ফেলে।দেখা দেয় পানীয় জলের সংকট।নদীনালা ও জলাশয় সমূহ গ্রীষ্মের দাবদাহের দিনে শুকিয়ে গেলে জলের সংকট তীব্র আকার ধারণ করে।২০২৪ সালে তাপ প্রবাহের কারণে দেশের বহু অঞ্চলে পানীয় জলের সংকট দেখা দিয়েছিল।রাজধানী দিল্লি সহ দেশের বিভিন্ন শহরে তীব্র আকার ধারণ করেছিল জল সংকট।নদীনালা সহ জলাশয়ে জলের অভাব দেখা দিলে আমাদের ভূগর্ভস্থ জলের উপরই নির্ভর করতে হয়।কিন্তু ব্যাঙ্গালুরু সহ দেশের কোনও কোনও বড় শহরে ভূগর্ভস্থ জলের ভাণ্ডারে টান পড়ায় এই সংকট স্বাভাবিক ভাবেই তীব্রতর হয়।সাম্প্রতিক কালে বিভিন্ন রাজ্যে জল সংরক্ষণের উপর ব্যাপক গুরুত্ব আরোপ করা হচ্ছে।
বিগত কয়েকটি বছরের মতো চলতি বছরও গ্রীষ্মের দাবদাহ শুরু হতেই মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে উঠে।ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা স্কুলে অসুস্থ হয়ে পড়ে।বিভিন্ন এলাকায় স্কুলের ছুটি এগিয়ে আনার দাবি উঠে।তীব্র গরমের মোকাবেলা সহ সুস্থ থাকার জন্য বিভিন্ন স্বাস্থ্য নির্দেশিকা জারি করা হয়।সব মিলিয়ে মনোরম বসন্তের পর গ্রীষ্ম হয়ে উঠে অসহনীয়। এ যেন আর আম-কাঠালের সেই গ্রীষ্ম নয়,এখন গ্রীষ্ম বয়ে আনছে উত্তরোত্তর তাপ প্রবাহের আশঙ্কা। জনজীবনে নেমে আসছে সংকট।প্রকৃতির কাছে মানুষের অসহায়ত্ব ফুটে উঠছে।প্রকট হচ্ছে ভবিষ্যতে এক চরম বিপর্যয়ের পদধ্বনি।কিন্তু কেন এমনটা ঘটছে? এর উত্তরটাও প্রায় সকলের জানা।সবাই বলবেন জলবায়ু পরিবর্তনের কথা।কেন জলবায়ুর পরিবর্তন ঘটছে তা নিয়েও সাম্প্রতিককালে বিস্তর আলোচনা চলছে।উঠে আসছে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের অভিমত।
গ্রীষ্মের ভয়াবহ দাবদাহের দাপটের পর আবার লাগাম ছাড়া অকাল বর্ষণে বানভাসি হচ্ছে গ্রাম শহর।সাম্প্রতিককালে প্রাক বর্ষাতেই টানা বর্ষণে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে।শহরের পথঘাট জলের তলায় চলে যাচ্ছে।এবারও প্রাক বর্ষার বর্ষণে আগরতলা,শিলচর, গুয়াহাটির জনজীবন বিপর্যস্ত হয়েছে।শহরের রাস্তাঘাট ডুবে গেছে।এমনকি গুয়াহাটিতে জলমগ্ন রাস্তায় দুই পথচারীর মৃত্যুর ঘটনা পর্যন্ত ঘটেছে।শুধু অকাল বর্ষণের জেরে শহরাঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগই নয়,অনেক গ্রামাঞ্চলও প্লাবিত হয়েছে।বরাক উপত্যকার বিভিন্ন অঞ্চলে প্রাক বর্ষাতেই বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল।নিম্নাঞ্চলে মানুষের ঘরবাড়ি প্লাবিত হওয়ার পাশাপাশি ফসলেরও বিস্তর ক্ষতি হয়েছে এই অকাল বন্যায়।
সাম্প্রতিককালে আবার মেঘ ভাঙ্গা বৃষ্টি আর হড়পা বানের মতো আকস্মিক বিপর্যয় নেমে আসছে উত্তর পূর্বাঞ্চল সহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে।সম্প্রতি অরুণাচল প্রদেশে এই মেঘ ভাঙ্গা বৃষ্টি বা ক্লাউডবার্স্টের ঘটনায় কয়েকজনের মৃত্যু ঘটেছে।খুব অল্প সময়ের মধ্যে কোনও এলাকায় প্রচুর পরিমাণে বৃষ্টি হলে তা ক্লাউডবার্স্ট হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকে।এ ধরণের বর্ষণে দ্রুত জমা বিপুল জলরাশি ভয়াবহ বিপর্যয় সৃষ্টি করে।যেমন ২৫ মি মি বর্ষণে প্রতি বর্গ কিলোমিটার এলাকায় ২৫ হাজার মেট্রিক টন জলরাশি হয়,যা হড়পা বানের সৃষ্টি করে সব কিছু ভাসিয়ে নিতে পারে।আরও সহজ করে বললে,মেঘ ভাঙ্গা বৃষ্টি বা ক্লাউডবার্স্ট হচ্ছে খুব অল্প সময়ে সীমিত এলাকায় তীব্র বর্ষণ।এক ঘন্টারও কম সময়ে ১০ সে:মি:'র বেশি বর্ষণ হলে এমনটা ঘটতে পারে।সম্প্রতি মেঘভাঙ্গা বৃষ্টির কবলে পড়ে বিপর্যস্ত হয়েছে অরুণাচল প্রদেশ।এতে কয়েকজনের মৃত্যুর পাশাপাশি বহু ঘরবাড়ি,রাস্তাঘাট বিধ্বস্ত হয়েছে।নীপকো কলোনী ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় সড়ক যোগাযোগ স্তব্ধ হয়ে পড়েছে।প্রবল বর্ষণে ধস নেমেছে অনেক জায়গায়।ফসলের ক্ষতি হয়েছে।
সব মিলিয়ে আজ খরা,বন্যা,মেঘভাঙ্গা বৃষ্টির মতো প্রাকৃতিক বিপর্যয় নেমে আসছে ঘন ঘন।একদিকে তাপ প্রবাহের মতো বিপর্যয়ের সতর্কবার্তা জারি করছেন বিজ্ঞানীরা,অপরদিকে বাড়ছে অকাল বন্যা সহ মেঘভাঙ্গা বৃষ্টির বিপর্যয়ও!কিন্তু কেন এমন ঘটছে? বিজ্ঞানীরা বিশ্ব ব্যাপী উষ্ণতা বৃদ্ধির সঙ্গে 'এল নিনো'র সম্পর্কের কথা বলছেন।যাইহোক, সাধারণ মানুষ কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন, বিশ্ব উষ্ণায়ণ ইত্যাদি বিষয়গুলো এতটা না বুঝলেও এটা স্পষ্ট বুঝতে পারছেন যে,প্রকৃতি ধ্বংসের কারণেই আজ প্রকৃতির ছন্দ পতন ঘটছে।বিপর্যয় ঘনীভূত হচ্ছে।আর এটাও ঘটনা যে মানুষের জীবন-জীবিকার জন্য প্রকৃতির উপর যতটা আঘাত আসছে তার থেকে অনেক বেশি পরিমাণে প্রকৃতি ধ্বংস হচ্ছে মানুষের অপরিমিত লোভের কারণে।বন কেটে বসত যেমন গড়ে উঠছে,তেমনই নির্বিচারে চলছে বৃক্ষমেধ,চলছে অরণ্য ধ্বংস।তবে বৃক্ষ রোপণ তথা বন সৃজন যে চলছে না এমনটা কিন্তু নয়।কিন্তু ধ্বংসের তুলনায় সৃষ্টি কম।সর্বোপরি বৃক্ষ রোপণ হলেও হারিয়ে যাচ্ছে সেই চিরহরিৎ বন।সবুজ প্রকৃতিকে তার আপন বৈভবে আবার ফিরিয়ে না আনতে পারলে বিপর্যয়ের মাত্রা কিন্তু দিনে দিনে বাড়তেই থাকবে!
আরও পড়ুন...