অনুরাগ ধানকর :ইউনিফর্মের ওপারে একজন প্রকৃত ভদ্রলোক ছিলেন, প্রকৃত শ্রদ্ধাঞ্জলি হোক নিরপেক্ষ তদন্ত

জয়ন্ত দেবনাথ

July 22, 2026

সাংবাদিক জীবনে এমন কিছু লেখা থাকে, যা কোনোদিন লিখতে চাই না। ত্রিপুরার পুলিশের মহা পরিচালক (ডিজিপি) অনুরাগ ধানকরের অকাল মৃত্যু নিয়ে এই লেখাটি তেমনই এক বেদনাদায়কলেখা।

আমার কাছে অনুরাগ ধানকর শুধু রাজ্যের ডিজিপি ছিলেন না। দীর্ঘদিনের সাংবাদিকতার সূত্রে তাঁকে খুব কাছ থেকে দেখার ও জানার সুযোগ হয়েছে। তিনি ছিলেন অত্যন্ত ভদ্র, বিনয়ী, সংযত ও সহজ-সরল, একজন ভাল মানুষ। পদমর্যাদার অহংকার তাঁর মধ্যে কোনোদিন দেখিনি। একজন সাধারণ সাংবাদিক থেকে শুরু করে একজন কনস্টেবল, সবার সঙ্গে তিনি সমান আন্তরিকতা ও সম্মানের সঙ্গে কথা বলতেন। উত্তর প্রদেশের অজ গ্রামের মানুষ ছিলেন। তাই সাধারণ মানুষের দুঃখ কষ্ট সহজেই বুঝতেন। কঠিন পরিস্থিতিতেও তাঁকে কখনও উত্তেজিত হতে দেখিনি।

এক কথায়- একজন দক্ষ প্রশাসক হওয়ার পাশাপাশি তিনি ছিলেন একজন অসাধারণ ভাল মানুষ।

আজ সেই মানুষটি আর নেই। ২০ জুলাই, ২০২৬ নিজের অফিসের বাতরুমে নিজের স্ত্রীর ব্যবহারের একটি দুপাট্টা দিয়ে ফাসীতে আত্মহত্যা করলেন তিনি। যাঁর কাঁধে ছিল ত্রিপুরার আইন-শৃঙ্খলার সর্বোচ্চ দায়িত্ব, যিনি ১৯৯৫ সাল থেকে তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে নিষ্ঠা, সততা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে ত্রিপুরা ও দেশের মানুষের নিরাপত্তার জন্য কাজ করেছেন, রাষ্ট্র ২১ জুলাই ২০২৬ তাঁকে গার্ড অব অনার দিয়ে বিদায় দিয়েছে, রাজ্য সরকার শোক পালন করেছে, তার অসংখ্য সহকর্মী অফিসার চোখের জলে বিদায় জানিয়েছেন। তাঁর আকস্মিক প্রয়াণে ত্রিপুরার মুখ্যসচিব জে কে সিনহা চোখের জল ফেলেছেন। কিন্তু এই সবকিছুর মধ্যেও একটি প্রশ্ন আজ গোটা ত্রিপুরাবাসীর মনে ঘুরপাক খাচ্ছে, এমন একজন অফিসারের মৃত্যু কীভাবে ফাসীতে ঘটল? তাও নিজের অফিসের বাতরুমে?

দল মত নির্বিশেষে এটা সবাই বলছেন, অনুরাগ ধানকরের কর্মজীবন ছিল অত্যন্ত গৌরবময়। ত্রিপুরা ক্যাডারের ১৯৯৪ ব্যাচের আইপিএস অফিসার হিসেবে তিনি এসডিপিও থেকে শুরু করে ডিজিপি পর্যন্ত প্রতিটি দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেছেন। সিবিআই, সিআইএসএফ, জাতিসংঘের কসোভো শান্তিরক্ষা মিশন, ১৯৮৪-র শিখবিরোধী দাঙ্গার বিশেষ তদন্তকারী অফিসার এবং নীরব মোদী-সংক্রান্ত পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাংক জালিয়াতি মামলার মতো সংবেদনশীল তদন্তেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। এমন একজন দক্ষ তদন্তকারী অফিসারের নিজের মৃত্যুই আজ একটি রহস্যের সৃষ্টি করেছে। বিশেষত, নিজের অফিসের বাতরুমে তাঁর অস্বাভাবিক মৃত্যু স্বাভাবিকভাবেই অসংখ্য প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। এই প্রশ্ন গুলো কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থেকে নয়, বরং একজন নাগরিকের স্বাভাবিক কৌতূহল ও ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা থেকেই উঠে এসেছে।

এখনও পর্যন্ত বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে যে তাঁর দুটি মোবাইল ফোনের সন্ধান মেলেনি। একটি কথিত সুইসাইড নোট নিয়ে নানা আলোচনা হলেও তদন্তকারী সংস্থা গুলি এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে তার অস্তিত্ব নিশ্চিত করেনি। ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা প্রাথমিক ভাবে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন এবং চূড়ান্ত মতামত পোস্টমর্টেম ও বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার ওপর নির্ভর করবে বলে জানিয়েছেন। মৃত্যুর কয়েক দিন আগে তিনি সীমান্তবর্তী জেলার এসপিদের নিয়ে দিল্লিতে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠকে অংশগ্রহণ করেছিলেন।সেই সফরের পর থেকেই তিনি মানসিক চাপে ছিলেন বলে বিভিন্ন সূত্রে দাবি করা হলেও কোনো সরকারি সংস্থা এখনও এইসব বিষয়ে কোনো নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি।

এই তথ্য গুলোর কোনোটিই চূড়ান্ত সত্য নয়। এগুলো তদন্তের বিষয়। আর সেই কারণেই আজ সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন একটি এমন তদন্ত, যার প্রতি সাধারণ মানুষের পূর্ণ আস্থা থাকবে।

ভারপ্রাপ্ত ডিজিপি জি এস রাও বহু সিনিয়র পুলিশ অফিসারকে নিয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন। মুখ্যমন্ত্রী অধ্যাপক (ড.) মানিক সাহাও আশ্বাস দিয়েছেন যে আইন অনুযায়ী সমস্ত দিক তদন্ত করে সত্য সামনে আনা হবে। বিজেপির রাজ্য সভাপতি অভিষেক দেবরায়ও বলেছেন, কথিত সুইসাইড নোট-সহ প্রতিটি বিষয় তদন্তের আওতায় আসবে। এই আশ্বাস গুলিকে এখন বাস্তব রূপ দিতে হবে। কিন্ত বিরোধীদল নেতা জীতেন্দ্র চৌধুরী, কংগ্রেসের সুদীপ রায় বর্মন চাইছেন ত্রিপুরা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে বিচার বিভাগীয় তদন্ত হোক। তারা মনে করেন পেশাগত অসংখ্য চাপ ছিল তাঁর উপর। এবং সেই চাপ সহ্য না করতে

পেরেই তিনি আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। তাদের মতে, ত্রিপুরার কোন অফিসার আমলাদের নিরপেক্ষ ভাবে কাজ করতে দিচ্ছেনা বিজেপির সরকার। একজন প্রাক্তন পুলিশ অফিসারের হস্তক্ষেপ কাজ করত তার সমস্ত সিদ্ধান্তে। এক্ষেত্রে পুলিশের মেরুদন্ড পুরোপুরিই ভেঙ্গে দেয়া হয়েছে।

আমার মতে, রাজ্য সরকারের উচিত এইসব অভিযোগ ও ডিজিপি-র রহস্যজনক মৃত্যুর তদন্তকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এই ঘটনার দ্রুত তদন্ত করা। ঘটনার সঙ্গে যুক্ত সমস্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ সংরক্ষণ করা, নিখোঁজ মোবাইল ফোন দুটি দ্রুত উদ্ধার করে তার ডিজিটাল তথ্য বিশ্লেষণ করা, সিসিটিভি ফুটেজ, কল রেকর্ড, ই-মেল, ফরেনসিক রিপোর্ট, পোস্টমর্টেম রিপোর্ট এবং ঘটনার আগে ও পরে যাঁরা তাঁর সংস্পর্শে এসেছিলেন তাঁদের প্রত্যেকের বক্তব্য অত্যন্ত পেশাদারিত্বের সঙ্গে পরীক্ষা করা প্রয়োজন। প্রয়োজনে তাঁর স্ত্রীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা যেতে পারে। কেননা, স্বামীর মৃত্যুর পর তিনি মিডিয়ার প্রতিনিধিদের বার বার চেষ্টার পরেও কোনও প্রশ্নের উত্তর দেন নাই। যদিও বিরোধী দলের অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন তাকে মিডিয়ার সাথে কথা বলতে দেয়া হয়নি। তাই সব অভিযোগ, সন্দেহ ও পাল্টা তথ্য গুলোর রহস্য উদ্ঘাটনে তদন্ত এমন হতে হবে যাতে ভবিষ্যতে কোনো প্রশ্ন অবশিষ্ট না থাকে। প্রয়োজনে জনমনে পূর্ণ আস্থা প্রতিষ্ঠার স্বার্থে সরকার আরও বিস্তৃত বা স্বাধীন তদন্তের সম্ভাবনাও আইনসম্মতভাবে বিবেচনা করতে পারেন।

এই তদন্ত কোনো ব্যক্তি, কোনো রাজনৈতিক দল বা কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নয়। এই তদন্ত শুধুমাত্র একজন প্রয়াত আইপিএস অফিসারের প্রতি ন্যায়বিচারের জন্যও নয়। তাঁর পরিবারের প্রতি যেমন আমাদের দায়িত্ব রয়েছে, পাশাপাশি ত্রিপুরার গোটা পুলিশ বাহিনীর মনোবল ধরে রাখতেও এর সুষ্ঠু তদন্ত প্রয়োজন। পুলিশের লোকদেরও অধিকার রয়েছে তাদের অভিভাবকের কিভাবে, কেন এমন অপমৃত্যু হয়েছে তা জানার। তাঁর সহকর্মীদের প্রতি আমাদের দায়িত্ব সর্বাগ্রে পূরন করা উচিত, যাতে ভবিষ্যতে কেউ আঙ্গুল তুলে বলতে না পারেন এরাজ্যের ডিজিপি-র রহস্য মৃত্যুর তদন্ত হয়নি।

সবচেয়ে বড় কথা, অনুরাগ ধানকরের মৃত্যু আমাদের আরেকটি বড় শিক্ষা দিয়েছে। ইউনিফর্মের আড়ালেও একজন মানুষের মন থাকে। তাঁরও মানসিক চাপ, পারিবারিক ঝামেলা, প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ এবং ব্যক্তিগত অনুভূতি ছিল। তাই পুলিশ বাহিনী এবং উচ্চপদস্থ প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের মানসিক সুস্থতার বিষয়টিকেও এখন থেকে আরও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত। মানসিক সুস্থতার জন্য চিকিৎসা সহায়তা গ্রহণ দুর্বলতার পরিচয় নয়। বরং সেটিই আজকের যুগে সবচেয়ে বড় লাইফ স্টাইল ডিজিজ। তাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে।

অনুরাগ ধানকর তাঁর পুরো কর্মজীবন অন্যদের জন্য ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে ব্যয় করেছেন। আজ সময় এসেছে তাঁর নিজের মৃত্যুর রহস্য উদ্ঘাটনের মাধ্যমে তাঁকেও ন্যায়বিচার দেওয়ার।

রাষ্ট্রের দেওয়া গার্ড অব অনার, এক দিনের রাষ্ট্রীয় শোক কিংবা হাজারো মানুষের অশ্রু, এসবই তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধার প্রকাশ। কিন্তু তাঁর প্রতি ত্রিপুরার সবচেয়ে বড় শ্রদ্ধাঞ্জলি হবে একটি নির্ভীক, নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ, বৈজ্ঞানিক এবং দ্রুত তদন্ত, যা সমস্ত প্রশ্নের উত্তর দেবে এবং সত্যকে মানুষের সামনে তুলে ধরবে।

অনুরাগ ধানকর আর ফিরে আসবেন না। কিন্তু সত্য সামনে এলে তাঁর পুলিশ বাহিনীর পাশাপাশি নিকট জনদের কষ্ট কিছুটা হলেও লাঘব হবে, ত্রিপুরার সরকারের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরে আসবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বিশ্বাস করবে

যে ত্রিপুরায় সত্যকে কখনও চাপা দেওয়া হয় না, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়, আর কর্তব্যনিষ্ঠ একজন পুলিশ অফিসার তাঁর মৃত্যুর পরও ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হন নাই।

শ্রদ্ধাঞ্জলি, অনুরাগ ধানকর। আপনার আত্মা শান্তিতে থাকুক। আর সত্যের জয় হোক।

(লেখক একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও ত্রিপুরাইনফো-র সম্পাদক )

আরও পড়ুন...


Post Your Comments Below

নিচে আপনি আপনার মন্তব্য বাংলাতেও লিখতে পারেন।

বিঃ দ্রঃ
আপনার মন্তব্য বা কমেন্ট ইংরেজি ও বাংলা উভয় ভাষাতেই লিখতে পারেন। বাংলায় কোন মন্তব্য লিখতে হলে কোন ইউনিকোড বাংলা ফন্টেই লিখতে হবে যেমন আমার বাংলা কিংবা অভ্রো কী-বোর্ড (Avro Keyboard)। আমার বাংলা কিংবা অভ্রো কী-বোর্ডের সাহায্যে মাক্রোসফট্ ওয়ার্ডে (Microsoft Word) টাইপ করে সেখান থেকে কপি করে কমেন্ট বা মন্তব্য বক্সে পেস্ট করতে পারেন। আপনার কম্পিউটারে আমার বাংলা কিংবা অভ্রো কী-বোর্ড বাংলা সফ্টওয়ার না থাকলে নিম্নে দেয়া লিঙ্কে (Link) ক্লিক করে ফ্রিতে ডাওনলোড করে নিতে পারেন।

Free Download Avro Keyboard

Fields with * are mandatory





Posted comments

Till now no approved comments is available.