ত্রিপুরা বিজনেস কনক্লেভ ২০২৬ : বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতির ২০% বাস্তবায়িত হলেও বদলে যেতে পারে ত্রিপুরার ভবিষ্যৎ

জয়ন্ত দেবনাথ

July 12, 2026

স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় ধরে ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা, সীমিত শিল্পায়ন এবং কর্মসংস্থানের অভাবে পিছিয়ে থাকা ত্রিপুরা আজ এক নতুন সম্ভাবনার দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে। সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে রাজ্য সরকার শিল্প বাণিজ্য খাতে বিনিয়োগের যে উদ্যোগ নিয়েছে, তার অন্যতম উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত 'ডেস্টিনেশন ত্রিপুরা বিজনেস কনক্লেভ ২০২৬'। গত ৯ ও ১০ জুলাই অনুষ্ঠিত দুই দিনব্যাপী এই কনক্লেভ শুধুমাত্র একটি বিনিয়োগ সম্মেলন নয়, বরং ত্রিপুরাকে উত্তর-পূর্ব ভারতের অন্যতম শিল্প ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ।

আয়োজক দপ্তর রাজ্যের শিল্প ও বাণিজ্য দপ্তরের দাবী অনুযায়ী, ত্রিপুরার উন্নয়নের সাথে যুক্ত বিভিন্ন দপ্তরের সমন্বিত উদ্যোগে আয়োজিত এই কনক্লেভে বিদেশের এগারটি দেশ, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ২,৭৩১-এরও বেশি নিবন্ধন, প্রায় ২,০০০ বিনিয়োগকারী এবং ১,২০০-রও বেশি সংস্থা অংশগ্রহণ করে। সব মিলিয়ে ৩৪২টি সমঝোতা স্মারক (MoU) ও বিনিয়োগের আগ্রহপত্র জমা পড়ে, যার সম্ভাব্য বিনিয়োগের পরিমাণ ১ লক্ষ ২১ হাজার ৩০৩ কোটি টাকা। ত্রিপুরার ইতিহাসে এত বড় বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি এর আগে কখনও দেখা যায়নি।

সেক্টর ভিত্তিক বিনিয়োগের মধ্যে শিল্প ও বাণিজ্যে ৩০,০০০ কোটি টাকা, ত্রিপুরা স্টেট ইলেকট্রিসিটি কর্পোরেশন (TSECL)-এ ১৮,১০০ কোটি, নগর উন্নয়নে ১৫,৭৪২ কোটি, তথ্যপ্রযুক্তিতে ১৩,২৪৮ কোটি, নবায়নযোগ্য শক্তি, সৌরবিদ্যুৎ, ব্যাটারি ও বৈদ্যুতিক গাড়ির চার্জিং অবকাঠামোয় ১২,৯৮০ কোটি, পর্যটনে ১২,৩০৩ কোটি, স্বাস্থ্য পরিষেবায় ৪,০০০ কোটি, পরিবহনে ৩,০৫৬ কোটি, উচ্চশিক্ষায় ৩,০০০ কোটি, পশুপালনে ২,৬৫০ কোটি, বাঁশ, রাবার ও আগর শিল্পে ১,৭০০ কোটি, কৃষি ও উদ্যানপালনে ১,৬৭৫ কোটি এবং স্কুল শিক্ষায় ৫৬৮ কোটি টাকা বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করা হয়েছে।

এই কনক্লেভে গুগল, সেলসফোর্স, লুলু গ্রুপ ইন্টারন্যাশনাল, পাওয়ার ফাইন্যান্স কর্পোরেশন, জিন্দাল গ্রুপের আর্ভি, ইন্ডিয়ান অয়েল, জি আই জেড (GIZ Germany), অম্বুজা নেওটিয়া, এন এল সি ইন্ডিয়া, মেকলেক, সুমনদীপ বিদ্যাপীঠ, ভুটোরিয়া লজিস্টিকস, আত্রি গ্রুপ সহ বহু দেশি-বিদেশি সংস্থা অংশগ্রহণ করেছেন। পাশাপাশি বাংলাদেশ, জাপান, দক্ষিণ আফ্রিকা, নেপাল, ফিলিপাইন, কাজাখিস্তান, লাওস, চিলি, উজবেকিস্তান এবং তিমুর-লেস্তের কূটনৈতিক প্রতিনিধিদের উপস্থিতি কনক্লেভকে আন্তর্জাতিক মাত্রা দেয়।

মুখ্যমন্ত্রী অধ্যাপক (ড.) মানিক সাহা, ভার্চুয়ালি কেন্দ্রীয় বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল, উত্তর-পূর্বাঞ্চল উন্নয়নমন্ত্রী জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়া এই অনুষ্ঠানে ভাষণ দেন। শারিরীক ভাবে উপস্থিত ছিলেন ত্রিপুরার অধিকাংশ মন্ত্রী, মুখ্যসচিব, সচিবগন সহ কেন্দ্রীয় সরকারের প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ড. ভি অনন্ত নাগেশ্বরন, শ্রী কেশব কুমার পাঠক, বিশেষ সচিব, ক্যাবিনেট সচিবালয়, ভারত সরকার সহ ত্রিপুরার অধিকাংশ বিশিষ্ট শিল্প বাণিজ্য ক্ষেত্রের উদ্যোগী ব্যক্তিরা। ত্রিপুরার শিল্প সচিব কিরণ গিত্তে, আইএএস, শিল্প বাণিজ্য দপ্তরের অধিকর্তা দীপক কুমার, আইএএস, কনক্লেভে ত্রিপুরার বিনিয়োগ সম্ভাবনা তুলে ধরেন। বিশেষ করে ড. নাগেশ্বরন সরকারী নিয়মকানুন অনুসরণ সংক্রান্ত বাধ্যবাধকতা হ্রাস ও নিয়ন্ত্রণ শিথিলকরণ উদ্যোগ- (Compliance Reduction and Deregulation Initiative)-এর আওতায় ৫১টি অগ্রাধিকারমূলক সংস্কার সম্পন্নকারী দেশের প্রথম রাজ্য হিসেবে ত্রিপুরার ভূয়সী প্রশংসা করেন।

তবে কনক্লেভে উপস্থিত শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীরা একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তব সমস্যার কথাও তুলে ধরেছেন। তাঁদের মতে, এক্ট ইস্ট পলিসির আওতায় উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বিপুল অবকাঠামো গড়ে উঠলেও সীমান্ত বাণিজ্যের পূর্ণ সম্ভাবনা এখনও কাজে লাগানো যায়নি। বিশেষ করে মৈত্রী সেতু, সাব্রুম ও বাংলাদেশের রামগড় শিল্প করিডোর এবং আধুনিক ইন্টিগ্রেটেড চেক পোস্ট (ICP)-গুলিকে পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর করা যায়নি। ত্রিপুরার শিল্প বাণিজ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, মৈত্রী সেতু ও সীমান্ত ওপারের সাথে রেল, বিমান দ্রুত চালু না করলে ত্রিপুরা কখনও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রকৃত প্রবেশদ্বার হয়ে উঠতে পারবে না।

সরকারি তথ্যে দেখা গেছে, আগরতলা, শ্রীমন্তপুর ও সবরুমে অত্যাধুনিক ল্যান্ড পোর্ট গড়ে উঠেছে। সাব্রুম থেকে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর মাত্র ৭২ কিলোমিটার দূরে। কিন্তু এখনও পূর্ণাঙ্গ কাস্টমস, কার্গো হ্যান্ডলিং এবং বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু না হওয়ায় এই অবকাঠামোর পূর্ণ সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে না।

রাজ্য ও বহিঃ রাজ্যের বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়ীদের মতে, এই করিডোর কার্যকর হলে পরিবহন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে, রপ্তানি বৃদ্ধি পাবে, নতুন শিল্প গড়ে উঠবে এবং হাজার হাজার কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

ত্রিপুরা বিজনেস কনক্লেভ ২০২৬ অনুষ্ঠানের পরে এটা নিঃসন্দেহ সবাই স্বীকার করছেন যে, ত্রিপুরার সামনে আজ সত্যিই একটি ঐতিহাসিক সুযোগ এসেছে। কিন্তু এই সুযোগকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে শুধু সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করলেই হবে না। এগুলোর দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে আর সেটাই হল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কেননা, বিনিয়োগকারীদের জন্য মুখে সিঙ্গেল ইউন্ডো ক্লিযারেন্স সিস্টেমে দ্রুত জমি বরাদ্দ, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, উন্নত সড়ক ও গ্যাস সংযোগ, পুর নিগমের বিল্ডিং প্ল্যানের ছাড় পত্রের কথা বলা হলেও বাস্তবে এখনও ত্রিপুরাতে শিল্প বাণিজ্য স্থাপনের ছাড়পত্র পাওয়া ততটাই কঠিন। ছোট্ট একটা ভুল সংশোধন করতে বা বাধ্যতামূলক সার্টিফিকেটের জন্য দূষণ নিয়ন্ত্রণ, অগ্নি নির্বাপক বিভাগ, কিংবা পুর নিগমে মাসের পর মাস চক্কর কাটতে হয়। সহজ ব্যাংক ঋণ, দ্রুত সরকারি অনুমোদন পদ্ধতি কার্যকর করে সিঙ্গেল উইন্ডো সিস্টেম, সীমান্ত বাণিজ্যের প্রতিবন্ধকতা দূরীকরণ এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা বজায় রাখার মতো বিষয় গুলিতে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি নিয়মিত পর্যালোচনা, নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাও অত্যন্ত জরুরি।

একজন সাংবাদিক হিসেবে আমার ব্যক্তিগত মূল্যায়ন হল, এবারের ত্রিপুরা বিজনেস কনক্লেভের আয়োজন বা ত্রিপুরা সরকারের বিনিয়োগ টানার উদ্যোগ নিঃসন্দেহে অত্যন্ত প্রশংসনীয়। কিছু ত্রুটি বিচ্যুতি থাকলেও, জাতীয় মানের এমন একটি বিজনেস কনক্লেভ সফল ভাবে আয়োজন করে মুখ্যমন্ত্রী অধ্যাপক ডাঃ মানিক সাহার নেতৃত্বে টিম ত্রিপুরা স্পষ্ট বার্তা দেয়ার চেষ্টা করেছেন যে তারা শিল্পায়ন ও বিনিয়োগের মাধ্যমে ত্রিপুরার অর্থনীতিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে চান।

তবে ত্রিপুরার ইতিহাস আমাদের এটাও শেখায় যে মৌ স্বাক্ষর আর প্রকল্প বাস্তবায়ন এক বিষয় নয়। সাম্প্রতিক ও অতীতের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, ঘোষিত বিনিয়োগের অনেকটাই শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয় না। তাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে এই প্রতিশ্রুতি গুলিকে বাস্তব প্রকল্পে রূপান্তর করা।

আমার দৃঢ় বিশ্বাস, যদি ১ লক্ষ ২১ হাজার ৩০৩ কোটি টাকার ঘোষিত বিনিয়োগের মাত্র ২০ শতাংশও বাস্তবে মাটিতে নেমে আসে, তাহলে ত্রিপুরার আর্থ-সামাজিক চেহারা ঐতিহাসিক ভাবে বদলে যাবে। নতুন শিল্প, বিপুল কর্মসংস্থান, রপ্তানি বৃদ্ধি, পর্যটনের প্রসার, তথ্যপ্রযুক্তির বিকাশ, উন্নত শিক্ষা ও স্বাস্থ্য পরিকাঠামো, সব মিলিয়ে ত্রিপুরা উন্নয়নের এক নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করবে।

শেষে ব্যক্তিগত ভাবে শুধু একটাই কামনা করব, ডেস্টিনেশন ত্রিপুরা বিজনেস কনক্লেভ ২০২৬-এ ঘোষিত বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতির অন্তত ২০ শতাংশ যেন আগামী দুই বছরের মধ্যে বাস্তবে রূপ পায়। যদি তা হয়, তাহলে ত্রিপুরার উন্নয়নের ইতিহাসে এই কনক্লেভ নিঃসন্দেহে এক যুগান্তকারী মাইলফলক হিসেবে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

(লেখক একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও ত্রিপুরাইনফো-র সম্পাদক)

আরও পড়ুন...


Post Your Comments Below

নিচে আপনি আপনার মন্তব্য বাংলাতেও লিখতে পারেন।

বিঃ দ্রঃ
আপনার মন্তব্য বা কমেন্ট ইংরেজি ও বাংলা উভয় ভাষাতেই লিখতে পারেন। বাংলায় কোন মন্তব্য লিখতে হলে কোন ইউনিকোড বাংলা ফন্টেই লিখতে হবে যেমন আমার বাংলা কিংবা অভ্রো কী-বোর্ড (Avro Keyboard)। আমার বাংলা কিংবা অভ্রো কী-বোর্ডের সাহায্যে মাক্রোসফট্ ওয়ার্ডে (Microsoft Word) টাইপ করে সেখান থেকে কপি করে কমেন্ট বা মন্তব্য বক্সে পেস্ট করতে পারেন। আপনার কম্পিউটারে আমার বাংলা কিংবা অভ্রো কী-বোর্ড বাংলা সফ্টওয়ার না থাকলে নিম্নে দেয়া লিঙ্কে (Link) ক্লিক করে ফ্রিতে ডাওনলোড করে নিতে পারেন।

Free Download Avro Keyboard

Fields with * are mandatory





Posted comments

Till now no approved comments is available.