ড্রাগস প্রতিরোধে সামাজিক আন্দোলনে গুরুত্ব

পান্নালাল রায়

July 11, 2026

ড্রাগ আসক্তি ও ড্রাগ বাণিজ্যের ক্রম বিস্তৃতিতে উত্তর পূর্বাঞ্চলে আজ এক ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।ড্রাগের বিরুদ্ধে সরকারের জিরো টলারেন্সের কথা বারবার ঘোষণা হলেও উত্তর পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোতে ড্রাগের রমরমা চলছে।এমনকি এই অঞ্চলের কিছু নেশামুক্তি কেন্দ্রের বিরুদ্ধেও ড্রাগস সরবরাহের অভিযোগ সামনে আসছে।সম্প্রতি অসম বিধানসভায় সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আলোচনা প্রসঙ্গে রাজ্য মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা ড্রাগসের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলনের ডাক দিয়েছেন। এদিকে সাম্প্রতিককালে উত্তর পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকা থেকে কোটি কোটি টাকার নেশাদ্রব্য উদ্ধারের ঘটনাও ঘটে চলেছে।

কয়েকদিন আগে ত্রিপুরার রাজধানী আগরতলায় কোটি কোটি টাকার নেশাদ্রব্য বাজেয়াপ্তের ঘটনা ঘিরে রাজ্যে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।আগরতলা রেল স্টেশনে আগরতলা-করিমগঞ্জ ডেমু ট্রেনের পার্সেল ভ্যান থেকে বিপুল পরিমাণ অবৈধ কফ সিরাফ উদ্ধার করা হয়েছে যার বাজার দাম সাড়ে পাঁচ কোটি টাকারও বেশি হবে বলে জানা গেছে।বাজেয়াপ্ত করা কফ সিরাফের এই বিপুল সংখ্যক বোতলগুলো ৮০টি নীল ড্রামের মধ্যে রাখা ছিল।প্রাথমিক তদন্তে প্রকাশ পায় যে,এইসব কফ সিরাফ বিহারের কাটিহার থেকে পাঠানো হয়েছিল। করিমগঞ্জ হয়ে তা আগরতলা এসে পৌঁছে।ধারণা করা হয়েছে সীমান্তের ওপারে পাঠানোর উদ্দেশ্যেই আগরতলায় এই বিপুল পরিমাণ কফ সিরাফ আনা হয়েছিল। যাইহোক, কারা কি উদ্দেশ্যে এইসব কফ সিরাফ এখানে এনছিল সে বিষয়ে এখন তদন্ত চলছে।ইতিমধ্যে একজনকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে।তবে এমনটা সহজেই ধারণা হয় যে এই বিপুল পরিমাণ কফ সিরাফ আমদানির পেছনে এক বড় ধরণের নেশাদ্রব্য পাচার চক্রের হাত রয়েছে।এমনকি এর পেছনে আন্তর্জাতিক পাচার চক্রের হাতও থাকতে পারে।উল্লেখ করা যায় যে, উত্তর পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন রেল স্টেশনে এ ধরণের নেশাদ্রব্য উদ্ধারের ঘটনা মোটেই নতুন নয়।শুধুমাত্র রেল স্টেশন নয়।বিভিন্ন সড়ক পথেও প্রায়ই নেশাদ্রব্য বাজেয়াপ্তের ঘটনা ঘটছে।সম্প্রতি আগরতলা-মাণিকভান্ডার রাস্তার হেজামারাতে একটি ট্রাক থেকে প্রায় ৯০০ কেজি বেআইনি গাঁজা বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে যার বাজার দাম হবে সাড়ে চার কোটি টাকা।ট্রাকটির ভেতরে বিশেষ ভাবে নির্মিত গোপন চেম্বারে এইসব গাঁজা রাখা ছিল। এ রকম ভাবে ত্রিপুরা থেকে নানা উপায়ে গাঁজা পাচার চলছে।কখনও ত্রিপুরার ভেতরে,কখনও আবার বহির্রাজ্যে ধরা পড়ছে বিপুল পরিমাণ গাঁজা।উল্লেখ করা যায় যে,ত্রিপুরায় গাঁজা চাষ সহ নেশাদ্রব্যের বিরুদ্ধে সরকার জিরো টলারেন্সের কথা বার বার বলে আসছে।বিভিন্ন সময়ে বেআইনি গাঁজা চাষের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।ধ্বংস করে দেয়া হচ্ছে লক্ষ লক্ষ গাঁজা গাছ।চলছে ধরপাকড়।তা সত্ত্বেও প্রায়ই বিপুল পরিমাণ গাঁজা বাজেয়াপ্তের ঘটনা ঘটেই চলেছে।প্রশ্ন উঠছে গাঁজা সহ নেশা বিরোধী অভিযান সত্ত্বেও গাঁজা চাষের এমন রমরমা চলে কি ভাবে!

ত্রিপুরায় গত এক বছরে নেশাদ্রব্য বাজেয়াপ্তের পরিমাণ দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।রাজ্যের ক্রীড়া ও যুব কর্মসূচি বিভাগের মন্ত্রী টিংকু রায় এক অনুষ্ঠানে বলেছেন,২০২৫ সালে ত্রিপুরাতে যে সব নেশাদ্রব্য বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে তার বাজারদর হবে ১৬০০ কোটি টাকা।২০২৪ সালে টাকার অঙ্কে এর পরিমাণ ছিল ৮০০ কোটি।মন্ত্রী বলেছেন, রাজ্যে নেশাদ্রব্য বাজেয়াপ্তের পরিমাণ বৃদ্ধিতে ড্রাগসের বিরুদ্ধে সরকারের জিরো টলারেন্সের নীতিই প্রতিফলিত হচ্ছে।মন্ত্রী আরও বলেন, গত তিন বছরে এক হাজারেরও বেশি নার্কোটিক্স সংশ্লিষ্ট মামলা রাজ্যে নথিভুক্ত হয়েছে এবং শাস্তির হারও বাড়ছে। মন্ত্রী উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, এক সময় ত্রিপুরাকে মাদক দ্রব্য পাচারের এক ট্রানজিট রুট হিসেবেই মনে করা হলেও আজ ত্রিপুরা যেন সংশ্লিষ্ট ভোক্তাদের এক বড় বাজার হয়ে পড়ছে,যার মোকাবিলা আরও কঠিন। নেশা আসক্তদের পুনর্বাসন প্রকল্পে সিপাহিজলা জেলাতে সরকার ২০০ শয্যার একটি ডিএডিকশন সেন্টার স্হাপন করছে বলে মন্ত্রী জানান। এ ছাড়াও রাজ্যে ৫০ শয্যা বিশিষ্ট আরও ৮টি ডিএডিকশন সেন্টার করা হচ্ছে।

ত্রিপুরার পর এবার অসম সহ উত্তর পূর্বাঞ্চলের অন্যান্য রাজ্যের প্রসঙ্গে আসা যাক।অসমের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রায়ই নেশাদ্রব্য বাজেয়াপ্ত করা হচ্ছে।মিজোরাম,মণিপুরেও তা ব্যাপক হারে উদ্ধারের ঘটনা ঘটছে।সম্প্রতি বরাক উপত্যকার হাইলাকান্দি জেলাতে চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে ৮ কোটি টাকা মূল্যের ইয়াবা ট্যাবলেট বাজেয়াপ্তের দুটি পৃথক ঘটনায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।প্রথমে পুলিশ লক্ষ্মীনগর এলাকা থেকে ৩০ হাজার ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করে।দ্বিতীয় ঘটনায় রামনাথপুর এলাকা থেকে পুলিশ ৫০ হাজার নিষিদ্ধ ইয়াবা ট্যাবলেট বাজেয়াপ্ত করে।সামান্য সময়ের ব্যবধানে বরাক উপত্যকার দুই এলাকা থেকে বিপুল অর্থ মূল্যের বেআইনি নেশা সামগ্রী উদ্ধারের ঘটনা থেকে এই অঞ্চলে সংশ্লিষ্ট পাচার বাণিজ্যের একটা ধারণা পাওয়া যায়। কোটি কোটি টাকার নেশাদ্রব্য যখন বাজেয়াপ্ত করা হয় তখন এমনটাও সহজেই ধারণা হয় যে,তার তুলনায় আরও বিপুল পরিমাণ নেশা সামগ্রী শহর-গঞ্জ সহ গ্রাম গ্রামান্তরে ছড়িয়ে পড়ছে।যা ধরা পড়ছে তা হয়তো জলে ভাসমান বরফখণ্ডের দৃশ্যমান অংশ মাত্র।

সাম্প্রতিক এক তথ্যে দেখা যায় ২০২৪ থেকে চলতি বছরের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত অসমে ১,১৫৫ কোটি টাকার বেআইনি নেশাদ্রব্য উদ্ধার করা হয়েছে।যার মধ্যে রয়েছে ২৩৯ কে.জি হিরোইন,৭১,৯০২ কে.জি গাঁজা এবং ৪.৭৮ লাখ বোতল কফ সিরাফ ইত্যাদি।এদিকে অসমের মুখ্যমন্ত্রী ড.হিমন্ত বিশ্বশর্মা জানিয়েছেন ড্রাগসের বিরুদ্ধে অভিযানের ফলশ্রুতিতে রাজ্যে ২০২১ সাল থেকে এ পর্যন্ত ৩,২৫৩ কোটি টাকার নেশাদ্রব্য বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে জড়িত ২৬,৫৩৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, ড্রাগ চক্র গুড়িয়ে দেয়া পর্যন্ত এই অভিযান চলবে।মিজোরামও কিন্তু ড্রাগস উদ্ধারের ক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই। গত আড়াই বছরে,অর্থাৎ ২০২৪ সাল থেকে চলতি বছরের মাঝামাঝি পর্যন্ত মিজোরামে ১,৮৬৩ কোটি টাকার নেশাদ্রব্য বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে।এর মধ্যে হিরোইন রয়েছে ১৬০ কে.জি,লক্ষ লক্ষ ট্যাবলেট, ৭০০ কেজি গাঁজা ও বিপুল পরিমাণ আফিম ইত্যাদি।

ড্রাগস বিষয়ে সাম্প্রতিককালে যে সব তথ্য উঠে আসছে তাতে এমনটাই ধারণা করা হয় যে,উত্তর পূর্বাঞ্চলে ভয়াবহ ভাবে ড্রাগসের বিস্তৃতি ঘটছে।ড্রাগসের কবলে পড়ে আজ এই অঞ্চলের যুব সম্প্রদায়ের এক বিরাট অংশের জীবনে নেমে এসেছে অন্ধকার। অকালে ঝরে পড়ছে অনেক প্রাণ।ড্রাগসের কারণে বহু পরিবার আজ ধ্বংসের মুখে দাঁড়িয়েছে।ইতিমধ্যেই ধ্বংস হয়ে গেছে অনেক পরিবার। নেশায় আসক্ত হবার ফলশ্রুতিতে খুন জখমের ঘটনাও ঘটছে। নেশা জোগানের অর্থের জন্য বাবা মায়ের উপর চাপ আসছে।কখনও আবার ড্রাগসে আসক্ত কিশোর অর্থের জন্য নানা অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে।সব মিলিয়ে আমাদের সমাজ জীবনে যেন ড্রাগসকে কেন্দ্র করে এক গভীর সংকট নেমে আসছে।শুধুমাত্র সরকার এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্হার মাধ্যমে যে এই পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠা সম্ভব নয় তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।অসমের মুখ্যমন্ত্রী এ ক্ষেত্রে তাই যথার্থই সামাজিক আন্দোলনের ডাক দিয়েছেন।

অসম বিধানসভার বাজেট অধিবেশনে ড্রাগস প্রসঙ্গে আলোচনায় মুখ্যমন্ত্রী ড.বিশ্বশর্মা ড্রাগসের বিরুদ্ধে লড়াইতে রাজনৈতিক বিভাজন ভুলে একজোট হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, এই লড়াইকে শুধুমাত্র প্রশাসনিক ব্যবস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে এক সামাজিক আন্দোলনের রূপ দিতে হবে।মুখ্যমন্ত্রী বলেন, সংশ্লিষ্ট বিষয়ে শাসক ও বিরোধী দুই পক্ষের মধ্যেই ইতিবাচক ও গঠনমূলক আলোচনা হয়েছে বিধানসভায়।এ ক্ষেত্রে বিরোধীদের ভূমিকার প্রশংসা করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, সমাজ থেকে ড্রাগসের অভিশাপ দূর করতে হলে সব রাজনৈতিক দলকেই একসঙ্গে কাজ করতে হবে।মুখ্যমন্ত্রী আরও বলেন, অসমে উদ্ধার হওয়া অধিকাংশ ড্রাগস মায়ানমার সীমান্ত হয়ে প্রথমে মণিপুর বা মিজোরাম প্রবেশ করে।সেখান থেকে বিভিন্ন পথে তা অসমে পৌঁছায়।এই আন্তঃরাজ্য পাচার রুখতে মিজোরাম ও মণিপুর সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করা হচ্ছে।কেন্দ্রের সঙ্গেও এ নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলেও মুখ্যমন্ত্রী জানান। ড্রাগস বিরোধী অভিযানের পাশাপাশি পুনর্বাসন প্রকল্পের উপর গুরুত্ব আরোপ করে মুখ্যমন্ত্রী আবার উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন,কিছু নেশামুক্তি কেন্দ্রের বিরুদ্ধেও ড্রাগস সরবরাহের অভিযোগ আসছে।সরকার কঠোর নজরদারি চালাবে।মুখ্যমন্ত্রী ড্রাগসের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতির উপর জোর দিয়ে বলেন,যুব সমাজকে এই মারণ নেশার কবল থেকে রক্ষা করতে সরকার, সমাজ,জন প্রতিনিধি এবং সাধারণ মানুষ সকলকেই একযোগে এগিয়ে আসতে হবে।

এটাই হচ্ছে আসল কথা।মারণ নেশার কবল থেকে যুব সম্প্রদায় তথা সমাজকে উদ্ধার করতে হলে সকলকে আজ ঐক্যবদ্ধ ভাবে এগিয়ে আসতে হবে।এটা ঘটনা যে,ড্রাগস প্রতিরোধে বর্তমানে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে সরকার থেকে।চলছে ব্যাপক ধরপাকড়।বাজেয়াপ্ত করা হচ্ছে কোটি কোটি টাকার নেশাদ্রব্য। কিন্তু একমাত্র সরকার ও আইন প্রয়োগকারী সংস্হা সমূহের তৎপরতার মাধ্যমেই এই গুরুতর সমস্যার মোকাবিলা কার্যত সম্ভব নয়।এ জন্য চাই সামাজিক আন্দোলন।ড্রাগস প্রতিরোধের আন্দোলনে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা,যুব সম্প্রদায়,ক্লাব,বিভিন্ন সংগঠন সহ সর্বস্তরের মানুষকে যুক্ত করতে হবে।সরকারি কঠোর ব্যবস্থার পাশাপাশি এ বিষয়ে জনসচেতনতা অভিযানও জোরদার করতে হবে।

আরও পড়ুন...


Post Your Comments Below

নিচে আপনি আপনার মন্তব্য বাংলাতেও লিখতে পারেন।

বিঃ দ্রঃ
আপনার মন্তব্য বা কমেন্ট ইংরেজি ও বাংলা উভয় ভাষাতেই লিখতে পারেন। বাংলায় কোন মন্তব্য লিখতে হলে কোন ইউনিকোড বাংলা ফন্টেই লিখতে হবে যেমন আমার বাংলা কিংবা অভ্রো কী-বোর্ড (Avro Keyboard)। আমার বাংলা কিংবা অভ্রো কী-বোর্ডের সাহায্যে মাক্রোসফট্ ওয়ার্ডে (Microsoft Word) টাইপ করে সেখান থেকে কপি করে কমেন্ট বা মন্তব্য বক্সে পেস্ট করতে পারেন। আপনার কম্পিউটারে আমার বাংলা কিংবা অভ্রো কী-বোর্ড বাংলা সফ্টওয়ার না থাকলে নিম্নে দেয়া লিঙ্কে (Link) ক্লিক করে ফ্রিতে ডাওনলোড করে নিতে পারেন।

Free Download Avro Keyboard

Fields with * are mandatory





Posted comments

Till now no approved comments is available.