বন্দেমাতরম : সার্ধশতবর্ষের গৌরবগাথা

পান্নালাল রায়

July 5, 2026

'বন্দেমাতরম' শুধুমাত্র একটি সংগীত নয়,এটি ছিল ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রেরণার উৎস।একদা এটি যেমন ছিল ব্রিটিশ বিরোধী সংগ্রামে সংগ্রামীদের রণধ্বনি,তেমনই অপরদিকে তা মাতৃভূমির প্রতি এক সুগভীর ভালোবাসা আর শ্রদ্ধার ব্যঞ্জনাও!

এই 'বন্দেমাতরম' স্বাধীনতা আন্দোলনের মন্ত্র থেকে আজ আমাদের জাতীয় গান।শুধু তাই নয়,বিবিসি'র এক সমীক্ষা অনুযায়ী 'বন্দেমাতরম' হচ্ছে পৃথিবীর দ্বিতীয় সর্বাধিক জনপ্রিয় সংগীত।

সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র ১৮৭৫ বা তার কিছু আগে সঙ্গীতটি রচনা করেছিলেন।পরবর্তী সময়ে এটি তাঁর সুবিখ্যাত উপন্যাস 'আনন্দমঠ'-এ অন্তর্ভুক্ত হয়।উপন্যাসটি ধারাবাহিক ভাবে ১৮৮১ সালে 'বঙ্গদর্শন' পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।১৮৮২ সালে তা প্রকাশিত হয় গ্রন্হাকারে।উল্লেখ করা যায় যে,'আনন্দমঠ' উপন্যাসের পটভূমি ছিল অষ্টাদশ শতকের সন্ন্যাসী বিদ্রোহ।আর এই বিদ্রোহে দেশমাতৃকাকে দেবীমূর্তির প্রতীক হিসেবে কল্পনা করা হয়েছিল।'বন্দেমাতরম' আলোচনায় অনিবার্য ভাবেই যেমন আসবে আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের অগ্নিঝরা দিনগুলোর কথা,তেমনই আসবে 'আনন্দমঠ' উপন্যাসের কথাও। সম্প্রতি সুবিখ্যাত প্রকাশন সংস্থা পারুল প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত 'বন্দেমাতরমঃশতবর্ষের গৌরবগাথা' নামের সুবৃহৎ গ্রন্হটিতে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।অতীতের অনেক দুর্লভ চিত্র আর নানা জানা অজানা গুরুত্বপূর্ণ সব তথ্যাদির সংযোজনে রুদ্রশেখর সাহার এই গ্রন্হটি যেন হয়ে উঠেছে অগ্নিযুগের এক দলিলও!

'বন্দেমাতরম' সংগীতটির সঙ্গে 'আনন্দমঠ' অঙ্গাঙ্গী ভাবে জড়িয়ে থাকলেও উপন্যাসটির কথা ভেবে কিন্তু সংগীতটি রচিত হয়নি।উপন্যাসটি লেখার কয়েক বছর আগেই বঙ্কিমচন্দ্র সংগীতটি রচনা করেছিলেন।পরবর্তী সময়ে তিনি তা উপন্যাসে ব্যবহার করেন। বঙ্কিমচন্দ্র কিন্তু 'বন্দেমাতরম' সঙ্গীতের ভবিষ্যত জনপ্রিয়তা নিয়ে অত্যন্ত আশাবাদী ছিলেন। তিনি তাঁর নিকটজনদের একদা বলেছিলেন-"এ গানের মর্ম তোমরা এখন বুঝিতে পারিবে না।যদি পঁচিশ বৎসর জীবিত থাক,তখন দেখিবে,এই গানে বঙ্গদেশ মাতিয়া উঠিবে।" বঙ্কিমচন্দ্রের এই ভবিষ্যত বাণী একশ শতাংশ ফলে গিয়েছিল। সংগীতটি রচনার ত্রিশ বছর পর ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে জাতীয় জীবনে তা প্রবল আলোড়ন তুলেছিল।দেশমাতৃকা বন্দনার এই সংগীত কণ্ঠে ধারণ করেই দেশবাসী ব্রিটিশ শাসকের বঙ্গভঙ্গ পরিকল্পনার বিরুদ্ধে সেদিন পথে নেমেছিল।বঙ্কিমের 'বন্দেমাতরম' থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে সে সময় আরও অনেকে স্বদেশ গীতি রচনা করেন। রবীন্দ্রনাথ 'বন্দেমাতরম' সঙ্গীতের প্রথমাংশের সুর দিয়েছিলেন।কবি বঙ্কিমচন্দ্রের সামনে বসে তা গেয়েও ছিলেন।১৮৯৬ সালে সেই সুরেই কলকাতায় জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশনে গানটি গেয়েছিলেন কবি।১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে কংগ্রেসের বারাণসী অধিবেশনে গানটিকে সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আনুষ্ঠানিক ভাবে গ্রহণ করা হয়।১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দের অক্টোবর মাসে গানটির প্রথম দুটি স্তবককে জাতীয় সংগীত হিসেবে গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।১৯৫০ সালের জানুয়ারিতে কনস্টিটিউয়্যান্ট এসেম্ব্লিতে জন গণ মন জাতীয় সংগীত হিসেবে ঘোষণার পাশাপাশি বন্দেমাতরম-কেও সমান মর্যাদা দেয়া হয়।গানটির প্রথম দুটি স্তবক জাতীয় গান হিসেবে মর্যাদা পায়।

১৯০৫ সালে বাংলা তথা দেশের নানা অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়া স্বদেশী আন্দোলনের মন্ত্র ছিল 'বন্দেমাতরম'।এই নামে ইংরেজি,উর্দু ভাষাতেও প্রকাশিত হয়েছিল সংবাদ পত্র। বোম্বাই,মাদ্রাজ, হায়দরাবাদের মতো দেশের বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়েছিল 'বন্দেমাতরম' ধ্বনি।এমনকি বিদেশে যেখানে ভারতের বিপ্লবীরা একত্রিত হয়েছেন সেখানেও উচ্চারিত হয়েছে এই মহামন্ত্র।সেদিন ভারতের সমাজ জীবনে 'বন্দেমাতরম' কতটা গভীর প্রভাব বিস্তার করেছিল তার প্রমাণ ছড়িয়ে আছে আমাদের মা বোনদের হাতের চুড়িতে,আছে তাদের সেলাই করা নক্সাতে।বন্দেমাতরম লেখা চুড়িকে সেদিন 'বীর প্রসবিনীর অলঙ্কার' বলে চিহ্নিত করা হয়েছিল। এমনকি দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল কাছাড়ের গ্রামাঞ্চলেও সেদিন অন্তঃপুরের গৃহবধূরা তাদের সেলাই কাজের মাধ্যমে 'বন্দেমাতরম' ধ্বনির প্রচারে নিজস্ব এক ভূমিকা পালন করতেন।

যাইহোক, বঙ্কিমচন্দ্রের 'বন্দেমাতরম' সংগীতটির রচনা,'আনন্দমঠে' তার ব্যবহার, স্বদেশী আন্দোলনে এই মহামন্ত্রের বহুধা বিস্তৃত প্রভাব ইত্যাদি নিয়ে যাবতীয় মূল্যবান তথ্য আর দুর্লভ সব চিত্র স্হান পেয়েছে আলোচ্য গ্রন্হটিতে।গ্রন্হকার রুদ্রশেখর সাহা গ্রন্হের শুরুতেই লিখেছেন,'রাষ্ট্রগান বন্দেমাতরম-এর সার্ধশতবর্ষ এই অনন্য গীতটিকে সবিশেষ অভিনিবেশে মনন,অনুভব এবং বিশ্লেষণের সুযোগ এনে দিয়েছে।গানটির রচনা-প্রসঙ্গ এবং এবং আনুষঙ্গিক বহুমাত্রিক বিষয় একত্রিত করে উপস্থাপন বক্ষ্যমাণ গ্রন্হের উপজীব্য।'গ্রন্হটি শুরু হয়েছে রবীন্দ্রনাথের 'বাংলার মাটি বাংলার জল/বাংলার হাওয়া বাংলার ফল...' এই রাখী সঙ্গীতটি দিয়ে।তারপর রয়েছে রাখীবন্দন উৎসবের কার্ড,বিজ্ঞাপন এইসবের চিত্র। তারপর রয়েছে আনন্দমঠ উপন্যাসের প্রথম সংস্করণের আখ্যাপত্র,রয়েছে বন্দেমাতরম সংগীত। ক্রমাণ্বয়ে রয়েছে ওয়ারেন হেস্টিংস'র চিঠি ও হান্টারের গ্রাম বাংলার ইতিহাস বিবরণী থেকে সন্ন্যাসী বিদ্রোহের বিবরণ।হেস্টিংস লিখেছিলেন-... We have lately been much troubled here with herds of desperate adventures called Senassies,who have over-run the province in great numbers, and committed great depredations.... হান্টার সাহেব লিখেছিলেন-...The collectors called out the military; but after a temporary success our Sepoys were at length totally defeated,and captain Thomas (their leader), with almost the whole party,cut off...

অতীত দিনের বিভিন্ন পত্র পত্রিকা থেকে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন রচনাও গ্রন্হটিতে পুনর্মুদ্রিত হয়েছে। সেদিনের বিখ্যাত 'বঙ্গশ্রী' পত্রিকা থেকে সংকলিত হয়েছে হেমেন্দ্রনাথ দাশগুপ্তের 'বহরমপুরে বঙ্কিমচন্দ্রের বঙ্গদর্শন ও বন্দেমাতরম' প্রবন্ধ। তাতে বঙ্কিমচন্দ্রের চাকরি জীবনের পাশাপাশি রয়েছে 'বঙ্গদর্শন' প্রকাশের কথাও।বিপিন চন্দ্র পালের মূল্যবান 'বন্দে মাতরম' প্রবন্ধটিও পুনর্মুদ্রিত হয়েছে গ্রন্হটিত। ঋষি অরবিন্দের সংশ্লিষ্ট একটি ইংরেজি প্রবন্ধও পুনর্মুদ্রিত হয়েছে গ্রন্হে। রয়েছে 'বন্দেমাতরম' সন্নিবিষ্ট আনন্দমঠ গ্রন্হের প্রথম সংস্করণের পৃষ্ঠা গুলিও।

দেবনাগরী লিপিতে বন্দেমাতরম এবং বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত সংগীতটির ইংরেজী অনুবাদও গ্রন্হটিতে সংকলিত হয়েছে।সেই সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ও সরলা দেবী কর্তৃক সঙ্গীতটির সুর,১২৯২ সালে 'বালক'-এ প্রকাশিত স্বরলিপি ইত্যাদিও সন্নিবিষ্ট হয়েছে।'বন্দেমাতরম' সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ সহ জাতীয় নেতৃবর্গের বিভিন্ন মন্তব্যও যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে স্হান পেয়েছে গ্রন্হটিতে।রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 'বন্দেমাতরম'কে বিশ্বমাতার বন্দনা হিসেবে বর্ণনা করে বলেছিলেন-'আমাদের বন্দেমাতরম মন্ত্র বাংলাদেশের বন্দনার মন্ত্র নয়-এ হচ্চে বিশ্বমাতার বন্দনা-সেই বন্দনার গান আজ যদি আমরা প্রথম উচ্চারণ করি তবে আগামী ভাবী যুগে একে একে সমস্ত দেশে এই মন্ত্র ধ্বনিত হয়ে উঠবে।' মহাত্মা গান্ধী 'বন্দেমাতরম' সম্পর্কে বলেছেন-...No matter what its source was and how and when it was composed,it had become a most powerful battle cry among Hindus and Musalmans of Bengal during the partition days. It was an anti-imperialist cry.

সুভষচন্দ্র বসু বলেছেন-Vande Mataram was not merely a song it was a prayer,a hymn to the motherland that stirred the soul of every Indian. 'বন্দেমাতরম' জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রতীকে পরিণত হয়েছে উল্লেখ করে জওহরলাল নেহরু বলেছিলেন, wherever it was sung,people felt inspired and uplifted.

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সেদিন 'বন্দেমাতরম' সঙ্গীতের প্রভাব প্রসঙ্গে গুলবার্গের বন্দেমাতরম আন্দোলন,তামিল জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই মহামন্ত্রের জনপ্রিয়তা ইত্যাদির উল্লেখ করা হয়েছে গ্রন্হটিতে।১৯১৯ সালে জালিয়ানওয়ালাবাগে ব্রিটিশদের নৃশংস গণহত্যার ঘটনার উল্লেখ করে বলা হয়েছে,এ ধরণের ঘটনার ক্ষেত্রেও 'বন্দেমাতরম' ধ্বনি ছিল ভারতীয়দের প্রতিরোধের ভাষা ও অদম্য চেতনার প্রকাশ।বন্দেমাতরম ধ্বনি সেদিন ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের চোখের ঘুম কেড়ে নিয়েছিল। স্কুল, কলেজ,হাট-বাজার যেখানেই বন্দেমাতরম ধ্বনি উঠেছে সেখানেই নেমে এসেছে তাদের অত্যাচার। যারা এই ধ্বনি দিয়েছে ইংরেজরা তাদের জেলে পুরেছে,করেছে বেত্রাঘাত।কিন্তু তাতে এই মহামন্ত্রের প্রভাব আরও বেগবান হয়েছে।এমনকি বিদেশেও ছড়িয়ে পড়েছে এই ধ্বনি।

দেশের স্বাধীনতা আন্দোলন সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দুষ্প্রাপ্য ছবির মুদ্রণ 'বন্দেমাতরমঃশতবর্ষের গৌরবগাথা' গ্রন্হটিকে নিঃসন্দেহে অনন্য মর্যাদা দান করেছে।গুরুত্বপূর্ণ তথ্যাদির পাশাপাশি রয়েছে অতীতের প্রাক স্বাধীনতা যুগের হারিয়ে যাওয়া নানা চিত্র,রয়েছে স্বাধীনোত্তর যুগের ছবিও।১৯৫৩ সালে পিকিং-এ বিরাট সমাবেশে ভারতীয় সাংস্কৃতিক প্রতিনিধি দলের 'বন্দেমাতরম' গাওয়ার ছবিও রয়েছে এতে।দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের ছবি,ডাক টিকিট,পত্র পত্রিকার ক্লিপিং,সংশ্লিষ্ট রেকর্ড ও চলচ্চিত্রের বিজ্ঞাপন সব কিছু সযত্নে সন্নিবিষ্ট হয়েছে গ্রন্হটিতে।বঙ্কিমচন্দ্রের জন্ম, বন্দেমাতরম সৃষ্টি,আনন্দমঠে তার ব্যবহার থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বন্দেমাতরম পরিক্রমা পর্যায়ক্রমে একনজরে তুলে ধরা হয়েছে গ্রন্হটিতে।সব মিলিয়ে বন্দেমাতরম-এর সার্ধশতবর্ষে পারুল প্রকাশনী প্রকাশিত ডাবল

ডিমাই সাইজের আর্ট পেপারে মুদ্রিত ১৩৬ পৃষ্ঠার সুবৃহৎ এই স্মারক গ্রন্হটি হয়ে উঠেছে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে চর্চার এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল।বর্তমান ও ভাবী প্রজন্মের জন্য স্কুল কলেজের পাঠাগারে তা সংগ্রহের দাবি রাখে।কারণ 'বন্দেমাতরম' শুধুমাত্র একটি সংগীত নয়,এটি এক যুগের ইতিহাস। একটি জাতির আত্মপরিচয় সহ বহু মানুষের আত্মত্যাগের স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে এই মহা সঙ্গীত।

আরও পড়ুন...


Post Your Comments Below

নিচে আপনি আপনার মন্তব্য বাংলাতেও লিখতে পারেন।

বিঃ দ্রঃ
আপনার মন্তব্য বা কমেন্ট ইংরেজি ও বাংলা উভয় ভাষাতেই লিখতে পারেন। বাংলায় কোন মন্তব্য লিখতে হলে কোন ইউনিকোড বাংলা ফন্টেই লিখতে হবে যেমন আমার বাংলা কিংবা অভ্রো কী-বোর্ড (Avro Keyboard)। আমার বাংলা কিংবা অভ্রো কী-বোর্ডের সাহায্যে মাক্রোসফট্ ওয়ার্ডে (Microsoft Word) টাইপ করে সেখান থেকে কপি করে কমেন্ট বা মন্তব্য বক্সে পেস্ট করতে পারেন। আপনার কম্পিউটারে আমার বাংলা কিংবা অভ্রো কী-বোর্ড বাংলা সফ্টওয়ার না থাকলে নিম্নে দেয়া লিঙ্কে (Link) ক্লিক করে ফ্রিতে ডাওনলোড করে নিতে পারেন।

Free Download Avro Keyboard

Fields with * are mandatory





Posted comments

Till now no approved comments is available.