পূর্বোত্তরে বাড়ছে মানব পাচারের ঘটনা

পান্নালাল রায়

June 30, 2026

উত্তর পূর্বাঞ্চলে মানব পাচারের ঘটনা ক্রমেই বেড়ে চলেছে।এর মধ্যে সর্বাধিক উদ্বেগজনক বার্তা বয়ে আনছে অসমের ক্রম বর্দ্ধমান মানব পাচারের ঘটনা।প্রতি বছর অসমে এক উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু হয় নিখোঁজ বা পাচার হয়ে যাচ্ছে।এই শিশুদের আবার বেশিরভাগ মেয়ে।ত্রিপুরাতেও মানব পাচারের ঘটনা বাড়ছে।রাজ্যটিতে রোহিঙ্গা সহ বিভিন্ন বেআইনি অনুপ্রবেশকারী ধরা পড়া সহ নাবালিকা ও গৃহবধূ নিখোঁজের ঘটনা ঘটে চলেছে।এই অঞ্চলে আন্তর্জাতিক মানব পাচার চক্রের তৎপরতা দিন দিন বাড়ছে।

এন সি আর বি বা জাতীয় অপরাধ রেকর্ড ব্যুরোর সাম্প্রতিক তথ্যে মানব পাচার সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অসমের এক উদ্বেগজনক চিত্র ফুটে উঠেছে।তথ্যে প্রকাশ ২০২৪ সালে অসম থেকে ২,৮৮০ জন শিশু ও কিশোর-কিশোরী নিখোঁজ হয়ে গেছে।এন সি আর বি'র সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে,দেশে মানব পাচার চক্রের সক্রিয়তা,পারিবারিক ক্ষেত্রে সহিংসতা এবং সর্বোপরি আর্থিক অনগ্রসরতার জন্যই এ ধরণের ঘটনা ক্রমাগত বেড়ে চলেছে।আরও উদ্বেগজনক বিষয় হচ্ছে নিখোঁজ শিশুদের মধ্যে ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের সংখ্যা অনেক বেশি।এন সি আর বি'র তথ্যানুসারে ২০২৪ সালে অসমের নিখোঁজ শিশুদের মধ্যে ৬৪৪ জন ছেলে এবং ২২৩৪ জন মেয়ে রয়েছে।জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও সংশ্লিষ্ট ওয়াকিবহাল মহলের মতে এ ভাবে শিশু নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার ঘটনার পেছনে সামাজিক কারণের পাশাপাশি অর্থনৈতিক কারণও রয়েছে।কখনও কর্মসংস্থান কিম্বা কখনও শিক্ষার কথা বলে,কিম্বা অন্য কোনও ভাবে প্রলুব্ধ করে শিশুদের অসাধু চক্র বাড়ি থেকে বের করে নিয়ে যায়।তারপর তাদের একটা অংশকে ঘর গেরস্হালির কাজ সহ বিভিন্ন শ্রমিকের কাজে নিয়োগ করা হয়।তবে পাচার হওয়া মেয়েদের বৃহৎ অংশকেই যৌন ব্যবসায় লিপ্ত করা হয়।অবশ্য অনেক শিশু আবার পারিবারিক কলহ,হতাশাজনিত পরিস্হিতি কিম্বা কখনও অজানা জীবনের হাতছানিতে বেরিয়ে পড়ে ঘরছাড়া হয়ে।তাদের বেশিরভাগ ক্ষেত্রেও একই পরিণতি ঘটে।ভবিষ্যত জীবনে নেমে আসে গভীর অন্ধকার।

অসমের পাশাপাশি ত্রিপুরাতেও মানব পাচার প্রসঙ্গে কিছুদিন আগের খোয়াই জেলার ঘটনার কথা উল্লেখ করা যায়।গত ক'বছরে খোয়াই জেলার বিভিন্ন থানা এলাকা থেকে নাবালিকা ও গৃহবধূ নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার ঘটনা বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে উদ্বেগের সঞ্চার হয়।তবে পুলিশী তৎপরতায় কিছু উদ্ধারের ঘটনাও ঘটেছে।এই সব পাচারের ঘটনার পেছনে সাধারণ ভাবে সামাজিক মাধ্যমের নেতিবাচক ভূমিকা,প্রেমের আকর্ষণে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়া ইত্যাদি উদাহরণ থাকলেও অনেক ঘটনার পেছনে মানব পাচার চক্রের হাতও উড়িয়ে দেয়া যায় না।বেশ কিছুদিন আগে অরুণাচল প্রদেশ থেকে ত্রিপুরার নিখোঁজ ৪৫ জন নাবালক ও যুবক শ্রমিককে উদ্ধার করে তাদের নিজ নিজ পরিবারের হাতে তুলে দেয়া হয়েছিল। ত্রিপুরার ঊনকোটি জেলার রাংরুং ও কালীশাসন চা বাগান এলাকা থেকে নিখোঁজ হয়ে যাওয়া ২৪জন নাবালক ও যুবক শ্রমিকের অনুসন্ধান সূত্রে অরুণাচল প্রদেশ থেকে ত্রিপুরার নিখোঁজ ৪৫ জনকে উদ্ধার করা হয়।জানা যায় অধিক রোজগারের লোভ দেখিয়ে এই সব নাবালক ও যুবকদের বহির্রাজ্যে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেখানে তারা চরম নির্যাতনের শিকার হয়।নিখোঁজদের পরিবারের পক্ষে অভিযোগ পাওয়ার পর পুলিশ ও শ্রম দপ্তরের লোকজন যৌথ ভাবে অভিযান চালিয়ে অরুণাচল প্রদেশ থেকে এদের উদ্ধার করে।এই ঘটনার পেছনেও আন্তর্জাতিক মানব পাচার চক্রের যোগাযোগ থাকতে পারে বলেও অনেকে মনে করছেন।শুধু ত্রিপুরা কেন,বরাক উপত্যকা তথা অসমের চা বাগান কেন্দ্র করেও মানব পাচারের অভিযোগ উঠেছে ইতিপূর্বে।

এদিকে ত্রিপুরায় ওপারের অনুপ্রবেশকারী প্রায়ই ধরা পড়ছে।রাজ্যের বিভিন্ন রেল স্টেশন সহ সড়ক পথে ধরা পড়া এইসব অনুপ্রবেশকারীদের একটা অংশ আবার রোহিঙ্গা শরণার্থী।এখানে উল্লেখ করা যায় যে,বাংলাদেশে শিবিরে প্রায় সাত/আট লক্ষ রোহিঙ্গা শরণার্থী রয়েছে,যারা গত কয়েক বছরে মায়ানমার থেকে অত্যাচারিত হয়ে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নিয়েছে।বাংলাদেশের কক্সবাজারে রয়েছে পৃথিবীর সর্ব বৃহৎ শরণার্থী শিবির। এই রোহিঙ্গা শরণার্থীদের একটি অংশ উন্নত জীবন জীবিকার আশায় ওপার থেকে এপারে আসছে। তারপর রেল ও সড়ক পথ ধরে তারা ছড়িয়ে পড়ছে দেশের অন্যান্য শহরে।ত্রিপুরাতে তাদের অনেকে ধরা পড়ছে।তারা এমনটাও স্বীকার করেছে যে দালাল চক্রের মাধ্যমে টাকার বিনিময়ে এপারে এসেছে।এতেই এই অঞ্চলে আন্তর্জাতিক মানব পাচার চক্রের সক্রিয়তা বোঝা যায়।শুধু তাই নয়,জাতীয় তদন্তকারী এজেন্সিও ক'বছর আগে ত্রিপুরা থেকে বেশ কয়েকজন মানব পাচারকারীকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল।

তবে শুধুমাত্র রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ কিম্বা আন্তর্জাতিক মানব পাচার চক্রের তৎপরতাই নয়,স্হানীয় ভাবেও শিশু,নারী পাচারের ঘটনা ঘটে চলেছে।কখনও গ্রাম শহর থেকে নিখোঁজ হয়ে যাওয়া কিশোর-কিশোরীর অভিভাবকরা থানা-পুলিশের দ্বারস্থ হয়।শারীরিক গঠন ও পোশাকের বর্ণনা দিয়ে পুলিশ থেকে সংবাদ মাধ্যমে নিখোঁজ বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়।কখনও আবার দূরদেশের বর এসে গ্রামের মেয়েকে বিয়ে করে নিয়ে যায়।প্রথম কিছুদিন সব ঠিকঠাক চললেও একদিন শোনা যায় তার অশ্রুসজল কাহিনি।এই ভাবে কখনও বিয়ে,কিম্বা কখনও চাকরি ইত্যাদি নানা প্রলোভন দেখিয়ে মেয়েদের নিয়ে যাওয়া হয়।মূলত যৌন শোষণ সহ সংশ্লিষ্ট বাণিজ্যিক কারণে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নারী পাচারের ঘটনাগুলো ঘটছে।মানব পাচারের এক উল্লেখযোগ্য সংখ্যক হচ্ছে নারী ও নাবালিকা।আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার তথ্যানুসারে মানব পাচারের সিংহ ভাগই হচ্ছে নারী ও নাবালিকা।ভারতেও প্রতিবছর হাজার হাজার নারী,শিশু ও নাবালিকা পাচারের শিকার হয়ে থাকে।তাদের কেউ জোর পূর্বক শ্রমে,কেউ ঘর গেরস্হালীর কাজে,কেউ আবার যৌন শোষণের শিকার হয়।সব মিলিয়ে মানব পাচার আজ এক ভয়াবহ মানবিক সংকট ডেকে আনছে।উল্লেখ করা যায় যে, অস্ত্র ও মাদক পাচারের পর মানব পাচারই আজ বৃহৎ অপরাধ বাণিজ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।ভারতে প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক শিশু নিখোঁজ হিসেবে নথিভুক্ত হয়।তাদের একটা অংশ উদ্ধার হলেও এক উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু দীর্ঘদিন নিখোঁজ থাকে।ভারতে ২০২৩ সালে প্রায় ৯১,২৯৬ জন শিশু নিখোঁজ হয়েছিল। অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন নিখোঁজ শিশুর সংখ্যা প্রায় ২৫০।নিখোঁজ শিশুদের ৭৫ ভাগ ছিল মেয়ে শিশু। দেশের উত্তর পূর্বাঞ্চলের রাজ্য সমূহের ক্ষেত্রে এই সমস্যা আরও স্পর্শকাতর বলা যায়।ভৌগোলিক অবস্থানের জন্য এই অঞ্চলে সমস্যাটি আরও গুরুতর আকার ধারণ করছে।উত্তর পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন রাজ্যের সঙ্গে ভূটান, মায়ানমার ও বাংলাদেশের দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে।তাই মানব পাচারের ক্ষেত্রে এই অঞ্চল এমনিতেই ঝুঁকিপূর্ণ। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দারিদ্র্য ও সচেতনতার অভাব। এই অঞ্চল থেকে পাচার হওয়া নারী ও শিশুদের দিল্লি, মুম্বই, কলকাতা ও ব্যাঙ্গালুরুর মতো বড় বড় শহরে নিয়ে যাওয়া হয়।তারপর তাদেরকে জোরপূর্বক বিভিন্ন শ্রম কার্য সহ যৌন ব্যবসায় লিপ্ত করা হয়।এদিকে শিশুশ্রম ব্যবহারের এক প্রবণতাও লক্ষ্য করা যায়।যে বয়সে শিশুদের স্কুলে যাবার কথা সেই বয়সে তাদের দেখা যাচ্ছে চায়ের দোকানে,হোটেল-রেস্টুরেন্টে,কারখানা কিম্বা ঘর ঘেরস্হালীর কাজে।এই ভাবে পাচারকৃত শিশুদের নানা কাজে লাগানো হচ্ছে।শিশুদের মাথার ঘাম পায়ে পড়ছে, ঝরে পড়ছে তাদের শৈশবও।

এবার শিশু পাচারের সাম্প্রতিক তথ্য প্রসঙ্গে আসা যাক।২০২৪ সালে সারা দেশে শিশু নিখোঁজ হয়েছে ৯৮,৩৭৫।২০২৩ সালের তুলনায় তা ৮ শতাংশ বেশি। ২০২৪ সালে সবচেয়ে বেশি শিশু নিখোঁজের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে পশ্চিমবঙ্গে।সংখ্যাটা ২২,৭৪২। উত্তর পূর্বাঞ্চলে এ ক্ষেত্রে অসমের স্হান শীর্ষে হলেও মিজোরামে কিন্তু সে বছর একটিও শিশু নিখোঁজের ঘটনা নথিভুক্ত হয়নি।যাইহোক,শিশু পাচার, শিশু শ্রম ব্যবহার সহ সামগ্রিক ভাবে মানব পাচার প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তর সহ বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার কাজ চলছে। নিখোঁজ শিশুদের দ্রুত উদ্ধারের লক্ষ্যেও পুলিশ সহ বিভিন্ন এন জি ও কাজ করছে।কিন্তু তা সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের আরও কার্যকর কঠোর ব্যবস্থার পাশাপাশি প্রয়োজন ব্যাপক জনসচেতনতা।আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও বিভিন্ন এনজিও'র পাশাপাশি মানব পাচার প্রতিরোধে সাধারণ মানুষকেও এগিয়ে আসতে হবে।সৃষ্টি করতে হবে ব্যাপক জনসচেতনতা।বর্তমান আর্থ সামাজিক অবস্থায় সরকারি-বেসরকারি স্তরে পাচার বিরোধী তৎপরতায় মানব পাচার পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে এমনটা আশা করা যায় না।তবে জনসাধারণের মধ্যে ব্যাপক হারে জন সচেতনতা সৃষ্টি হলে নিশ্চিত তার মাত্রা অনেকটাই কমবে।

আরও পড়ুন...


Post Your Comments Below

নিচে আপনি আপনার মন্তব্য বাংলাতেও লিখতে পারেন।

বিঃ দ্রঃ
আপনার মন্তব্য বা কমেন্ট ইংরেজি ও বাংলা উভয় ভাষাতেই লিখতে পারেন। বাংলায় কোন মন্তব্য লিখতে হলে কোন ইউনিকোড বাংলা ফন্টেই লিখতে হবে যেমন আমার বাংলা কিংবা অভ্রো কী-বোর্ড (Avro Keyboard)। আমার বাংলা কিংবা অভ্রো কী-বোর্ডের সাহায্যে মাক্রোসফট্ ওয়ার্ডে (Microsoft Word) টাইপ করে সেখান থেকে কপি করে কমেন্ট বা মন্তব্য বক্সে পেস্ট করতে পারেন। আপনার কম্পিউটারে আমার বাংলা কিংবা অভ্রো কী-বোর্ড বাংলা সফ্টওয়ার না থাকলে নিম্নে দেয়া লিঙ্কে (Link) ক্লিক করে ফ্রিতে ডাওনলোড করে নিতে পারেন।

Free Download Avro Keyboard

Fields with * are mandatory





Posted comments

Till now no approved comments is available.