‘স্মৃতির ঝাঁপি’: একজন প্রশাসকের জীবনকথার এক অনন্য দলিল

জয়ন্ত দেবনাথ

June 17, 2026

২০২২ সালে লেখা, মাত্র ৭২ পাতার একটি বই। কিন্তু সেই ৭২ পাতার মধ্যে একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তার জীবন সংগ্রাম, স্বপ্ন, কর্মনিষ্ঠা, মূল্যবোধ এবং একটি সময়ের সামাজিক ও প্রশাসনিক ইতিহাসকে এত সুন্দর, সাবলীল ও হৃদয়গ্রাহী ভাষায় তুলে ধরা সম্ভব, তা ‘স্মৃতির ঝাঁপি’ না পড়লে বিশ্বাস করা কঠিন। বিলম্বে হলেও বইটি হাতে পেয়ে জাস্ট একদিনের মধ্যেই গোটা বইটি পড়তে বাধ্য হলাম। এবং বইটি পড়া শেষ হবার পর আমার দৃঢ়ভাবে মনে হয়েছে, এই বইটি শুধু বর্তমান প্রজন্মের সরকারি অফিসার-কর্মচারীদের জন্য নয়, বরং ত্রিপুরার অতীত, সমাজ, সংস্কৃতি, শিক্ষা ব্যবস্থা, প্রশাসনিক বিবর্তন এবং স্বাধীনোত্তর সময়ের পরিবর্তনের ধারাবাহিকতা জানতে আগ্রহী মানুষের পড়া উচিত। কারণ এটি নিছক একটি আত্মজীবনী নয়, এটি এক যুগের জীবন্ত ইতিহাস। কিশোর আম্বুলী তাঁর শৈশবের আগরতলাকে বইটিতে যেভাবে তুলে ধরেছেন, তা আজকের প্রজন্মের ছেলে মেয়েদের কাছে রূপকথার মতো মনে হতে পারে। কিশোর আম্বুলীর মতে, সেই আগরতলায় ছিল আন্তরিকতা, প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক, মানবিক বন্ধন, বইপড়ার পরিবেশ এবং সংস্কৃতিচর্চার এক অসাধারণ আবহ। লেখকের স্মৃতিতে উঠে আসা ১৯৫৬ সালের বন্যা কেবল একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিবরণ নয়, বরং দুর্যোগের মুখে মানুষের সহমর্মিতা, সহযোগিতা এবং বেঁচে থাকার সংগ্রামের এক মূল্যবান সামাজিক দলিল।

বইটির অন্যতম আকর্ষণ লেখকের পাঠাভ্যাসের বর্ণনা। আজ যখন ডিজিটাল বিনোদনের ভিড়ে বই পড়ার সংস্কৃতি ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে, তখন কিশোর আম্বুলী-র শৈশবের বইপ্রীতি আমাদের নতুন করে ভাবায়। তাঁর পিতার উৎসাহে গড়ে ওঠা সেই পাঠজগত পরবর্তীকালে তাঁকে একজন চিন্তাশীল, সংবেদনশীল এবং দূরদর্শী মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেছিল, এ কথা বইটির প্রতিটি অধ্যায়ে স্পষ্ট। তাই কিশোর আম্বুলীর কোনরূপ অনুরোধ ছাড়াই তার ২০২২ সালে লেখা স্মৃতির ঝাঁপি’র উপর খানিকটা আলোকপাত করার চেষ্টা করলাম।

বইটির দ্বিতীয় অংশে আমরা দেখি একজন স্বপ্নবাজ তরুণ কীভাবে কঠোর পরিশ্রম, অধ্যবসায় এবং আত্মবিশ্বাসের মাধ্যমে প্রশাসনিক জীবনের শীর্ষে পৌঁছেছেন। হাইকোর্টে কর্মজীবন, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় সাফল্য, ত্রিপুরা সিভিল সার্ভিসে যোগদান এবং পরবর্তীকালে গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন, সমগ্র যাত্রাপথ তিনি অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে তুলে ধরেছেন।

এই অংশটি বিশেষ ভাবে নতুন প্রজন্মের প্রশাসনিক কর্মকর্তা এবং তরুণদের জন্য অনুপ্রেরণামূলক। কারণ এখানে সাফল্যের পেছনের কঠোর পরিশ্রম, সীমাবদ্ধতার সঙ্গে লড়াই এবং কর্মের প্রতি নিষ্ঠার বাস্তব ছবি পাওয়া যায়।

বাস্তব জীবনেও দেখেছি, কিশোর আম্বুলী-র প্রশাসনিক দর্শন ছিল অত্যন্ত মানবিক। তিনি প্রশাসনকে কখনও ক্ষমতার আসন হিসেবে দেখেননি, দেখেছেন জনসেবার মাধ্যম হিসেবে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকা থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা, সমস্যা ও প্রত্যাশাকে তিনি প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দুতে স্থান দিয়েছেন। তাঁর অভিজ্ঞতার মাধ্যমে পাঠক বুঝতে পারেন যে উন্নয়ন কেবল পরিসংখ্যানের বিষয় নয়, উন্নয়ন মানে মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা।

ত্রিপুরার প্রশাসনিক ইতিহাসের অনেক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ও এই বইয়ে স্থান পেয়েছে। নির্বাচন পরিচালনা, কর্মসংস্থানমূলক প্রকল্প, গ্রামীণ উন্নয়ন, তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার, ভূমি রেকর্ড আধুনিকীকরণ, শিক্ষা ও পরিবহন খাতের উন্নয়ন, এসব ক্ষেত্রে তাঁর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা বইটিকে প্রশাসনিক ইতিহাসের একটি মূল্যবান তথ্যভান্ডারে পরিণত করেছে।

এই বইয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর আন্তরিকতা। লেখক কোথাও নিজেকে বড় করে দেখানোর চেষ্টা করেননি। তিনি নিজের সাফল্যের পাশাপাশি সীমাবদ্ধতা, সংগ্রাম এবং শেখার অভিজ্ঞতাও সমান ভাবে তুলে ধরেছেন। ফলে বইটি আত্মপ্রশংসার দলিল হয়ে ওঠেনি, বরং একজন সৎ, মানবিক ও কর্মনিষ্ঠ মানুষের জীবনের সত্যনিষ্ঠ বিবরণ হয়ে উঠেছে।

‘স্মৃতির ঝাঁপি’ পড়তে পড়তে আমার আরও মনে হয়েছে, আমি যেন একজন মানুষের স্মৃতিকথা পড়ছি না, আমি পড়ছি আগরতলার সামাজিক ইতিহাস, ত্রিপুরার প্রশাসনিক বিবর্তনের ইতিহাস এবং মূল্যবোধভিত্তিক জীবনচর্চার ইতিহাস। আজকের দ্রুত পরিবর্তনশীল সমাজে এই ধরনের বইয়ের গুরুত্ব অপরিসীম।

কিশোর আম্বুলীর প্রশাসনিক দর্শনের মূল ভিত্তি ছিল, “প্রশাসন মানুষের জন্য”। তিনি বিশ্বাস করতেন, একজন প্রশাসকের প্রকৃত সাফল্য কেবল ফাইল নিষ্পত্তি বা প্রকল্প বাস্তবায়নে নয়, বরং সাধারণ মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারার মধ্যেই নিহিত।

জেলাশাসক হিসেবে তিনি কখনও অফিস কেন্দ্রিক প্রশাসনে বিশ্বাস করেননি। মাঠে নেমে, প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষের সঙ্গে কথা বলে, তাঁদের সমস্যা বুঝে এবং দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ গ্রহণ করাই ছিল তাঁর কাজের ধারা। যার ফলে জনগণের সঙ্গে প্রশাসনের দূরত্ব কমেছে।

তখন ধলাই জেলা ছিল ত্রিপুরার অন্যতম দুর্গম ও অনগ্রসর এলাকা। সীমিত অবকাঠামো, যোগাযোগের সমস্যা এবং অর্থনৈতিক পশ্চাৎপদতার মধ্যেও কিশোর আম্বুলী অন্যান্য জেলাশাসকের গতানুগতিক চিন্তার বাইরে গিয়ে উন্নয়নের জন্য পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। বিভিন্ন প্রকল্পকে তিনি কেবল সরকারি স্কিম হিসেবে দেখেননি, বরং মানুষের জীবনমান উন্নয়নের কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন।

পশ্চিম ত্রিপুরার জেলাশাসক হিসেবেও তাঁর সময়কাল ছিল প্রশাসনিক দক্ষতা ও উদ্ভাবনী চিন্তার এক উজ্জ্বল উদাহরণ।

তিনি জেলার প্রতিটি উন্নয়ন প্রকল্পের উপর ব্যক্তিগত নজরদারি রাখতেন। প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতেন। তাঁর কাছে উন্নয়ন মানে ছিল কেবল অর্থ ব্যয় নয়, বরং জনগণের জীবনে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনা।

উচ্চশিক্ষা সচিব হিসেবেও কিশোর আম্বুলীর অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়। ত্রিপুরায় উচ্চশিক্ষার প্রসার এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলির অবকাঠামো উন্নয়নে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

ত্রিপুরার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির প্রতি তাঁর ছিল গভীর শ্রদ্ধা। রাজ্যের বিভিন্ন প্রাচীন মন্দিরের সংস্কার ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে তিনি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেন।

দুর্গাবাড়ি, লক্ষ্মীনারায়ণ বাড়ি, চতুর্দশ দেবতাবাড়ি, কমলাসাগর কালীবাড়ি ইত্যাদি মন্দিরের উন্নয়নে তিনি সক্রিয়ভাবে কাজ করেন। মন্দিরগুলির সৌন্দর্যবর্ধন, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং দর্শনার্থীদের সুবিধা বৃদ্ধির জন্য তাঁর উদ্যোগ প্রশংসিত হয়।

প্রশাসনিক ব্যস্ততার মাঝেও কিশোর আম্বুলী সাহিত্যচর্চা ও লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং আছেন। তাঁর ভ্রমণকাহিনি এবং বিভিন্ন বিষয়ে লেখা পাঠকদের কাছে সমাদৃত হয়েছে।

কিশোর আম্বুলীর কর্মজীবন আমাদের শেখায় যে প্রশাসন কেবল ক্ষমতার প্রয়োগ নয়, এটি মানুষের জীবনকে উন্নত করার এক মহান দায়িত্ব, যা তার 'স্মৃতির ঝাঁপি’ শীর্ষক বইটি পড়লেও বোঝা যায়।

(লেখক একজন সিনিয়র সাংবাদিক, লেখক ও সম্পাদক tripurainfo.com)

আরও পড়ুন...


Post Your Comments Below

নিচে আপনি আপনার মন্তব্য বাংলাতেও লিখতে পারেন।

বিঃ দ্রঃ
আপনার মন্তব্য বা কমেন্ট ইংরেজি ও বাংলা উভয় ভাষাতেই লিখতে পারেন। বাংলায় কোন মন্তব্য লিখতে হলে কোন ইউনিকোড বাংলা ফন্টেই লিখতে হবে যেমন আমার বাংলা কিংবা অভ্রো কী-বোর্ড (Avro Keyboard)। আমার বাংলা কিংবা অভ্রো কী-বোর্ডের সাহায্যে মাক্রোসফট্ ওয়ার্ডে (Microsoft Word) টাইপ করে সেখান থেকে কপি করে কমেন্ট বা মন্তব্য বক্সে পেস্ট করতে পারেন। আপনার কম্পিউটারে আমার বাংলা কিংবা অভ্রো কী-বোর্ড বাংলা সফ্টওয়ার না থাকলে নিম্নে দেয়া লিঙ্কে (Link) ক্লিক করে ফ্রিতে ডাওনলোড করে নিতে পারেন।

Free Download Avro Keyboard

Fields with * are mandatory





Posted comments

Till now no approved comments is available.