“স্মৃতির সেতুবন্ধন - আজির বিদ্যা স্যার”

মোসলেম উদ্দিন আহমেদ

June 14, 2026

৩১শে জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে সরকারি চাকরির মেয়াদ শেষ করে ১লা ফেব্রুয়ারি থেকে আমাকে একটি বিশেষ পারিবারিক প্রয়োজনে প্রায়ই রাজ্যের বাইরে, বিশেষত দিল্লি, আলিগড়, লখনৌসহ বিভিন্ন স্থানে যেতে হচ্ছে। আগরতলা থেকে সরাসরি আকাশপথে দিল্লি আসা-যাওয়ায় প্রতিবার সময় লাগে প্রায় ২ ঘণ্টা ৪৫ মিনিট। তবে তারও দেড়-দুই ঘণ্টা আগেই বিমানবন্দরে পৌঁছে যেতে হয়। কেননা আকাশযান নির্দিষ্ট সময়ে, কিংবা অনেক সময় সব যাত্রী আগে এসে গেলে নির্ধারিত সময়েরও পূর্বে উড্ডয়নের প্রস্তুতি সম্পন্ন করে। আমাদের মতো সাধারণ মানুষের জন্য সে এক মিনিটও অপেক্ষা করে না। তাই কমপক্ষে ৪৫ মিনিট আগে অবশ্যই উপস্থিত হতে হয়। কোনো রকম ঝুঁকি না নিয়ে দেড়-দুই ঘণ্টা আগেই আমাদের, অর্থাৎ যাত্রীদের, বিমানবন্দরে পৌঁছে সেই ছোট্ট চিরকুট—যার আলংকারিক নাম 'বোর্ডিং পাস’–হাতে নিয়ে প্রস্তুত হয়ে থাকতে হয়। ফলে হাতে প্রচুর সময় থেকে যায়।

এই পৃথিবীতে জীবনের ৬০ বছর সময় কাটিয়ে দিলাম, তবুও বিমান বা রেলে অসংখ্য মানুষের ভিড়ে চেনাজানা মানুষের দেখা অধিকাংশ সময়ই মেলে না। অচেনা-অপরিচিত মানুষগুলো নিজেদের হাতের মোবাইল ফোনেই বন্দি হয়ে থাকে, অথবা নিজস্ব পরিচিত আপনজনদের মধ্যেই আলোচনা কিংবা গল্পগুজবে সীমাবদ্ধ থাকে। অনেক সময় ইচ্ছে করেও কথা বলতে চাইলে অচেনা মানুষ খুব একটা আগ্রহ দেখায় না। জানি না কেন মানুষ অদেখা বা অচেনা মানুষের সঙ্গে দিলখোলা ও সহজভাবে কথা বলতে চায় না। এই অবস্থায় চলার সঙ্গী হিসেবে বিভিন্ন ঘটনার আদান-প্রদান করে সময় কাটানোর একমাত্র মাধ্যম, কিংবা বলা যায় একমাত্র ভালো বন্ধু, হলো বই বা পুস্তক।

আকাশপথে বিজ্ঞানের তৈরি প্রাণহীন উড়ন্ত পাখির পেটে বসে, মেঘের কোলে ভেসে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে দিতে গত কয়েক মাসে অনেকগুলো বই পড়া হয়ে গেছে। এবার যখন আবার যাত্রা করছিলাম, তখন আমার সিনিয়র সহকর্মী, প্রাক্তন টিসিএস অফিসার শ্রদ্ধেয় নেপাল চন্দ্ৰ সেনের অতি সম্প্রতি প্রকাশিত অত্যন্ত তথ্যবহুল বই "Romancing with Challenges - A Civil Servant's Story" সঙ্গে নিয়েছিলাম। বইটিতে তিনি দিন-তারিখসহ তাঁর চাকরিজীবনের নানাবিধ ঘটনা অত্যন্ত যত্ন ও নিষ্ঠার সঙ্গে ১৭টি অধ্যায়ে এমন জীবন্তভাবে তুলে ধরেছেন, যা সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে। এটি নিঃসন্দেহে একটি কঠিন ও শ্রমসাধ্য কাজ। বইটি পড়তে পড়তে নিজের কর্মজীবনের বহু স্মৃতি মনে ভেসে উঠছিল। পুরো বইটি আকাশপথের এক যাত্রায় শেষ করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তাই সময় পেলেই বইটি হাতে নিয়ে কিছুটা সময়ের জন্য নিজেকে অন্য এক জগতে ডুবিয়ে রাখার ইচ্ছে জাগে।

মেয়ের কল্যাণে আমাকে পূর্ব দিল্লির দিলশাদ গার্ডেন এলাকার একটি ভাড়া বাড়িতে কিছুদিন থাকতে হচ্ছে। মেয়ে তার কর্মস্থলে, অর্থাৎ হাসপাতালে, চলে যাওয়ার পর আমি একেবারেই নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ি। এই ভবনের এবং আশপাশের কিছু মানুষের সঙ্গে পরিচয় ঘটেছে বটে, কিন্তু বসে আড্ডা দেওয়া বা গল্পগুজব করার মতো ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব এখনও গড়ে ওঠেনি। তাই ঘরের প্রাথমিক ও প্রয়োজনীয় কিছু কাজ সেরে বইটি হাতে নিয়ে পাতা উল্টাতে উল্টাতে এক জায়গায় এসে দেখি- নেপাল চন্দ্র সেন যখন উত্তর ত্রিপুরার বর্তমান ঊনকোটি জেলার কৈলাসহরে টিসিএস প্রবেশনার অফিসার হিসেবে কর্মরত ছিলেন, তখন অবিভক্ত উত্তর ত্রিপুরা জেলার (বর্তমান উত্তর ত্রিপুরা, ঊনকোটি ও ধলাই জেলা নিয়ে গঠিত) জেলা শাসক ছিলেন শ্রী আজির বিদ্যা, ১৯৭৭ ব্যাচের মণিপুর- ত্রিপুরা ক্যাডারের একজন আইএএস ইয়ং অফিসার।

শ্রী সেন তাঁর বইয়ের “The New Beginning - A Probationer in Civil Service” নামক অধ্যায়ে তৎকালীন উত্তর ত্রিপুরার জেলাশাসক শ্রী আজির বিদ্যার ব্যক্তিত্ব ও কর্মধারা সম্পর্কে বিস্তৃতভাবে আলোচনা করেছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, জেলাশাসক তাঁর টিম নিয়ে বর্তমান ধলাই জেলার আমবাসা ব্লকের খগেন্দ্র রোয়াজাপাড়া পরিদর্শনে গেলে এলাকার মানুষ তাঁকে “উত্তর ত্রিপুরার সাধারণ কর্তা কি জয়” স্লোগানে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানায়। এক জায়গায় শ্রী সেন আজির বিদ্যা স্যার সম্পর্কে লিখেছেন-"On the first day of our journey, Mr. Ajir Vidya struck me as a kind-hearted, untraditional Collector. However, I never imagined that he could also be a team player with such a generous heart." তিনি আরও লিখেছেন, প্রবেশনকাল শেষ হওয়ার পর এক সন্ধ্যায় জেলাশাসক সমস্ত প্রবেশনার অফিসারদের তাঁর সরকারি বাসভবনে আমন্ত্রণ জানান। সেই আতিথেয়তা ও আন্তরিকতার বর্ণনা দিতে গিয়ে শ্রী সেন লিখেছেন- "It was more than surprising that Mr. Ajir Vidya, the Collector himself, waited for our arrival. It was unexpected. He welcomed everyone, treating us as the most important visitors to his residence. His wife herself brought us tea and snacks. He kept an eye to ensure that everyone enjoyed the evening refreshment." প্রতিটি লাইন পড়তে পড়তে আমার নিজের কর্মজীবনের বহু স্মৃতি যেন একে একে জেগে উঠছিল। বিশেষ করে আজির বিদ্যা স্যারের সঙ্গে স্বল্প সময়ের কর্ম-সম্পর্কের স্মৃতিগুলো মনের পর্দায় স্পষ্ট হয়ে ভেসে উঠছিল।

আমি ২০ জুলাই ২০০০ তারিখে বক্সনগর ব্লকে চাকরিজীবনের প্রথম বিডিও হিসেবে যোগদান করি। যোগদানের কিছুদিনের মধ্যেই একদিন পশ্চিম ত্রিপুরার জেলাশাসকের কার্যালয় থেকে একটি ফ্যাক্স বার্তা আসে। তখনকার সময়ে আজকের মতো মোবাইল ফোন, হোয়াটসঅ্যাপ কিংবা ইনস্টাগ্রামের যুগ ছিল না; ল্যান্ডফোন, ফ্যাক্স ও টেলিগ্রামই ছিল যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম৷ ফ্যাক্স বার্তায় দিন, তারিখ ও সময় উল্লেখ করে জানানো হয় যে ত্রিপুরা সরকারের গ্রামোন্নয়ন দপ্তরের প্রধান সচিব বক্সনগর ব্লক পরিদর্শনে আসবেন। আরও বলা হয়, সোনামুড়া মহকুমার আরও দুটি ব্লকের বিডিও, পঞ্চায়েত সমিতির চেয়ারম্যান এবং ব্লক অ্যাডভাইজরি কমিটির প্রতিনিধিদের সঙ্গে নিয়ে তিনি বক্সনগর ব্লকের কয়েকটি গ্রাম সকাল ৯টা থেকে পরিদর্শন করবেন। সেখানে স্বনির্ভর গোষ্ঠীগুলোর কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করবেন, সদস্যদের সঙ্গে কথা বলবেন। যেমন সফল গোষ্ঠীগুলো দেখবেন, তেমনি যেসব গোষ্ঠী এখনও কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন করতে পারেনি, সেগুলিও খতিয়ে দেখবেন এবং সবার সঙ্গে মতবিনিময় করবেন। বিডিও হিসেবে আমাকে সমস্ত বিষয় নথিভুক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়।

সকালের পুরো সময় গ্রাম পরিদর্শনের পর বিকেল ৩টায় পঞ্চায়েত সমিতির কনফারেন্স হলে প্রধান সচিবের সভাপতিত্বে একটি পর্যালোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে তিনটি ব্লকের চেয়ারম্যান, বিডিও এবং গ্রামোন্নয়ন দপ্তরের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের উপস্থিত থাকার নির্দেশ ছিল। প্রধান সচিবের ব্লক পরিদর্শন—বিষয়টি স্বাভাবিকভাবেই আমার মনে এক ধরনের উদ্বেগ সৃষ্টি করেছিল। কর্মজীবনের একেবারে শুরুতেই এত উচ্চপদস্থ একজন কর্মকর্তার সফর। সবকিছু ঠিকঠাক না থাকলে বিপাকে পড়তে হবে-এই আশঙ্কায় যথাসাধ্য চেষ্টা করছিলাম সমস্ত প্রস্তুতি সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে। কোন কোন গ্রাম পরিদর্শন করা হবে তা নির্ধারণ করে প্রতিটি গ্রামের পঞ্চায়েত প্রতিনিধি এবং স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয় ।

যথাসময়ে তিনটি ব্লকের চেয়ারম্যানসহ সবাই গ্রাম পরিদর্শন শেষ করে পর্যালোচনা সভায় অংশগ্রহণ করলেন। সেখানে আমি একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষ্য করেছিলাম—আমার মতো

নবীন ও জুনিয়র কর্মকর্তাদের প্রতিও প্রধান সচিব অত্যন্ত স্নেহশীল ও আন্তরিক ছিলেন। তিনি শুধু নির্দেশ দেননি; বরং কাজকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য উৎসাহ ও মূল্যবান পরামর্শ ও দিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে প্রতি মাসে পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন ব্লকে এ ধরনের পরিদর্শন ও পর্যালোচনা সভা অনুষ্ঠিত হতো।

আজ, প্রায় পঁচিশ বছর পর, আজির বিদ্যা স্যার সম্পর্কে লেখা এই স্মৃতিচারণ পড়তে গিয়ে আমি গভীরভাবে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ি। আমারও সরকারি কর্মজীবনের পরিসমাপ্তি ঘটেছে। কর্মজীবনের একেবারে শুরুতে যাঁর সংস্পর্শে এসে, যাঁর পরামর্শ ও প্রেরণা নিয়ে কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলাম, তাঁকে ঘিরে সেই ব্যস্ত দিনগুলোর স্মৃতি আজ আবার উজ্জ্বল হয়ে চোখের সামনে ভেসে উঠছে। মনে হয়, সময়ের স্রোত বয়ে গেলেও কিছু মানুষ এবং কিছু মুহূর্ত কখনও সত্যিই হারিয়ে যায় না; তারা স্মৃতির গভীরে অমলিন হয়ে থেকে যায়।

মনে মনে ভাবছি-স্যার এখন কোথায় আছেন? কেমন আছেন? আদৌ সুস্থ আছেন কি না, কিছুই তো জানি না। কিভাবে তাঁর সন্ধান পাওয়া যায়? যদি একবার দেখা করার সুযোগ হয়, তবে সেটি হবে আমার জীবনের এক বিরাট প্রাপ্তি। এত বছর কেটে গেছে। তিনি বহু আগেই চাকরি জীবন থেকে অবসর নিয়েছেন। আমারও সরকারি কর্মজীবনের পরিসমাপ্তি ঘটেছে। কত পুরোনো দিনের কথা! স্যারের শরীর-স্বাস্থ্য কেমন আছে, তা নিয়েও মনে নানা প্রশ্ন ও উদ্বেগ ঘুরপাক খেতে লাগল। অবশেষে অগতির গতি হিসেবে গুগলের শরণাপন্ন হলাম। গুগলে খোঁজাখুঁজি করে স্যারের বর্তমান ঠিকানার সন্ধান পেলাম। তারপর গুগলকে অনুরোধ করলাম, যদি তাঁর কোনো যোগাযোগ নম্বর থেকে থাকে, তবে সেটিও যেন জানায়। প্রযুক্তির এই যুগে গুগলও যেন মুহূর্তের মধ্যে আমার অনুরোধ রাখল। কিছুক্ষণের মধ্যেই স্যারের মোবাইল নম্বর পেয়ে গেলাম। নম্বরটি হাতে নিয়ে বেশ দ্বিধা ও সংকোচের মধ্যেই ফোন করলাম। Good Morning, Sir. Good Morning. Who is speaking? Sir, myself Moslem Uddin Ahmed. নাম শোনামাত্রই ওপার থেকে ভেসে এলো পরিচিত, উষ্ণ কণ্ঠস্বর -“আরে আহমেদ! বক্সনগর এবং কাঠালিয়া ব্লকে বিডিও হিসেবে তোমাকে পেয়েছিলাম। তুমি প্রথমে বক্সনগরে, পরে কাঠালিয়ায় ছিলে, তাই না?” “হ্যাঁ স্যার।”“তোমাদের কথা আমার বেশ মনে আছে। তুমি কেমন আছো? কোথায় আছো? এখন কী করছো? আর আমার মোবাইল নম্বরই বা কিভাবে পেলে?” এক নিঃশ্বাসে কত প্রশ্ন! তারপর বললেন- “বহুদিন পর তোমার কণ্ঠস্বর শুনলাম।”আমি বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে গেলাম। এতদিন পরেও স্যার আমাকে চিনতে পেরেছেন! তিনি আবার বললেন-“তোমার নাম শুনেই চিনে ফেলেছি। সেই দিনগুলোর কথা মনে

পড়ে গেল, যখন তোমার ব্লকের বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে আমরা মিটিং করতাম। গ্রামোন্নয়ন দপ্তরের বিভিন্ন প্রকল্প, বিশেষ করে স্বনির্ভর গোষ্ঠীগুলোর কাজকর্ম পরিদর্শনের কথা এখনও মনে আছে। ভালো আছো তো?”এভাবেই কথোপকথন চলতে লাগল। আমার মনে হচ্ছিল, যেন বহুদিনের হারিয়ে যাওয়া কোনো আপনজনের কণ্ঠস্বর শুনছি। সেই আনন্দ প্রকাশ করার মতো ভাষা আমার জানা নেই। এত বড় একজন সিনিয়র অফিসার আজও আমাকে মনে রেখেছেন—এই অনুভূতিই ছিল এক অনির্বচনীয় প্রাপ্তি।

স্যার জানতে চাইলেন “এখন কোথায় আছো? আর কতদিন থাকবে?” “স্যার, আমি এখন পূর্ব দিল্লির দিলশাদ গার্ডেনে মেয়ের বাসায় আছি।”মেয়ে ও পরিবারের সকলের খোঁজখবর নিলেন। তারপর বললেন-“ খুব ভালো। একদিন এসো, দেখা হলে ভালো লাগবে। অনেক কথা হবে। “অবশ্যই স্যার।”তিনি আবার স্নেহভরে বললেন-“আসার আগে একবার ফোন করে নিও।”

৩ জুন ২০২৬। দিনের শেষ প্রহর। সারাদিন দিল্লির দিলশাদ গার্ডেন অঞ্চলকে প্রচণ্ড দাবদাহে পুড়িয়ে, ৪১ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় মানুষের জীবনকে প্রায় দুর্বিষহ করে তুলে সূর্যদেব পশ্চিম আকাশে বিদায় নিয়েছেন। ভাবলাম, একটু হাঁটাহাঁটি করে আসি পাশের পার্কে। চারপাশের মানুষ গরমে অতিষ্ঠ হলেও তাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় তেমন কোনো ব্যাঘাত ঘটেছে বলে মনে হলো না। বরং আমার কাছেই গরমটা বেশি অসহনীয় মনে হচ্ছিল। সম্ভবত আমি এই এলাকার নতুন বাসিন্দা বলেই এমন অনুভূতি হচ্ছিল। বাড়ির সামনের রাস্তা অত্যন্ত সুন্দর। সারি সারি সবুজ বৃক্ষ যেন রাস্তার ওপর একটি প্রাকৃতিক ছাউনি তৈরি করেছে। গাছপালার ঘন ছায়ায় রাস্তার অধিকাংশ অংশ ঢাকা থাকে; রোদের তেজ সেখানে খুব একটা পৌঁছাতে পারে না।

দিল্লি নগর নিগমের পার্কে অসংখ্য অচেনা-অজানা মানুষের ভিড়ে আমিও আপন মনে হেঁটে চলেছিলাম। আর সেই সময় মনের গভীর থেকে উঁকি দিয়ে উঠছিল বহু বছরের পুরোনো কর্মব্যস্ত দিনগুলোর স্মৃতি। অতীত যেন নিঃশব্দে বর্তমানের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল।ঠিক তখনই হাতে থাকা মোবাইল ফোনটি সংকেত দিল-কেউ একজন কল করছেন। স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আমি বিস্মিত হয়ে গেলাম। ফোন করেছেন শ্রী আজির বিদ্যা স্যার। “হ্যালো, স্যার।” ওপার থেকে স্নেহমাখা কণ্ঠ ভেসে এলো “কাল তুমি কি ফ্রি আছো?” “হ্যাঁ স্যার, আমি ফ্রি আছি। “তাহলে আগামীকাল দুপুর ১২টার সময় দিল্লির চাণক্যপুরী এলাকার বিনয় মার্গে অবস্থিত CSOI (Civil Services Officers' Institute)-এ চলে এসো। শ্রী শশী প্রকাশ, প্রাক্তন মুখ্য সচিব; শ্রী যশপাল সিং, প্রাক্তন মুখ্য সচিব; এবং শ্রী প্রবীণ শ্রীবাস্তব, সিনিয়র আইএএস অফিসার—সকলেই আসবেন। সবার সঙ্গে তোমার দেখা হবে। চলে এসো।”আমি উত্তেজনা সামলে বললাম- “ঠিক আছে স্যার, আমি অবশ্যই আসব।”ফোন রাখার পর স্বাভাবিকভাবেই মন আনন্দ ও কৌতূহলে ভরে উঠল। বহু বছরের স্মৃতি যেন একে একে জীবন্ত হয়ে উঠছিল। সেদিন রাতে মেয়ে, ডা. রেজওয়ানা, বাড়ি ফিরে এলে তাকে বললাম—“কাল আমি আমার পুরোনো স্যারদের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছি।”

এরপর পুরো ঘটনাটি এবং কর্মজীবনের নানা স্মৃতি তার সঙ্গে ভাগ করে নিলাম। কতদিন পর আমার সেই পুরোনো স্যারদের সঙ্গে দেখা হবে! ভাবতেই এক অদ্‌ভুত আনন্দ অনুভব করছিলাম। প্রায় পঁচিশ বছর পর আজির বিদ্যা স্যারের সঙ্গে সামনাসামনি সাক্ষাৎ হবে-এই ভাবনাটুকুই আমার কাছে এক অসাধারণ প্রাপ্তি হয়ে উঠেছিল।

৪ঠা জুন সকাল বেলা ওবেরের মাধ্যমে একটি গাড়ি বুক করে গাড়িতে দিল্লির উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। নির্দিষ্ট গন্তব্যস্থলে পৌঁছার ১০-১৫ মিনিট বাকি,এমন সময় স্যারের ফোন, আহমেদ, তুমি কোথায় আছো ? হ্যাঁ স্যার, আমি কাছাকাছি চলে এসেছি, আর দশ পনেরো মিনিটের মধ্যেই পৌঁছে যাব। ঠিক আছে, এসো আমি এবং ওয়াইপি (যশপাল সিং) চলে এসেছি। আমি CSOIতে প্রবেশ করে দরজা থেকেই দেখছি শ্রী আজির বিদ্যা স্যার, শ্রী যশপাল সিং এবং আরো একজন -তিন জনই বসে গল্প গুজবে মশগুল। দূর থেকেই আমি আজির বিদ্যা স্যার এবং ওয়াইফি সিংসার কে চিনতে পেরেছি। কাছাকাছি পোছতেই আজির বিদ্যা স্যার কাছে ডেকে নিয়ে কাঁধে হাত দিয়ে অত্যন্ত স্নেহভরে ছোট ভাইয়ের মতো করে বললেন, বস,আহমেদ বস। তোমাকে বহুদিন পর দেখলাম। ওয়াই ফিশিং স্যার আরেক জনের সঙ্গে কথা বলছিলেন। নমস্কার স্যার কেমন আছেন বলতেই ওয়াই ফি স্যার, আরে মোসলেম উদ্দিন কেমন আছো? বহুদিন পরে তোমাকে দেখেছি? তুমি কি এখনো আছে চাকরিতে আছো ? না, স্যার,আমি তো গত ৩১শে জানুয়ারি ২০২৬ অবসর নিলাম। এই সেইদিন চাকরিতে ঢুকলে, ৬০ বছর হয়ে গেল। দেখতে দেখতে সময় চলে যায়। ওনার সঙ্গে হয়তো তোমার পরিচয় নেই, ইনি হচ্ছেন শ্রী প্রবীন শ্রীবাস্তব, সিনিয়র আই এ এস অফিসার। এখন আমরা সবাই অবসর জীবন যাপন করছি। আজির বিদ্যা স্যারের স্বাস্থ্য ঠিক আগের মতই আছে, তবে বার্ধক্যের ছাপ একটু বুঝা যায়। কিন্তু পুরোপুরি সুস্বাস্থ্যের অধিকারী। একটু পরেই প্রাক্তন মুখ্য সচিব শ্রী শশী প্রকাশ স্যার হাজির হলেন। স্যার খুব ভালো বাংলা বলেন। আমি বাংলা ভাষাটি এখনো চর্চায় রাখি। বাড়িতে দুজন কাজের লোক আছে, ওরা বাঙালি, ওদের সঙ্গে আমি সব সময় বাংলায় কথাই বলি। আজির বিদ্যা স্যার জানতে চান তুমি আমার নাম্বার কোথায় পেলে। এ প্রসঙ্গে আমি শ্রী নেপাল চন্দ্ৰ সেনের লেখা বইয়ে প্রসঙ্গ এবং গুগল থেকে স্যারের নাম্বার পেয়েছি বলে উনাদের জানাই। শ্ৰী শশী প্রকাশ স্যার বললেন, নেপাল এখন আবার বই লিখে,সে কি বই লিখছে। অত্যন্ত স্নেহভরে বললেন ওই দুষ্টটার নাম্বার আছে তোমার কাছে ? আছে স্যার। আমার মোবাইলে তার নাম্বারটা সেভ করে দাও। ওর সঙ্গে কথা বলতে হবে। আমি এখন আর এইসব ঠিক মত করতে পারছিনা। স্যার খুব আস্তে আস্তে কথা বলেন। রাজ্যের অনেকের কথাই উনি জিজ্ঞাসা করলেন। আজির বিদ্যা স্যার ত্রিপুরা রাজ্যের আমাদের সময়কার প্রায় সব বিডিওদের সম্পর্কেই জানতে চাইলেন, কে কোথায় কেমন আছেন। ওয়াইফি শিং স্যার, শশী প্রকাশ স্যার এবং শ্রী প্রবীণ শ্রীবাস্তব স্যার - প্রায় সবাই রাজ্য প্রশাসনের এবং রাজ্যের উন্নয়নমূলক বিভিন্ন কাজকর্মের প্রসঙ্গ আলোচনা করেন। রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী নৃপেন চক্রবর্তী, মানিক সরকার এবং এবং রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্য সচিব শ্রী এস আর সংকরণ সহ অনেকের কথাই ওনারা আলোচনা প্রসঙ্গে বলেন।স্বাস্থ্যের খোঁজখবর করেন। সবাই রাজ্যের বিশেষ করে টিসিএস অফিসারদের কাজকর্মের ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং এটাও বলেন ত্রিপুরা রাজ্যের প্রশাসনের সততা ও স্বচ্ছতা নিয়ে এখনো আমরা গর্ববোধ করি । এ রাজ্যের করে উন্নয়নের কাজে অংশীদার হতে পারে আমরা অত্যন্ত খুশি। উনাদের কথাবার্তায় এটা পরিষ্কার এখনো উনারা আমাদের ত্রিপুরা রাজ্য এবং রাজ্যের মানুষকে অত্যন্ত ভালবাসেন ।রাজ্যের ভালো খবর সুখবর অত্যন্ত আনন্দিত হন এবং খারাপ কিছুতে বেশি ব্যথিত হন।

"সিভিল সার্ভিস অফিসার্স ইনস্টিটিউটের ডাইনিং টেবিল ঘিরে স্মৃতিমাখা আলাপচারিতা, হাসি-আনন্দ আর আন্তরিকতার এক অপূর্ব সন্ধ্যা কেটে গেল। সুস্বাদু আহারের সঙ্গে প্রাণবন্ত আলোচনা যেন পুরোনো দিনের বন্ধনকে আরও দৃঢ় করে তুলল। এই মিলনমেলার সমস্ত ব্যয়ভার অত্যন্ত স্নেহ ও উদারতার সঙ্গে বহন করলেন আজির বিদ্যা স্যার। সময়ের নিয়মে একসময় বিদায়ের ক্ষণ উপস্থিত হলো। ‘আবার দেখা হবে - এই আশাবাদ বুকে নিয়ে একে একে সবাই বিদায় নিলেন। কিন্তু সেদিনের উষ্ণতা, সৌহার্দ্য আর হৃদয়ছোঁয়া মুহূর্তগুলো স্মৃতির পাতায় দীর্ঘদিন অম্লান হয়ে থাকবে।

আরও পড়ুন...


Post Your Comments Below

নিচে আপনি আপনার মন্তব্য বাংলাতেও লিখতে পারেন।

বিঃ দ্রঃ
আপনার মন্তব্য বা কমেন্ট ইংরেজি ও বাংলা উভয় ভাষাতেই লিখতে পারেন। বাংলায় কোন মন্তব্য লিখতে হলে কোন ইউনিকোড বাংলা ফন্টেই লিখতে হবে যেমন আমার বাংলা কিংবা অভ্রো কী-বোর্ড (Avro Keyboard)। আমার বাংলা কিংবা অভ্রো কী-বোর্ডের সাহায্যে মাক্রোসফট্ ওয়ার্ডে (Microsoft Word) টাইপ করে সেখান থেকে কপি করে কমেন্ট বা মন্তব্য বক্সে পেস্ট করতে পারেন। আপনার কম্পিউটারে আমার বাংলা কিংবা অভ্রো কী-বোর্ড বাংলা সফ্টওয়ার না থাকলে নিম্নে দেয়া লিঙ্কে (Link) ক্লিক করে ফ্রিতে ডাওনলোড করে নিতে পারেন।

Free Download Avro Keyboard

Fields with * are mandatory





Posted comments

Till now no approved comments is available.