সিবিএসই-র শিক্ষাব্যবস্থায় যুগান্তকারী পরিবর্তন: তৃতীয় শ্রেণি থেকেই এআই শিক্ষা, বাধ্যতামূলক তিন ভাষা, তবে ত্রিপুরায় অপ্রতুল পরিকাঠামো নিয়ে প্রশ্ন
জয়ন্ত দেবনাথ
June 5, 2026
ভারতের স্কুল শিক্ষাব্যবস্থায় এক নতুন যুগের সূচনা করেছে কেন্দ্রীয় মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড (সিবিএসই)। জাতীয় শিক্ষানীতি (NEP-2020) এবং ন্যাশনাল কারিকুলাম ফ্রেমওয়ার্ক ফর স্কুল এডুকেশন (NCFSE-2023)-এর আলোকে ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে সিবিএসই একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার কার্যকর করার ঘোষণা করেছে। তৃতীয় শ্রেণি থেকেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ও কম্পিউটেশনাল থিংকিং (CT) শিক্ষা, ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে বাধ্যতামূলক তিন ভাষা অধ্যয়ন, নবম-দশম শ্রেণির পাঠক্রমে আমূল পরিবর্তন, দক্ষতাভিত্তিক মূল্যায়ন এবং বৃত্তিমূলক শিক্ষার সম্প্রসারণের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপের মাধ্যমে দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও ভবিষ্যতমুখী করে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্ত তাতে ছাত্র ছাত্রীদের বই এর ব্যাগের ওজন কমানোর পরিবর্তনে খানিকটা বেড়েছে।
তবে এই উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা ত্রিপুরার মতো শিক্ষা পরিকাঠামোর ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে থাকা রাজ্য গুলিতে কতটা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। এখনও রাজ্যের বহু সরকারি বিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত ডিজিটাল পরিকাঠামো, কম্পিউটার, ইন্টারনেট সুবিধা এবং প্রশিক্ষিত শিক্ষকের অভাব রয়েছে। এমনকি নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হওয়ার পরও সব বিদ্যালয়ে পাঠ্যপুস্তক পৌঁছে দেওয়ার কাজ সম্পূর্ণ হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে নতুন শিক্ষানীতির বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষা প্রশাসনের মধ্যে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
তৃতীয় শ্রেণি থেকেই এআই ও কম্পিউটেশনাল থিংকিং
সিবিএসই ১ এপ্রিল ২০২৬-এ প্রকাশিত অ্যাকাডেমিক সার্কুলারের মাধ্যমে তৃতীয় থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের জন্য কম্পিউটেশনাল থিংকিং ও আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স পাঠক্রম চালুর সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছে। এই পাঠক্রমের মূল লক্ষ্য হলো ছোটবেলা থেকেই শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তি সম্পর্কে সচেতন করে তোলা এবং তাদের মধ্যে যৌক্তিক চিন্তাভাবনা, দ্রুত সমস্যা সমাধানের দক্ষতা, প্যাটার্ন চিহ্নিত করার ক্ষমতা, অ্যালগরিদমিক চিন্তাধারা এবং ডিজিটাল সাক্ষরতা গড়ে তোলা।
সিবিএসই-র মতে, ভবিষ্যতের কর্মসংস্থানের বাজারে প্রযুক্তিগত দক্ষতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। তাই শিক্ষার্থীদের প্রাথমিক স্তর থেকেই প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে পরিচিত করা প্রয়োজন।
নবম ও দশম শ্রেণিতে বাধ্যতামূলক এআই শিক্ষা
নতুন পাঠক্রম অনুযায়ী নবম ও দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্যও কম্পিউটেশনাল থিংকিং ও এআই মডিউল অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। সিবিএসইর পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৭-২৮ শিক্ষাবর্ষ থেকে এই বিষয় গুলিকে পূর্ণাঙ্গ বাধ্যতামূলক বিষয় হিসেবে চালু করা হবে। এর ফলে মাধ্যমিক স্তর থেকেই শিক্ষার্থীরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা বিশ্লেষণ এবং আধুনিক ডিজিটাল প্রযুক্তির বাস্তব ব্যবহার সম্পর্কে জ্ঞান অর্জনের সুযোগ পাবে।
বদলাচ্ছে নবম-দশমের বিষয় কাঠামো:
সিবিএসই নবম ও দশম শ্রেণির বিষয় কাঠামোতেও বড় পরিবর্তন এনেছে। নতুন ব্যবস্থায় গণিত বিষয়ে বেসিক ও স্ট্যান্ডার্ড- এই দুই স্তরের ব্যবস্থা থাকবে। বিজ্ঞানের ক্ষেত্রেও সাধারণ বিজ্ঞান এবং অ্যাডভান্সড বিজ্ঞান অধ্যয়নের সুযোগ রাখা হয়েছে। এর ফলে শিক্ষার্থীরা নিজেদের দক্ষতা, আগ্রহ এবং ভবিষ্যৎ শিক্ষাগত লক্ষ্য অনুযায়ী বিষয় নির্বাচন করতে পারবে।
নতুন পাঠক্রমে ‘Individuals in Society’ নামে একটি নতুন বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি বৃত্তিমূলক শিক্ষা, দক্ষতাভিত্তিক বিষয়, চারুকলা শিক্ষা, শারীরিক শিক্ষা ও সুস্থতা শিক্ষার উপরও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। দশম শ্রেণিতে ‘Individuals in Society’-এর পরিবর্তে ‘Environmental Education’ বা পরিবেশ শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত হবে।
তিন ভাষা অধ্যয়ন বাধ্যতামূলক:
সিবিএসইর নতুন ভাষানীতি শিক্ষাক্ষেত্রে বিশেষ আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। ৯ এপ্রিল ২০২৬-এ প্রকাশিত সার্কুলারের মাধ্যমে R1-R2-R3 ভাষা কাঠামো কার্যকর করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই নতুন ব্যবস্থার অধীনে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে তৃতীয় ভাষা অধ্যয়ন বাধ্যতামূলক হবে।
বিদ্যালয় গুলিকে তাদের নির্বাচিত তৃতীয় ভাষার বিষয়ে সিবিএসইকে জানাতে হবে। ষষ্ঠ শ্রেণিতে যে ভাষা চালু হবে, পরবর্তীকালে নবম ও দশম শ্রেণিতেও সেই ভাষা অধ্যয়নের সুযোগ রাখতে হবে। সিবিএসই-র মতে, এই নীতির মাধ্যমে বহুভাষিক শিক্ষা, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ এবং জাতীয় সংহতি আরও সুদৃঢ় হবে।
মুখস্থ বিদ্যার পরিবর্তে দক্ষতা ভিত্তিক মূল্যায়ন:

নতুন শিক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো দক্ষতা ভিত্তিক মূল্যায়ন ব্যবস্থা। সিবিএসই স্পষ্ট জানিয়েছে যে শিক্ষার্থীদের শুধু তথ্য মুখস্থ করার ক্ষমতার উপর নয়, বরং ধারণাগত বোঝাপড়া, বিশ্লেষণী দক্ষতা, সৃজনশীলতা, অনুসন্ধানী মনোভাব এবং বাস্তব সমস্যার সমাধান করার সক্ষমতার উপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে।
প্রকল্পভিত্তিক শিক্ষা, গবেষণামূলক কার্যক্রম, উপস্থাপনা, অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিক্ষা এবং বাস্তব জীবনের সমস্যার সমাধানমূলক কার্যক্রমকে পাঠক্রমের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হবে। এর ফলে পরীক্ষা কেন্দ্রিক শিক্ষা থেকে বেরিয়ে এসে বাস্তবমুখী শিক্ষার দিকে অগ্রসর হওয়ার পথ তৈরি হবে।
নবম শ্রেণির মূল্যায়ন ও গ্রেডিং পদ্ধতি (Class IX)
নবম শ্রেণির মূল্যায়ন পদ্ধতি মূলত দশম শ্রেণির বোর্ড পরীক্ষার মূল্যায়ন ব্যবস্থার অনুরূপ। তবে এখানে শিক্ষার্থীদের প্রাপ্ত নম্বরের ভিত্তিতে বিদ্যালয় নিজস্বভাবে নির্ধারিত গ্রেড প্রদান করে। এই পদ্ধতির মূল উদ্দেশ্য হলো শিক্ষার্থীদের সামগ্রিক শিক্ষাগত দক্ষতা মূল্যায়ন করা এবং শুধুমাত্র নম্বরের ভিত্তিতে নয়, বরং একটি নির্দিষ্ট গ্রেডের মাধ্যমে তাদের সাফল্য প্রকাশ করা।
নবম শ্রেণির শিক্ষাবিষয়ক (Scholastic Areas) মূল্যায়নে ৯১ থেকে ১০০ নম্বর প্রাপ্ত শিক্ষার্থীরা সর্বোচ্চ A1 গ্রেড লাভ করবে। ৮১ থেকে ৯০ নম্বর প্রাপ্ত শিক্ষার্থীরা A2 গ্রেড পাবে। ৭১ থেকে ৮০ নম্বরের জন্য নির্ধারিত গ্রেড হলো B1। ৬১ থেকে ৭০ নম্বর পেলে শিক্ষার্থী B2 গ্রেড অর্জন করবে। ৫১ থেকে ৬০ নম্বরের জন্য C1 গ্রেড প্রদান করা হবে। ৪১ থেকে ৫০ নম্বরের জন্য নির্ধারিত গ্রেড হলো C2। ৩৩ থেকে ৪০ নম্বর প্রাপ্ত শিক্ষার্থীরা D গ্রেড পাবে।
দশম শ্রেণিতে বোর্ড পরীক্ষা আগের মতো থাকলেও দক্ষতাভিত্তিক ও ধারণাভিত্তিক প্রশ্নের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হবে।
নতুন এনসিইআরটি পাঠ্যপুস্তক:
সিবিএসই জানিয়েছে, নতুন পাঠক্রমের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এনসিইআরটি নতুন ও সংশোধিত পাঠ্যপুস্তক প্রকাশ করবে ,কিছু পুস্তক ইতিমধ্যেই প্রকাশিত হয়েছে। কিছু প্রকাশিত হবার পথে। এই বই গুলিতে ভারতীয় জ্ঞান ব্যবস্থা, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, বাস্তব জীবনের উদাহরণ, আন্তঃবিষয়ক সংযোগ, অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিক্ষা এবং প্রযুক্তি নির্ভর শিক্ষার উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নবম শ্রেণির নতুন বই গুলি ২০২৬ সালের মধ্যেই প্রকাশের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
কর্মসংস্থানের জন্য প্রস্তুত করবে বৃত্তিমূলক শিক্ষা:
নতুন শিক্ষা ব্যবস্থায় বৃত্তিমূলক শিক্ষার উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি, স্বাস্থ্য পরিষেবা, খুচরা ব্যবসা এবং অন্যান্য কর্মমুখী ক্ষেত্রের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পরিচিত করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এর ফলে স্কুল স্তর থেকেই কর্মসংস্থানের উপযোগী দক্ষতা গড়ে তোলার সুযোগ সৃষ্টি হবে।
শিক্ষক ও অভিভাবকদের জন্য বিশেষ উদ্যোগ:
নতুন পাঠক্রম সফলভাবে বাস্তবায়নের জন্য সিবিএসই স্কুল গুলিকে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, অভিভাবকদের সচেতনকরণ এবং বিশেষ প্যারেন্টস-টিচার্স মিটিং আয়োজনের নির্দেশ দিয়েছে। এছাড়াও নতুন পাঠক্রম ও মূল্যায়ন পদ্ধতি সম্পর্কে বিস্তারিত জানাতে বিশেষ ওয়েবিনারের আয়োজন করা হবে।
ত্রিপুরায় বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয়:
শিক্ষা মহলের মতে, সিবিএসই-র এই সংস্কার নিঃসন্দেহে ভারতীয় শিক্ষাব্যবস্থাকে আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার একটি বড় পদক্ষেপ। কিন্তু ত্রিপুরার মতো রাজ্যে পর্যাপ্ত শিক্ষক, কম্পিউটার ল্যাব, ইন্টারনেট সংযোগ, ডিজিটাল অবকাঠামো এবং আর্থিক সংস্থান ছাড়া এই পরিবর্তন বাস্তবায়ন সহজ হবে না।
জানা গেছে, ত্রিপুরা বোর্ডের অধীন বিদ্যালয় গুলিতে এখনও এই নতুন কাঠামো কার্যকর করার মতো পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নেই। বিশেষ করে এআই ও কম্পিউটেশনাল থিংকিং পড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষিত শিক্ষক এবং প্রযুক্তিগত পরিকাঠামোর অভাব একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। ফলে সিবিএসই-র উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা বাস্তবে কতটা সফল হবে, তা অনেকটাই নির্ভর করবে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের সমন্বিত উদ্যোগ, পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ এবং বিদ্যালয় গুলির প্রস্তুতির উপর।
এক কথায়, ভারতের স্কুল শিক্ষা ব্যবস্থায় ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে চলেছে। তবে এই পরিবর্তনের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে দেশের প্রতিটি রাজ্য, বিশেষ করে ত্রিপুরার মতো দূরবর্তী অঞ্চলে, কত দ্রুত এবং কত কার্যকর ভাবে এই নতুন শিক্ষাব্যবস্থা বাস্তবায়ন করা যায় তার উপর।
( লেখক একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও ত্রিপুরাইনফো-র সম্পাদক)
আরও পড়ুন...