২০২৬ বিশ্ব পরিবেশ দিবস ও ভারতের দহনকাল: সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার সংকট
সঞ্জয় রায়
June 5, 2026
১৯৭২ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত এবং ১৯৭৩ সাল থেকে প্রতি বছর ৫ জুন পালিত বিশ্ব পরিবেশ দিবস আজ বিশ্বের বৃহত্তম পরিবেশ-সচেতনতা ও জনসম্পৃক্ততার অন্যতম মঞ্চে পরিণত হয়েছে। ২০২৬ সালের বিশ্ব পরিবেশ দিবসের আয়োজক দেশ আজারবাইজান এবং এবারের প্রতিপাদ্য—“Inspired by Nature. For Climate. For Our Future”। এই প্রতিপাদ্য জলবায়ু সহনশীলতা, বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধার, পরিচ্ছন্ন শক্তি, টেকসই জীবনযাপন এবং বৈশ্বিক সহযোগিতার গুরুত্বকে সামনে নিয়ে আসে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে যখন জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার, সবুজ হাইড্রোজেন, নবায়নযোগ্য শক্তির প্রসার এবং টেকসই উন্নয়নের নতুন পথ নিয়ে আলোচনা চলছে, তখন ভারত এক ভয়াবহ বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। সেই বাস্তবতা হল ক্রমবর্ধমান তাপপ্রবাহ, যা দেশের কোটি কোটি সাধারণ মানুষের জীবন, জীবিকা, স্বাস্থ্য এবং মর্যাদার উপর সরাসরি আঘাত হানছে।
২০২৬ সালের গ্রীষ্ম ভারতের সামনে স্পষ্ট করে দিয়েছে যে জলবায়ু পরিবর্তন আর ভবিষ্যতের কোনো আশঙ্কা নয়; এটি বর্তমানের এক নির্মম বাস্তবতা। তাপপ্রবাহ এখন দেশের অন্যতম ভয়ংকর জলবায়ুজনিত বিপর্যয়ে পরিণত হয়েছে। কিন্তু বন্যা, ঘূর্ণিঝড় বা ভূমিকম্পের মতো দৃশ্যমান ধ্বংসযজ্ঞ সৃষ্টি না করায় এই বিপর্যয়কে এখনও সেই মাত্রার গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয় না। অথচ এর প্রভাব অনেক ক্ষেত্রে আরও গভীর এবং সুদূরপ্রসারী।
ভারতের তাপ-জরুরি অবস্থা
ভারতীয় আবহাওয়া দফতর (IMD) গত কয়েক মাস ধরে সতর্ক করে আসছে যে উত্তর, মধ্য, পূর্ব এবং উপদ্বীপীয় ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে তাপপ্রবাহ ও তীব্র তাপপ্রবাহের পরিস্থিতি অব্যাহত থাকতে পারে। ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের উপরে তাপমাত্রা এখন আর ব্যতিক্রম নয়; বহু স্থানে পারদ ৪৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছুঁয়েছে বা অতিক্রম করেছে। ২০২৬ সালের ২২ মে বিশ্বের ৫০টি উষ্ণতম শহরের সবকটিই ভারতের অন্তর্গত ছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ওডিশা, উত্তরপ্রদেশ, বিহার, রাজস্থান, মহারাষ্ট্র, মধ্যপ্রদেশ, তেলেঙ্গানা এবং ছত্তীসগঢ়ের বহু অঞ্চল রেকর্ড গরমের সাক্ষী হয়েছে। বলা বাহুল্য, ২০২৪ সালে, ভারত তার ইতিহাসে নথিবদ্ধ দীর্ঘতম তাপপ্রবাহের সম্মুখীন হয়েছিল। রাজস্থানের চুরুতে তাপমাত্রা ৫০.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে (১২২.৯ ডিগ্রি ফারেনহাইট) পৌঁছেছিল এবং চুরু, সিরসা ও ফালোদিতে তাপমাত্রা ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস (১২২ ডিগ্রি ফারেনহাইট) স্পর্শ করেছিল। বর্তমানে ভারতের ৫৭ শতাংশ জেলা—যা মোট জনসংখ্যার ৭৬ শতাংশ নিয়ে গঠিত—তীব্র তাপপ্রবাহে আক্রান্ত।
বিজ্ঞানীরা এই পরিস্থিতির পেছনে একাধিক কারণকে দায়ী করছেন। গ্রিনহাউস গ্যাসের ক্রমবর্ধমান নিঃসরণ, পশ্চিমী ঝঞ্ঝার দুর্বলতা, বনভূমি ও সবুজ আচ্ছাদনের হ্রাস, দ্রুত ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ, কংক্রিটের বিস্তার এবং সম্ভাব্য ‘সুপার এল নিনো’-র প্রভাব—সবকিছু মিলিয়েই এই সংকটকে তীব্রতর করেছে। জাতিসংঘের জলবায়ু বিষয়ক শীর্ষকর্তা সাইমন স্টিয়েলও মন্তব্য করেছেন যে কয়লা, তেল এবং গ্যাসের অব্যাহত ব্যবহার জলবায়ু পরিবর্তনকে আরও ত্বরান্বিত করছে এবং ভারতের বর্তমান তাপপ্রবাহ তারই প্রত্যক্ষ ফল।
অদৃশ্য বিপর্যয়: উষ্ণ রাতের আতঙ্ক
তাপপ্রবাহের আলোচনা সাধারণত দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। কিন্তু বর্তমান সংকটের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিকগুলির একটি হল রাতের তাপমাত্রার অস্বাভাবিক বৃদ্ধি। গত এক দশকে, মুম্বাইতে প্রতি গ্রীষ্মে অতিরিক্ত ১৫টি অত্যন্ত উষ্ণ রাতের ঘটনা নথিবদ্ধ হয়েছে; একইভাবে বেঙ্গালুরুতে ১১টি, ভুপাল ও জয়পুরে ৭টি করে, দিল্লিতে ৬টি এবং চেন্নাইতে ৪টি এমন রাতের ঘটনা দেখা গেছে। ঘিঞ্জি বস্তি, টিনের ছাউনি দেওয়া ঘর, অপর্যাপ্ত বায়ু চলাচলযুক্ত বাসস্থান এবং অনানুষ্ঠানিক আবাসনে বসবাসকারী কোটি কোটি মানুষের কাছে রাত আর স্বস্তি বয়ে আনে না। দেশের বহু অঞ্চলে রাতের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের উপরে অবস্থান করছে। চিকিৎসকরা সতর্ক করেছেন যে মানুষের শরীর রাতে যথেষ্ট পরিমাণে ঠান্ডা হতে না পারলে দিনের তাপজনিত চাপ শরীরে জমা হতে থাকে। রাতের এই অতিরিক্ত উষ্ণতা শহুরে জনসংখ্যার ওপর এক মারাত্মক মনস্তাত্ত্বিক ও শারীরিক চাপ সৃষ্টি করছে। যাদের ঘরে পর্যাপ্ত শীতলীকরণের ব্যবস্থা নেই, বিশেষত দরিদ্র জনগোষ্ঠী, তারাই এই পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় শিকার।
জনস্বাস্থ্যের উপর তাপপ্রবাহের আঘাত
তাপপ্রবাহ শুধুমাত্র অস্বস্তিকর আবহাওয়া নয়; এটি একটি জনস্বাস্থ্য সংকট। অতিরিক্ত গরমের কারণে হিট ক্র্যাম্প, মারাত্মক শরীরে জলের ঘাটতি, হিট স্ট্রোক, কিডনির ক্ষতি এবং হৃদরোগজনিত জটিলতা দেখা দিতে পারে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী ২০০০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে ভারতে তাপপ্রবাহের কারণে ১০ হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি, কারণ বহু মৃত্যুই সরাসরি তাপপ্রবাহজনিত বলে নথিভুক্ত হয় না। শিশু, প্রবীণ নাগরিক, গর্ভবতী নারী, কৃষক, নির্মাণ শ্রমিক, রিকশাচালক, ডেলিভারি কর্মী, পথবিক্রেতা এবং গৃহহীন মানুষ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। সামাজিক বৈষম্য এই বিপর্যয়কে আরও নির্মম করে তোলে। ধনী মানুষ শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘর, অফিস, গাড়ি এবং শপিং মলে আশ্রয় নিতে পারেন। কিন্তু দরিদ্র মানুষের সামনে সেই সুযোগ থাকে না।
অর্থনীতির উপর তাপপ্রবাহের মূল্য
তাপপ্রবাহ এখন কেবল পরিবেশগত বা স্বাস্থ্যগত সমস্যা নয়; এটি এক গভীর অর্থনৈতিক সংকটেও পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে যে ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রার কারণে ২০৩০ সালের মধ্যে ভারতে প্রতিদিনের কর্মঘণ্টার প্রায় ৫.৮ শতাংশ হারিয়ে যেতে পারে। কৃষি, নির্মাণ, পরিবহণ এবং অসংগঠিত ক্ষেত্রে এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়বে। গবেষণা আরও বলছে, গড় তাপমাত্রা মাত্র এক ডিগ্রি বৃদ্ধি পেলেও বহিরাঙ্গনে কাজ করা শ্রমিকদের আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। তীব্র তাপপ্রবাহের সময় বহু শ্রমিক তাঁদের দৈনিক আয়ের ৪০ শতাংশ পর্যন্ত হারান, কারণ জীবন রক্ষার তাগিদে তাঁদের কাজ বন্ধ রাখতে হয়। এর প্রভাব কেবল শ্রম উৎপাদনশীলতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। কৃষি উৎপাদন হ্রাস, জলসংকট বৃদ্ধি, স্বাস্থ্যব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি, খাদ্যদ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি, নগর অবকাঠামোর উপর অতিরিক্ত চাপ এবং গ্রামাঞ্চল থেকে শহরমুখী অভিবাসন—সবকিছুর সঙ্গে তাপপ্রবাহ জড়িয়ে পড়ছে। ফলে টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন আরও কঠিন হয়ে উঠছে।
টেকসই উন্নয়ন বনাম বেঁচে থাকার প্রশ্ন
ভারত ২০৭০ সালের মধ্যে নেট-জিরো নির্গমনের লক্ষ্য এবং টেকসই উন্নয়নের বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করেছে। কিন্তু কোটি কোটি মানুষ যদি ক্রমশ প্রতিকূল হয়ে ওঠা জলবায়ুর মধ্যে বেঁচে থাকতেই না পারেন, তবে সেই উন্নয়নের অর্থ কী?
আজ শীতলীকরণের সুযোগ আর বিলাসিতা নয়; এটি একটি মৌলিক প্রয়োজন হয়ে উঠছে। বিদ্যুৎকে দীর্ঘদিন ধরে অর্থনৈতিক পরিষেবা হিসেবে দেখা হয়েছে। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় বিদ্যুৎকে জনস্বাস্থ্য রক্ষা এবং জলবায়ু অভিযোজনের অপরিহার্য উপাদান হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। একটি পরিবার যদি তাপপ্রবাহের সময় একটি সাধারণ কুলার ( যা অনেক শহরে প্রয়োজনীয় সামগ্রী) চালানোর সামর্থ্য না রাখে, তবে সেটি কেবল অসুবিধার বিষয় নয়; তা তাদের স্বাস্থ্য এবং কখনও কখনও জীবনের জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।
বিদ্যুতের মূল্য, বিদ্যুৎ সংস্কার এবং জলবায়ু ন্যায়বিচার
আজ ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জননীতিগত প্রশ্ন হল—চরম গরম থেকে নিজেদের রক্ষা করার জন্য দরিদ্র / মধ্যবর্তী আয়ের পরিবারগুলি কি পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ ব্যবহারের সামর্থ্য রাখে?
২০২৬ সালের মে মাসে দেশের বিদ্যুতের চাহিদা ২৭০ গিগাওয়াট অতিক্রম করেছে। এর বড় অংশই এসেছে শীতলীকরণের চাহিদা থেকে। অথচ লক্ষ লক্ষ নিম্ন ও মধ্য আয়ের পরিবার এখনও পাখা, কুলার বা শীতলীকরন যন্ত্র ব্যবহার করতে ভয় পান, কারণ মাসের শেষে বিদ্যুতের বিল তাঁদের নাগালের বাইরে চলে যেতে পারে। অন্যদিকে, বিদ্যুৎ খাতের ক্রমবর্ধমান বেসরকারিকরণ নিয়েও জনমনে উদ্বেগ বাড়ছে। বিভিন্ন রাজ্যে বিতরণ ব্যবস্থায় বেসরকারি অংশগ্রহণ বাড়ানো হয়েছে আর্থিক ক্ষতি কমানো, বিদ্যুৎ চুরি রোধ, স্মার্ট মিটার স্থাপন এবং পরিষেবার আধুনিকীকরণের যুক্তিতে। কিন্তু সাধারণ মানুষের একাংশের অভিজ্ঞতা ভিন্ন কথা বলে।
অনেকেরই অভিযোগ, বিদ্যুতের ইউনিট মূল্য, স্থায়ী চার্জ এবং অন্যান্য পরিষেবা বাবদ ব্যয় ক্রমাগত বেড়ে চলেছে। বিশেষত গ্রামীণ এলাকায় পরিষেবার মান নিয়ে অসন্তোষ থাকলেও খরচ কমেনি। রাষ্ট্রায়ত্ত বিদ্যুৎ সংস্থাগুলি একসময় কৃষক, দরিদ্র পরিবার এবং সমাজের দুর্বল অংশের জন্য ভর্তুকিযুক্ত পরিষেবা দেওয়ার সামাজিক দায়িত্ব পালন করত। বাজারমুখী কাঠামো শক্তিশালী হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই সুরক্ষাবলয় দুর্বল হয়ে পড়ছে বলে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
ফলে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য তৈরি হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন যখন শীতলীকরণকে জীবনরক্ষাকারী প্রয়োজনীয়তায় পরিণত করছে, তখন সেই শীতলীকরণের প্রধান মাধ্যম বিদ্যুৎই ক্রমশ ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে। এই পরিস্থিতি গভীর জলবায়ু বৈষম্যের জন্ম দিচ্ছে। যারা বৈশ্বিক উষ্ণায়নের জন্য সবচেয়ে কম দায়ী, তারাই এর সবচেয়ে ভয়াবহ পরিণতি ভোগ করছে এবং নিজেদের রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সম্পদ থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে।
তাপপ্রবাহের সময় বিদ্যুৎ সহায়তা কেন জরুরি
যদি তাপপ্রবাহকে জাতীয় গুরুত্বসম্পন্ন দুর্যোগ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়, তবে সরকারের প্রতিক্রিয়াও সেই অনুযায়ী হওয়া উচিত। শুধু মানুষকে ঘরে থাকার বা বেশি জল পান করার পরামর্শ দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। কারণ এসব পরামর্শ ধরে নেয় যে মানুষের কাছে আত্মরক্ষার উপায় আছে। বাস্তবে লক্ষ লক্ষ দরিদ্র / মধ্যবিত্ত পরিবারের বেঁচে থাকা নির্ভর করে সুলভ বিদ্যুতের উপর। তাই তীব্র তাপপ্রবাহের সময় নির্দিষ্ট পরিমাণ বিদ্যুৎ স্বল্পমূল্যে বা ভর্তুকির মাধ্যমে সরবরাহ করার বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা প্রয়োজন। যেমন বন্যা, ঘূর্ণিঝড় বা খরার সময় বিশেষ ত্রাণ ব্যবস্থা নেওয়া হয়, তেমনই তাপপ্রবাহের সময় বিদ্যুৎ সহায়তাকেও দুর্যোগ মোকাবিলার অংশ হিসেবে দেখা উচিত। এর পাশাপাশি শক্তি-সাশ্রয়ী পাখা, কুলার এবং অন্যান্য শীতলীকরণ যন্ত্র কেনার জন্য আর্থিক সহায়তা দেওয়া যেতে পারে। স্কুল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, গ্রন্থাগার এবং কমিউনিটি হলগুলিকে অস্থায়ী ‘কুলিং সেন্টার’-এ রূপান্তর করা যেতে পারে, যেখানে প্রবীণ, গৃহহীন এবং ঝুঁকিপূর্ণ মানুষ আশ্রয় নিতে পারবেন। দীর্ঘমেয়াদে নিশ্চিত রক্ষণাবেক্ষণসহ ছাদ-ভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা, বিকেন্দ্রীভূত নবায়নযোগ্য শক্তি প্রকল্প এবং কমিউনিটি-ভিত্তিক শীতলীকরণ অবকাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন। এতে একদিকে বিদ্যুতের ব্যয় কমবে, অন্যদিকে পরিবেশবান্ধব শক্তির ব্যবহারও বাড়বে। প্রবীণ নাগরিক, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, গর্ভবতী নারী, শিশু এবং নিম্নআয়ের পরিবারগুলির জন্য বিশেষ সহায়তা কর্মসূচি গ্রহণ করা জরুরি। কারণ এই গোষ্ঠীগুলিই তাপপ্রবাহের সময় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে থাকে।
এই ধরনের পদক্ষেপকে কেবল ভর্তুকি বা কল্যাণমূলক ব্যয় হিসেবে দেখা উচিত নয়। বরং এগুলিকে জনস্বাস্থ্য, অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতা, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং মানবিক মর্যাদার উপর বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।
উপসংহার: পরিসংখ্যানের আগে মানুষের জীবন
ভারতের তাপপ্রবাহ সংকট আর ঋতুভিত্তিক অসুবিধা নয়; এটি একটি মানবিক, অর্থনৈতিক, পরিবেশগত এবং উন্নয়নগত জরুরি অবস্থা। জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য সবচেয়ে কম দায়ী মানুষগুলিই আজ সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছেন। তাঁরা এমন ঘরে বাস করেন যেখানে গরম আটকে থাকে, এমন পেশায় নিযুক্ত যেখানে সারাদিন রোদে কাজ করতে হয়, এবং তাঁদের অনেকের কাছেই সুলভ শীতলীকরণের সুযোগ নেই। এই প্রেক্ষাপটে শীতলীকরণের জন্য বিদ্যুতের প্রাপ্যতাকে জনকল্যাণ ও জলবায়ু ন্যায়বিচারের প্রশ্ন হিসেবে দেখা প্রয়োজন। একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের ( inclusive development) স্বপ্ন দেখানো রাষ্ট্রের পক্ষে এই বাস্তবতা উপেক্ষা করা সম্ভব নয় যে দেশের কোটি কোটি মানুষ বিদ্যুতের বিলের ভয়ে কুলার / শীতলীকরন সরঞ্জাম চালাতে দ্বিধা বোধ করেন। বিশ্ব পরিবেশ দিবস ২০২৬-এর প্রতিপাদ্য আমাদের ভবিষ্যৎকে প্রকৃতি ও জলবায়ুর সঙ্গে যুক্ত করে দেখার আহ্বান জানায়। সেই আহ্বানের প্রেক্ষিতে ভারতেরও উচিত শুধু নির্গমন কমানোর লক্ষ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে মানুষের জীবন রক্ষাকারী অভিযোজনমূলক পদক্ষেপগুলিকে অগ্রাধিকার দেওয়া।
টেকসই উন্নয়নের প্রথম শর্ত কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নয়; বরং এটি নিশ্চিত করা যে সাধারণ মানুষ একটি উষ্ণতর পৃথিবীতেও মর্যাদার সঙ্গে বাঁচতে, কাজ করতে, ঘুমাতে এবং সুস্থ থাকতে পারবেন। সময় এসেছে তাপপ্রবাহকে জাতীয় সংকট হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার এবং এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলার, যেখানে শুধুমাত্র শীতলীকরণের ব্যয় বহন করতে না পারার কারণে কোনো নাগরিককে প্রাণঘাতী গরমের মুখে অসহায় হয়ে পড়তে না হয়।
আরও পড়ুন...