প্রযুক্তি নির্ভর পরিষেবা প্রদানে দ্রুত এগুচ্ছে ত্রিপুরা, কিন্তু বড় চ্যালেঞ্জ প্রশিক্ষিত লোকবল ও রক্ষণাবেক্ষণ
জয়ন্ত দেবনাথ
June 1, 2026
ছোট রাজ্য হলেও ডিজিটাল প্রশাসনের ক্ষেত্রে গত কয়েক বছর ধরেই দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে ত্রিপুরা। তথ্যপ্রযুক্তি নির্ভর সরকারি পরিষেবা চালুর ক্ষেত্রে রাজ্য সরকার যেভাবে একের পর এক নতুন উদ্যোগ নিচ্ছে, তা দেশের প্রশাসনিক মহলেও বিশেষভাবে নজর কেড়েছে। অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, ডিজিটাল পরিষেবা বিস্তারের গতিতে ত্রিপুরা এখন দেশের বড় বড় প্রযুক্তি নির্ভর রাজ্য ও শহর গুলোকেও অনেক ক্ষেত্রে চমকে দিচ্ছে।
ব্যাংগালোর, মহারাষ্ট্র, দিল্লি, কলকাতা কিংবা হায়দরাবাদের মতো উন্নত প্রযুক্তি অবকাঠামো সমৃদ্ধ রাজ্য গুলোর সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যাচ্ছে, সরকারি প্রশাসনের ডিজিটাল সার্ভিস প্রদানে ত্রিপুরা খুব দ্রুত এগিয়ে চলেছে। সীমিত সম্পদ এবং ছোট প্রশাসনিক কাঠামো থাকা সত্ত্বেও রাজ্য সরকার এখন বহু সরকারি পরিষেবা অনলাইনের মাধ্যমে মানুষের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে। কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশ ও মুখ্যমন্ত্রী ডাঃ মানিক সাহার ইচ্ছা ও আন্তরিক আগ্রহের কারণে রাজ্য সরকার এখন পর্যন্ত সাতচল্লিশটি জন পরিষেবা প্রযুক্তি নির্ভর করেছে। তাছাড়া ত্রিপুরা সরকারের ষোলশত চুরানব্বইটি অফিসের কাজ কর্মে আধুনিক ডিজিটাল প্রশাসনিক ব্যবস্থা চালু করেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল সরকারী অফিসার কর্মচারীদের ছুটি থেকে বেতন ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি, ই-ক্যাবিনেট, ই-বিদানসভা, ই-অফিস, ডিজিটাল ট্রেজারি ব্যবস্থা, অনলাইন পেনশন প্রক্রিয়াকরণ, আধারভিত্তিক সরাসরি অর্থ স্থানান্তর এবং কাজের হিসাব ব্যবস্থাপনা তথ্য পদ্ধতি।
এক সময় ত্রিপুরার বহু সরকারি অফিস পুরোপুরি কাগজপত্রের উপর নির্ভর করত। এখন ধীরে ধীরে সেই ব্যবস্থা বদলে যাচ্ছে। সরকারি কর্মচারীদের হাজিরা, মাসিক বেতন, ছুটি, পেনশন, বিল অনুমোদন, বাজেট ব্যবস্থাপনা এবং উন্নয়নমূলক প্রকল্পের হিসাব এখন অনলাইনে করা হচ্ছে। এতে যেমন কাজের গতি বেড়েছে, তেমনি প্রশাসনে স্বচ্ছতাও বৃদ্ধি পেয়েছে।
ত্রিপুরা সরকারের অন্যতম বড় ডিজিটাল উদ্যোগ হল পরবর্তী প্রজন্মের মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে সরকারি কর্মচারীদের চাকরির শুরু থেকে অবসর পর্যন্ত সব তথ্য ডিজিটালভাবে সংরক্ষণ করা হচ্ছে। বর্তমানে এই ব্যবস্থার আওতায় রয়েছে ৬৮টি দপ্তর, ১,৬৯৪টির বেশি সরকারি অফিস। এর ফলে কর্মচারীদের বেতন, হাজিরা, পদোন্নতি, বেতন নির্ধারণ এবং পেনশন সংক্রান্ত কাজ এখন অনেক দ্রুত করা সম্ভব হচ্ছে।
আগে সরকারী অফিসার কর্মচারীদের বাড়ি ভাড়া, ভাতা এবং চিকিৎসা ভাতার ক্ষেত্রে নানা ধরনের অনিয়মের অভিযোগ উঠত। তথ্য গোপন করে স্বামী স্ত্রী দুজনেই হাউজ রেন্ট নিতেন। এখন সফটওয়্যার নিজেই এসব তথ্য যাচাই করছে। ব্যাংক অ্যাকাউন্ট এবং অন্যান্য তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই হওয়ায় ভুয়ো বিল পেশ করে সরকারী তহবিলের অর্থ স্থানান্তর অনেকটাই বন্ধ হয়েছে। সরকার খুব শীঘ্রই ডিজিটাল পদ্ধতিতে অফিসার কর্মচারীদের বদলী, চাকরির যাবতীয় নথি রক্ষণাবেক্ষণ এবং অনলাইন ছুটি ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি চালু করতে যাচ্ছে। এর ফলে কর্মচারীদের ছুটির আবেদন, অনুমোদন এবং চাকরি জীবনের সমস্ত নথি অনলাইনে সংরক্ষণ করা হবে।
ত্রিপুরা সরকার এখন পরবর্তী প্রজন্মের সমন্বিত আর্থিক ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি চালুর দিকেও দ্রুত এগোচ্ছে। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে রাজ্যের আর্থিক অনুমোদন, অর্থ লেনদেন সংক্রান্ত কাজ পুরোপুরি ডিজিটালি হবে। অনলাইন বিল পেমেন্ট ব্যবস্থা, অনলাইন ভাউচার সংরক্ষণ ব্যবস্থা, অনলাইন প্রশাসনিক অনুমোদন, অনলাইন অর্থ প্রদান ব্যবস্থা, আধারভিত্তিক সরাসরি অর্থ স্থানান্তর ব্যবস্থা এবং কাজের হিসাব ব্যবস্থাপনা তথ্য পদ্ধতির সঙ্গে অনলাইন সরকারী সামগ্রীর ক্রয় ব্যবস্থার সংযোগ তৈরি করা হচ্ছে। এর ফলে সরকারি বিল প্রক্রিয়াকরণ, আর্থিক অনুমোদন, বাজেট ব্যবস্থাপনা এবং সরকারি টাকার লেনদেন আরও স্বচ্ছ হবে।
সরাসরি অর্থ স্থানান্তর ব্যবস্থার মাধ্যমে বৃত্তি, ভাতা এবং সরকারি সহায়তার টাকা সরাসরি উপভোক্তার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পৌঁছে যাবে। এতে ভুয়ো সুবিধাভোগী এবং একই ব্যক্তির একাধিক রেকর্ড কমবে। সরকারের মতে, এই ব্যবস্থা চালু হলে সরকারি অর্থ অপচয়ও অনেক কমে যাবে।
কাজের হিসাব ব্যবস্থাপনা তথ্য পদ্ধতি চালু হলে উন্নয়নমূলক কাজের ক্ষেত্রেও বড় পরিবর্তন আসবে। প্রকল্পের হিসাব তৈরি, অনলাইন দরপত্র আহ্বান, কাজের অনুমোদন, বিল প্রক্রিয়াকরণ এবং ট্রেজারি সংক্রান্ত কাজ সম্পূর্ণ ডিজিটাল মাধ্যমে করা হবে। ইতিমধ্যেই ট্রেজারির অধিকাংশ কাজ ডিজিটাল পদ্ধতিতে হচ্ছে। সরকারের আশা, এর ফলে উন্নয়নমূলক কাজের গতি বাড়বে এবং ঠিকাদারদের অর্থ প্রদান দ্রুত হবে।
ত্রিপুরা সরকার এখন শুধু অফিস প্রশাসন নয়, সাধারণ মানুষের জন্যও একাধিক ডিজিটাল পরিষেবা চালু করেছে। মানুষ এখন ঘরে বসেই বিদ্যুৎ বিল অনলাইনে জমা দিতে পারছেন। জমির রেকর্ড, তৌজি এবং দলিল সংক্রান্ত তথ্যও ডিজিটাল নিবন্ধন ব্যবস্থার মাধ্যমে যাচাই করা যাচ্ছে। ব্যবসায়িক অনুমোদনের ক্ষেত্রেও বড় পরিবর্তন এসেছে। সমবায় সমিতি নিবন্ধন, বৈদ্যুতিক লাইন অনুমোদনের মতো বিভিন্ন সরকারি পরিষেবা এখন অনলাইনে দেখা ও অনুসরণ করা সম্ভব হচ্ছে।
তবে এত বড় ডিজিটাল পরিবর্তনের মধ্যে একটি বড় সমস্যাও উঠে এসেছে। আর সেটি হল প্রশিক্ষিত প্রযুক্তিগত লোকবলের অভাব এবং প্রযুক্তির রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা। বহু সরকারি অফিসে এখনও পর্যাপ্ত প্রশিক্ষিত কর্মী নেই। বিশেষ করে গ্রামীণ ও দূরবর্তী এলাকায় ডিজিটাল ব্যবস্থা পরিচালনা, সার্ভার রক্ষণাবেক্ষণ, সফটওয়্যার রক্ষণাবেক্ষণ এবং প্রযুক্তিগত সমস্যার দ্রুত সমাধান করা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অনেক কর্মচারী এখনও নতুন ডিজিটাল ব্যবস্থার সঙ্গে পুরোপুরি অভ্যস্ত নন। ফলে নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়েছে। এই সমস্যা মোকাবিলায় অর্থ দপ্তর এবং তথ্য প্রযুক্তি দপ্তর অবশ্য ইতিমধ্যেই নিয়মিত প্রশিক্ষণ কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। ত্রিপুরার তথ্য প্রযুক্তির
বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী দিনে যদি পর্যাপ্ত প্রশিক্ষিত প্রযুক্তিগত কর্মী তৈরি করা যায় এবং শক্তিশালী প্রযুক্তিগত রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হয়, তাহলে ত্রিপুরা দেশের অন্যতম সেরা ডিজিটাল প্রশাসন মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে। ছোট রাজ্য হওয়া সত্ত্বেও ত্রিপুরা ইতিমধ্যেই প্রমাণ করে দিয়েছে যে সঠিক পরিকল্পনা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে সীমিত সম্পদ নিয়েও বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব।
(লেখক একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও সম্পাদক ত্রিপুরাইনফো)
আরও পড়ুন...