ত্রিপুরার একমাত্র পন্য যা বিশ্বজুড়ে প্রসিদ্ধ: আনানাস থেকে আনারস: ব্রাজিল থেকে ত্রিপুরা

সত্যজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়

May 28, 2026

আগরতলার প্যারাডাইস চৌমুহনী, এককালে প্যারাডাইস মিষ্টান্ন ভাণ্ডার থেকেই এই নামকরণ।কালের গর্ভে সেই "প্যারাডাইস লস্ট" হলেও এই চৌরাস্তার নামটি ইতিহাসের সাক্ষী হিসেবে আজও টিকে আছে।যদিও এই জায়গাটি অন্য একটি কারনেও আগরতলাবাসীর কাছে পরিচিত।মুলত গরমের মরশুমে এখানে আনারসের পসরা নিয়ে বসেন বিক্রেতারা। ত্রিপুরার বিভিন্ন জায়গা থেকে আসে এই আনারস।বর্তমানে ত্রিপুরার ক্যুইন প্রজাতির আনারস GI Tag পেয়েছে ।কোলকাতায় ত্রিপুরার সুমিষ্ট আনারস আগরতলার আনারস হিসেবে আগে থেকেই কিছু মাত্রায় জনপ্রিয় ছিল।

এই লালমাটির দেশের আনাচে কানাচে, গৃহকর্তার ঘরের পাশে, আদরে অনাদরে গজিয়ে ওঠা এই ফলকে কখনও বিদেশি বলে ভাবাটাও যেন এক অবান্তর ভাবনা বলেই মনে হয়।ককবরকে আনারসের প্রতিশব্দ ওমোতুই আর ইংরেজিতে পাইনাপেল।পাইনের কোনের মত আকৃতির জন্যেই ইংরেজিতে এই নামকরন।কথা হল বাংলায় আনারস নামের উৎপত্তি কিভাবে হল? এ কোন তৎসম বা তদ্ভব শব্দ কিন্তু নয়।এর উৎপত্তি খুঁজতে গেলে আপনাকে যেতে হবে পর্তুগালে - দরিয়ায় জাহাজ ভাসিয়ে দেশ আবিষ্কার আর উপনিবেশ স্থাপনের ইতিহাসে। পর্তুগিজদের আনানাস থেকেই এই আনারস শব্দের উৎপত্তি।

১৪৯৮ সালের মে মাস - পর্তুগাল থেকে ভাস্কো -দা - গামার নৌবহর আফ্রিকা মহাদেশ ঘুরে নোঙর করল মালাবারের কালিকটে।ইউরোপিয়দের কাছে আবিষ্কৃত হল ভারতে আসার জলপথ।

সে সময়টা ইউরোপীয়দের ব্যবসা আর নতুন নতুন দেশ আবিষ্কার আর উপনিবেশ স্থাপনের যুগ।

স্পেন থেকে দক্ষিণ আমেরিকায় কলম্বাস গিয়ে পৌঁছন ১৪৯৩ সালে। সেখানকার গুয়াদেলুপেতে দ্বীপে গিয়ে আনারসের সাথে পরিচিত হলেন কলম্বাস।

পর্তুগিজরা আবিষ্কার করেছিল এক কৌনিক যন্ত্র যা তাদের সমুদ্র অভিযানে কার্যকরী ভূমিকা নিয়েছিল।১৫০০ সালে আরেক পর্তুগিজ আন্দ্রে আলভারেজ ক্যাব্রাল আবিস্কার করেন ব্রাজিল উপকূল। সেখানে গিয়েও দেখা পান এই সুমিষ্ট সুস্বাদু ফলের।সেখানের উৎপাদিত আনারসও গিয়ে পৌঁছয় ইউরোপে।পর্তুগিজদের জাহাজে চড়েই ব্রাজিলের সেই আনারস পাড়ি জমায় এই ভারতে।আনানাস থেকে আনারস নামকরণ সেই সাক্ষ্যই বহন করে।

শুধু আনারসই নয়, পেঁপে, মরিচ, পেয়ারা, টমাটো ,পাউরুটি ইত্যাদি বহু কিছুই পর্তুগিজদের হাত ধরে ভারতে এসে পৌঁছেছিল। বহুল পরিচিত এই জিনিস গুলির অস্তিত্বই ছিলনা এই ভূ -ভারতে।

আমাদের এই অঞ্চলের মানুষ এক সময় অভিজ্ঞতায় বুঝতে পেরেছিল যে মাটি ও জল হাওয়ায় শাল গাছ বেড়ে ওঠে আনারসও তেমন জায়গায় বেড়ে ওঠে।

ইউরোপের ঠান্ডা আবহাওয়ায় এর চাষ ছিল অত্যন্ত কঠিন। কিন্তু সাহেব সুবোদের মুখে আনারসের স্বাদ এমন ভাবেই লেগে যায় যে আমদানি অপ্রতুল হলেও এর এক ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয়।যার দাম হয়ে যায় এতোটাই আকাশ ছোঁয়া যে শেষমেশ খাওয়ার বদলে সাজিয়ে রাখাটাই হয়ে দাঁড়ায় আভিজাত্যের প্রতীক।শিল্প এবং স্থাপত্যেও আনারস স্থান পেতে শুরু করে। লন্ডনের চার্চ থেকে স্কটল্যান্ডের বাড়ির খিলানেও স্থান পেয়ে যায় আনারস। এমনকি উইম্বলডন ট্রফির চূড়াতেও শোভা বর্ধন করে এই ফল। জাহাজে করে ইউরোপে পৌঁছুতে পৌঁছুতে অনেক আনারস নষ্ট হয়ে যেত, এরসাথে চাষের অনুপযুক্ত পরিবেশ।তাই গ্রীন হাউসে চেষ্টা শুরু হয় আনারস ফলানোর।তাতেও উল্লেখযোগ্য সাফল্য এলো না।তাতে আলাদাভাবে ধোঁয়ার মাধ্যমে উত্তাপ দেওয়ার চেষ্টা করা হল। চাষের জন্য যে ঘর তৈরি করা হল তার নামকরণ হল পিনাচার্ড।

১৮১৫ সালে মার্কিন রণতরীতে যুক্ত হল বাষ্প চালিত ইঞ্জিন । আস্তে আস্তে যখন এই বাষ্পীয় ইঞ্জিন নৌ চলাচলে বহুল ব্যবহার শুরু হল তখন আনারস পরিবহনের সমস্যাও অনেকটা দূরীভূত হয়েগেল। বার্বাডোজ থেকে ইংল্যান্ডে আমদানি শুরু হল আনারসের।

ভাস্কো-দা-গামা ভারতে পৌঁছানোর পর মালদ্বীপ, সিলোন সহ দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন জায়গায় তাদের উপনিবেশ গড়ে উঠতে থাকল।

সে সময় চট্টগ্রাম ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ বন্দর।আইনি আকবরিতেও চট্টগ্রামের উল্লেখ রয়েছে।কোলকাতার গর্ভ সঞ্চার তখন দূরস্থান। গঙ্গার প্রবাহ মুর্শিদাবাদে দু'টো ভাগে বিভক্ত হয়ে প্রবাহিত।একটি দক্ষিণ দিকে আর একটি পূর্বদিকে। পূর্বদিকের ধারাটি ব্রহ্মপুত্র, মেঘনা হয়ে চট্টগ্রামে বঙ্গোপসাগরে মিশেছে।বাংলায় হোসেন শাহী রাজ বংশের রাজধানী হল গৌড়। চট্টগ্রাম হয়ে গৌড়ে যাতায়াতের জলপথটিই ছিল সহজতর।১৫১৬ সাল থেকে কয়েকবারের প্রচেষ্টার পর ১৫৩৬ সালে চট্টগ্রাম এবং সপ্তগ্রামে দুর্গ ও বাণিজ্য কুঠি তৈরি করতে সক্ষম হয় পর্তুগিজরা।

সুতরাং এই ঘটনা থেকে এটাই বুঝাতে পারা যায় দীর্ঘ কয়েক দশকের পদচারণা এবং থিতু হয়ে বসার মাধ্যমেই এই অঞ্চলে আনারসের আগমন ঘটেছিল।এর সাথে যদি আগে উল্লিখিত আনানাস থেকে আনারস শব্দের উৎপত্তির বিষয়টি মেলাই তাহলে পর্তুগিজদের মাধ্যমে আনারসের আগমনের ধারনাটিকেই আরও পুষ্ট করে।



এশিয়ার বিভিন্ন জায়গা সহ ট্রপিক্যাল ও সাব ট্রপিক্যাল অঞ্চলের উপযুক্ত পরিবেশে ক্রমে ক্রমে আনারসের বিস্তার এবং বংশ বিস্তার ঘটে চলে উপনিবেশ স্থাপনের মাধ্যমেই।ফিলিপিন্স, থাইল্যান্ড, বার্মা সহ পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় তার বিস্তার ঘটে চলে।বর্তমানে কোস্টারিকা, ব্রাজিল, ফিলিপিন্সের মত দেশ গুলোতে প্রচুর আনারসের উৎপাদন হয়।

এখন কথা হল বর্তমান ত্রিপুরা সহ পার্বত্য চট্টগ্রামে এই "ওমোতুই" উৎপাদন কিভাবে শুরু হল? কারন পার্বত্য অঞ্চলের জনজাতিরা জুম চাষ করে। আনারস তো জুমের ফসল বলে মনে হয়না।এই গুচ্ছ ফল গাছ রোপন থেকে শুরু করে ফল পাকা পর্যন্ত সময় নেয় দেড় বছর।একটা হতে পারে খাওয়ার পর ফেলে দেওয়া অংশ থেকে লাল মাটি আর উপযুক্ত জল হাওয়ায় প্রথম এমনিতেই বাড়তে থাকে।

পর্তুগিজরা ভারতে আসার পর তাদের রান্নাবান্নায় সে দেশীয় স্বাদ আনতে গেলে যে সমস্ত জিনিসের প্রয়োজন হত এ দেশে সেগুলো ছিলনা।তাই কাছাকাছি স্বাদের জন্য নতুন বিভিন্ন উপকরণ ব্যবহার করতে শুরু করে। এমন কিছু খাবার তৈরি হয় যা পর্তুগালেরও নয় আবার ভারতীয়ও নয়।আমরা চালকুমড়া,আনারস ইত্যাদির মোরব্বা খাই, সেই মোরব্বা তেমনি একটা মুখরোচক খাবার। ভারতের কেরালাতেও আনারস চাষ শুরু হয়েছিল। ঘটনা প্রবাহ থেকে এটাও বুঝতে পারা যায় এরা সচেতন ভাবেই আনারসকে বাঁচিয়ে রেখেছিল। পর্তুগিজরা উপনিবেশ স্থাপন, বাণিজ্য করার সাথে সাথে খ্রীস্ট ধর্মও প্রচার করত। একদিকে অত্যাচার, শোষণ আর অন্যদিকে বিক্ষুব্ধ দেশবাসী কে শান্ত রাখতে প্রেমের বাণী বিতরণ করা শুরু করে। ভারতের কয়েক শতকের ঔপনিবেশিক যুগে এটাই চলে এসেছে।এই সব ধর্ম প্রচারকরা ধর্ম প্রচারের পাশাপাশি অসুস্থের সেবা,শিক্ষা, বিভিন্ন উপার্জনে পথ তৈরি করা ইত্যাদি কাজ করত।শিলচরের অনতিদূরে মণিপুর সীমান্তের কাছাকাছি লক্ষীপুর বলে একটা জায়গা আছে, যেখানে (হ)মার জনজাতির বসবাস।এদের খৃষ্টান ধর্মে দীক্ষিত করা হয়েছিল।১৯৩২ সালে জেমস রবার্ট নামের একজন মিশনারী ত্রিপুরা থেকে আনারস নিয়ে যান।এই (হ)মাররা এটাকে তাদের জীবিকা হিসেবে গ্রহন করে। এছাড়া বর্তমান ঊণকোটি ত্রিপুরার দারচৈ, নেপাল টিলা ইত্যাদি জায়গায় অভিবাসী ডারলং সম্প্রদায়ের লোকেরাও আনারস চাষকে জীবিকা হিসেবে গ্রহন করে।এই ডারলংরাও খ্রীস্টান।যদিও বর্তমানে সে সমস্ত এলাকায় আনারস চাষের জায়গা নিচ্ছে সুপারি, রাবার। মিজোরাম থেকে বিস্থাপিত জম্পুই এবং অন্যান্য জনজাতি মানুষের মধ্য এগ্রিকালচারের মাধ্যমে উপার্জনের একটা প্রবনতা লক্ষ করা যায়।এরা সবাই খ্রীষ্টান মিশনারীদের সংস্পর্শে এসেছিল।

বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলেও আনারসের উৎপাদন হয়, যে সমস্ত অঞ্চল গুলো ত্রিপুরা, মিজোরাম,সন্নিহিত।এছাড়া হিমালয়ের পাদদেশে উত্তরবঙ্গেও আনারস উৎপাদন হয়। বাংলাদেশের টাঙ্গাইলের পার্শ্ববর্তী মধুপুর আনারসের জন্য বিখ্যাত। সেখানকার গাড়ো সম্প্রদায়ের এক মহিলা ১৯৪২ সালে মেঘালয় থেকে আনারস নিয়ে চাষের সূচনা করেন। চট্টগ্রামের রাঙ্গামাটির নানিয়ারচরকে বলাহয় সেখানকার আনারসের রাজধানী। ভারতের মণিপুরেও আনারস চাষের প্রচলন রয়েছে।

অমরমাণিক্যের আমলে (১৫৭৭ - ১৫৮৬) কিছু সংখ্যক পর্তুগিজদের ভাড়াটে সৈনিক হিসেবে নিয়োগ করা হয়।এরা রাঙ্গামাটি অর্থাৎ বর্তমান উদয়পুরে বসবাস শুরু করে।১৭৬০ সালে কৃষ্ণমাণিক্য যখন বর্তমান পুরাতন আগরতলায় রাজধাণী স্থানান্তর করেন তখন এদের বংশধররাও চলে আসে।রাজা কাশীপুর সংলগ্ন এলাকায় ভূমি দান করেন।মাতা মেরীর নামানুসারে জায়গার নামকরণ হয় মরিয়ম নগর। সেখানে এদের বসতী সমেত ক্যাথলিক চার্চ গড়ে ওঠে।তাহলে কি এদের হাত ধরেই আনারস আগরতলায় এসেছিল? কিন্তু কথা হল এদের রাজার প্রদত্ত জমিও এরা রাখেনি।এদের পেশা প্রথমে কি ছিল, এরা আনারস চাষ করত কিনা সেটাও একটা প্রশ্ন। মরিয়ম নগর সংলগ্ন নন্দন নগরের অনেক বছর আগেই আনারস চাষ শুরু হয়।পর্তুগিজরাই কি সেখানে আনারস চাষের সূচনা করেছিল? অতীতে নন্দন নগর, মোহনপুর, লেম্বুছড়া মিলিয়ে আগরতলার পাশ্বথবর্তী অঞ্চলে ত্রিপুরার জনজাতি অংশের মানুষই আনারস চাষ করা শুরু করে।সেই আনারস হল ক্যুইন প্রজাতির।পরবর্তী সময়ে দেশ ভাগের ফলে বর্তমান সিপাহীজলা জেলাতেও বাঙালিদের মাধ্যমে এই চাষ ছড়িয়ে পড়ে।

প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমান থেকে জানা যায় মেক্সিকো এবং পেরুতেও মানুষ আনারসের ব্যবহার করত।১৯০০ সালে আমেরিকার হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জে আলফ্রেড ডব্লিউ ইমেস ব্যাপক ভাবে আনারসের বাণিজ্যিক চাষ শুরু করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে অন্যান্য জায়গার উৎপাদিত আনারস এবং আনারস জাত বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্য সেই বাজার দখল করে।

আগে ত্রিপুরার একটা কথা প্রচলিত ছিল,"আনা দরে আনা যায় কত আনারস"। অর্থাৎ এই ফলটি ছিল সহজ লভ্য।এই বছর অর্থাৎ ২০২৫ মরশুমে প্যারাডাইস চৌমুহনীতে দু'খানা গন্ডাছড়ার আনারসের দাম চাইল পঞ্চাশ টাকা।আকৃতিও খুবই ছোট।আজ ক্রেতার কাছে আনারসও মেহেঙ্গা। আনারস চাষ, বাজার জাত করণ থেকে গৃহস্থের হাতে পৌঁছনো পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটির অনুসন্ধান করলেই এর বাণিজ্যিক উৎপাদনের পরিস্থিতি কি আছে সেটা আন্দাজ করা সম্ভব।

তবে আনারস রয়ে যাবে আরও বহুকাল আর নিঃশব্দে রয়ে যাবে তাঁর ইতিহাস।

আরও পড়ুন...


Post Your Comments Below

নিচে আপনি আপনার মন্তব্য বাংলাতেও লিখতে পারেন।

বিঃ দ্রঃ
আপনার মন্তব্য বা কমেন্ট ইংরেজি ও বাংলা উভয় ভাষাতেই লিখতে পারেন। বাংলায় কোন মন্তব্য লিখতে হলে কোন ইউনিকোড বাংলা ফন্টেই লিখতে হবে যেমন আমার বাংলা কিংবা অভ্রো কী-বোর্ড (Avro Keyboard)। আমার বাংলা কিংবা অভ্রো কী-বোর্ডের সাহায্যে মাক্রোসফট্ ওয়ার্ডে (Microsoft Word) টাইপ করে সেখান থেকে কপি করে কমেন্ট বা মন্তব্য বক্সে পেস্ট করতে পারেন। আপনার কম্পিউটারে আমার বাংলা কিংবা অভ্রো কী-বোর্ড বাংলা সফ্টওয়ার না থাকলে নিম্নে দেয়া লিঙ্কে (Link) ক্লিক করে ফ্রিতে ডাওনলোড করে নিতে পারেন।

Free Download Avro Keyboard

Fields with * are mandatory





Posted comments

Till now no approved comments is available.