ধর্ষণ মামলায় জরিমানার বিধান, ত্রিপুরায় ‘জামাতিয়া কাস্টমারি ল’ নিয়ে নতুন আইনি ও সাংবিধানিক প্রশ্ন
মধুমিতা ভট্টাচার্য, আইনজীবী
May 17, 2026
ত্রিপুরায় আবারও আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে উপজাতীয় প্রথাগত আইন বা কাস্টমারি ল। বিশেষ করে ‘জামাতিয়া কাস্টমারি অ্যাক্ট, ২০১৭’-এর একটি বিতর্কিত ধারাকে ঘিরে প্রশ্ন উঠেছে। যদিও এই আইনটি ২০১৭ সালে ত্রিপুরার স্বশাসিত জেলা পরিষদ পাশ করেছে, কিন্ত সম্প্রতি তিপ্রামথার এডিসি-র প্রশাসন আরও কিছু কাস্টমারী ল' নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে একটি মামলার প্রেক্ষাপটে এই ভুলে ভরা আইনটির বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ত্রিপুরা ও দিল্লির একাধিক আইন বিশেষজ্ঞ। অভিযোগ উঠেছে, এই আইনের একটি বিধানে ধর্ষণের মতো গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রেও অভিযুক্ত ব্যক্তি আর্থিক জরিমানা বা সামাজিক নিষ্পত্তির মাধ্যমে পার পেয়ে যাওয়ার সুযোগ পেতে পারেন। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর একাধিক আইনজীবী, মানবাধিকার কর্মী, আইন বিশ্লেষকদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বর্তমানে এই বিতর্ক শুধুমাত্র একটি আইনের ধারা নিয়ে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি ত্রিপুরায় উপজাতীয় স্বায়ত্তশাসন, সংবিধানের ষষ্ঠ তফসিল, প্রথাগত বিচারব্যবস্থা এবং ভারতের আধুনিক ফৌজদারি আইনের সম্পর্ক নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু হল জমাতিযাদের কাস্টমারী ল' এর ধারা ১৪৩। এই ধারায় 'Punishment for enticement and rape of woman' অর্থাৎ নারীকে প্রলুব্ধ করা ও ধর্ষণের শাস্তি হিসাবে জরিমানা সম্পর্কিত বিধান রয়েছে। সমালোচকদের অভিযোগ, এই ধারায় গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রেও প্রথাগত সামাজিক প্রতিষ্ঠান গুলির মাধ্যমে আর্থিক দণ্ড বা সামাজিক শাস্তির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, যা ভারতের প্রচলিত ফৌজদারি আইন ব্যবস্থার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ধর্ষণ একটি অ-আপসযোগ্য (non-compoundable) অপরাধ। অর্থাৎ এই ধরনের অপরাধে কোনও সামাজিক আপস, আর্থিক জরিমানা বা পারিবারিক সমঝোতার মাধ্যমে মামলার নিষ্পত্তি আইনত বৈধ নয়। এটি সরাসরি রাষ্ট্র বনাম অভিযুক্তের মামলা এবং এর বিচার করার একমাত্র ক্ষমতা রয়েছে আইনানুগ ফৌজদারি আদালতের।
ভারতীয় ফৌজদারি আইনে ধর্ষণের অবস্থান
বর্তমানে ভারতের নতুন ফৌজদারি আইন ভারতীয় ন্যায় সংহিতা অনুযায়ী ধর্ষণ অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত। ধর্ষণ, গণধর্ষণ, অপ্রাপ্তবয়স্কদের উপর যৌন নির্যাতন কিংবা পুনরাবৃত্ত অপরাধের ক্ষেত্রে কঠোর কারাদণ্ড, যাবজ্জীবন এমনকি কিছু ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে।
আইন বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, এ ধরনের অপরাধে কোনও প্রথাগত প্রতিষ্ঠান, সামাজিক পরিষদ বা উপজাতীয় আদালতের বিচারিক ক্ষমতা থাকতে পারে না। কারণ ভারতীয় সংবিধান ও ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থা অনুযায়ী এ ধরনের অপরাধ তদন্ত করবে পুলিশ এবং বিচার করবে নিয়মিত আদালত। ২০১৭ সালে
টিটিএএডিসি
এই আইনটি প্রণয়ন করেছিল তাদের কাস্টমারী ল হিসাবে। ভারতের সংবিধানের ষষ্ঠ তফসিলের অধীনে উপজাতীয় স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা গুলিকে কিছু বিশেষ ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে। সেই ক্ষমতার ভিত্তিতে ত্রিপুরার বিভিন্ন উপজাতীয় সম্প্রদায়ের সামাজিক রীতি, প্রথা ও ঐতিহ্যকে সংরক্ষণের লক্ষ্যে টি টি এ ডি সি এখন পর্যন্ত উনিশটি কাস্টমারি আইন তৈরি করেছে। কিন্ত এখন পর্যন্ত জমাতিযাদের কাস্টমারী ল ছাড়া বাকি গুলি ত্রিপুরা সরকারের পর্যবেক্ষণে রয়েছে। টিভি এ ডি সি অনুমোদনের পরেও কেন ত্রিপুরা সরকার বাকি কাস্টমারী ল গুলির অনুমোদন করছেন না এই ইসূতে এডিসি-র প্রশাসন ইতিমধ্যেই রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন। আর তখনি স্ক্রুটিনীতে জমাতিযাদের কাস্টমারী আইনে এই গুরুতর বেনিয়মটি প্রকাশ্যে এসেছে।
জামাতিয়া সম্প্রদায়ের সামাজিক কাঠামো ও বিচার ব্যবস্থার অংশ হিসেবে ‘হদা’, ‘ওকরা’ এবং ‘পাঞ্চাই’-এর মতো ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান গুলিকে এই আইনে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। তারাই সামাজিক অপরাধের বিচার করার অধিকারী। দীর্ঘদিন ধরে এই প্রতিষ্ঠান গুলি ধর্ষণের মত অপরাধ সহ বিবাহ, সামাজিক বিরোধ, পারিবারিক সমস্যা এবং সম্প্রদায় ভিত্তিক নানা বিষয়ে সালিশি ও সামাজিক নিয়ন্ত্রণের ভূমিকা পালন করে আসছে।
কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, এই প্রতিষ্ঠান গুলিকে কিভাবে ধর্ষণের মতো গুরুতর অপরাধের আসামীদের দোষ বিচারের অধিকার দেয়া হল? তাও আবার জেলে না পাঠিয়ে ধর্ষণের শিকার মহিলাদের শুধুমাত্র জরিমানার নামে টাকা দিয়ে পৈশাচিক যৌন অপরাধের আসামীদের মুক্তি পাওয়ার সুযোগ করে দেয়া যেতে পারে স্বাভাবিক ভাবেই এই প্রশ্ন উঠেছে।
সংবিধান বিশেষজ্ঞদের মতে, ষষ্ঠ তফসিল উপজাতীয় সংস্কৃতি ও সামাজিক প্রথাকে সুরক্ষা দিলেও তা ভারতের মূল সংবিধান ও ফৌজদারি আইনের ঊর্ধ্বে নয়। বিশেষত নারী অধিকার, সমান আইনি সুরক্ষা এবং মৌলিক অধিকারের প্রশ্নে কোনও প্রথাগত আইন যদি সাংবিধানিক নীতির সঙ্গে সংঘর্ষে আসে, তাহলে আদালতে তা চ্যালেঞ্জ হতে পারে।
সমালোচকদের বক্তব্য, ধর্ষণের মামলায় আর্থিক জরিমানা বা সামাজিক নিষ্পত্তির বিধান থাকলে তা ভুক্তভোগী নারীর উপর সামাজিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে পরিবার বা সমাজের চাপে পুলিশে অভিযোগ না করে স্থানীয় প্রথাগত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মীমাংসা করার প্রবণতা তৈরি হতে পারে। এতে ন্যায়বিচার ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আইন বিশ্লেষকদের মতে, ধর্ষণের মতো অপরাধকে সামাজিক বা আর্থিক সমঝোতার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করার ধারণা আধুনিক মানবাধিকার ও নারী সুরক্ষার পরিপন্থী।
অন্যদিকে, আইনের সমর্থকরা বলছেন যে এই আইনটির উদ্দেশ্য ছিল জামাতিয়া সম্প্রদায়ের ঐতিহ্য, সামাজিক পরিচয় এবং নিজস্ব শাসন কাঠামোকে রক্ষা করা। তাদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে উপজাতীয় সমাজে প্রচলিত সামাজিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ও প্রথাগত বিচার পদ্ধতিকে আইনি স্বীকৃতি দেওয়ার জন্যই এই আইন তৈরি হয়েছিল।
তাদের যুক্তি, প্রথাগত প্রতিষ্ঠান গুলি সবসময় অপরাধকে প্রশ্রয় দেয় না, বরং অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তবে সমর্থকদের একাংশও স্বীকার করছেন যে ধর্ষণের মতো গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে আধুনিক ফৌজদারি আইনের ভূমিকা স্পষ্ট হওয়া দরকার।
বৃহত্তর বিতর্কের সূচনা
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে এখন ত্রিপুরায় আরও বড় বিতর্ক শুরু হয়েছে, উপজাতীয় কাস্টমারি ল এবং ভারতের আধুনিক আইনি কাঠামোর মধ্যে সীমারেখা কোথায়?
বিশেষজ্ঞদের মতে, উপজাতীয় সংস্কৃতি সংরক্ষণ অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সেই সংরক্ষণের নামে যদি এমন কোনও বিধান থাকে যা নারী অধিকার বা মৌলিক ন্যায়বিচারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়, তাহলে তা নিয়ে বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনা হওয়া স্বাভাবিক।
আইনজীবীদের একাংশ মনে করছেন, ভবিষ্যতে এই ধরনের ধারা গুলি আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। বিশেষ করে গুরুতর ফৌজদারি অপরাধের ক্ষেত্রে প্রথাগত বিচার ব্যবস্থার ভূমিকা কতটা বৈধ, তা নিয়ে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত বিতর্ক গড়াতে পারে।
সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া
ত্রিপুরার বিভিন্ন মহলে ইতিমধ্যেই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকেই দাবি তুলেছেন যে সরকার ও টিটিএএডিসি-র উচিত বিতর্কিত ধারাগুলি নিয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া। (লেখক একজন আইনজীবী)
আরও পড়ুন...