অর্ধ শতাব্দী পর বঙ্গে ডাবল ইঞ্জিন

পান্নালাল রায়

May 4, 2026

পাঁচ রাজ্যের বিধানসভার ভোটে প্রত্যাশিত সাফল্য যেমন বিজেপি-কে আগামী দিনের জন্য ভোট রাজনীতিতে এগিয়ে রাখছে,তেমনই দেশের বিরোধী শক্তির জন্যও তা এক অশনি সংকেত।পাঁচ রাজ্যের ভোটের মধ্যে সর্বাধিক চমকপ্রদ ঘটনা হচ্ছে অর্ধ শতাব্দী পর বিপুল ভোটাধিক্যে বঙ্গে ডাবল ইঞ্জিন সরকার প্রতিষ্ঠা।দক্ষিণ ভারতে এগিয়ে যাওয়ার সংকেতও বিজেপি'র পক্ষে যথেষ্ট উৎসাহ ব্যঞ্জক।সর্বোপরি কেন্দ্র বিরোধী জিগির যে পশ্চিমবঙ্গ ও তামিলনাড়ুর মানুষ প্রত্যাখ্যান করেছেন দুই রাজ্যের নির্বাচনী ফলাফলও তার স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে।

পাঁচ রাজ্যে বিধানসভার ভোট হলেও এবার আকর্ষণের কেন্দ্র বিন্দু ছিল পশ্চিমবঙ্গ। রাজ্যটি বরাবরই নানা ইস্যুতে রাজনৈতিক বিতর্ক আর সংঘাতের শিরোনামে থাকে।আর ভোটের মুখে তা যে একেবারে তুঙ্গে উঠবে সেটা বলাই বাহুল্য। গত কয়েক মাস ধরে পশ্চিমবঙ্গ বিভিন্ন ইস্যুতে সর্ব ভারতীয় সংবাদ মাধ্যমের শিরোনামে।শুরুটা হয়েছিল এস আই আর দিয়ে।ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনী(এস আই আর) প্রক্রিয়ার কথা ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে বঙ্গে প্রতিবাদের ঝড় উঠে।মামলা মোকদ্দমা থেকে হুমকি ধমকি শুরু হয় পশ্চিমবঙ্গের শাসকদল তৃণমূলের পক্ষ থেকে।এমনকি খোদ মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি প্রকাশ্য জনসভা থেকে এই ইস্যুতে নির্বাচন কমিশন ঘেরাও'র ঘোষণা দেন।রাজ্যব্যাপী তৃণমূলের তৃণমূল স্তরের সংগঠন সোচ্চার হয়ে উঠে এস আই আর-এর বিরোধিতায়।প্রথমে তারা বলে একটি নামও যাতে ভোটার তালিকা থেকে বাদ না যায়।পরে তা সংশোধন করে বলা হয় একজন ন্যায্য ভোটারের নামও যেন ভোটার তালিকা থেকে বাদ না যায়।পাল্টা বি জে পি থেকে বলা হয় রোহিঙ্গাদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দিতে হবে।এস আই আর নিয়ে আড়াআড়ি ভাবে ভাগ হয়ে পড়ে দুই শিবির।নির্বাচন কমিশন অবশ্য বরাবরই বলে আসছিল স্বচ্ছ ভোটার তালিকার জন্যই এস আই আর। এটা নতুন কিছু নয়,আগেও এমনটা হয়েছে।মৃত,স্হানচ্যুত,একাধিক জায়গায় থাকা নাম ইত্যাদি ঝাড়াই বাছাই করার জন্যই ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন। দেশের আরও ১২টি রাজ্যে এস আই আর হলেও শুধু পশ্চিমবঙ্গই এ নিয়ে পক্ষে বিপক্ষে সমালোচনায় মুখর হয়ে উঠে রাজনৈতিকদলগুলো।মামলা মোকদ্দমা থেকে ঘেরাও, অশান্তি বাদ যায়নি কিছুই। তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা ব্যানার্জি এস আই আর-এর বিরুদ্ধে এতটাই সোচ্চার ছিলেন যে,তিনি নির্বাচন কমিশনকে প্রতিনিয়ত সমালোচনার বাণে বিদ্ধ করতে থাকেন। এমনকি মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধেও তিনি ভ্যানিশ কুমার নাম দিয়ে সমালোচনার বাণ নিক্ষেপ করেন। ভোটার তালিকা থেকে নাম ভ্যানিশ করে দিচ্ছেন তিনি! সব মিলিয়ে ভোট প্রচারে প্রধান ইস্যু হয়ে পড়ে এস আই আর। কিন্তু নির্বাচন কমিশন তাদের নির্দিষ্ট নিয়মে এস আই আর চালিয়ে যেতে থাকে।অশান্তি এবং রাজ্য সরকারে থাকা তৃণমূল তথা মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির প্রবল বিরোধিতার মধ্যেও এস আই আর চলতে থাকে।প্রায় ৯০ লাখ নাম তালিকা থেকে বাদ পড়ার সম্ভাবনা প্রকট হতেই বিজেপি'র নেতা কর্মীদের মুখে হাসি দেখা দিয়েছিল,যা প্রবল উচ্ছ্বাসে পরিণত হয় সোমবার ভোট গণনার পরে। বঙ্গ বিজেপি'র বক্তব্য ছিল যে নামগুলো বাদ পড়েছে তারাই এতদিন ধরে তৃণমূল কংগ্রেসকে জিতিয়ে দিত অবৈধ ভোটের মাধ্যে! এবার পশ্চিমবঙ্গে উন্নয়ন, অনুন্নয়ন, দুর্নীতি কিছুই যেন ইস্যু হয়নি।এমনকি ইস্যু হয়নি পাইয়ে দেয়ার রাজনীতিও। এস আই আর যেন সব নির্বাচনী ইস্যুই গ্রাস করে নিয়েছিল।আর অবশ্যই ধর্মীয় মেরুকরণের রাজনীতিও প্রবল ভাবে প্রভাবিত করেছে নির্বাচনকে।বিজেপি'র সর্ব স্তরের নেতৃবৃন্দ আগেই বলেছিলেন এবার হিন্দু ভোট এককাট্টা হবে।আর তা হবে মমতার তোষণের রাজনীতির বিরুদ্ধে।বিজেপি নেতৃবৃন্দের আগাম কথা ভোট বাক্সে প্রতিফলিত হয়েছে বলা যায়।তবে অনুন্নয়ন, বেকারি,চাকরি চুরি,দুর্নীতি, আর জি কর ইত্যাদি নিশ্চিত পশ্চিমবঙ্গের ভোটকে প্রবল ভাবে প্রভাবিত করেছে।হয়তো ভোটের মুখে তা তেমন ভাবে প্রচারে আসেনি,কিন্তু সারা বছরই এসব প্রচারে ছিল। মানুষের বুকে ক্ষোভের পাহাড় জমছিল আগে থেকেই। ইভিএম-এ তার বিস্ফোরণ ঘটে।সর্বোপরি এবারকার ভোটে পশ্চিমবঙ্গের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দুই দল,তৃণমূল এবং বিজেপি,উভয়ের প্রচারেই ছিল হুমকি ধমকি।সাধারণ মানুষ এ সব মোটেই পছন্দ করেন না।পছন্দ করেননি ভোট প্রচারে শালীনতার সীমা লঙ্ঘনও। দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে কটূক্তি,প্রধানমন্ত্রীর অহেতুক সমালোচনা,অহেতুক কেন্দ্র বিরোধী জিগির বঙ্গবাসীরা যে একেবারেই পছন্দ করেননি ইভিএম তার প্রমাণ দিচ্ছে।শুধু কেন্দ্র বিরোধী জিগিরই নয়,দেশের গো বলয়কে নিশানা করে বিজেপি বিরোধী ভাষণ বক্তৃতায় সরব হয়েছিল তৃণমূল। নিশানা করা হয়েছিল গুজরাট,উত্তর প্রদেশকে,যা কিনা দেশের সংহতির পক্ষেও ছিল ভয়ঙ্কর হুমকির মতো।বাঙালিরা এ ধরণের বিভাজন কখনও পছন্দ করেন না,এবার ভোট বাক্সেও তার বিরূপ প্রতিক্রিয়া প্রতিফলিত হয়েছে।পশ্চিমবঙ্গের মতো কেন্দ্র বিরোধী জিগির তামিলনাড়ুর মানুষও যে আর পছন্দ করছেন না,তাও ভোটবাক্সে প্রতিফলিত হয়েছে।স্ট্যালিনের ডিএমকে সাম্প্রতিক কালে নানা ইস্যুতে কখনও কেন্দ্র বিরোধী,কখনও বা হিন্দির বিরোধিতায় সোচ্চার হতেন।তামিলনাড়ুর মানুষ যেন এবার এই একঘেয়েমী রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছিলেন। তামিলনাড়ুর মানুষ এবার দ্রাবিড় রাজনীতির দুই ধারার বাইরে এসে উজাড় করে ভোট দিয়েছে তামিল সুপারস্টার থলপতি বিজয়ের দল 'তামিলাগা ভেট্রি কাঝাগাম'-কে।যদিও তামিলনাড়ুতে এবার অপর একটি আঞ্চলিক দলেরই অভ্যুদয় ঘটেছে,তবু,ডিএমকে'র পরাজয় বিজেপি-কে স্বস্তি দেবে।বাড়ছে বিজেপি'র সম্ভাবনাও।কেরালাতে প্রত্যাশিত ভাবেই কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউডিএফ দশ বছর পর ক্ষমতায় ফিরে এসেছে।বিজেপি দুটি আসন লাভ করেছে।ভোটের হারেও বিজেপি'র অগ্রগমন আগামী দিনের জন্য কেরালা নিঃসন্দেহে তাদের আশা জাগিয়েছে।অসমের কথা আর নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না।বিজেপি'র শুধু হ্যাট্ট্রিকই নয়,অসমে এবারে বিজেপি'র বিশাল জয় উত্তর পূর্বাঞ্চল তো বটেই,সারা দেশেই তাদের পক্ষে এক বিরাট ইতিবাচক বার্তা দেবে।

বঙ্গ ভোটের কথায় আবার আসা যাক।আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে,নির্বাচন পাঁচ রাজ্যে হলেও সারা দেশের চোখ ছিল পশ্চিমবঙ্গের প্রতি।নির্বাচন নিয়ে বঙ্গে এমন সব ঘটনা ঘটে যায় যেমনটা ইতিপূর্বে পরিলক্ষিত হয়নি।তবে নির্বাচন কমিশনের কঠোর ব্যবস্থা পশ্চিমবঙ্গবাসীর সপ্রশংস দৃষ্টি আকর্ষণ করে।পশ্চিমবঙ্গে মৃত্যুহীন এবং প্রায় রক্তপাতহীন ভোট গত অর্ধ শতাব্দী ধরে রাজ্যবাসী দেখেনি,এবার যা দেখা গেছে।ভোটের হারও সর্ব কালের রেকর্ড ছাপিয়ে গেছে।ভোটের পর এমন সব রিপোর্ট বেরিয়ে এসেছে যাতে দেখা গেছে,গত পনেরো বছর ধরে ভোট দিতে পারেননি এমন অনেকে এবার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পেরেছেন। মানুষের এইসব ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটেছে ভোটবাক্সে,বিজেপি ফসল তুলেছে তাদের বিপুল জয়ের।শেষপর্যন্ত তৃণমূল নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে কামান দাগতে দাগতে 'স্ট্রংরুম' রাজনীতিতেও জড়িয়ে পড়ে।হয়তো রেকর্ড ভোটদান ও এক্সিট পোল সমীক্ষায় তৃণমূল দেয়ালের লিখন পড়তে পেরেছিল এবং একটা শেষ চেষ্টা করেছিল 'স্ট্রংরুম' ঘিরে নানা অভিযোগ করে।লোক জমায়েত,মধ্যরাত অব্দি স্ট্রংরুমে মুখ্যমন্ত্রীর উপস্থিতি,চমকপ্রদ সব ঘটনা প্রবাহ! শেষপর্যন্ত বিজেপি-ও নেমে পড়ে এই রাজনীতিতে।কিন্তু নির্বাচন কমিশনের নজিরবিহীন কড়া ব্যবস্থা সব কিছু ভেস্তে দেয়।এমনকি সোমবার ডায়মন্ডহারবারে গণনা কেন্দ্র থেকে তৃণমূল নেতা অভিষেক ব্যানার্জিকে বের করে দেয়া হয়।ভবানীপুর আসনের গণনা কেন্দ্রে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি ও বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর মোবাইল ফোন বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দেয়া হয়।ঘটনা প্রবাহ সব নজিরবিহীন।

পশ্চিমবঙ্গে প্রায় শতাব্দীকাল পর বহু কথিত ডাবল ইঞ্জিনের সরকার আসছে বলা যায়।১৯৭৭ সালের পর পশ্চিমবঙ্গে একনাগাড়ে প্রায় সাড়ে তিন দশক বামফ্রন্টের শাসন এবং তারপর একনাগাড়ে দেড় দশক তৃণমূল কংগ্রেসের শাসন চলেছে।সেই সময়কালে কেন্দ্রে কখনও কংগ্রেস, কখনও অকংগ্রেসী সরকার,আবার কখনও বিজেপি সরকার। কখনও কেন্দ্রে বন্ধু সরকার থাকলেও বঙ্গে ঠিক ডাবল ইঞ্জিন সরকার বলতে যা বোঝায় তা কিন্তু ছিল না।অবশ্য 'ডাবল ইঞ্জিনে'র শব্দবন্ধ তখন ব্যবহারেও আসেনি।গত প্রায় অর্ধ শতাব্দীর বেশিরভাগ সময়ই বঙ্গ রাজনীতির কেন্দ্রে ছিল কেন্দ্রীয় সরকারের বিরোধিতা।এবার বঙ্গে ডাবল ইঞ্জিনের সরকার আসায় নিশ্চিত তার অবসান ঘটবে।সর্বোপরি এবার বিজেপি'র বঙ্গ বিজয় সহ অন্যত্র তাদের সাফল্য বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিকে দুর্বল করবে,অন্তত আগামী কিছুকাল!

আরও পড়ুন...


Post Your Comments Below

নিচে আপনি আপনার মন্তব্য বাংলাতেও লিখতে পারেন।

বিঃ দ্রঃ
আপনার মন্তব্য বা কমেন্ট ইংরেজি ও বাংলা উভয় ভাষাতেই লিখতে পারেন। বাংলায় কোন মন্তব্য লিখতে হলে কোন ইউনিকোড বাংলা ফন্টেই লিখতে হবে যেমন আমার বাংলা কিংবা অভ্রো কী-বোর্ড (Avro Keyboard)। আমার বাংলা কিংবা অভ্রো কী-বোর্ডের সাহায্যে মাক্রোসফট্ ওয়ার্ডে (Microsoft Word) টাইপ করে সেখান থেকে কপি করে কমেন্ট বা মন্তব্য বক্সে পেস্ট করতে পারেন। আপনার কম্পিউটারে আমার বাংলা কিংবা অভ্রো কী-বোর্ড বাংলা সফ্টওয়ার না থাকলে নিম্নে দেয়া লিঙ্কে (Link) ক্লিক করে ফ্রিতে ডাওনলোড করে নিতে পারেন।

Free Download Avro Keyboard

Fields with * are mandatory





Posted comments

Till now no approved comments is available.