রামকুমারঃ বিস্মৃত অধ্যায়ের উজ্জ্বল উদ্ধার

পান্নালাল রায়

May 3, 2026

" ...অশোক পত্রের কাণ্ড লেখনী করিয়া;

গলিত পল্লব যত, প'ড়ে আছে ইতস্ততঃ

লেখিলাম সে সকল একত্র করিয়া;

পড়িয়া দেখিও নাথ!নির্জ্জনে বসিয়া।..."

উপরোক্ত লাইন ক'টি হচ্ছে ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষদিকে উত্তর পূর্বাঞ্চলে রচিত পত্র কাব্যের এক উজ্জ্বল উদাহরণ।অশোকবনে বন্দিনী জানকী তাঁর অসহায় অবস্থার কথা জানিয়ে পত্র লিখছেন স্বামী রামকে।কিন্তু লিখলেন কি ভাবে? অশোক বনে কালি-কলম কোথায়? পত্র কাব্যের শুরুতেই রয়েছে এর উত্তর-

"চিরিয়া সকল অঙ্গ সুদীর্ঘ নখরে;

না পাই শোণিত তায়, শুকিয়া গিয়াছে হায়,

বাহিরায় এক বিন্দু বহুক্ষণ পরে;

সেই রক্তে লিখিলাম অতি ধীরে ধীরে।"

অশোক বনে বন্দিনী অসহায় সীতা নিজ রক্ত দিয়ে পত্র লিখলেন স্বামীকে।মহাকবি কালিদাসের 'অভিজ্ঞান শকুন্তলম্'-এর শকুন্তলাও পদ্মপাতায় নখ দিয়ে অক্ষর ফুটিয়ে পত্র লিখেছিলেন রাজা দুষ্মন্তকে।

যাইহোক, উত্তর পূর্বাঞ্চলে রচিত এই পত্রকাব্যের অপর অংশে কর্ণের উদ্দেশ্যে পদ্মাবতী লিখছেন-

"কৃষ্ণার্জ্জুন অসাক্ষাতে, এক দিন সমরেতে,

বধিলা সকলে মিলি অভিমন্যু বীরে;

করিয়া অন্যায় যুদ্ধ ব্যূহের ভিতর।।"

ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে উত্তর পূর্বাঞ্চলে বাংলা সাহিত্যের বলিষ্ঠ আত্ম প্রকাশের সূচনা ঘটেছিল যাদের কলম ধরে তাদের মধ্যে অগ্রণী হচ্ছেন রামকুমার নন্দী মজুমদার।তাঁর 'নবপত্রিকা' কাব্যে পুরাণ ও মহাকাব্যের নয়জন নারী তাদের স্বামীর উদ্দেশ্যে পত্র লিখেছেন।মাইকেল মধুসূদনের 'বীরাঙ্গনা' কাব্যে অনুপ্রাণিত হয়ে রামকুমার ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দশকে রচনা করেছিলেন 'নবপত্রিকা' পত্রকাব্য।এটি অবশ্য কবির দ্বিতীয় পত্রকাব্য।রামকুমারের (১৮৩১-১৯০৪খ্রিঃ)জীবদ্দশাতে অবশ্য তাঁর 'নবপত্রিকা' পত্রকাব্য প্রকাশিত হয়নি।রচনার সোয়াশো বছর পর কবির মূল পাণ্ডুলিপির ফটোগ্রাফ সহ মুদ্রিত গ্রন্হাকারে পত্রকাব্যটি পাঠকের কাছে এসেছে। পদ্ম কুমারী চাকমা সম্পাদিত রামকুমার নন্দী মজুমদারের 'নবপত্রিকা কাব্য' গ্রন্হটি আগরতলার বাংলা আকাদেমি ২০২৫ সালে পাঠকদের হাতে তুলে দিয়েছে।উত্তর পূর্বাঞ্চলে বাংলা সাহিত্যের অনুসন্ধিৎসু পাঠকদের কাছে নিঃসন্দেহে এ এক দুর্লভ প্রাপ্তি।

'নবপত্রিকা' কাব্যে পুরাণ ও মহাকাব্যের যে নয়জন নারী তাদের স্বামীর উদ্দেশ্যে পত্র রচনা করেছেন তারা হলেন সুনীতি,দ্রৌপদী, জানকী,দেবযানী,সুলোচনা, পদ্মাবতী,মন্দোদরী,সুভদ্রা এবং দময়ন্তী।উত্তানপাদের উদ্দেশ্যে সুনীতি,ভীমের প্রতি দ্রৌপদী, রামের প্রতি জানকী,যযাতির প্রতি দেবযানী,মাধবের প্রতি সুলোচনা, কর্ণের প্রতি পদ্মাবতী, রাবণের প্রতি মন্দোদরী,অর্জুনের প্রতি সুভদ্রা এবং নলের উদ্দেশ্যে পত্র রচনা করেছেন দয়মন্তী। আলোচ্য গ্রন্হটি সম্পাদনা করতে গিয়ে পদ্ম কুমারী চাকমা চমৎকার ভাবে পুরাণ ও মহাকাব্যে সংশ্লিষ্ট নারীদের অবস্থান বিশ্লেষণ করেছেন এবং সেই সঙ্গে তুলে ধরেছেন ভারতীয় ঐতিহ্যের প্রেক্ষাপট। মাইকেল মধুসূদনের পত্রকাব্যের নায়িকাদের সঙ্গে আলোচ্য 'নবপত্রিকা' কাব্যের নায়িকাদের তুলনা করে সম্পাদক বলেছেন,এ ক্ষেত্রেও নায়িকারা নিজ নিজ স্বাতন্ত্র্যে সমুজ্জ্বল। 'নবপত্রিকা' কাব্যের কবি রামকুমার পুরাণ ও মহাকাব্যের যে সব আখ্যান নায়িকাদের পত্রের বিষয় হিসেবে বেছে নিয়েছেন সম্পাদক পদ্ম কুমারী চাকমা তাও তুলে ধরেছেন,বিশ্লেষণ করেছেন। যেমন দ্রৌপদীর পত্রে রামকুমার বেছে নিয়েছেন ভীম কর্তৃক কীচক বধের কাহিনি,মহাভারতের বিরাট পর্বের পঞ্চদশ থেকে বিংশ অধ্যায়ে যা বর্ণিত রয়েছে।জানকীর পত্রে কবি বেছে নিয়েছেন রামায়ণের সুন্দর কাণ্ড, যাতে বর্ণিত আছে হনুমানের হাতে সীতার চূড়ামণি দেয়ার কথা।এটিকেই রামকুমার পত্রে রূপান্তরিত করেছেন।

পত্রকাব্যের সংজ্ঞা থেকে কি ভাবে বাংলা ভাষায় পত্রকাব্য রচনার ধারা এসেছে তাও উল্লেখ করেছেন আলোচ্য গ্রন্হের সম্পাদক।A dictionary of Literary Terms and Literary Theory গ্রন্হের Epistle সংজ্ঞা উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, বাংলায় পত্রকাব্য রচনার ধারা এসেছে পাশ্চাত্যের Epistle থেকে।এই ভাবে বিষয় থেকে বিষয়ের গভীরে গিয়ে বিশ্লেষণ সহকারে আলোচ্য গ্রন্হের সম্পাদক উত্তর পূর্বাঞ্চলের ঊনবিংশ শতকের এক কবিকে তুলে ধরেছেন একবিংশ শতকের পাঠকদের কাছে।

রামকুমারের অন্যান্য প্রকাশিত রচনার কথাও সম্পাদক তাঁর গ্রন্হে তুলে ধরেছেন।এর মধ্যে রয়েছে বীরাঙ্গনা পত্রোত্তর, উষোদ্বাহ কাব্য,গীতি সঞ্চয়ন,পরমার্থ সঙ্গীত, মালিনীর উপাখ্যান (গদ্য),ভগবতীর জন্ম ও বিবাহ(যাত্রা পালা),কংসবধ (যাত্রা পালা) ইত্যাদি।রামকুমারের রচনা সম্পর্কে আলোকপাত করতে গিয়ে সম্পাদক পদ্ম কুমারী চাকমা বলেছেন, সময়োপযোগী প্রাচীন রীতির সাহিত্য রচনা করলেও রামকুমার আধুনিক চিন্তা চেতনার প্রবাহে অবগাহন করেছেন,এগিয়ে এসেছেন নব্য চেতনাকে প্রতিষ্ঠিত করতে।প্রতিষ্ঠা দিয়েছেন যুক্তিবাদকে।যেমন 'মালিনীর উপাখ্যান'-গদ্য আখ্যানে মালিনী তার পিতার কাছে চিঠিতে সমাজে নারীর অবস্থান সম্পর্কে প্রশ্ন উত্থাপন করে।যেমন- 'জন্মমাত্রেই বালককে সুসন্তান বলেন, কিন্তু সেইটি যথার্থ সুসন্তান হইবে কি কুসন্তান হইবে কে বলিতে পারেন?তদানীন্তন সময়ে মেয়েদের বিদ্যাশিক্ষা সম্পর্কিত কুসংস্কারের বিরোধিতাও করা হয়েছে 'মালিনীর উপাখ্যানে'। উমেশচন্দ্র দেব রচিত রামকুমারের জীবনী 'রামকুমার চরিত' মুদ্রিত হয়েছিল ১৯১৯ সালে।১৮৩১ সালে শ্রীহট্টের পাটলি গ্রামে এক আর্থিক অসচ্ছল পরিবারে তিনি জন্ম গ্রহণ করেন। মাত্র ১২ বছরে তিনি 'দাতাকর্ণ' যাত্রাপালা রচনা করেন। খুব অল্প বয়সেই তাঁর সাহিত্য প্রতিভার স্ফূরণ ঘটে।ফার্সি ভাষা সহ বিদ্যা শিক্ষার জন্য কিশোর বয়সে তিনি ত্রিপুরাতেও এসেছিলেন একসময়। যৌবনে তিনি কর্মসংস্থানের জন্য যখন শিলচর চলে আসেন তখন সবে মাত্র শিলচর ব্রিটিশ অধিকৃত কাছাড়ের জেলা সদর হিসেবে গড়ে উঠেছে।শিলচরে এক বেসরকারি চাকরির পর তাঁর আর্থিক দুশ্চিন্তা দূর হয়।তিনি ব্রতী হন সাহিত্য ও সঙ্গীত চর্চায়।শিলচরে দীর্ঘ কর্মজীবন অতিবাহিত করার পর রামকুমার ১৮৮৯ সাল শেষে গ্রামের বাড়িতে ফিরে গিয়ে সাহিত্য রচনায় পুরোপুরিই মনোনিবেশ করেন। সেই সময়কালেই 'নবপত্রিকা' কাব্যটি রচিত বলে ধারণা করা হয়। আলোচ্য গ্রন্হের সম্পাদক রামকুমারের জীবন ও সাহিত্য রচনা,তদানীন্তন শিলচরের বর্ণনা ছোট পরিসরে হলেও তুলে ধরায় গ্রন্হটি এক ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে।গ্রন্হের মুখবন্ধ অংশে দক্ষিণ অসমের বিশিষ্ট সাহিত্য ও ইতিহাস গবেষক অমলেন্দু ভট্টাচার্য লিখেছেন,রামকুমার উত্তর পূর্ব ভারতে বাংলা সাহিত্য চর্চার ধারায় আধুনিকতার সূচনা করেছিলেন।উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে জনরুচি অনুযায়ী তিনি একদিকে রচনা করেছেন যাত্রাপালা,পাঁচালি,কবিগান এবং অপরদিকে মাইকেল মধুসূদনের কাব্যশৈলীত প্রভাবিত হয়ে তিনে লিখেছেন পত্রকাব্য। অমলেন্দু বাবু আরও লিখেছেন,স্বাধীনতা পূর্বকালে বরাক-সুরমা উপত্যকার সাহিত্য অনুরাগীরা রামকুমারের সৃষ্টি কর্ম সম্পর্কে অবহিত থাকলেও স্বাধীনতা উত্তরকালে তিনি ধীরে ধীরে বিস্মৃতির পর্যায়ে চলে যান।এই পরিপ্রেক্ষিতে রামকুমারের সাহিত্য রচনা নিয়ে আলোচনা ও অতীতের সাহিত্য নিদর্শন সংরক্ষণে এগিয়ে আসায় তিনি ত্রিপুরা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহঃ অধ্যাপক ড.পদ্ম কুমারী চাকমার প্রশংসা করেন।

গ্রন্হটির দীর্ঘ ভূমিকায় সম্পাদক লিখেছেন, রামকুমার তাঁর গদ্য আখ্যান 'মালিনীর উপাখ্যানে' যেমন স্ত্রী শিক্ষার সপক্ষে কথা বলেছেন,তেমনই 'নবপত্রিকা' কাব্যে নারীরাই প্রধান চরিত্র। কবি তাঁর কাব্যে সনাতন ভারতীয় ঐতিহ্যের প্রেক্ষাপটে নারীর চিরন্তন লালিত্যময় কোমল রূপটিকেই বিশেষ ভাবে তুলে ধরতে চেয়েছেন। প্রাচীন ভারতে নারীর সামাজিক গুরুত্ব ও অবস্থান সম্পর্কে সম্পূর্ণ সচেতন থেকেই রামকুমার তাঁর কাব্যের নায়িকাদের চরিত্র নির্মাণ করেছেন। ভারতীয় ঐতিহ্যের প্রতি অকুণ্ঠ শ্রদ্ধা রেখে প্রয়োজনে স্হানীয় লোক ঐতিহ্যের উপকরণ যুক্ত করেছেন তাতে।

আলোচ্য এই গ্রন্হের মাধ্যমে উত্তর পূর্বাঞ্চলের বাংলা সাহিত্যের এক বিস্মৃত নিদর্শনকে তুলে ধরার জন্য এই অঞ্চলের অনুসন্ধিৎসু পাঠকদের পক্ষে সম্পাদক ড.চাকমার অবশ্যই প্রশংসা প্রাপ্য। আশা করি আগামী দিনেও তাঁর এ ধরণের প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।

নবপত্রিকা কাব্য,রামকুমার নন্দী মজুমদার,সম্পাদনা পদ্ম কুমারী চাকমা,বাংলা আকাদেমি,আগরতলা,প্রচ্ছদ উমা মজুমদার,মূল্য ৩৬০ টাকা।

আরও পড়ুন...


Post Your Comments Below

নিচে আপনি আপনার মন্তব্য বাংলাতেও লিখতে পারেন।

বিঃ দ্রঃ
আপনার মন্তব্য বা কমেন্ট ইংরেজি ও বাংলা উভয় ভাষাতেই লিখতে পারেন। বাংলায় কোন মন্তব্য লিখতে হলে কোন ইউনিকোড বাংলা ফন্টেই লিখতে হবে যেমন আমার বাংলা কিংবা অভ্রো কী-বোর্ড (Avro Keyboard)। আমার বাংলা কিংবা অভ্রো কী-বোর্ডের সাহায্যে মাক্রোসফট্ ওয়ার্ডে (Microsoft Word) টাইপ করে সেখান থেকে কপি করে কমেন্ট বা মন্তব্য বক্সে পেস্ট করতে পারেন। আপনার কম্পিউটারে আমার বাংলা কিংবা অভ্রো কী-বোর্ড বাংলা সফ্টওয়ার না থাকলে নিম্নে দেয়া লিঙ্কে (Link) ক্লিক করে ফ্রিতে ডাওনলোড করে নিতে পারেন।

Free Download Avro Keyboard

Fields with * are mandatory





Posted comments

Till now no approved comments is available.