২০২৬ পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা ভোট: জয়ের ব্যাটন নিয়ে জল্পনা

সঞ্জয় রায়।

April 29, 2026

সাম্প্রতিক সময়ে, ভারতের কোনো বিধানসভা নির্বাচনই সম্ভবত পশ্চিমবঙ্গের চলমান নির্বাচনের মতো এত বিপুল আলোচনা ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এমন উন্মাদনা সৃষ্টি করতে পারেনি। এই নির্বাচনকে 'সব নির্বাচনী লড়াইয়ের জননী' হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে। দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীর কাছে এটি এখন হয়' বাঁচা কিংবা মরা' (do-or-die) পরিস্থিতি অথবা ‘এখনই নয়ত কখনোই নয়। একদিকে, তৃণমূল কংগ্রেসের (TMC) সুপ্রিমো এবং পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (মমতা) টানা চতুর্থবারের মতো নিজের ঘাঁটি রক্ষা করার লক্ষ্য নিয়ে লড়ছেন। অন্যদিকে, বিজেপি—যারা খুব অল্প সময়ের মধ্যেই রাজ্যে নিজেদের প্রভাব ও উপস্থিতি বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছে—তারাও পশ্চিমবঙ্গ জয় করার লক্ষ্যে তাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার ভোটে বিজেপির জয় নির্বাচনী কৌশলের (playbook) জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেবলমাত্র কৌশলগত কারণেই নয়—যেমন 'চিকেনস নেক' বা 'মুরগির ঘাড়' নামে পরিচিত শিলিগুড়ি করিডোর, যা উত্তর-পূর্ব ভারতকে ভারতের বাকি অংশের সাথে সংযুক্ত করে—বরং আদর্শগত দৃষ্টিকোণ থেকেও এটি সমান তাৎপর্যপূর্ণ। কারন পশ্চিমবঙ্গ হলো ভারতীয় জনসংঘের (বিজেপির পূর্বসূরি দল) প্রতিষ্ঠাতা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের জন্মভূমি; তাই এই রাজ্যে জয়লাভ করা রাজনৈতিক ও আদর্শগত—উভয় দিক থেকেই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও এক মাইলফলক। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছেও এই নির্বাচনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি জানেন, যদি তিনি এই নির্বাচনে পরাজিত হন, তবে পাঁচ বছর পর ঘুরে দাঁড়ানো বা পুনরায় ক্ষমতায় ফেরা তাঁর জন্য এক অত্যন্ত কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি- অমিত শাহ জুটির তত্বাবধানে বিজেপির জন্য ও হয়ত শেষ সুযোগ- পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় বিজেপির জয় প্রতিষ্ঠিত ও নিশ্চিত করা।

বিজেপি দীর্ঘকাল ধরেই বাংলার দিকে নজর রেখে আসছে এবং ধাপে ধাপে এই রাজ্যে নিজেদের ভিত্তি গড়ে তুলেছে। ২০১১ সালে মাত্র ৪.১৪ শতাংশ ভোট দিয়ে দলটি তাদের যাত্রা শুরু করেছিল। ২০১৬ সালে তাদের ভোটের হার বেড়ে ১০.২৮ শতাংশে পৌঁছায় এবং তিনটি আসনে জয়লাভ করে; ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি ১৮টি সংসদীয় আসনে জয় লাভ করে। পশ্চিমবঙ্গের বুকে তাদের পূর্ববর্তী ফলাফলের তুলনায় এটি ছিল এক উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি; মোট ৪২ আসনের মধ্যে ১৮টি তে জয়ী হওয়ার পাশাপাশি বিজেপি ৪০.২ শতাংশ ভোট পেয়েছিল। কিন্তু ২০২১ বিধান্সভা নির্বাচনে ভোটের হার কমে ৩৮.২৬ শতাংশ হয় এবং দলটি ৭৭টি আসন নিশ্চিত করে। ২০২৪ সালে লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি মোট মাত্র ১২টি তে জয়ী হয় এবং ভোটের হার ৩৮.৭ শতাংশের কাছাকাছি থাকে। তাই এই বার বাংলাকে জয় করার লক্ষ্যে দলটি যেন তাদের সর্বশক্তি ও সাংগঠনিক কাঠামোকে পুরোপুরি কাজে লাগানোর চেষ্ঠা করেছে। বিজেপি "বহিরাগত" লেবেলগুলি থেকে দূরে সরে যেতে এবং স্থানীয় শিকড়কে শক্তিশালী করার জন্য তার নেতৃত্বের কাঠামোকে সংশোধন করেছে। ‘বুথ-লেভেল ম্যানেজমেন্ট’ কৌশল প্রয়োগ করেছে। টিএমসির শক্তিশালী তৃণমূল ক্যাডারকে মোকাবেলা করার জন্য প্রতিটি বুথের জন্য পর্যবেক্ষক নিয়োগ করেছে। 2021 সালের সমালোচনা প্রশমিত করার জন্য প্রার্থী নির্বাচন স্থানীয় মুখ এবং "মাটির ছেলে" প্রার্থী করার উপর জোর দিয়েছে। বিজেপি ভালো করেই জানে যে, তৃনমূল কংগ্রেস এক দুর্ধর্ষ প্রতিপক্ষ —যার কোনো তুলনা হয় না এবং যা বিজেপি অন্য কোনো রাজ্যে ক্ষমতায় আসার আগে ত্তটা কখনো প্রত্যক্ষ করেনি। কারন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর সমসাময়িক রাজনীতিকদের মধ্যে অন্যতম কুশলী ও দক্ষ একজন নেত্রী; তিনি তাঁর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের কূটকৌশল ও চাতুর্যের যোগ্য জবাব দিতে যে পুরোপুরি সক্ষম, তা বারবার প্রমাণ করেছেন।

মূলত গত বছর রাজ্যে ভোটার তালিকা সংশোধনের জন্য চালু করা 'বিশেষ নিবিড় সংশোধন কর্মসূচি' (SIR) তৃণমূল কংগ্রেসের সমস্যাকে বাড়িয়ে তুলেছে। এই SIR প্রক্রিয়ার ফলে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ৬৩ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ পড়ে—যাদের মৃত্যু হয়েছে অথবা যারা বাংলার বাইরে চলে গেছেন। এছাড়া গত ৬ এপ্রিল প্রকাশিত সম্পূরক তালিকায় আরও ২৭ লক্ষ মানুষকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়। এই ২৭ লক্ষ নামের অধিকাংশই মুর্শিদাবাদ, মালদা এবং উত্তর দিনাজপুর জেলার—যেখানে মুসলিমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। অনেকেই জানেন মহিলাদের পাশাপাশি, মুসলিমরাও তৃণমূল কংগ্রেসের অন্যতম প্রধান ভোটব্যাঙ্ক।

ভোটার তালিকা সংশোধনের একটি রুটিন প্রশাসনিক প্রক্রিয়া হিসেবে চালু হওয়া ‘SIR’-এর মাধ্যমে ৯১ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ পড়া ইস্যুকে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবারের পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনে প্রচারের মুখ্য বিষয় হিসাবে গুরুত্ব দেন এবং এই বিষয়টিকেই তিনি ও তার দল তুরুপের তাস হিসাবে বেছে নেন, সঙ্গে এবারও বাঙালী অস্মিতাকে কাজে লাগিয়ে বিধানসভা নির্বাচনে প্রচারে সরব হন। গত ফেব্রুয়ারি মাসে, একজন কর্মরত মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে নজিরবিহীন এক পদক্ষেপ নিয়ে তিনি সুপ্রিম কোর্টে উপস্থিত হন। সেখানে তিনি একজন 'সাধারণ নাগরিক' হিসেবে পশ্চিমবঙ্গের নাগরিকদের ওপর ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার ফলে সৃষ্ট 'অভূতপূর্ব দুর্ভোগ ও দুর্দশার' বিরুদ্ধে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন। মার্চের প্রথম সপ্তাহে, তিনি কলকাতায় ব্যাপক হারে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার (SIR deletions) বিরুদ্ধে এক সপ্তাহব্যাপী অবস্থান বিক্ষোভ শুরু করেন।

তবে বিজেপিও পিছিয়ে ছিল না। তারা ভোটার তালিকা সংক্রান্ত এই বিষয়টিকে কাজে লাগিয়ে মেরুকরণের তাস খেলে এবং হিন্দু ভোট একত্রিত করার চেষ্টা চালায়। তারা একটি পাল্টা বয়ান বা 'কাউন্টার-ন্যারেটিভ' তৈরি করে প্রচার করতে থাকে যে, অতীতে তৃণমূল সরকার কীভাবে ভুয়া ভোটারদের ব্যবহার করে নিজেদের সংখ্যা বাড়িয়েছিল; এবং এর ফলে কীভাবে অনুপ্রবেশকারীরা বাংলায় প্রবেশ করেছে এবং সীমান্ত এলাকাগুলোতে রাজ্যের জনবিন্যাস ধীরে ধীরে বদলে দিচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী মোদী ছাড়াও, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার সদস্যদের পাশাপাশি, বিজেপি অন্তত অর্ধ-ডজন বিজেপি-শাসিত রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকেও নির্বাচনী প্রচারে শামিল করেছে। বিজেপিএবার তৃণমূল কংগ্রেসের (TMC) বিরুদ্ধে ভোটারদের অসন্তোষকে—বিশেষ করে মানুষের মনে দানা বাঁধা 'ভয়ের উপাদান' বা 'fear factor'-কে—পুরোপুরি কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছে । বস্তুত, এবারের নির্বাচনী প্রচারণায় বিজেপির অন্যতম প্রধান স্লোগান হলো—"বাঁচতে চাই, তাই বিজেপি চাই"। ২০২১/ ২০২৪ সালের নির্বাচনের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে—যেখানে তৃণমূল 'বাঙালি অস্মিতা' বা বাঙালি আত্মপরিচয়কে একটি বড় নির্বাচনী ইস্যু বানিয়েছিল এবং যা বিজেপিকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করতে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিল—গেরুয়া শিবির এবার উত্তর ভারত থেকে কয়েকজন বাংলাভাষী নেতাকে প্রচারে নামিয়েছে, তাঁদের মধ্যে প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী স্মৃতি ইরানি এবং বিহারের তরুণ বিজেপি বিধায়ক মৈথিলী ঠাকুর , ত্রিপুরার বর্তমান ও প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীগন ইত্যাদি।

এমন নয় যে, ভোটারদের মধ্যে যে অসন্তোষ দানা বেঁধেছে, সে সম্পর্কে মমতা অবগত নন। গত ১৫ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকায়, নিজের সরকারের বিরুদ্ধে যে প্রবল 'সরকার-বিরোধী হাওয়া' বইছে, সে সম্পর্কে তিনি পুরোপুরি সচেতন। পরিকাঠামোর অভাব থেকে শুরু করে কর্মসংস্থানহীনতা; দুর্নীতি থেকে শুরু করে 'সিন্ডিকেট রাজ'—সরকারের ব্যর্থতা ও প্রতিশ্রুতি পূরণে অক্ষমতা নিয়ে একেরপর যে অভিযোগের ঝড় তুলেছেন প্রধানমন্ত্রী থেকে অন্যান্য নেতৃত্ববৃন্দ, সে সম্পর্কে অবগত। তবেএ কথাও অনস্বীকার্য যে, বাস্তব পরিস্থিতি বা 'মাঠের লড়াইয়ে'—ভোটারদের মনে নানা অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও—মমতার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা কম-বেশি অটুটই রয়েছে। সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বললে একটি কথা বারবার শোনা যায়—"দিদি ভালো, কিন্তু দিদির সঙ্গের লোকেরা ঠিক নয়।" ভোটারদের—বিশেষকরে নারী ভোটারদের সঙ্গে তাঁর যে গভীর সংযোগ রয়েছে, সে সম্পর্কে মমতা নিজেও বেশ সচেতন। 'লক্ষ্মীর ভাণ্ডার' হলো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নেতৃত্ব সরকারের অন্যতম জনপ্রিয় প্রকল্প যার মাধ্যমে রাজ্যের লক্ষ লক্ষ নারী প্রতি মাসে ১,০০০ টাকা করে আর্থিক সহায়তা পাচ্ছিলেন। নির্বাচনের ঠিক আগে তিনি এই মাসিক অনুদানের পরিমাণ বাড়িয়ে সাধারণ ক্যাটাগরির নারীদের জন্য ১,৫০০ টাকা এবং তফসিলি জাতি ভুক্ত নারীদের জন্য ১,৭০০ টাকা করেন। বিজেপি বুঝতে পেরেছিল যে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এক্ষেত্রে 'অগ্রাধিকারের সুবিধা' ভোগ করছেন। অর্থাৎ, নারী ভোটারদের ওপর তাঁর যে প্রবল প্রভাব বা নিয়ন্ত্রণ রয়েছে, তাতে খুব সামান্যই চিড় ধরেছে। এই পরিস্থিতিকে মোকাবিলা করার একমাত্র উপায় হিসেবে বিজেপি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে ওই আর্থিক অনুদানের পরিমাণ দ্বিগুণ (৩০০০ টাকা) করার প্রতিশ্রুতি দেয়।

এছাড়া, উভয় রাজনৈতিক দলই আরও একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভোটব্যাঙ্ককে নিজেদের দিকে টানার চেষ্টা করেছে—আর তা হলো রাজ্যের বাইরে কর্মরত লক্ষ লক্ষ বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিক। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাস থেকে শুরু করে বিশেষট্রেন—প্রবাসীদের ভোট দিতে ফিরিয়ে আনার জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের লজিস্টিকবা যাতায়াত ও আনুষঙ্গিক সহায়তা বিজেপি এবং তৃণমূল কংগ্রেস (TMC)—উভয় দলেরনেতা ও কর্মীরাই প্রদান করেছেন/ আগামীদিন ( ২৯শে এপ্রিল) জারি থাকবে বলে ধারনা করা যায়।

প্রথম পর্বের ভোট গ্রহণের পর উভয় দলই এখন চরম উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছে কারন রেকর্ড পরিমান ৯২.৮৮% ভোট পড়েছে—যা স্বাধীনতার পর থেকে পশ্চিমবঙ্গে সর্বোচ্চ। যেহেতু পশ্চিমবঙ্গে এর আগে কখনো এত বেশি হারে ভোট পড়েনি, তাই উভয়দলই বোঝার চেষ্টা করছে যে নির্বাচনী হাওয়া কোন দিকে বইবে। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার যে এই নির্বাচনের ফলাফল উভয় দলের জন্যই 'অস্তিত্বের লড়াই' বা 'হয়-মরণ-নয়-বরণ' হয়ে দাঁড়াবে। তাই নিজের দলের সদস্যদের মনোবল চাঙা ও ধরে রাখতে দুই-দলই প্রথম পর্বের পর শতাধিক আসনে জয়ী হবে বলে দাবী করছে। ভোটার উপস্থিতির এই হার কি সত্যি এত বৃদ্ধি পেয়েছে না এটা 'SIR' প্রভাব তার কিছু কারন নিম্নে দেওয়া হলো:

১. 'SIR' প্রভাব (এর গাণিতিক কারণ) : এর নেপথ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদানটি হলো নির্বাচন কমিশন কর্তৃক পরিচালিত 'বিশেষ নিবিড় সংশোধন' (Special Intensive Revision - SIR) প্রক্রিয়া। ইহা মূলত হ্রাসকৃত ভাজকের ফলে সৃষ্ঠ। ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ৯১ লক্ষ মৃত, স্থানান্তরিত কিংবা 'ভুতুড়ে' ভোটার হিসেবে চিহ্নিত নাম বাদ দেওয়ার ফলে তালিকা পরিচ্ছন্ন হয়। যখন মোট তালিকা থেকে লক্ষ লক্ষ নিষ্ক্রিয় নাম সরিয়ে ফেলা হয়, তখন ভোটদানে অংশগ্রহণকারী সক্রিয় ভোটারদের হার স্বয়ংক্রিয়ভাবেই অনেক বেশি বলে প্রতীয়মান হয়।

৮৩%-এর বাস্তবতা: প্রাক্তন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার এস.ওয়াই. কুরেশির মতো বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেছেন যে, যদি ওই ৯১ লক্ষ নাম তালিকা থেকে বাদ না দেওয়া হতো, তবে ভোটের হার সম্ভবত ৮৩%-এর কাছাকাছিই থাকত—যা নিঃসন্দেহে একটি উচ্চ হার, কিন্তু বাংলার ভোটের স্বাভাবিক প্রবণতার সঙ্গেই সামঞ্জস্যপূর্ণ। উল্লেখ্য প্রথম পর্বে ২০২১ সালে ১৫২ আসনে মোট ভোটার ছিল ৪.০১ কোটি জন, ভোট দিয়েছিল ৩.৩০ কোটি জন , ভোটের হার ৮২.৩%, আর ২০২৬ সালে ‘SIR’ ফলে ১৫২ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা দাঁড়ায় ৩.৬৪ কোটি, ভোট পরে ৩,৩৭ কোটি , হার ৯২.৫৮%। তার মানে ইহা অনেকাংশেই 'বিশেষ নিবিড় সংশোধন' প্রক্রিয়ার প্রভাব। ১৫২ আসনে মোট ভোটারের সংখ্যা মাত্র ৭ লক্ষ বেড়েছে, আসন প্রতি গড়ে ৪৬০০ জন।

২। অনেকে উচ্চহারে ভোটকে অস্তিত্ব-সংক্রান্ত ভয় ও বাড়তি অনুপ্রেরণা মনে করছেন। NRC (জাতীয় নাগরিক পঞ্জি) ঘিরে ছড়িয়ে পড়া গুজব এবং এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে সৃষ্ট ভয়ের কারণে অনেকেই এমনটা বিশ্বাস করতে শুরু করেছেন যে—যদি তাঁরা ভোট না দেন, তবে হয়তো তাঁরা তাঁদের নাগরিকত্ব কিংবা এই রাজ্যে বসবাসের অধিকার হারিয়ে ফেলতে পারেন। তবে প্রশ্ন হল তার সংখ্যা কত। 'বিশেষ নিবিড় সংশোধন' যাদের নাম ভোটার লিষ্টে আসে নি , তারা ১০-১১%। কিন্তু 'বিশেষ নিবিড় সংশোধন' প্রভাব উপরের দেখানো চিত্র অনুযায়ি “ খুবই ন্যূনতম”।

৩. নিরাপত্তা ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর পজিটিভ ভূমিকাও এই উচ্চ ভোটের কারন বলে গণ্য করা হচ্ছে। নির্বাচন কমিশন নজিরবিহীন সংখ্যক কেন্দ্রীয় বাহিনী এবং মাইক্রো-পর্যবেক্ষক মোতায়েন করেছিল। এর ফলে ঐতিহাসিকভাবে "সংবেদনশীল" এলাকাগুলোতে এক ধরনের নিরাপত্তার বোধ তৈরি হয়, যা সেইসব মানুষকে—যারা সহিংসতার আশঙ্কায় হয়তো ঘরেই থেকে যেতেন—বাস্তবে বেরিয়ে এসে ভোট দিতে উৎসাহিত করে। প্রথম পর্যায়ের এবারের নির্বাচনে তা নিঃসন্দেহে এক উল্লেখযোগ্য ব্যতিক্রম। তার প্রভাব কতদূর কোন দিকে যাবে তা বলা এখনি হয়ত যাচ্ছে না। সঙ্গে কয়েকটি জেলায় (মুর্শিদাবাদ, মালদহ, পুর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুর) মহিলাদের উচ্চহারে ভোটদান।

৪। বামপন্থী ও কংগ্রেসের ভূমিকাঃ বামপন্থী ও কংগ্রেসের ভূমিকা ২০২১ সালের মত দুর্বল অস্তিত্বহীন ছিল না, প্রথম পর্যায়ের শেষে , ভোটের ময়দানে ছিল।প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী বামপন্থী দলগুলি ও কংগ্রেস কিছু জেলায় ভাল প্রতিদ্বন্দিতা করেছে এবং তাদের ভোটারগন সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছে, ফলে হার বেড়েছে।

বলা বাহুল্য, প্রথম পর্যায়ের নির্বাচনে যে ১৫২ আসনে ভোট হয় , ২০২১ সালের নির্বাচনে বিজেপি ৫৯ টি, টিএমসি ৯২ টি ও অন্যান্য ০১ টি আসন লাভ করেছিল। আর ২০২৬ নির্বাচন আবারও মূলত তৃণমূল কংগ্রেস (TMC) এবং ভারতীয় জনতা পার্টির (BJP) মধ্যকার এক লড়াইয়ে পরিণত হতে চলেছে বলে মনে হলেও, সিপিআই(এম) নতুন উদ্যম ও অভিনব চিন্তাভাবনা নিয়ে এই দ্বিমেরুভিত্তিক নির্বাচনী সমীকরণকে চ্যালেঞ্জ জানানোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। সিপিআই(এম)-এর নেতৃত্বাধীন বাম শিবির ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্ট (আইএসএফ) এবং সিপিআই(এমএল) লিবারেশনের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে লড়ছে। সিপিআই(এম) রাজ্যের ২৯৪টি আসনের মধ্যে ১৯৫টিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। চলতি পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে সিপিআই(এম)-এর বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট যুব নেতাকে দলটি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ আসন থেকে প্রার্থী করেছে। রাজ্যে নিজেদের হারানো জমি পুনরুদ্ধারের জন্য সিপিআই(এম) সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কলকাতা, দক্ষিণ ও উত্তর ২৪ পরগনা, হাওড়া ও হুগলিসহ বিভিন্ন জেলার কয়েকটি আসনে সিপিআই(এম) শিবির আশাবাদী যে তাদের যুব ব্রিগেড একটি যুগান্তকারী সাফল্য অর্জন করতে পারবে। কংগ্রেস পার্টি একাই লড়ছে ও প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী কংগ্রেস কিছু জেলায় ( মালদহ, মুর্শিদাবাদ, উত্তরদিনাজপুর) ভাল প্রতিদ্বন্দিতা করেছে এবং কিছু আসনে জয়ের আশা করছে। যদি তাই হয় তবে প্রতিষ্ঠান বিরোধী ভোট নিয়ে শাসক তৃণমূল ও প্রধান বিরোধী বিজেপির ঘুম উবে যেতে পারে। কারন কংগ্রেস/বামপন্থীদের জনগন ভোট করলে, শাসক বা বিজেপি কোন দলের ভোট কাটা যাবে, কেউ বলতে পারবে না।

এখন দ্বিতীয় পর্বের ভোটের জন্য প্রস্তুতি চলছে। দ্বিতীয় দফায় ১৪২টি আসনে ভোটগ্রহণ ২৯শে এপ্রিল, ২০২৬ তারিখে অনুষ্ঠিত হবে। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে, এই নির্দিষ্ট ১৪২টি আসনের মধ্যে , তৃণমূল কংগ্রেস ১২৩ টি, বিজেপি ১৮টি ও ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট ০১ টি জয়লাভ করেছিল। এই দফার ভোট মূলত দক্ষিণবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের (TMC) প্রথাগত শক্ত ঘাঁটি এবং কলকাতার পার্শ্ববর্তী শহরাঞ্চল গুলিকে ঘিরে অনুষ্ঠিত হবে। বিজেপির কাছে এই পর্যায়টি হলো ‘দক্ষিণবঙ্গের দুর্গ’ ভেদ করার চ্যালেঞ্জ। কারণ ২০২১ সালে তারা তাদের মোট ৭৭টি আসনের সিংহভাগই (৫৯) জিতেছিল উত্তরবঙ্গ ও জঙ্গলমহল অঞ্চলে যেখানে ২৩শে এপ্রিল ভোট সমাপ্ত । পর্যবেক্ষন করার বিষয় হল , দ্বিতীয় দফায় কত শতাংশ ভোট পড়ছে। আর বড় প্রশ্নটি হলো, ভোটারদের বিপুল উপস্থিতি কি সরকারের পরিবর্তনের/ প্রত্যাবর্তনের ইঙ্গিত দেয়?



তবে উচ্চ ভোটের হারে সব-সময়ই এক উত্তর হয় না। হাঁ, প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী ভোটারদের উচ্চ উপস্থিতি মানেই হলো ক্ষমতাসীন সরকারের প্রতি জন-অসন্তোষ (anti-incumbency), তবুও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলায় ভোটারদের বিপুল উপস্থিতি প্রায়শই ক্ষমতাসীন দলের প্রতি জনসমর্থন সুদৃঢ় হওয়ারই ইঙ্গিত দিয়েছে—ঠিক ততটাই জোরালোভাবে, যতটা এটি বিরোধী পক্ষের অনুকূলে কোনো জনজোয়ারের ইঙ্গিত দেয়। তাই আগামি ৪ঠা মে ২০২৬ এর দিকে তাকিয়ে থাকাই উচিত।

আরও পড়ুন...


Post Your Comments Below

নিচে আপনি আপনার মন্তব্য বাংলাতেও লিখতে পারেন।

বিঃ দ্রঃ
আপনার মন্তব্য বা কমেন্ট ইংরেজি ও বাংলা উভয় ভাষাতেই লিখতে পারেন। বাংলায় কোন মন্তব্য লিখতে হলে কোন ইউনিকোড বাংলা ফন্টেই লিখতে হবে যেমন আমার বাংলা কিংবা অভ্রো কী-বোর্ড (Avro Keyboard)। আমার বাংলা কিংবা অভ্রো কী-বোর্ডের সাহায্যে মাক্রোসফট্ ওয়ার্ডে (Microsoft Word) টাইপ করে সেখান থেকে কপি করে কমেন্ট বা মন্তব্য বক্সে পেস্ট করতে পারেন। আপনার কম্পিউটারে আমার বাংলা কিংবা অভ্রো কী-বোর্ড বাংলা সফ্টওয়ার না থাকলে নিম্নে দেয়া লিঙ্কে (Link) ক্লিক করে ফ্রিতে ডাওনলোড করে নিতে পারেন।

Free Download Avro Keyboard

Fields with * are mandatory





Posted comments

Till now no approved comments is available.